লাকসাম রেলওয়ে জংশন ষ্টেশন মাষ্টারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দূর্ণীতির অভিযোগ

লাকসাম প্রতিনিধি:

লাকসাম রেলওয়ে জংশন ষ্টেশনের মাষ্টারের বিরুদ্ধে ট্রেনের টিকেট কালোবাজারিসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্ণীতির অভিযোগ উঠেছে। এতে ট্রেন যাত্রীরা ও রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত পেনশন ভোগীরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এদিকে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ টিকেট কালোবাজারির অভিযোগে রফিকুল ইসলাম বাবুল নামে এক বুকিং কার্ককে বদলি করা হয়েছে। এরপরও থেমে নেই টিকেট কালোবাজারি।

অভিযোগে জানা যায়, গত ৯মে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ন ও প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা সম্পন্ন লাকসাম রেলওয়ে জংশনে ষ্টেশন মাষ্টার হিসাবে যোগদান করেন গ্রেড-২ ধারী পিতু রঞ্জন চক্রবতী। তিনি ষ্টেশন মাষ্টার হিসেবে যোগদানের পর থেকেই যাত্রীরা ট্রেনের টিকেট ও পেনশন ভোগীরা পেনশন পেতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ষ্টেশন মাষ্টারের যোগসাজসে রেলওয়ের লাকসাম বুকিং অফিসে কর্মরত বুকিং ক্লার্করা প্রতিদিন নিদিষ্ট হারে মাসোহারা দিয়ে এখানে টিকেট ও পেনশন বিতরণে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে। যার ফলে যে কোন ট্রেনের টিকেট যাত্রীরা টিকেট পেতে হলে অতিরিক্ত ৫০/১০০টাকা অথবা অনেক সময় টিকেটের দ্বিগুন মূল্য দিতে হয়।

এদিকে পেনশন ভোগীরাও ২/৩শ টাকা বাধ্যতামূলক হারে বুকিং ক্লার্কদের হাতে তুলে দিতে হয়। না দিলে তাদেরকে নানা ভাবে হয়রানী করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বুকিং ক্লার্ক জানান, মাষ্টার সাহেবকে প্রতিদিন টাকা দিয়ে আমরা চাকুরী করি। তাই টিকেট ও পেনশন ভোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিতে হয় । টাকা না নিলে আমরা তো আর বেতনের টাকা মাষ্টার কে দেবো না।

টিকেট ক্রয়ে ভুক্তভোগী লাকসাম শহরের নশরতপুর এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর মাওলা চৌধুরীর অভিযোগে জানা যায়, তিনি ব্যবসায়ীক কাজে প্রায়ই ট্রেনে চট্টগ্রাম আসা-যাওয়া করেন। কিন্তু বর্তমান ষ্টেশন মাষ্টার যোগদানের পর থেকে টিকেট কাউন্টারে কোন টিকেট পাওয়া যায় না। তবে অতিরিক্ত টাকা দিলেই বুকিং ক্লার্কদের পকেট থেকে টিকেট বেরিয়ে আসে। তিনি আরও অভিযোগ করেন টিকেট করে এ পর্যন্ত ভিআইপি ও প্রথম শ্রেনীর বিশ্রামাগারটি খোলা পাননি। বিষয়টি মাষ্টারকে জানালে তিনি ষ্টেশন মাষ্টার কর্তৃক অশোভন আচরনের শিকার হয়েছেন।

অপরযাত্রী লাকসাম হাউজিং এষ্টেটের বাসিন্দা বাখরাবাদ গ্যাসের ঠিকাদার কবির আহম্মদ জানান, টিকেট কাউন্টারে গেলে বলা হয় টিকেট নেই। তবে একটু বাড়তি দেওয়ার কথা বললে কাউন্টার সংলগ্ন দোকান থেকে টিকেট আছে বলে দেখিয়ে দেয়া হয় বুকিং ক্লার্করা । সেখানে থেকে অতিরিক্ত টাকা দিলে টিকেট পাওয়া যায়।

পেনশনভোগী রেলওয়ের কর্মচারীর স্ত্রী বৃদ্ধ রহিমা খাতুন জানান, গত মাসে তার পেনশনের টাকা উঠাতে মাষ্টারকে ৩’শ টাকা আগেই দিতে হয়েছে। না দিলে মাষ্টার সাহেব নানা অজুহাতে ২/৩দিন ঘুরিয়ে পেনশনের টাকা দেন। অপর পেনশনভোগী রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত এসএম গ্রেড-৪ চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার হাজী মহিন উদ্দিন জানান, গত ১৩ আগষ্ট পেনশন নিতে এসে তার স্বাক্ষরে হাজী শব্দটি লেখায় তাকে পেনশন দেয়নি ষ্টেশন মাষ্টার। পরে হাজী শব্দটি বাদ দেওয়ার পর হয়রানী করে পেনশন দেওয়া হয়।

এদিকে কুমিলার বসবাসকারী ষ্টেশন মাষ্টার পিতু রঞ্জন চক্রবর্তী লাকসামে অবস্থান কালে প্রায়ই ষ্টেশনের ভিআইপি কক্ষে এসি চালিয়ে বিশ্রাম নেন। অথচ টিকেটধারী যাত্রীরা বাহিরে ঘোরাফেরা করেন। এছাড়াও ষ্টেশনে ভাসমান হকারদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাটফরমে যাত্রীরা চলাফেরা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এসব ভাসমান হকারদের কাজ থেকে ষ্টেশন মাষ্টার মাসোহারা নিয়ে তাদেরকে বৈধ্যতা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ষ্টেশন মাষ্টারের সহযোগিতায় বুকিং কার্করা কম্পিউটার থেকে লাকসামের বিভিন্ন ট্রেনের টিকেটগুলো কেটে তারা আলাদা ভাবে রেখে টিকেট সংকট দেখিয়ে তা কালোবাজারে বিক্রি করেন। যাত্রীরা টিকেট চাইলে কম্পিউটার স্কিনে দেখানো হয় টিকেট নেই।

এক রেলকর্মকর্তা জানান, ট্রেনের যাত্রার ১০ দিন আগে টিকেট বুকিং নেয়ার সুবিধা থাকায় অসাধু বুকিং কার্করা সবগুলো টিকেট কম্পিউটার থেকে বের করে নেয়। রেলসূত্র ও যাত্রীরা আরও জানায়, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চাঁদপুর-লাকসাম-চট্টগ্রাম লাইনে চলাচলকারী মেঘনা ও সাগরিকা এক্সপ্রেস ট্রেনে বেশি যাত্রী হওয়ায় অসাধু রেলকর্মচারীরা টিকেট কালোবাজারি করে যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এদিকে গত ৬ মাস যাবত আন্তঃনগর মেঘনা ট্রেনে প্রথম শ্রেণীর বগিটি সংযুক্ত না করায় চাঁদপুর ও লাকসামের যাত্রীরা দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে। পাশাপাশি ওই ট্রেনে সংযুক্ত থাকা চেয়ার বগিটির লাকসামে আসন বরাদ্দ না থাকায় যাত্রীরা লাকসাম ও চাঁদপুরের বুকিং কার্কদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে চাঁদপুর থেকে টিকেট ক্রয় করে এনে যাত্রা করতে হয়। এতে লাকসামের যাত্রীরা প্রতিদিন বুকিং কার্কদেরকে শতশত টাকা অবৈধভাবে দিতে হচ্ছে।

মেঘনা ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর যাত্রী ব্যবসায়ী আক্তার হোসেন মিলন জানান, প্রথম শ্রেণী বগিটি সংযুক্ত থাকলে রেলের রাজস্ব আদায় হতো। আর এখন আয় হচ্ছে বুকিং কার্কদের।

এদিকে রেল সপ্তাহ উপলক্ষে চট্টগ্রাম রেলওয়ের প্রধান বানিজ্যিক কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান লাকসাম পরিদর্শনে এলে স্থানীয় যাত্রীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে টিকেট কালোবাজারির সাথে জড়িত বুকিংকার্ক রফিকুল ইসলাম বাবুলকে লাকসাম থেকে শাস্তিমূলক ভাবে বদলি করেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ষ্টেশন মাষ্টার পিতু রঞ্জন চক্রবর্তী তার জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেন, টিকেট কালোবাজারি ও পেনশনভোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেয়ার কথা শুনেছি। তা বন্ধ করতে সময় লাগবে।

প্রসঙ্গত, টিকেট কালোবাজারি ঘটনায় ষ্টেশন মাষ্টার পিতু রঞ্জন চক্রবর্তী, বুকিং কার্ক রফিকুল ইসলাম বাবুল, আবু তাহেরকে লাকসামে বদলি করা হয়েছিল।





Check Also

লাকসাম-মনোহরগঞ্জের বিএনপি’র সাবেক এমপি আলমগীরের জাতীয় পার্টিতে যোগদান

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা-১০ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) বিএনপি’র সাবেক এমপি এটিএম আলমগীর জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেছেন। সোমবার জাতীয় ...

Leave a Reply