সীমাহীন দুর্নীতি আর অনিয়ম নিয়েই চলছে কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১; নতুন সংযোগ পাচ্ছে না গ্রাহকরা

মাসুমুর রহমান মাসুদ, স্টাফ রিপোর্টার :

চান্দিনায় সীমাহীন দুর্নীতি আর অনিয়ম নিয়েই চলছে কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর কার্যক্রম। দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছে গ্রাহকরা। সমিতি কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে তার নেই অজুহাতে নতুন সংযোগ প্রদান বন্ধ রয়েছে দেড় মাস ধরে। নিয়মানুযায়ী সকল কাগজপত্র ও টাকা জমা দেওয়ার পরও সংযোগ পাচ্ছেনা গ্রাহকরা। এদিকে কতিপয় কর্মকর্তাদের ঘুষ গ্রহণের কারণে সমস্যা আরও প্রকট হয়ে দাড়িয়েছে। নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন করার পর থেকে মিটার লাগানো পর্যন্ত চলে ঘুষ গ্রহণের মহোৎসব। শুধু কর্মকর্তারাই নয় ঘুষ লেনদেনের সাথে জড়িত রয়েছে ইলেকট্রিশিয়ানরা, পাশাপাশি সক্রিয় রয়েছে দালাল চক্র। দালালদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে সাধারণ গ্রাহকরা। এদিকে সমিতির প্রধান কার্যালয়ের অভিযোগ কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই হাজারো অভিযোগ রয়েছে। ওয়ান পয়েন্ট সার্ভিস চালু রয়েছে নামে মাত্র।

যেভাবে নেওয়া হয় ঘুষ

নিয়মানুযায়ী একজন গ্রাহক নতুন সংযোগের জন্য ১০০টাকা দিয়ে আবেদন জমা দিবেন। ইন্সপেক্টররা পরিদর্শনের পর বৈধতা যাচাই করে অফিসে রিপোর্ট প্রদান করবেন। রিপোর্টে গ্রাহক বিদ্যুৎ পাওয়ার উপযোগী হলে ৫শত ২২টাকা দিয়ে মিটার বোর্ড ও আর্থিং রড নিয়ে ঘর বা বাড়ি ওয়্যারিং করে ইলেকট্রিশিয়ান দ্বারা ওয়্যারিং রিপোর্ট জমা দিবেন। পরবর্তীতে ওই গ্রাহক ৬শত টাকা মিটার সিকিউরিটি ২০টাকা সদস্য ফি জমা দিবেন। পক্রিয়া শেষ হলে সমিতি কর্তৃপক্ষ নতুন সংযোগ প্রদান করবেন। এভাবে মোট ১ হাজার ২শত ৪২টাকা জমা দিয়ে নতুন সংযোগ গ্রহণ করবেন গ্রাহকরা। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। আবেদনের পর ইন্সপেক্টরদের ৫শত থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ না দিলে পরিদর্শনে যান না। ঘুষের অঙ্ক বেশি হলে ঘটনাস্থলে না গিয়েও পরিদর্শন রিপোর্ট জমা দেওয়া হয় বলে অনেক গ্রাহকরা অভিযোগ করেন। বহুবার ধর্ণা দিয়েও যখন সৎ পন্থায় কাজ হয় না তখন গ্রাহকরা অসদুপায়ে ঘুষ লেনদেনে বাধ্য হন। আর যারা ঘুষ দিতে ভয় পান তারা দালালদের সাহায্য নেন। পরিদর্শনের পর ওয়্যারিং রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময় ১০০ থেকে ৫শত টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়। পরে মিটার টেস্টিং কক্ষ থেকে মিটার নিতে ৩শত থেকে ৫শত টাকা এবং লাইনম্যানদের ২শত টাকা দিয়ে সংযোগ গ্রহণ করতে হয়। এছাড়া খুঁটি অথবা ট্রান্সফর্মার প্রয়োজন হলে ৫-১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। নতুন লাইন নির্মাণের জন্য অফিসিয়াল নিয়মানুযায়ী সকল ফি জমা দেওয়ার পরও অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। কন্ট্রাক্টরদেরকে অতিরিক্ত টাকা না দিলে লাইন নির্মাণ হয় না।

অনিয়মের চিত্র

অনিয়মিত লোডশেডিং এর কারণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। রমজান মাসেও সরকার ঘোষিত লোডশেডিং এর নিয়ম মানছেনা কর্মকর্তারা। জেনারেশন নেই অজুহাতে প্রতিদিন ১২-১৪ ঘন্টা লোডশেডিং হয়। কয়েকজন ভিআইপি’র জন্য অন্য ফিডার লাইনগুলোতে লোডশেডিং বেড়ে যায়। নিয়মানুযায়ী গ্রাহকদের আবেদনপত্র অফিসে সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু আবেদনগুলো দালাল, ইলেকট্রিশিয়ান বা গ্রাহকদের কাছেই থাকে। প্রায়ই ঘটে আবেদন হারানোর ঘটনা। ঘুষের বিনিময়ে ইন্সপেক্টররা ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করেই অফিস সংলগ্ন চা-দোকান বা আশেপাশের দোকানগুলোতে বসে পরিদর্শন রিপোর্টে স্বাক্ষর করেন। অভিযোগ কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই রয়েছে হাজারো অভিযোগ। অভিযোগ কেন্দ্রের ল্যান্ড ফোনটি দীর্ঘদিন যাবৎ বিকল। একটি টেলিফোন সেট ক্রয় করা হচ্ছেনা শুধুমাত্র কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে। অভিযোগ কেন্দ্রের একমাত্র মোবাইল ফোনে হাজার বার চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়না। বহুচেষ্টার পর অভিযোগ দায়ের করলে সিরিয়াল অনুযায়ী কাজ না করে প্রভাবশালী, পরিচিত ও ঘুষ দাতাদের কাজ আগে করা হয়। ওয়ান পয়েন্ট সার্ভিসটি চালু আছে নামেমাত্র। ওই সার্ভিস সেলে এক অবস্থানে থেকেই গ্রাহকরা সেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু যে কোন সমস্যায় ওয়ান পয়েন্ট সার্ভিসে গেলে প্রতিটি কর্মকর্তার টেবিলে ঘুরে চরম হয়রানি হতে হয় গ্রাহকদের। ঠিকাদারদের কাছে তার মওজুদ থাকলেও অফিসে তার না থাকায় নতুন গ্রাহকরা সংযোগ পাচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরিচালক অভিযোগ করেন, নতুন সংযোগ বা অন্য কোন সমস্যায় সাধারণ মানুষ আমাদের কাছে আসলে আমরা অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদের কাছে পাত্তা পাই না। ঘুষ নেওয়া কাজগুলো আগে করা হয়।

জেনারেল ম্যানেজারের বক্তব্য

কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. মজির উদ্দিন আহমেদ খাঁন জানান, আমাদের একমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কুটুম্বপুর সামিট পাওয়ার এর যান্ত্রিক ত্র“টির কারণে ১০ মেগাওয়াট এর মত জেনারেশন কমে গেছে। আমরা ৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে গ্রীড সহ মিলিয়ে ২৪-২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাই। ফলে লোডশেডিং করতেই হবে। অভিযোগকেন্দ্রের বিষয়ে তিনি বলেন, তিন লাখ গ্রাহকের মধ্যে নূন্যতম ১ শতাংশ গ্রাহক প্রতিদিন ফোন করেন ফলে মোবাইলটি খুবই ব্যস্ত থাকে। ল্যান্ড ফোন নষ্ট হয়ে থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। ওয়ান পয়েন্ট সার্ভিসের অনিয়মও তিনি স্বীকার করেন। ঘুষ গ্রহণের বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, “আপনি একদিন অফিসে আসেন, এ বিষয়ে আপনাদের সহায়তা দরকার।”





Check Also

কুমিল্লার চান্দিনায় বাসে পেট্রলবোমা : জামায়াত-শিবিরের ৭ নেতাকর্মী জেল হাজতে

কুমিল্লা প্রতিনিধি :– কুমিল্লার চান্দিনায় বাসে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় আটক জামায়াত-শিবিরের সাত নেতাকর্মী আদালতে জবানবন্দী ...

Leave a Reply