বেড়েই চলছে শব্দদূষণ

প্রশান্ত কুন্ডু শুভ :

বেড়েই চলছে শব্দদূষণ। নীতিমালা আছে তারপরও যেন প্রতিকার নেই। রাজধানী ঢাকা শুধু নয়। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরেই বর্তমানে এই দূষণের শিকার। ফলে শ্রবণশক্তি হারাচ্ছে আগামী প্রজন্ম। শ্রবণশক্তিই নয়, শব্দ দূষণের কারণে উচ্চরক্ত চাপ, মাথাধরা, অজীর্ণ, পেপটিক আলসার, অনিদ্রা ও ফুসফুসে ক্ষতিসহ নানা রকম মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

অতিরিক্ত শব্দ দূষণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তানষ্ট হয়, সন্তান সম্ভাবনা মায়েদের যে কোনো ধরনের উচ্চ শব্দ মারাত্মক ক্ষতিকর। শুধু তাই নয় যানবাহনের শব্দ দূষণে ষ্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ায় বহুমাত্রায়।

নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ও ক্যাম্পইন ফর ডেভেলপমেন্ট ফাউ-েশন কর্তৃক পরিচালিক এক জরিপে রাজধানী ঢাকার শব্দ দূষণের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। যা সত্যিই আতংকজনক। এইভাবে যদি প্রতিনিয়তই নগরবাসী শব্দ দূষণের শিকার হয় তবে আগামী প্রজন্ম হবে ‘বধির’। আর এই আগামীর প্রজন্ম নিয়ে গর্ব করার মতো কিছু থাকবে না। বধির প্রজন্ম বললাম এই কারণে যে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৬০ ডেসিবেল শব্দ মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে এবং ১০০ ডেসিবেল শব্দে চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে।

কিন্তু আমাদের প্রাণ প্রিয় রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি মাত্রাতিরিক্ত ভয়াবহ। জরিপে দেখা গেছে, সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল ১০৬ ডেসিবেল, যাত্রাবাড়ীতে ১০০ ডেসিবেল, বাংলা মটর ১০০ ডেসিবেল, সোনারগাঁও হোটেলের সামনে (কারওয়ান বাজার মোড়) ও ফার্মগেটে ১০৪, মহাখালী রেলক্রসিং, মগবাজার ও মৌচাকে ১০৩ ডেসিবেল, গাবতলী ১০২ ডেসিবেল, তেজগাঁও শিল্প এলাকা ও মিরপুর-১ নম্বর ৯০ ডেসিবেল, কাকরাইল ৯২ ডেসিবেল, গুলশান ৯০ ডেসিবেল, মতিঝিল শাপলা চত্বর ৯২ ডেসিবেল, সদরঘাট ৮৭ ডেসিবেল, বারডেম হাসপাতাল ৮১ ডেসিবেল, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা ৭৮ ডেসিবেল, শাহীন কলেজ ৮৩ ডেসিবেল, আজিমপুর মহিলা কলেজ ৮০ ডেসিবেল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ৮৭ ডেসিবেল এবং মিটফোর্ড হাসপাতাল ৮৩ ডেসিবেল ও শিশু হাসপাতালে ৯৩ ডেসিবেল।

এদিকে পরিবেশ অধিদফতরের মতে, শহরে শব্দের সহনীয় মাত্রা হচ্ছে আবাসিক এলাকার জন্য দিনে ৪৫ রাতে ৩৫ ডেসিবেল। মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ রাতে ৫০ ডেসিবেল এবং শিল্পাঞ্চল এলাকার জন্য ৭০ ডেসিবেল।

গত ২৬ জানুয়ারি ২০১১ইং ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যানবাহনের শব্দ দূষণে ষ্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে ৬৫ কিংবা এরচেয়ে বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরো বেশি। গবেষণায় বলা হয়েছে, ৫০ হাজারেরও বেশি লোকের ওপর এক জরিপ শেষে দেখা গেছে অতিরিক্ত প্রতি ১০ ডেসিমেল শব্দের জন্য ষ্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে ১৪ শতাংশ। এ ঝুঁকি গড়ে সব বয়সীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ ডেসিমেল শব্দে ষ্ট্রোকের ঝুঁকি ২৭ শতাংশ বাড়ে।

গবেষকরা বলছেন, ৬০ কিংবা এর চেয়ে বেশি ডেসিমেল শব্দের জন্য ষ্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে আরো বেশি হারে। একটি ব্যস্ত সড়কে সাধারণত ৭০ কিংবা ৮০ ডেসিমেল মাত্রার শব্দ তৈরি হয়। তুলনামূলকভাবে একটি ঘাসকাটার যন্ত্র শব্দ তৈরি করে ৯০ কিংবা ১শ’ ডেসিমেল। এছাড়া একটি জেট বিমান অবতরণকালে ১২০ ডেসিমেল শব্দ উৎপন্ন করে।

ড্যানিশ ক্যান্সার সোসাইটির প্রধান গবেষক মেটি সোরেনসিনা বলেন, ‘যানবাহনের শব্দের সঙ্গে উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের সম্পর্কের বিষয়টি আগের গবেষণা থেকেই জানা গেছে। নতুন এ গবেষণায় দেখা গেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণহীন শব্দের কারণে ষ্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।’ গবেষণায় বলা হয়েছে, সবধরনের ষ্ট্রোকের ক্ষেত্রে ৮ শতাংশ এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশের জন্য দায়ী যানবাহনের অতিরিক্ত শব্দ। তারা আরো বলেন, শব্দের কারণে চাপ তৈরি হয় এবং তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। এর ফলে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। গবেষণায় আরো বলা হয়, যানবাহনের শব্দের ঝুঁকির সঙ্গে সামাজিক শ্রেনীগত অবস্থানেরও একটি সম্পর্ক রয়েছে। কারণ সম্পদশালীরা সাধারণত অধিকতর শান্ত এলাকায় বসবাস করে।

বর্তমানে আমাদের দেশের নগরীর হাজার সমস্যার মধ্যেও শব্দদূষণ অন্যতম একটি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু শব্দ দূষণের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সমস্যা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত। শব্দ দূষণ রোধে নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে সে আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। প্রতিদিনই বাড়ছে মানুষ। রাস্তায় নামছে নতুন নতুন গাড়ি। তৈরি হচ্ছে নতুন স্থাপনা। আর এই বাড়তি মানুষের চাহিদার জোগান দিতে বেড়েছে শব্দ দূষণের মাত্রা এবং বাড়তে বাড়তে এক অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। আবাসিক, অনাবাসিক এলাকা, অফিসপাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি হাসপাতালের আশপাশেও শব্দ দূষণের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শব্দদূষণ শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করে। এ সমস্যার কারণে হাজার হাজার মানুষ বধির হওয়া থেকে হার্টএ্যাটাকের মতো মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্কুলগামী শিশুরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিন বছর বা তার কমবয়সী শিশু যদি খুব কাছ থেকে ১০০ ডেসিবল শব্দ শোনে তাহলে সে শিশুটি চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে। ঢাকা শহরে প্রতিদিন অনেক স্কুলগামী শিশুরা শ্রবণ শক্তি হারাতে বসেছে। উচ্চশক্তি শুধু শ্রবণ শক্তিই নষ্ট করে না সৃষ্টি করে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার। এমনকি মানসিক বিকাশের জন্যও ক্ষতিকর। গাড়ীর হাইড্রোলিক হর্ণ ও উচ্চ শব্দে মাইক বাজানোও ঢাকা শহরে শব্দ দূষণের মধ্যে অন্যতম কারণ। অপরিকল্পিত নগরায়নই এ সমস্যার সৃষ্টি করে।

শব্দদূষণ বন্ধে বিধিমালা বাস্তবায়নে গাড়িচালকদের মধ্যে সচেতনতার পাশাপাশি পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের মাধ্যমে গাড়ীর হর্ণ বাজানোর জন্য সংশ্লিষ্ট চালক ও গাড়ির বিরুদ্ধে অর্থাৎ শব্দ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শব্দ দূষণ বন্ধে পুলিশ বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ এবং জেলা প্রশাসনের পরিচালিত মোবাইল কোর্টগুলোতে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ণের ব্যবহার রোধে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

শব্দ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে- ট্রাফিক পুলিশ, গাড়ি চালক, শিশু-কিশোর, ছাত্র-ছাত্রী, অসুস্থ ব্যক্তি, গর্ভবতী মহিলা। সরকার জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শব্দদূষণ বিধিমালা ২০০৬ প্রণয়ন করে। এ বিধিমালা বাস্তবায়নে জরিমানা আদায়ে ট্রাফিক পুলিশকে ক্ষমতা প্রদান করা জরুরি। জনগণকে শব্দ দূষণসৃষ্টিকারী গাড়ীর বিরুদ্ধে সহজে অভিযোগ প্রদানের ব্যবস্থা করা, সার্জেট বা ট্রাফিক পুলিশের নিকট অভিযোগ প্রদানে উৎসাহী করা, শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা বাস্তবায়নে প্রত্যেকটি সড়কে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা ও বাস্তবায়নে ব্যবস্থা গ্রহণ করা, গাড়ী চালকদের প্রশিক্ষণ মডিউলে শব্দ দূষণ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা, গাড়ি চালক ও গাড়ির মালিকগণকে শব্দ দূষণের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবহিতকরণসহ জনসচেতনতা সৃষ্টি, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার মাধ্যমে হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত বিধান এবং শব্দ দূষণ বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ করতে হবে।

বিশেষ করে বৃহৎ জনগোষ্টীর কথা বিবেচনা করে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

লেখক ঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply