কেমন আছেন সেই আলোচিত বিধবা দেলোয়ারা :প্রশাসনের অবহেলায় আজ তিনি অসহায়

শরিফুল আলম চৌধুরী, মুরাদনগর(কুমিল্লা) প্রতিনিধিঃ

প্রতিবেশীর ঘরে জাল বুননের কাজ করছেন দেলোয়ারা
পাওনা টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে শ্বশুর পরিবারের হাতে নির্মম নির্যাতনে শিকার বিধবা দেলোয়ারা। পর পুরুষের সাথে কথা বলাই কাল হয়ে দাঁড়ার তার জীবনে। শ্বশুর পরিবার ও তাদের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা তাকে পর পুরুষের সাথে কথা বলার অজুহাতে স্বামীর সম্পত্তি হতে বিতারিত করার উদ্দেশ্যে মৌলানা দিয়ে ফতোয়া জারী করে দোররা মারতেনা পারায়, পরে ওই সন্ত্রাসীরা পাশবিক নির্যাতন শেষে ওই বিধবা বাম হাতের কব্জি কেটে দেয়।

আদালত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তার স্বামীর ন্যার্য পাওনা ওই সময়ের ৭দিনের মধ্যে বুঝিয়ে দেয়া সহ তার একমাত্র ছেলের ভরণ পোষণের জন্য ১৫০ টাকার নন জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্পের মাধ্যমে একটি লিখিত চুক্তি হয়। দীর্ঘ ৩ বছর অতি বাহিত হলেও অদ্যবধি দেলোয়ারা ও তার শিশু পুত্র মিজানকে নিয়ে এখনো তার স্বামীর গৃহে উঠতে পারেনি। এবং বুঝে পায়নি তার স্বামীর ন্যায পাওনা। এ অবস্থায় একমাত্র শিশু সন্তানকে নিয়ে চলতি রমযান মাসেও প্রতিবেশী রাজ যোগালী ফরিদ মিয়ার স্ত্রী রওশোন আরা বাড়ীতে অমানবিক ভাবে জীবন যাপন করছেন।

গত ২০০৮ সালের ১৭ আগষ্ট মুরাদনগর উপজেলার কাজিয়াতল গ্রামের মৃত আবদুল কাদের মিয়ার স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম মুষ্টি চালের করা সমিতির টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে প্রতিবেশী মৃত সিরাজ মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর আলমের সাথে কাটা কাটির এক পর্যায়ে দুজনের মধ্যে গালমন্দ বিনিময় হয়। পূর্বশত্রুতার জের ধরে তার শ্বশুর পরিবারেই ঘটনা পুঁজি করে ২০০৮ সালের ২৯ আগষ্ট দেলোয়ারার বিরুদ্ধে স্থানীয় সমাজ পতিদেরকে নিয়ে ফতোয়ার মাধ্যমে তাকে দোররা মেরে গ্রাম ছাড়া করার চেষ্টা করে। পরে ওই সংক্রান্ত সংবাদ দেশের জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের কারনে তাকে দোররা মারতে পারেনি।

পরবর্তী ২০০৯ সালের ১২ মে ওই বিরোধের প্রতিশোধ নেতে একটি কাঁচা আম পাড়াকে কেন্দ্র করে তাকে এলোপাথারী পিটিয়ে তার বাম হাতের কব্জি কেটে কাজিয়াতল ইসলামিয় দাখিল মাদ্রাসার সড়কে অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে রাখলে প্রতিবেশী ফরিদ মিয়া(৪২) ও তার স্ত্রী রওশোন আরা (৩৪) তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সয় ভর্তি করায়। ওই দিন রাতেই দেলোয়ারার শ্বশুর পরিবারের সদস্য ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা হাসপাতালে মেয়ে ফের হামলা চালায়। এবং তাকে হাসপাতাল হতে অপহরণ করে নিয়ে যেতে উদ্যত হলে দেলোয়ারা শোর চিৎকার শুনে স্থানীয় সাংবাদিক শরিফুল আলম চৌধুরী রক্ষা করার জন্য এগিয়ে গেলে সন্ত্রাসীরা তার উপরও হামলা চালায় এবং তাকেও গুরতর আহত করে। ওই ঘটনায় ওই দিন রাতেই সাংবাদিক শরিফুল আলম চৌধুরী বাদী হয়ে দেবিদ্বার থানায় এবং দেলোয়ারা বাদী হয়ে মুরাদনগর থানায় তার শ্বশুর পরিবারের ১৪ জনকে আসামী করে পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলা দুটিতেই খোরশেদ আলম (৪৮) গিয়ান উদ্দিন (৩৬), নজরুল ইসলাম (৩৪) এর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী থাকা সত্ত্বেও এ ঘটনা পেরিয়েগেছে ৩ বছর। দেলোয়ারা বেঁচে আছেন। তবে তার বর্তমান বেঁচে থাকা আর না থাকাই সমান। বাম হাত অবশ, পথ চলতে হয় অন্যের সহযোগীতায়। আর এ অবস্থায় হতভাগী দেলোয়ারা বেগম সারাক্ষণ কেঁদে বুক ভাসায়। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রওশোন আরার উদ্যোগে করা সমঝোতা শালিসের বাস্তবায়ন অধ্য ৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়ন হয়নি আজও। দেলোয়ারাও তার শিশু পুত্র মিজানুর রহমান (১৩) অসংখ্যবার উপজেলা প্রশাসন সহ স্থানীয় সমাজ পতিদের ধারে ধারে ঘুরেও অবহেলায় শিকার হওয়ার কারনে এখন আর কারো কাছে তারা যায়না। বর্তমানে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে সমস্ত পরিজন নিয়ে। বর্তমানে চরম অভাব অনটন এর মাঝে চলছে দেলোয়ারার পরিবার। তার শয়ন ঘরটি এক প্রকার ঝুপড়ি বিশেষ বিভিন্ন রকমের ছেড়া কাপড়, কলাপাতা আর মাঝে মধ্যে কঞ্চি দিয়ে ঘেড়া বাড়ির আঙ্গিনা। আঙ্গিনার মাঝ খানে ভাঙ্গা একটি রান্নাঘর। তার পাশেই ছেড়া কাপড় দিয়ে ঘেড়া বাথরুম। ১০ হাত লম্বা একটি মরিচাপড়া টিনেরঘর, বেড়া বাতা ও ছনের। ওই ঘরেই দেলোয়ারার পরিবারের বসবাস। একমাত্র সন্তান মিজানুর রহমান নেয়ামত কান্দি দাখিল মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। দেলোয়ারা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, এবারের ঈদেও পূর্বেকার ঈদের মতোই আমার একমাত্র ছেলের মূখে একটু সেমাই তুলে দিতে হলে কারো কাছ থেকে চেয়ে নিতে হবে। ছেলে বার বার তার মাদ্রাসার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার রেজিষ্ট্রেশন বাবদ ২৫০ টাকার জন্য কান্নাকাটি সহ ঈদের নতুন জামা কিনে দেয়ার আবদার করছে। কি করে আমার অবুঝ শিশু পুত্রের এই আবদার পূরণ করব? দেলোয়ারা আরো বলেন, আমি যদি স্বামীর ন্যায পাওনা বুঝে পেতাম তাহলে আমাদের কিছুটা হলেও দুঃখ্য কষ্ট লাঘব হতো।

বেসরকারী স্বেচ্ছা সেবী সংস্থা ব্রাক মুরাদনগর শাখার সহায়তাকারী কর্মী আমিনুল ইসলাম বলে, দেলোয়ারার উপর পাশবিক নির্যাতনের ঘটনাটি একটি আলোচিত ঘটনা। ব্রাক তাকে ফ্রি আইনী সহায়তা দিচ্ছে। সে সময় ঐ ঘটনার প্রতিবাদে সভা, সমাবেশ, বিক্ষোপ ও মানবন্ধন করেছে মুরাদনগর উপজেলার সজীব বাংলা সেবা সংসদ।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম নাজমা বলেন, বিষয়টি অনেক পূর্বের। তবু জানতে পেরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে করা সমঝোতার বাস্তবায়ন করার জন্য ইতি মধ্যে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি।





Check Also

দেবিদ্বারের সাবেক চেয়ারম্যান করোনা আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যু: কঠোর নিরাপত্তায় গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ভাণী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান (৫৫) করোনায় আক্রান্ত ...

Leave a Reply