তারেক মাসুদের মৃত্যু ও দুর্ঘটনা নিয়ে কিছু কথা

মমিনুল ইসলাম মোল্লা :

প্রয়াত তারেক মাসুদ -ফাইল ফটো
১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরি এলাকার জোকায় যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ নিহত হয়েছেন। এসময় তার সাথে আরও নিহত হয়েছেন শহীদ বুদ্ধিজীবি মুনির চৌধুরীর ছেলে এটিএন নিউজের নির্বাহী সাংবাদিক মিশুক মনিরসহ আরো ৫ জন। তারা মইক্রোবাসে চড়ে একটি প্রোগ্রাম শেষে ঢাকা ফিরছিলেন। শুধু তাই নয় এসময় আহত হয়েছেন তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ঢালি আল মামুন ও তার স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম জলি। শুধু চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদই নয় বিভিন্ন সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী , সাবেক অর্থমন্ত্রী সাঈফুর রহমান , সচিব ছিদ্দিকুর রহমানসহ আরো অনেকে। অন্য একটি দুর্ঘটনায় বেঁেচে যাওয়া একজন যাত্রী বল্লেন-তিনি শ্যামলি থেকে সাভার যাচ্ছিলেন। সেদিন বাসে উঠার পরপরই তিনি তন্দ্রা যান। হঠাৎ একটি বিকট শব্দ কানে ভেসে এল। মুহুর্তেই বাসটি পড়ে গেল তুরাগ নদীতে। তিনি বল্লেন বাস থেকে বের হবার কোন পথ তিনি পাচ্ছিলেন না ,তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কিছুক্ষণের জন্য হলেও তিনি মৃত্যুর যন্ত্রণা উপভোগ করলেন। তিনি বল্লেন ,আমার হাত ও মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছিল। চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। বের হবার কোন পথ পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ একটু যায়গা ফাঁকা পেলাম। তা দিয়ে কোন রকমে বের হয়ে এলাম কিন্তু পানি থেকে মাথা তুলতে পারছিলাম না । পাঞ্জাবী ফুলিয়ে ভেসে থাকতে চেষ্টা করলাম। আমার একমাত্র ছেলে তপুর মুখটি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। আল্লাহকে বল্লাম আল্লাহ তুমি আমার ছেলেকে এতিম করো না। হঠাৎ একটি ঢেউ এসে আমাকে ২/৩ শ ফুট দূরে নিয়ে গেল। সমস্ত শক্তি দিয়ে কোন রকমে মাথাটি পানির উপরে ভেসে উঠলাম । এসময় একটি উদ্ধারকারী দল এসে আমাকে টেনে তুল্ল্”। প্রতিদিনই আমাদের দেশে দুর্ঘটনা ঘটছে। যাদের ভাগ্য ভাল তারা বেচেঁ যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার বেঁচে থেকেও পঙ্গুত্বের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। তাই সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের সাস্থখাতের একটি প্রধান সমস্যা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়-যাত্রী এবং চালকদের ট্রাফিক আইন অনুসরণ না করা , অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে গাড়ী চালানো , গতিসীমা অনুসরণ না করে বেপরোয়াভাবে চালানো, অতিরিরক্ত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন , অভারটেক করার প্রবনতা ও চালকদের মোবাইলফোনে কথা বলা বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে চলন্ত অবস্থায় ড্রাইভারদের মোবাইল ব্যবহার। এব্যাপারে দুর্ঘটনায় আহত যাত্রী আব্দুল করিম বলেন-”স্টেশন ত্যাগ করার পর পরই ড্রাইভারের মোবাইল ফোন বেজে উঠল।”হ্যাঁ মিস্টি কও।(সম্ভবত শ্যালিকা অথবা প্রেমিকা) আরে না না কি অসুবিধা? বুঝছো এ রাস্তা আমার মুখস্ত। ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া কত গাড়ী চালাইছি , কী বল্লা একসিডেন্ট! আরে না না , তুমি কি আমাকে যা-তা ড্রাইভার ভবেিছা নাকি? গামছা দিয়ে চোখ বাইন্ধা দিও ,তারপরও দেখবা ঠিকই কুমিল্লা পৌঁছাইয়া গেছি।” আর কিছুই মনে নেই করিমের। কোথায় যেন বিকট শব্দ হলো। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখলেন তিনি হাসপাতালে শুয়ে আছেন।

নিয়ম অনুযায়ী ২০ বছরের পুরনো বাস এবং ২৫ বছরের পুরনো ট্রাক ও কভার্ড ভ্যান রাস্তায় চলার কথা নয়। কিন্তু বিআরটিএ এব্যাপারে কিছুদিন তৎপরতা চালালেও অজ্ঞাত কারণে আবার তা বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তায় চলাচলকারী পথযাত্রীদের জন্যও নিয়মকানুন রয়েছে। রাস্তার বামপাশে যানবাহন চলাচল করায় পথিকগন হাঁটবেন ডানপাশ দিয়ে। যেখানে ফুুটওভার ব্রিজ রয়েছে তা ব্যবহার না করলে ৫ টাকা জরিমানা দেয়ার বিধান রয়েছে। এ নিয়ম সবাইকে মেনে চলতে হবে। ”নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে”র চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন-অনেক চালক আছেন যারা হেল্পার থেকে চালক হন। চালকদের পেশাগত এবং একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে। ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন- দুর্ঘটনা হলে বিশিরভাগ ক্ষেত্রে চালকদের দোষ দেয়া হয়। কিন্তু রাস্তার অপ্রশসস্থতা ,ফুটফাত দখল , এসব কারণেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের স্বজনরা নিজেদের কষ্ট ভাগাভাগি করে নিতে গড়ে তুলেছেন ”ফ্যামিলি ইউনাইটেড এগেইনস্ট রোড একসিডেন্ট” নামক একটি সংগঠন। এ সংগঠন থেকে দোষী ড্রাইভারদের ফাঁসির দাবী তোলেন। দুর্ঘটনায় নিহত উইলস লিটল ফ্ল্ওায়ার স্কুলের ছাত্র হামীমের বাবা শেখ মোতালেব বলেন , আমার ছেলের ঘাতক বাস চালক ৩ মাস আগে ছাড়া পেয়েছে। এসব ঘাতকদের বিরুদ্ধে কঠিন আইনী ব্যবস্থা না থাকায় নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। বর্তমান আইন পরিবর্তন প্রয়োজন। নিহত রওশন আরা বেগমের স্বামী জানান, শুধু সচেতন হলেই চলবেনা। যথাযথ আইন প্রনয়ন ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। দুর্ঘটনাবিরোধী সংগঠন ”ফুয়ারাব”এর আহবায়ক ইকরাম আহমেদ বলেন ,প্রতিটি জেলায় ভোকেশনাল ড্রাইভিং ট্রেনিং সুবিধা বাড়াতে হবে। শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত গাড়ী চালক তৈরি হলেই সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে। বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিউটের পরিচালক ডঃসামসুল হক বলেন-দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। তারপর সেটি রোধে এগিয়ে আসতে হবে। ভুয়া লাইসেন্স প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এন্ড কামউনিটি সার্ভিসের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার মোঃ মাহমুদুর রহমান বলেন-সত্যিকার অর্থে ভুয়া লাইসেন্স শনাক্তকরনের আলাদা কোন উপায় নেই। সব লাইসেন্সেই বিআরটিএর অনুমোদন থাকে। ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ডের পরিচালক মশিউর রহমান বলেন-দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। যেখানে ফুটওভার ব্রিজ আছে তা যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া জনসচেতনতা জরুরি। এক জরিপে দেখা যায় দেশে ঘটে যাওয়া মোট দুর্ঘটনার ৬৪% ঘটে আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে । বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট এসোসিয়েশেনের হিসেব অনুযায়ী ঢাকায় গাড়ী রয়েছে ৭ হাজার ৪০০টি । এর মধ্যে অধিকাংশই অবৈধ। অবৈধ গাড়ীগুলোই বেশির ভাগ সময় দুর্ঘটনায় পতিত হয়। ঢাকায় শথগতিতে গাড়ী চল্লেও দুর্ঘটনা কিন্তু কম হচ্ছেনা। পথচারি কিংবা স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের জন্য অপেক্ষমান যাত্রীর উপর হঠাৎ করেই চেপে বসে দ্রুতগামী বাস , ট্রাক , কিংবা অন্য কোন যানবাহন। বিশেষ করে শনির আখড়া , জুরাইন , রেলগেট , ফার্মগেট, শাহবাগ , যাত্রাবড়ি , পান্থপথ ,সায়েদাবাদ , জিপিওরোড , মালিবাগ , মৌচাক , বাংলামটর , কাকরাইল , শান্তিনগর , বাসাবো , এসব যায়গায় ৫২ % দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

ডিএমপির সুত্র অনুযায়ী গত ১৫ বছরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭০ হাজার। এতে মারা গেছে ১৫ হাজার । অন্যদিকে বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চ সেলের হিসেব মতে -২০০০ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত দুর্ঘটনা ঘটেছে৪২ হাজার ৪৫৭ টি । এর মধ্যে নিহত হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৫ জন। আর আহত হয়েছে ২৯ হাজার ৭৮৭ জন। সরকারি হিসেবে প্রতিদিন মারা যায় ১২ জন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আর পঙ্গু হচ্ছে লক্ষাধিক মানুষ। পুলিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১৫ বছরে মারা গেছে ২ লাখ মানুষ । সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বড় ধরণের দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ৪৪ জন ছাত্র মারা যাওয়ার ঘটনা অন্যতম। আগে সকল যাত্রীবাহি বাসের গায়ে লিখা থাকত ”যাত্রীদের জীবন বীমাকৃত।”দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার অর্থ সাহায্য পেত। এখন দুর্ঘটনার ক্ষতিগ্রস্থদেও ৯৯% ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেননা বলে এক তথ্যে জানা যায়। এতে যাত্রীদের অজ্ঞতা বাদেও আইনগত জটিলতা রয়েছে। এছাড়া অধিকাংশ ঘটনায় চালকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় না। কোন কোন ঘটনায় মামলা হলেও সাক্ষীর অভাবে বিচার করা যায়না। সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় ৪৪ জন ছাত্র নিহত হওয়ায় একজন প্রকৌশলী মামলা দায়ের করেন। এতে চালককে ৩ বছরের সাজা ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু এতে নিহতের আত্মীয় স্বজন সন্তুষ্ট হননি। তেমনিভাবে সন্তুষ্ট হননি নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন প্রচলিত আইন সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। দুর্ঘটনার শাস্তি বৃদ্ধি করা না গেলে বাস্তবিক পক্ষে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়।”

লেখকঃ
প্রভাষক, সাংবাদিক, কুমিল্লা





Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply