বঞ্চিত নারী সুনাগারিকের জন্ম দিতে পারে না

বাচ্চু মিয়া বকাউল :

নারীর নদীর মত গতিময়, মায়ার আাঁধার, ভালবাসার ফুলঝুড়ি। কবিদের কবিতায়, গানে, ঔপন্যাসে নানাভাবে এসেছে নারীদের ত্যাগ আত্মত্যাগ, মায়ামমতার ফল্গুধারা। দেশকে মায়ের সাথে তুলনা করা হয়। নারী পবিত্রতার প্রতীক। নারী শব্দটির সাথে মায়ার বাঁধন জড়ানো। নারী মানে জননী, নারী মানে প্রেয়সী। বিধাতা নারীদের সৃষ্টির সময় নদী, পাহাড়, ফুল, ঝরনা, প্রজাপতি পার্থিব যাবতীয় সৌন্দর্যের স্পর্শে তাদের আরো বেশি অপরূপ করে তুলেছেন। পৃথিবী সৃষ্টির মূলে রয়েছে এ নারী। অথচ আজ সে নারীরা হয় প্রতি মুহুর্তে অবহেলিত, লাঞ্চিত, অত্যাচারিত। পত্র পত্রিকার পাতা উল্টালে মন খারাপ হয়ে যায়। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা ভরে আসছে নারীদের উপর অত্যাচারের ভয়ার্ত চিত্র। যৌতুক, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, মুক্তিপণ দাবী চিরপরিচিত নারী নির্যাতন। তারপরে রয়েছে দোররা মারা। এর যে কী তীব্র গভীরতা, ভয়ানক ব্যাখ্যা যারা এর শিকার তারাই জানে। যৌতুকের দাবী পূরণে ব্যর্থ হাজারো নিষ্পাপ বধূ প্রতিদিন অবর্ণনীয় লাঞ্চনার শিকার হচ্ছে। গরিব নিরক্ষরেরাই মেন তান্ডব করে তা নয় শিক্ষিত নামক মুখোশধারী ভদ্রলোকেরাও যৌতুকের স্বাদ উপভোগ করছে নির্ধিদায়। জোড় করে ধর্ষণ করছে নিরাপরাধ নারীদের। বখে যাওয়া তরুণের প্রেম নিবেদন প্রত্যাখান করায় কিশোরীর নিস্পাপ মুখখানি ঝলসে যায় এসিডের তরল ধাবায়।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় নারীরা কেবল বাহিরেই নির্যাতিত তা নয় তারা ঘরেও নির্যাতনের শিকার হয়। একটি পরিবারে একটি শিশু জন্ম নিলে শিশুটি কন্যা না পুত্র সেই বিচারে তার স্থান নির্ধারিত হয়। মা নিজে নারী হয়েও কন্যার জন্মকে অভিশপ্ত মনে করেন। সেটা কখনো তার নিজের জীবন পরিক্রমার কথা ভেবে আবার কখনোবা নারী বিদ্বেষী পুরুষ পূজারী মনোভাব থেকে যাই হোক না কেন ভালবাসার চেয়ে করুণাই কণ্যা শিশুর জন্য মূখ্য হয়ে উঠে। কণ্যা শিশুটি যেন কোন অমঙ্গল বয়ে নয়ে এসেছে। দাদা-দাদী, বাব-কাকা কারো মুখে যেন হাসী নেই। কন্যা সন্তান জন্মদানকারী মা যেন এক পাপ করে বসেছেন। পরপর দু, তিনটি কন্যা সন্তান জন্মদিলেতো কোন কথাই নেই। অনেক সময় কন্যা সন্তান জন্মদনের কারনে নানাবিধ অশান্তি লেগেই থাকে সংসারে। মাঝে মাঝে এর ভয়াবহ পরিণত বরণ করতে হয় কন্যা সন্তান জন্মদানকারী মাকে। কন্যা সন্তান জন্মদানে বাবা নামক ব্যাক্তিটির যেন কোন দোষ নাই। এ যেন মায়ের মহা দোষের একটি ব্যাপার। অথচ কন্যা কিংবা পুত্র সন্তান সবই আল্লাহর দান। আল্লাহ যাহা ভাল মনে করেন তাহাই করেন এতে কারো হাত নেই। এ বিধিবদ্ধ ব্যাপারখানি যেন মানতে চাননা অনেকেই। সামাজিক বৈষম্যের কারনে ছোট বয়স থেকেই অপুষ্টির শিকার হন কন্যা শিশুটি। পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে তার স্বাভাবিক বিকাশ বাঁধাগ্রস্ত হয়। আর তাই সে হয়ে উঠে শারীরিকভাবে দুর্বল।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈষম্য দেখা যায়। কন্যা শিশুর চেয়ে পুত্র সন্তানের জন্য পরিবারের সবার মনোযোগ বেশি থাকে। পুত্র উপার্জন করবে বাবা-মাকে দেখাশুনা করবে তাই তার পিছনেই সব ব্যায়। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে কন্যার সামাজিক বাঁধা ও অনেক বেশি।

কৈশোরে পা দেয়ার সাথে সাথে জীবনের অসুন্দর আর নোংরা ব্যাপারগুলো সম্পর্কে তাকে সজাগ করতে গিয়ে তাকে আতংকিত করে তোলা হয়। শুরু হয় তার অবাধ চলাফেরায় বাঁধা। উচ্চ শিক্ষার পথ হয়ে উঠে বিপদসংকুল। প্রাপ্ত বয়সের পরে আসে বিয়ে নামক বাস্তব বিষয়টি। সেখানে পুরুষের যেমন অবাধ স্বাধীনতা, নারীর জন্য সেখানে থাকে কঠিন বাঁধা, একজন পুরুষ তার শিক্ষায়, কর্মে, মেধায় যতই অযোগ্য হোক না কেন তার ইচ্ছা শক্তির বাস্তবায়ন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার কিন্তু একজন নারী নিজের পছব্দমাফিক বিয়েতে বাবা মায়ের ঘরে যতটুকু অধিকার পায় স্বামীর ঘরে ততটুকু পায় না। প্রতিপদে তাকে গঞ্জনা সহ্য করে বছর ঘুরত্বেই বিয়ে নামক শব্দটি তার কাছে অসহ্য বলে মনে হয়। স্বামী নামক ব্যক্তিটিও চরম এক বৈরীভাব নিয়ে ক্রমেই আত্মপ্রকাশ করে। নারীর চলাফেরায় স্বাধীনতা নষ্ট হয়। সন্তান জন্মদানের ইচ্ছা প্রকাশেও নেই তার কোন স্বাধীনতা। এমনকি পরিকল্পনাহীন ভ্রুন হত্যায় পর্যন্ত নারীর কোন মতামত থাকে না। স্বামী, শ্বশুড়, শাশড়ী দেবার ননদ তুষ্টির উপর তার অবস্থান আর সুখ নির্ভর করে। অথচ স্বামীর চলাফেরার ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছার কোন কিছুতেই থাকে না তার কোন অধিকার। স্ত্রী যেন নির্বিকার ভাবে হয়ে উঠে স্বামীর ভোগ বিলাশের সামগ্রী। ঘরে স্ত্রীর পূর্ণ অধিকার সত্বেও তার বাইলে নিষিদ্ধঅনেক ক্ষেত্রে নিত্য আনাগোনা। এ জন্য কোন ন্যায় অন্যায় বোধ ও অনেক সময় কাজ করে না। স্ত্রী তার অধিকার খাটাইতে চাইলে স্বামী চরম নিষ্ঠুরভাবে তার সীমা নির্ধারণ করে দেয়। স্বামীর এই বহুগামীতে স্ত্রীকে অনেক সংসারে মেনে নিতে হয় নইলে তার জীবনে নেমে আসে নিজ স্বামীর ঘরে নির্বাসন। কখনো সন্তান ও সংসারের মায়া কাটিয়ে একেবারে বিদায় নিতে হয়। সন্তানকে একটি সুস্থ্য জীবন দানের জন্য স্ত্রীগণ অনেক সময় আবার নিরবে সহ্য করেন। কাউকে কিছু জানতে দেয় না। পাছে সন্তানটি পিতৃহারা কিংবা মাতৃøেহ থেকে বঞ্চিত হন। এমনকি নিজের বাবা, মা, ভাই বোন ও নিজেদের সামাজিক মর্যাদাহানীর ভয়ে মেয়েটিকে বাধ্য করে স্বামীর অনাচার মেনে নিতে। বার বার স্বামীর অবস্থান, বিত্ত ও প্রতাপকে সমাজের মান দন্ড হিসেবে তার সামনে হাজির করা হয়। সন্তান দিন দিন এর মাঝেই বড় থাকে। স্ত্রী সব রক্ষনাবেক্ষনের মালিক আর স্বামী হলো সব ভোগের মালিক। শিক্ষিত উচ্চ বিত্তের ঘরে দেখা যায় স্ত্রী পরিবারের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ি গাড়ি সব কিছুর মালিক। তবে তা কাগজে কলমে এ যেন লোক দেখানো ব্যাপার। তার চেয়ে বড় কথা যাবতীয় অবৈধ অর্থ আর ব্যবসাকে ধামাচাপা দেয়ার প্রয়াস।

মায়ের এ অবহেলা দেখে সন্তান মাকে একজন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ভাবতে শুরু করে। অক্ষম নারী হিসেবে সে শুধু কামনা করে করুনা। বড় হয়ে সে বুঝতে পারে সংসারে অধিক উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিই প্রধান। তাকে তুষ্ট রাখাটাই আসল। সমাজে তার পরিচয় তার বাবার জন্যই। মায়ের নির্ঘুম রাতের সেব যতœতো বাবা বিত্ত দিয়ে কিনতে পারে। বাবার অত্যাচারে মায়ের প্রতি তার অনুকম্পা হলে তা প্রকাশের সাহস তার থাকে না। পাছে যদি সে সব হারায়। মাকে তাই উপদেশ দেয় কোন ঝামেলায় না গিয়ে চুপচাপ সব মেনে নিতে। অনেক দিনতো সহ্য করেছো এখন কেন প্রতিবাদ।

বিবাহিত নারীর অপমৃত্যুর ৫০ ভাগ হয়ে থাকে স্বামীর মানষিক নির্যাতনে। এমনকি উন্নত বিশ্বে ও এ ধরণের মৃত’্য ৩০ ভাগ। খোদ আমেরিকায় প্রতিবছর ১৮ মিলিয়ন নারী স্বামীর হাতে প্রহৃত হয়। অথচ বিশ্বের উন্নততম দেশ হিসেবে নারী স্বাধীনতার বিষয়ে কত গালভরা বুলি। সামজের এই আমলা চিত্রকে কিভাবে মুছা যাবে? বাংলাদেশে শিশু ও নারী পাচর চলছে। অর্থনৈতিক সুবিধাদি যখন সমস্ত জনগণের মাঝে সঠিকভাবে বিতরণ করা হয়না, স্ত্রী জাতি তখন ঘরে বাইরে অত্যাচারিত হয়ে আদি ব্যবসা পতিতা বৃত্তিতে চলে যায়। সুস্থ জাত সুস্থ্য নেতা সুস্থ্য প্রজন্মের জন্য সুস্থ্য পরিবেশ এবং তাদের নারী গোষ্ঠীকে সঠিক মূল্যায়ন করা রাষ্ট্র ও সরকারের প্রধান দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে বিঞ্চিত নারী কোন দিন সুনাগরিকের জন্ম দিতে পারে না।

নারী অধিকার মানবিক ও আইনের সঠিক দৃষ্টিতে তা বিচারকরে দেখা দরকার। নইলে এমনি ঘটতে থাকবে। সেই ৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী যেভাবে আমাদের মা বোনদের অপমান করেছে, ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে তাদের লুকিয়ে রাখা সম্ভ্রম, ওদের সাজতে হয়েছে বীরঙ্গনা- সেসব পাক হানাদার, দালাল রাজাকারদের কিছু বীজ হয়তো অবশিষ্ট রয়ে গেছে এই বাংলায়। নইলে কারা পারবে আমাদের ত্যাগি বীরঙ্গনা, যোদ্ধা মা বোনদের উপর নির্যাতনের পূনরাবৃত্তি করতে। কেবল ঐসব বিবেকহীন কুরুচীপূর্ণ ব্যক্তিরাই পারে এমন নারকীয় কান্ড ঘটাতে। নারীরা আজও অসহায় তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। তাদেরকে প্রকৃত শিক্ষার আলোতে আলোকিত করে ঘরে তুলতে হবে। একাজটিতে তাদের নিজেদেরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। নারীরা সাহস করে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে তার যোগ্যতা, শিক্ষা ও দক্ষতায় তাকে সঠিক স্থানে নয়ে যাবে কারো করুণায় নয়। তাদের বেরিয়ে আসতে হবে অন্ধকারের বেড়াজাল থেকে। তাদেরকে আত্মনির্ভরশীল হয়ে জীবন গড়ে তুলতে হবে। কবে আসবে সেই শুভ দিন? এর জন্য আমাদের সকলকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে। রুখে দাড়াতে হবে কুৎসিত অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষগুলোকে। আমরা নারী ও শিশু নির্যাতনহীন আলোকিত ভোরের প্রত্যাশায়।

-লেখক
সম্পাদক ও প্রকাশক
সাপ্তাহিক সময়ের পথ
কুমিল্লা, বাংলাদেশ





Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply