অটিস্টিকদের সেবায় হাত বাড়িয়ে দিন

মমিনুল ইসলাম মোল্লা :

২৫ জুলাই থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ঢাকার রুপসী বাংলা হোটেলে”অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট ডিজএবিলিটিজ ইন বাংলাদেশ এন্ড সাউথ এশিয়া”শীর্ষক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়/হবে। এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। অটিজম এমন একটি সমস্যা যা প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। কোন কারণে আমাদের পরিবারে এধরণের শিশুর জন্ম হলে তাকে অবহেলা আর অনাদরে ফেলে না রেখে মমতার সাথে বড় করে তুলতে হবে। অটিজমে আক্রান্তরা অটিস্টিক শিশু নামে পরিচিত । এসব শিশু সাধারণত জন্মের ৩ মাস থেকে ৩ বছরের মধ্যে এরোগে আক্রান্ত হয়। তাদের আই কিউ ৭০ এর নীচে। ওরা সমাজের ৮/১০টি শিশু থেকে ব্যাতিক্রম। তথাকথিত ধর্মীয় সম্প্রদায় একে সমাজে পাপ বৃদ্ধি ও মহিলাদের পর্দাহীন অবস্থায় চলাফেরা করার ফসল বলে আখ্যায়িত করেলেও এপর্যন্ত এ রোগের সুস্পষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি। এতে কিছুটা জেনেটিক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কোন পরিবারে একটি শিশু অটিস্টিক থাকলে অন্য সন্তানগুলো অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৫০%। এছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের রুবেলা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া মস্তিষ্কে প্রদাহ,সিসা কিংবা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়াকেও কেউ কেউ দায়ী করেন। এসব শিশু এক বছর বয়সেও মুখে কোন আওয়াজ করতে পারেনা, চোখে চোখে তাকায়না, নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয়না, হঠাৎ ক্ষেপে উঠে, আন্দদায়ক বিষয় শেয়ার করেনা এবং সমবয়সীদের সাথে বন্ধুত্ব করেনা।

এছাড়া আরো যেসব লক্ষণ দেখা যায় সেগুলো হচ্ছেঃ শারিরিক আদর , চুমু, কিংবা চেপে ধরে কোলে নিলে বিরক্ত হয়, কোন কোন শিশু বাক্য শুরু করতে পারলেও শেষ করতে পারেনা। হঠাৎ পা দোলানো কিংবা আংগুল নাড়াচাড়া শুরু করলে বার বার তা করতেই থাকে, হাসির উত্তরে হাসতে জানেনা, এছাড়া শিশুদের প্রিয় বস্তু খেলনার প্রতি আকর্ষণ বোধ করেনা। অটিজমকে বিশ্ব ষ¦া¯্য’ সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থ ”ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিেিকশন অফ ডিজেজ”এ এফ ৮৪ .০ হিসেবে কোডিং করা হয়েছে। অটিজমের ব্যাপারটি যত আগে চিহ্নিত করা যায় ততই মঙ্গল। প্রায় অর্ধেক বাবা মা ১৮ মাসের পূর্বেই বুঝতে পারেন, ৪/৫ ভাগ ২৪ মাসের পূর্বেই বুঝেন, বাকীরা ৩৬ মাসের মধ্যে বুঝতে পারেন তাদের শিশুর সমস্যা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে অটিজম বুঝার উপায় হচ্ছে ঃ ১২ মাস বয়সের মধ্যে কোন রকম শব্দ উচ্চারণ না করলে ২৪ মাস বয়সের মধ্যে ২টি জটিল শব্দ বলতে না পারলে। বিভিন্ন দেশে অটিস্টিক শিশুর সঠিক পরিসংখ্যান থাকলেও বাংলাদেশে নেই। তবে যতটুকু জানা যায়, ৯০ এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজারে ১জন শিশু ছিল অটিস্টিক। ২০০৯ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ এ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি ৫০০ জনে ১ জন শিশু এ সমস্যায় আক্রান্ত। এ হিসেবে দেশের ২.৫ লাখ শিশু অটস্টিক।

জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী বিশ্বের প্রতি ১১০ জনে ১জন অটিজমে ভূগছে। ভারতে প্রতি ৫০০ জনে ১জন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১০০০০ জনে ৫জন, অটিস্টিক শিশুদের ঢালাওভাবে প্রতিবন্ধী বলা হয় । তবে এদের সবাইকে প্রতিবন্ধী বলা ঠিক নয়। যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। ৩০ শতাংশের বুদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হলেও সকলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নয়। ৪৫-৫০ শতাংশের বুদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমান কম। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে ৮০ বছর বয়সী মায়ের অটিস্টিক শিশু হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মায়ের তুলনায় ৫০ ভাগ বেশি। এ গবেষণায় ৪৯ লাখ শিশুর জন্মগ্রহণ তথ্যের পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ায় অটিজমে আক্রান্ত ১২হাজার ১৫৯ জন শিশুর বাবা মায়ের বয়স পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশের একজন ডাক্তার বলেন-তার সোনামনিটির ব্যপারে শিশু বিশেষজ্ঞ যখন বল্লেন শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত, তখন তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। পর পর তিন দিন ঘুমুতে পারেননি। দেশে বাদেও বিদেশে চিকিৎসা করিয়েছেন, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। সাধারণ মানুষেরও একই অবস্থা। শিশুটির মতো তারাও নীরবে কষ্ট পেতে থাকেন। একজন মা তার দুঃখের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন-আড়াই বছর বয়সে যখন বিষয়টি ধরা পড়ে তার বাবা তাদের ছেড়ে চলে যান। আরেক মা জামিলা খাতুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন-জন্মের পরপরই ওর তাকানো, ওকে ছোঁয়া, আদর করা , হাসা, কাঁদা, অন্যরকম মনে হতো, পরবর্তীতে বুঝতে পারি সে অটিস্টিক। কুমিল্লার দেবিদ্বারের একজন হতভাগ্য বাবা মমতাজ উদ্দিন বলেন-ওকে নিয়ে কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে আমরা বিব্রত বোধ করি। সবাই যখন ওর দিকে অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকায় তখন খুব খারাপ লাগে। কেউ তাকে পাগল বল্লে কাঁদতে ইচ্ছা করে। আরেকজন বৃদ্ধ বাবা হতাশার সুরে বলেন-আমরা দুনিয়াতে না থাকলে ওরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে, ওদের কোন স্থায়ী ঠিকানা হবেনা। এ চিন্তা আমাকে সব সময় ভাবিয়ে তোলে। ওদের জন্য কি আমাদের কিছুই করার নেই? অটিজমের ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হচ্ছে। শিশু মনস্তাত্তিক লিওকামার (১৯৪৩) হ্যান্স এসপার্গার (১৯৪৪) ও লোমা উইং শীর্ষস্থানীয় গবেষক। গবেষণার পর লোমা উইং সিদ্ধান্ত দেন যে- সামাজিক প্রতিবন্ধকতা হলো একটি বিকাশের সমস্যা এবং তার বিভিন্ন রূপভেদগুলোর সবগুলোই সম্পর্কযুক্ত সমস্যার একটি ”স্পেকট্রাম। ”যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণায় দেখা গেছে-বেশিরভাগ অটস্টিক শিশুরা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হয়। ১০টি শিশুর মধ্যে ১টির দক্ষতা দেখা যায় ছবি আঁকা, গান কিংবা কম্পিউটার পরিচালনায়। সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুরে অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাইন্ডেশন প্রাঙ্গনে অটিস্টিক শিশুদের তৈরি হস্তশিল্পের মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থান পায় নকশা আঁকা ওড়না, শাড়ি, শাল, শার্ট। এছাড়া পাটি, মাটি, মোম, বাাঁশ ও বেত জাতীয় উপাদানে তৈরি খেলনা, কলমদানি, ও ফুলদানি, দর্শকদের নজর কেড়ে নেয়। একটি চিত্র প্রদর্শনী হয় ঢাকার দৃক গ্যালারিতে। গ্রাম বাংলার মেঠো পথে মনের আনন্দে রাখালের বাঁশি বাজানো, মুক্তিযুদ্ধে বাংলার দামাল ছেলেদের পাকসেনাদের গুলি করার দৃশ্য, হ্যারি পটারের বিভিন্ন চিত্র দেখে অনুমান করার জোঁ নেই এই ছেলে মেয়েগুলো স¦াভাবিক নয়।

২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম দিবস। ২০০৮ সালে এদিবসটি প্রথম পালন করা হয়। তখন এর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ”অটিস্টিক ও প্রতিবন্দী উন্নয়নে পনবন্দী।” তারপর থেকে প্রতিবছর এ দিবসটি সারা বিশ্বে পালন করা হচ্ছে। ১৩ জুলাই জাতিসংঘের একটি সম্মেলনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা খাতুন পুতুল মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অটিস্টিক শিশুদের সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতি , অর্থনৈতিক অবস্থা, অবকাঠামোগত সুবিধা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরূত্ব দেয়া জরুরি। এ সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচীব উপস্থিত ছিলেন। এটি কোন নিরাময়যোগ্য রোগ নয়। তবে সমন্বিত চিকিৎসার মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের চেষ্টা করা যায়। এ ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞগণ শিশু নিউরোলজি অনুযায়ী চিকিৎসা দিবেন, সাইকোলজিস্ট-বাবা মাকে কাউন্সিল করবেন, স্পিচথেরাপিস্ট কথা বলতে সাহায্য করবেন, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট সামাজিক আচরনশিক্ষা দেবেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডঃ শারমিন চৌধুরি বলেন-বিদেশ থেকে রিসোর্স পার্সন এনে প্রশিক্ষণ দিয়ে রিসোর্স পার্সন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হবে। সমাজকল্যানমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ বলেছেন-অটিস্টিক শিশুদের জন্য সরকার বাস্তবধর্মী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে স্বল্প পরিসরে অটিস্টিক শিশুদের জন্য কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। শেরেবাংলানগরে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ১৯৯৮ সালে একটি কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এখানে কানাডার সহযোগীতায় পরিচালিত ”মোর দ্যান ওয়ার্ক ” নামে একটি প্রকল্প চালু রয়েছে। এছাড়া সরকারি ৮টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের বিকাশ ও চিকিৎসা সেবার বিশেষ সুবিধা রয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অটিস্টিক শিশুদের উন্নয়নে কাজ করছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-সোয়াক, কেয়ারিং গ্লোরি, বিউটিফুল মাইন্ড, কানন, আনন্দ ও প্রয়াস। এগুলোর কোন কোনটিতে ভাল চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও কোথাও কোথাও সংশ্লিষ্টদের ব্যবসাসুলভ মনোভাবের প্রমাণ মেলে। এব্যপারে একজন প্রত্যেক্ষদশী তার অভিজ্ঞতা বর্ননা করেন এভাবে-অত্যন্ত নির্দয় করূণ, এমনকি অমানবিক ব্যাপার হলো অটিস্টিক শিশুর সমস্যা সমাধানের কার্যকর কিছু না করে ঘুমের ওষুধ দিয়ে দিনরাত ঝিমানির মধ্যে রেখে দেয়া এবং দেশের বিপর্যস্ত অভিভাবকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে লাভজনক ব্যবসা ফেঁদে বসা। অটিস্টিক শিশুদের উন্নয়নের লক্ষে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ও সুশীল সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে, ওদের কল্যাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। আর এ প্রতিশ্রুতি হতে হবে নিশ্বার্থ। এদের দিকে নজর দিলে হয়তো এরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। অভিভাবকদেরও এব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। অবহেলা নয় মমতা দিয়ে ওদের গড়তে হবে। আমরা আমাদের অন্তরের সবটুকু ভালবাসা দিয়ে ওদের যতœ করব। আপনার স্বাভাবিক শিশুটির মতো ওর গায়েও আপনার রক্ত প্রবাহমান। তাই বিমাতাসুলভ আচরণ করবেননা, আমরা জানিনা সৃষ্টিকর্তা কোথায় কোন মঙ্গল নিহিত রেখেছেন। ধৈর্য্য ধরে ওদের পাশে দাঁড়ান।

লেখকঃ প্রভাষক, সাংবাদিক





Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply