চৌদ্দগ্রামে কো-অপারেটিভ ও এনজিও ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি ॥ ঋণের ফাঁদে হাজারো পরিবার সাধারণ মানুষ দিশেহারা

জামাল উদ্দিন স্বপন:
চৌদ্দগ্রাম উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের হাজারো সাধারণ মানুষ এনজিও এবং কো-অপারেটিভ (উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ব্যতিত) ব্যবসায়ীদের ঋণের জালে জড়িয়ে দিন দিন আরো বেশি ঋণগ্রস্থ হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ঋণের টাকা পরিশোধের চাপে সুদ গ্রহীতারা রীতিমতো দিশেহারা। মহাজনদের চড়া সুদের টাকা নিয়ে আগাম মাঠের ফসল বিক্রি করে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সুত্র জানায়, এভাবেই সাধারণ মানুষ একটি ঋণ থেকে বাঁচতে আরেকটি ঋণের জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। এমনকি অনেকে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের স্বর্ণালংকার, হালের বলদ, গরু-বাছুর, ছাগল ও হাঁস-মুরগি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার অনেকেই শেষ সম্বল ভিটাবাড়ি বিক্রি করে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। অনেক সুদ গ্রহীতা নারী-পুরুষ ঋণের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। গত ১০ বছরে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় একজনকে হত্যা ও ১২ জন আত্মহত্যা করেছে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ৬০-৬৫ শতাংশ মানুষ কো-অপারেটিভ ও এনজিও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। ফলে মহাজনরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠেছে। কোন চাকরি বা ব্যবসা না করেও তাদের রাজার হালে চলতে দেখা যায়। সরকারি ব্যাংকগুলো কৃষিসহ অন্যান্য ঋণ বিতরণে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালালেও নানা নিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়ে কৃষকদের একটি বড় অংশই এ ঋণ থেকে বঞ্চিত। ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় সাধারণ মানুষ ব্যবসায়ীদের সুদখোর ঋণের ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ, ক্ষেতখামার ও ব্যবসায় বাণিজ্য করতে হয়।

সরেজমিন উপজেলার বড় বড় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৬০/৭০ শতাংশ ব্যবসায়ী কো-অপারেটিভ ও এনজিও কারবারিদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। এতে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অসহায় ব্যবসায়ী ও কৃষকরা। এ অবস্থায় উৎপাদন বা আয় থেকে কারো পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। ফলে ঋণগ্রহীতাদের চড়া সুদে অপর অপর মহাজন বা অন্য এনজিও/কো-অপারেটিভ থেকে আবার ঋণ নিতে হয়।

একই সময় তিন-চারটি উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের ফলে তাদের এ ঋণের বোঝা আরো কয়েকগুন বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঋণের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে নেমে আসে আমনবিক নির্যাতন। ঋণের টাকা দিতে একটু দেরি হলে গালিগালাজ এবং মামলা-মোকদ্দমার ভয়ভীতি দেখানো হয়। এনজিও কর্তৃক ঋণগ্রহীতার বাড়ি থেকে গরু-ছাগল ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

ঋণ পরিশোধকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবারে দাম্পত্য কলহ, মা-ছেলে, বাবা-মেয়েদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই আছে। আবার অনেক পরিবারে সংসার ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হয়রানির জন্য অনেকটা দায়ী বিভিন্ন সময় নির্বাচিত দূর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধিরা। তাদের সিন্ডিকেট এত শক্তিশালী যে এর বিরুদ্ধে কেউ টুঁ শব্দ পর্যন্ত করে না। স্থানীয় প্রশাসনকে এ বিষয়ে বারবার জানানো হলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ফলে কো-অপারেটিভ প্রতিনিধিরা হয়ে উঠেছে আরো বেপরোয়া। প্রত্যেক গ্রামে রয়েছে তাদের শক্তিশালী সাব-সিন্ডিকেট।

আরো জানা গেছে, সাধারণত নিরীহ গ্রামবাসীকে যে কারণে সুদের টাকা নিতে হয় তা হলো- কৃষি ব্যাংকসহ অন্যান্য অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের ঋণদান পদ্ধতির জটিলতা, দারিদ্র্য, যৌতুকের টাকা জোগানো, বিদেশ গমন, কৃষকদের সার ও কৃষিপণ্য ক্রয় ইত্যাদি।

অভিযোগে জানা গেছে, কো-অপারেটিভ ও এনজিও প্রতিনিধিরা ঋণ দেয়ার সময় ব্লাঙ্ক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর গ্রহণ, দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে সময় বুঝে অর্থ প্রদান, গ্রাম্য সালিশে পরাজিত করা, মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া। এক্ষেত্রে পুলিশ তাদের সহযোগিতা করে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন।

এনজিও ব্যবসায়ীদের ঋণের জালে জড়িয়ে কয়েক হাজার পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা এসব এনজিও’র উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি নিছক লোক দেখানো। এনজিওগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আবার কখনো কখনো ভূয়া এনজিও আত্মপ্রকাশ করে বেকারত্বের সুযোগে তরুণ-তরুণীদের চাকরি দেয়ার নামে মোটা অঙ্কের জামানত নিয়ে উধাও হয়ে যায়।

উপজেলায় যেসব এনজিওগুলো কাজ করছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ব্র্যাক, আশা, গ্রামীণ ব্যাংক, টিএমএমএস, ব্যুারো, জাগরণী চক্রসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও উপজেলায় ২’শ ৩৪ টি কো-অপারেটিভ রয়েছে বলে উপজেলা সমবায় অফিস সুত্রে জানা গেছে। এগুলোর মধ্যে কার্যকর রয়েছে ১’শ ২৬টির মতো।

জানা গেছে, এনজিওগুলো সামাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ড যেমন- গণশিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, শিশু শিক্ষা, বনায়ন, স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, হাঁস-মুরগি পালনসহ নানা কর্মসূচি থাকলেও সুদের ব্যবসায়ই তাদের আসল টার্গেট। এনজিও কর্মীরা সহজ শর্তে ঋণ দানের আশ্বাস দিয়ে দরিদ্র পরিবারের মহিলাদের আকৃষ্ট করেন। সমিতির সদস্য বানিয়ে প্রথমেই তিন থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়া হয়। লিখিত নিয়ম অনুযায়ী ঋণের টাকা খাটিয়ে আয় থেকে কিস্তির টাকা আদায়ের কথা থাকলেও ঋণ দানের পরের সপ্তাহ থেকে এনজিওগুলো কিস্তির টাকা আদায় করে। কিন্তু এই ঋণের সুদের হার ব্যাংকের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি। সাধারণ মহিলা জানেন না, এই ঋণের সুদের হার কত? প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্টভাবে কিস্তির টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে এনজিও কর্মী ও কর্মকর্তারা ঋণ গ্রহীতার বাড়ি গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে নেন। ফলে একটি কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না করতেই আরেক কিস্তির টাকা পরিশোধের চিন্তা মাথায় চাপে। এক সংস্থার ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে তারা অন্য সংস্থার ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। এক সময় ঋণের চাপে শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। নিঃস্ব হচ্ছে গ্রামের সহজ সরল হাজার হাজার পরিবার। অনেকেই টাকা পরিশোধের জন্য জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে।

শুধু চৌদ্দগ্রাম নয় সারাদেশেই এ অবস্থা বিরাজ করছে। প্রতি দিনই কোন না কোন পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছেন এসব সাধারণ মানুষ। তাদের দিকে তাকানোর যেন কেউ নেই। সঠিক সরকারি নীতিমালার আলোকে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হোক সচেতন মহল এটাই আশা প্রকাশ করেছেন।





Check Also

চৌদ্দগ্রামে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত

মোঃ বেলাল হোসাইন, চৌদ্দগ্রাম :– প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মন্ত্রীপরিষদের প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ছবি ...

Leave a Reply