কুমিল্লা শহরে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোতে ফাটল।।শতাধিক ভবনে ঝুকিঁ নিয়ে বাস করছে অসংখ্য মানুষ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী,কুমিল্লা :

কুমিল্লা শহরে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি অসংখ্য নতুন ভবন নির্মাণ হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। নির্মাণের সময় মানা হচ্ছে না কোন নিয়ম আর নির্মাণ কাজে ঠিকাদাররা মান সম্মত নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার না করেই নির্মাণ কাজ শেষ করছে । যার ফলে নির্মাণরত ভবনগুলো মান সম্মত হচ্ছে না। শহরের শতাধিক বসবাসের অনুপযোগী ঝুকির্পূণ ভবনগুলোতে বসবাস করছে অসংখ্য মানুষ। যা খুবই বিপদজনক,তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নতুন ও পুরাতন অফিস ভবন, বিদ্যালয় ও কলেজ গুলোতেও অফিস সময়ে কাজ করা ও থাকা তেমনি বিপদজনক। যেকোন সময় ঘটে যেতে পারে অসংখ্য প্রাণহানি। যেমন,বিগত বছরের ১৪ই জুন বেলা ১১ টায় জেলার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর সুবল আফতাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর গ শাখার ছাত্রীরা যখন ক্লাস করছিল ঠিক তখনি হঠাৎ পুরাতন ভবনের ছাদের প্লাস্টার ধসে পড়ে। এতে ওই ক্লাসের ছাত্রী তানিয়া, সুখী, সামিনা, রূপা, মারিয়া, সালমা, জাকিয়া, আমেনা, সুরাইয়া, সুরভী ও মীম আহত হয়।

কুমিল্লা শহরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সরকারি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। এই ভবনগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে অসংখ্য চাকরিজীবি। যে কোন সময় অসংখ্য প্রাণহানির আশংকা রয়েছে সরকারি এই ভবন গুলোতে।

শহরের ফৌজদারিতে অবস্থিত জেলা জজ ভবনের নীচ তলায় আদালত কেন্টিন,মসজিদ, জেলা সরকারি কৌশলীর (জি.পি),কোর্টের ২ টি হাজতখানা(মহিলা ও পুরুষ)কক্ষ সহ ৪/৫টি কক্ষের ভেতরের দেয়াল ও নীচ তলার মেঝেতেও ফাটল দেখা দিয়েছে। এই ভবনগুলো কুমিল্লা গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ ভবনটি তৈরির ৩ বছর ৮ মাসের মধ্যেই ৪/৫টি কক্ষের ভেতরের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন ফাটলরত মসজিদ,কেন্টিন, অফিসের কক্ষগুলোতে মানুষ নামায পড়ছে,নাস্তা খাচ্ছে,অফিসের কাজ করছে।

ফাটল দেখা দিয়েছে কুমিল্লা কেন্দ্রিয় কারাগার সংলগ্ন নতুন জেলা পরিষদ অফিসের নতুন ভবনেও। জেলা পরিষদের নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি এই ভবনের দু তলার সিড়ি,সিড়ির দেয়াল,সিড়ি সংলগ্ন কক্ষের দেয়াল,তৃতীয় তলার সিড়ির দেয়াল,এক তলার পেছনের একটি কক্ষের সামনের,ভেতরের দেয়াল ও মেঝেতে ফাটল দেখা দিয়েছে।

জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, এই ভবনটির জন্য টেন্ডার আহবান করা হয়েছিল ২০০২-০৩ সালে। জেলা পরিষদের নিজস্ব অর্থায়নে দেড় কোটি টাকার এই ভবনটির ৫% লেসে কাজের অনুমতি পায় মের্সাস ফয়জুল্লাহ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মের্সাস ফয়জুল্লাহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার শহরের পুলিশ লাইনের ফয়জুল্লাহ ঝালু মিয়া ও দাউদকান্দির মোস্তাক মিয়া এই ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন ২০০৩-০৪ সালে। ২০০৫ সালের জুন মাসে এই ভবনটি নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর জেলা পরিষদকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। নির্মাণের ৫ বছরের মধ্যে এ ভবনের বিভিন্ন অংশে এখন ফাটল দেখা দিয়েছে।

শহরের মোগলটুলিতে অবস্থিত টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন রাজস্ব অফিসের প্রায় সবগুলো কক্ষের ভিতরের ছাদের প্লাষ্টার ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে এবং কক্ষগুলো জরার্জীণ। এর মধ্যে কম্পিউটার কক্ষ,ডাক গ্রহণ ও বিলি কক্ষ,সাব লেজার শাখার কক্ষ,হিসাব রক্ষণ অফিসারের কক্ষ,সহকারি হিসাব রক্ষণ অফিসারের কক্ষ গুলোতে প্লাষ্টার ক্ষয়ে পড়ছে। জানা যায়, ১৯৭৪ সালের দিকে এ ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল।

এদিকে জেলার লাকসাম উপজেলায়ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে উপ-কর কমিশনারের অফিসসহ ৬টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। ঝুঁকিপূর্ণ ওই ভবনের ছাদে রয়েছে একটি মোবাইল টাওয়ার। বর্তমানে ভবনটির নিচের অংশ মাটিতে দেবে গেছে। এতে যে কোন মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ৪ বছর আগে লাকসাম পৌরসভা কর্তৃপক্ষ শহরের মধ্য লাকসাম বাইপাস সড়কের পাশে করকমিশনারের কার্যালয়ের ৪ তলা ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ভবন মালিকসহ ভাড়াটিয়াদের নোটিশ দিয়েছিল। পাশাপাশি ভবনের ছাদ থেকে দ্রুত টাওয়ারটি অপসারণের নোটিশ দেন। কিন্তু ভবন মালিক এখনও কোন পদক্ষেপ নেয়নি। তবে বেশ কয়েকজন ভাড়াটিয়া ওই ভবন ছেড়ে দিয়েছেন। লাকসাম পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ওই এলাকার প্রকৌশলী আবুল হাসেমের মালিকানাধীন ৪ তলা ভবনটি নির্মাণ ত্র“টির কারণে সেটিকে ২০০৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে মালিকসহ ভাড়াটিয়াদের নোটিশ দেয়া হয়েছিল। নোটিশ দেয়ার পর ওই ভবন ছেড়ে দিয়েছেন চাইল্ড হার্ট কিন্ডার গার্টেন, ইকরা কম্পিউটার সেন্টার, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিসহ ৪টি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ওই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে রয়েছে উপ-কর কমিশনারের অফিস, হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ, পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সান ফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স, মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গাইডিয়ান হেলফ অফিস। এছাড়াও ছাদে এখনও রয়েছে একটি মোবাইল টাওয়ার। এদিকে কয়েকদিন আগে ওই ৪ তলা ভবনটির কিছু অংশ মাটিতে দেবে যাওয়াতে সেটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের তিন তলা বিশিষ্ট নতুন ২ টি ছাত্র হোস্টেলের ভবনের বিভিন্ন জয়েন্টেও ফাটল দেখা দিয়েছে। তিন তলা বিশিষ্ট ছাত্র হোস্টেল-১ ও ২ এ মোট ৫৮টি কক্ষ রয়েছে। এই কক্ষগুলোর প্রায় দেয়ালেই লম্বা চিকন ফাটল দেখা দিয়েছে। ২০০৮ সালের শেষের দিকে এ ভবনগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ২০০৯ এর প্রথমে এ ভবনগুলো উদ্ধোধন করা হয়। নির্মাণের ১ বছরের মধ্যে ২০১০ সালের জানুয়ারী মাসে ভবনের বিভিন্ন জয়েন্টে ফাটল দেখা দেয়।

এছাড়াও কুমিল্লা শহরে সরকার ঘোষিত বসবাসের অনুপযোগী পরিত্যক্ত ভবন রয়েছে প্রায় অর্ধ শতাধিক। ঝুকিপূর্ণ এসব ভবনে বসবাসে যে কোন সময়ে ঘটে যেতে পারে অসংখ্য মানুষের প্রানহানী। এমন আশংকা জেনেও এসব ভবনে বসবাস করছেন অনেক লোক। কুমিল্লা শহরের কাপড়িয়াপট্রি,ছাতিপট্রি,ঝাউতলা,মর্ডাণ স্কুল রোড, কুমিল্লা কেন্দ্রিয় কারাগারের ভিতর ৩টি ভবন,রেইসর্কোস,মনোহরপুর,সোনালী ব্যাংকের বিপরীত পাশের গলির ভিতর ২ টি বাড়ি, দারগাবাড়ি, নবাববাড়ি,মুরাদপুর সহ শহরের আশেপাশে রয়েছে প্রায় অর্ধ শতাধিক পরিত্যক্ত ভবন। যেখানে মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।

কুমিল্লা কেন্দ্রিয় কারাগারের ভিতরে রয়েছে সরকার ঘোষিত বসবাসের অনুপযোগী পরিত্যক্ত ৩টি ভবন। এই ৩টি ভবনের মধ্যে ২ তলা বিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৮৭১ সালে। এটি ব্যবহারের অযোগ্য ঘোষনা করা হয়েছে ১৯৮২ সালের ২৬ই আগষ্ট। যার গণপূর্ত বিভাগের স্মারক নং-২০৫৩ পঃ। এই ভবনটি এখনো হাসপাতালের কাজে ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে ২ তলা বিশিষ্ট অফিস/কাম জেলারের বাস ভবন হিসেবে যে ভবনটি ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৮৭১ সালে। এটি ব্যবহার অযোগ্য ঘোষনা করা হয়েছে ১৯৮২ সালের ২৬ই আগষ্ট ।যার গণপূর্ত বিভাগের স্মারক নং-২০৫৩ আর সহকারী সার্জনের বাস ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৮৬৫ সালে। এটি ব্যবহারের অযোগ্য ঘোষনা করা হয়েছে ১৯৮৮ সালের ২৬ই আগষ্ট । যার গণপূর্ত বিভাগের স্মারক নং-২০৫৩ ।

সরকার ঘোষিত বসবাসের অনুপযোগী শহরের মনোহরপুরের একটি ৩ তলা জরাজীর্ণ ভবনে রয়েছে নোটারী পাবলিকের কার্যালয়। মনোহরপুর মৌজার পৌর এলাকায় ১৪৬ নং হোল্ডিংয়ের জরার্জীণ এই বাড়িটিও যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে। রামঘাটলায় বি.এম.এ ভবনটিও বহু পুরনো জরাজীর্ণ যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে।

এরকম কুমিল্লা শহরে আরো অনেক সরকার ঘোষিত বসবাসের অনুপযোগী পরিত্যক্ত ভবন রয়েছে,যেগুলো পরিত্যক্ত ও ঝুকির্পূণ ভবন জেনেও অনেক শিক্ষিত মানুষ বসবাস করছে। এসব পরিত্যক্ত ভবন ভেঙ্গে পড়লে জীবনহানি সহ অপূরণীয় ক্ষতি হবে জেনেও এতে মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে ।





Check Also

কুসিক নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করার দাবি বিএনপির

সৌরভ মাহমুদ হারুন :– কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার ...

Leave a Reply