দেবিদ্বারে মাইকে ঘোষণা দিয়ে বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা-ভাংচুর লুটপাটের ঘটনায় বিএনপির নেতা কর্মীদের জড়িয়ে থানায় মামলা ॥ এলাকায় উত্তেজনা, পুলিশ মোতায়েন:

স্টাফ রিপোর্টার:
কুমিল্লার দেবিদ্বারে একটি হত্যা মামলা ও হত্যা প্রচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ঘোষণা দিয়ে বিক্ষুব্ধ প্রায় ৩ শতাধিক গ্রামবাসী হত্যা মামলার আসামীদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন দেবিদ্বার উপজেলার ভানী গ্রামে। এ ঘটনায় নারী-শিশুসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে শনিবার রাতেই পুলিশ প্রহরায় বাড়ি ফিরে এসেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলি।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, গত ১৮ জুলাই শবে বরাতের রাতে দেবিদ্বার উপজেলার ভানী গ্রামের মৃত লাল মিয়ার পুত্র মোঃ হানিফ মিয়াকে জেলার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া থেকে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগে গত ২০ আগস্ট চান্দিনা থানায় তার মা রহিমা বেগম বাদী হয়ে ভানী গ্রামের গৌতম দাস, শিপন দাস, উত্তম দাসসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করে। বর্তমানে ওই মামলার সকল আসামী জামিনে রয়েছে। এলাকাবাসী আরো জানায়, ওই হত্যা মামলার অভিযুক্ত আসামী গৌতম দাস, শিপন দাস, উত্তম দাসসহ তাদের সহযোগীরা টাকা লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ঈদের দিন ভোরে একই গ্রামের মৃত আবদুল আজিজের পুত্র জাহাঙ্গীর আলম কে অপহরণ করে মারধর ও ছুরিকাঘাতপূর্বক মৃত ভেবে কুমিল্লার ময়নামতি এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ফেলে যায়। হাইওয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে ভর্তি করে। ঈদের পরদিন বৃহস্পতিবার আহত জাহাঙ্গীর তাকে অপহরণ ও ছুরিকাঘাত করার ঘটনায় ওই ৩ জনের নাম প্রকাশ করলে এলাকার লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত হামলার উদ্দেশ্যে কয়েকদফা বৈঠক করে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঘোষণা দিয়ে গত শনিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে লাঠি-সোটা, হকিস্টিক নিয়ে গৌতম, শিপন, উত্তম, নয়ন, তপন ও রিপন দাসের ৯টি ঘরে হামলা ভাংচুর ও ব্যাপক লুটপাট চালায় এলাকাবাসী। এসময় হামলাকারীদের কবল থেকে রা পায়নি ওই বাড়ির মন্দির ঘর ও এর ভেতরে থাকা ২টি মূর্তি। প্রায় ঘন্টাব্যাপী ওইসব বাড়িঘরে হামলার সময় পুরুষশূন্য হলেও নারী ও শিশুরা হামলার কবলে পড়ে। এসময় হামলায় লাভলী রাণী দাস (৩৫), পিংকি রাণী দাস (৩৮), জ্যোসনা রাণী দাস (২৬), রিংকু রাণী দাস (৩০), তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী পিয়াসহ কমপে ১০ জন নারী ও শিশু আহত হয়। হামলার ঘটনার সময় ওই এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তী, সহকারি পুলিশ সুপার ইলতুৎমিশ, দেবিদ্বার ও চান্দিনা থানার ওসিসহ অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, ওই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান জানান, শুক্রবার রাতে হামলার পরিকল্পনার কথা জেনে তিনি ভানী গ্রামে গিয়ে এলাকাবাসীর সাথে সমঝোতা বৈঠকের চেষ্টা করলেও গতকাল বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী তার কথা কর্ণপাত না করে হামলা চালায়। দেবিদ্বার থানার ওসি স্বপন কুমার নাথ জানান, হামলার ঘটনায় নুরুল ইসলাম ও আবু মিয়াকে আটক করা হয়েছে। দেবিদ্বার পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি নারায়ণ মাস্টার ও সাধারণ সম্পাদক বিকাশ দাস জানান, জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ব্যক্তিকে হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে নিশ্চিত না হয়ে গ্রামবাসীরা মন্দির ও বাড়ি-ঘরে হামলা ও লুটপাটের বিষয়টি দুঃখজনক। তারা এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে ওই গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এদিকে দেবিদ্বার উপজেলার ভানী গ্রাম এখন অনেকটা পুরুষ শূণ্য। ৭ টি পরিবারের ৯টি ঘরবাড়ি, মন্দির, আসবাব পত্র ভাংচুর চালিয়ে অর্ধকোটি টাকার মালামাল ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। ঘটনায় রাতেই স্বপন কুমার দাস বাদী হয়ে এজাহার নামীয় ১৮ জন এবং অজ্ঞাতনামা ২শ’ লোকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার পর থেকে গ্রেফতার আতংকে ভানী গ্রাম অনেকটা পুরুষ শূন্য হয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানান পুরো ভানী গ্রামের লোকজনই এখন গ্রেফতার আতংকে রয়েছে। শনিবার রাতে মামলা দায়ের করার পর থেকে পুলিশ গ্রেফতার অভিযানে নামে। কিন্তু এর আগেই বিকেল থেকে পুরুষ শূন্য হয়ে পড়ে ওই গ্রামটি। মামলায় মাসুম বিল্লাহ, হুমায়ুন মাষ্টার, তাজুল ইসলাম, সোলেমান ও বিএনপি সমর্থিত স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ সরকারসহ ১৮ জনকে এজাহারভুক্ত করা ছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরো ২শ’ জনকে আসামী করা হয়েছে। মামলার বিষয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ জানান প্রকাশ্যে ওই হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের সাথে জড়িত অনেক ব্যক্তিকে মামলায় আসামী না করে ঘটনার সময় তিনি এলাকায় অবস্থান না করলেও তাকেসহ অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকে রাজনৈতিক আক্রোশে মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্বপন কুমার নাথ জানান ঘটনার সাথে জড়িত না থাকলে কাউকে হয়রানী কিংবা গ্রেফতার করা হবে না। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাহ কামাল আখন্দ জানান এজাহার নামীয় আসামী ছাড়াও ঘটনার সাথে প্রত্য ও পরোভাবে জড়িতদের সনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে ওই এলাকা পুরুষ শূণ্য হয়ে পড়ায় এ পর্যন্ত এজাহার নামীয় নুরুল ইসলাম ও আবু মিয়া নামের ২ জনকে গ্রেফতার করতে সম হয়েছে পুলিশ। পুলিশ প্রহরায় শনিবার রাতেই বাড়ি ফিরেছে তিগ্রস্ত ৭টি হিন্দু পরিবার।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply