মেঘনা নদীতে দূর্ধর্ষ নৌ-ডাকাতি : সীমানা অস্বীকার করছে তিন থানার ওসি

লিটন চৌধুরী.ব্রাহ্মণবাড়িয়াঃ-
মেঘনা নদীর মোহনা ঘেঁষে তিন উপজেলার সীমানা। উপজেলা তিনটি হচ্ছে-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, আশুগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব। নদীতে ডাকাতি বা অন্য কোনো দূর্ঘটনা ঘটলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে তিন থানা। একে অন্যের সীমানায় ঘটনাটি ঘটেছে বলে বক্তব্য দিতে থাকে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ একে অপরের বক্তব্যকে মিথ্যা বলতেও দ্বিধা করেন না।

তাদের এ ধরণের রশি টানাটানিতে মামলা করতে পারেন না ভূক্তভোগীরা। সুযোগে পার পেয়ে যায় নৌ-ডাকাতরা। এমনই একটি দুর্ধর্ষ নৌ-ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, গত শুক্রবার সকালে মেঘনা নদীর আশুগঞ্জ এবং পানিশ্বর এলাকার মাঝামাঝি স্থানে।

ভূক্তভোগী যাত্রী ও ট্রলারের মাঝিরা জানায়, গত শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে সরাইল উপজেলার অরুয়াইল ঘাট থেকে ‘তাহের পরিবহন’ নামে একটি যাত্রীবাহী ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ভৈরবের উদ্দেশ্যে ৬০ জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা করে। পথিমধ্যে ট্রলারটি সরাইল উপজেলার হরিপুর, আজবপুর ও পানিশ্বর থেকে যাত্রী উঠায়। পানিশ্বর থেকে যাত্রীবেশে চার ডাকাত ট্রলারে উঠে। আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎ এলাকার কাছাকাছি ট্রলারটি পৌঁছামাত্র পেছনদিক থেকে ছোট একটি ইঞ্জিন নৌকায় করে বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ১২ জনের সংঘবদ্ধ ডাকাতদল ট্রলারটিকে ধাওয়া করে। মূহুর্তের মধ্যে তারা ট্রলারে লাফিয়ে উঠে পড়ে। তাদের সাথে যোগ দেয় পানিশ্বর থেকে উঠা চার যাত্রী।

তারা অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে ফেলে। ট্রলারের মাঝি মহিউদ্দিনকে বেধড়ক মারপিটের পর ধাক্কা মেরে নদীতে ফেলে দেয়। যাত্রীদেরকেও ব্যাপক মারপিট করে। এতে ২৫ যাত্রী আহত হয়। যাত্রীদের কাছ থেকে ডাকাতরা নগদ টাকা, মুঠো ফোন সেট, স্বর্নালংকারসহ প্রায় চার লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুটে নেয়। এসময় যাত্রীদের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠে মেঘনা নদীর বাতাস। ডাকাতি শেষে দ্রুত নৌপথ দিয়ে ডাকাতদল পালিয়ে যায়। যাত্রীরা ট্রলার থেকে আশুগঞ্জে নেমে যায়। আহত যাত্রীরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মো. আব্বাস উদ্দিন বলেন, নদীতে ডাকাতির ঘটনা জেনে খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারি-আশুগঞ্জ এবং ভৈরবের মাঝামাঝি স্থানে ডাকাতি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমার থানার টহল পুলিশ বিষয়টি জানেন।

মেঘনা নদীতে দায়িত্বরত সরাইল থানার টহল পুলিশের হাবিলদার আবদুল খালেক বলেন, আমরা আমাদের এলাকার জলসীমা পাহারা দিচ্ছি। ডাকাতির খবর পেয়ে ছুটে যায়। গিয়ে দেখি, সেটি আমাদের সীমানায় পড়েনি।

আশুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু জাফর আহমেদ বলেন, ডাকাতির ঘটনাটি আমার থানা এলাকার দুই কিলোমিটার পূর্বে সরাইল থানা এলাকায় ঘটেছে। অপরদিকে ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান কবির বলেন, ডাকাতির ঘটনাটি আমাদের জলসীমায় হলে জানতাম। নদীতে আমাদের টহল পুলিশ রয়েছে। সরাইল থানা পুলিশ মিথ্যা বলছে।

বৃহস্পতিবার দিনে-দুপুরে মেঘনা নদীতে যাত্রীবাহী ট্রলারে ডাকাতির ঘটনার দায়িত্ব স্বীকার নিয়ে তিন থানার ওসিদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও মন্তব্যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন ট্রলার মালিক এবং যাত্রীরা।

ট্রলার মালিক তাহের মিয়া বলেন, প্রতিদিন হাওর অঞ্চলের হাজার হাজার যাত্রী মেঘনা নদী দিয়ে আশুগঞ্জ ও ভৈরবে যাতায়াত করেন। এই জলপথে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। জলসীমা নিয়ে পুলিশের রশিটানাটানির কারণে ইচ্ছে থাকা সত্বেও মামলা করতে পারে না ভূক্তভোগীরা।

ট্রলার মালিক মো. হারুন মিয়া, রুবেল মিয়া সহ অনেকে জানান, থানায় মামলা না হওয়ায় এবং টহল পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার সুযোগে নদীতে ডাকাতির ঘটনা ঘটেই চলেছে। সমপ্রতি একই স্থানে এলাকার দানু মাঝির ট্রলারে ডাকাতি হয়। লুটে নেয় ৮ লাখ টাকার মালামাল। এছাড়াও আরো দু’টি নৌডাকাতির ঘটনা ঘটে। পুলিশকে জানানো হয়নি।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ডাকাতির ঘটনা আইনশৃঙ্খলা অবনতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ। থানা এলাকায় অধিক ডাকাতির ঘটনা ঘটলে ওসিকে বিভাগীয় শাস্তি ভোগ করতে হয়। আর এজন্যই ডাকাতির দায় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন সকল পুলিশ কর্মকর্তারা।





Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply