হামলা সংঘর্ষে রক্তাক্ত সরাইল :চলতি বছরে আট খুন, একশ’পঙ্গু, পাঁচ অন্ধত্ব, আহত সহস্রাধিক

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল :

সংঘর্ষে দাঙ্গাবাজ এবং পুলিশের এএসপি’র গুলির এ্যাকশান
গত দুই বছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা বেড়েই চলেছে। গ্রাম্য ও গোষ্ঠির আধিপত্য বিস্তার, জমি-জমা ও নারী সংক্রান্ত, দল ও দখলবাজি, অর্থ লেনদেন, পূর্ব শত্র“ুতার জের ইত্যাদি কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু চলতি বছরেই সরাইলে ছোট-বড় ১শ’রও বেশী হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় খুন ৮, পঙ্গু শতাধিক, অন্ধত্ব ৫ ও নারী-পুরুষ, পুলিশ ও শিশুসহ আহত সহস্্রাধিক মানুষ। এছাড়াও ৫শতাধিক ঘর-বাড়ি, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরণের যানবাহনে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। এসবের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অগণিত মূল্যের সরকারি গোলাবারুদ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহৃত হয়। পুলিশ সূত্র জানায়, হামলা ও সংঘর্ষে চলতি বছরে উপজেলায় এক শিশুসহ ৮ নারী-পুরুষ নিহত হয়। গত ১মার্চ শাহবাজপুরে মালেকা বেগম, ২০ এপ্রিল পাকশিমুলে দুদু মিয়া, ২৪ মে পানিশ্বরে চাতাল শ্রমিক মাজু মিয়া, ১২ জুন সরাইল উপজেলা চেয়ারম্যানের ছোট ভাই আনিছ উদ্দিন ঠাকুর, কুট্টাপাড়া গ্রামের জামাতা নীল মিয়া, ১১ জুলাই শাহজাদাপুরে সবুজ মিয়া, ২২ জুলাই চুন্টার ঘাগড়াজুর গ্রামের আলী হোসেন খুন হয়। এছাড়া সরাইল সৈয়দটুলা গ্রামের দুই জন, অরুয়াইলের দুই জন ও কালীকচ্ছের একজন সংঘর্ষে মারবেলের আঘাতে অন্ধ হয়ে পড়ে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক মানুষ পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় পুলিশ বাহিনী, প্রশাসন ও সরাইলের সমাজপতিরা কার্যত কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করছেন না। শুধু তামাশাই করে যাচ্ছেন। এলাকায় টানা ২/৩ দিন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চললেও কোন দাঙ্গাবাজকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেন নি। শুধু জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীনদলের নেতাদের তদবিরের দোহাই দিয়ে পুলিশ নীরব থাকছেন। এ বিষয়ে থানায় কোনো মামলা নেয়া হয় না। ফলে দিন দিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেড়েই চলেছে। সরাইলের সুশীল সমাজের একাধিক ব্যক্তি জানান, তারা লজ্জায় মুখ ঢেকে রাখতে হচ্ছে। দেশ-বিদেশের পরিচিত লোকজন মুঠোফোনে তাদের কাছে জানতে চান- সরাইলে এতো হামলা-সংঘর্ষের কারণ কি? ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এলাকায় এসব কি হচ্ছে? সভ্য সমাজের মানুষ হিংস্্র হয়ে উঠছে কেন? এসব প্রশ্নের সদুত্তর তারা দিতে পারেন না। সুশীল সমাজের লোকজন মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের গাফিলতির কারণে হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা বাড়ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে সরাইল অচল হয়ে পড়বে। তাদের অভিযোগ, কোনো এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ যথাসময়ে আসেন না। প্রায় ঘটনাকে তারা দুর্বল চোখে দেখেন। ভূক্তভোগীরা থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও পুলিশ তা আমলে নিতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে এসব কারণেও সংঘর্ষের সূচনা হয়। সরাইলের পুলিশ গ্রাম্য সালিশের ওপর নির্ভর হয়ে পড়ছে। দুর্বল ও পাতানো সালিশের কারণে এলাকায় ফের দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি হচ্ছে। লাখ লাখ টাকা মূল্যের মালামাল লুটতরাজ কিংবা ক্ষতি হলেও সালিশে দু’পক্ষের নামমাত্র আর্থিক জরিমানা হয়। পরবর্তীতে এর জের হিসেবে এলাকায় ক্ষোভ ও উত্তেজনা বাড়ে। তুচ্চ ঘটনায় ফের সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে মানুষ। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় এনজিও সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচালক মো. মমিন হোসেন বলেন, এলাকায় ঘন ঘন সংঘর্ষের কারণে সরাইলের বাহিরে গেলে মুখ লুকিয়ে রাখতে হয়। তিনি বলেন, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতি এবং গ্রাম্য দুর্বল সালিশ ব্যবস্থার কারণেই এমনটি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ করছেন না। সরাইল মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টি সরাইলবাসীর জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ব্যাপার। আমরা তা আশা করি না। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে আরো কঠোর হওয়া উচিত। উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষানুরাগী মো. এমদাদুল্লা মিয়া বলেন, সরাইল উপজেলার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের চরম অবহেলার কারণে সংঘর্ষের ঘটনা বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা রহস্যজনক। কুট্টাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সমাজ সেবক হাজী ইকবাল হোসেন বলেন, এক্ষেত্রে পুলিশের পাশাপাশি সমাজপতিদেরও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। পুলিশ আইন প্রয়োগ করছে না। শুধু পাশ কেটে যাচ্ছে। সমাজে সচেতনতার অভাব রয়েছে। সালিশে সভায় একশ্রেণীর ব্যক্তিরা পক্ষ-পাতিত্ব করে চলেছেন। এই দাঙ্গা রুখতে হলে সবার আন্তরিক ভূমিকা রাখতে হবে।

এ ব্যাপারে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(তদন্ত) মো. আব্বাস উদ্দিন বলেন, যে কোন সময় সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে আমরা নিজেরাই আতঙ্কে থাকি। সামান্য বিষয় নিয়ে মানুষ সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। সরাইল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিন ঠাকুর বলেন, গোষ্ঠিগত ও গ্রাম্য আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিছু কিছু এলাকার মানুষ তুচ্চ ঘটনায় সংঘর্ষে জড়িয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটায়।





Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply