মেঘনা নদীতে অবৈধ বালু মহাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধ :৪ ড্রেজার জব্দ

লিটন চৌধুরী.ব্রাহ্মণবাড়িয়া :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী মেঘনা নদীতে বুধবার দুপুরে অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্ধি দুই পক্ষের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। তবে কেউ হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বালিমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় মেঘনা নদীতে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে আড়াইহাজার উপজেলার কদমিরচর ইউনিয়নের কদমিরচর মৌজার ডিগচর বালুমহাল সংলগ্ন বাহেরচর এলাকা থেকে ৪টি ড্রেজার জব্দ করেছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আটককৃত ড্রেজার মালিকদের জরিমানা করা হয়নি বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় মেঘনা নদীতে তিন ঘন্টার জন্য নৌ চলাচল বন্ধ ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বাহেরচর-কানাইনগর এলাকায় বালু উত্তোলন নিয়ে মেঘনা নদী তীরবর্তী নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার কদমিরচর ডিগচর এলাকার বালু ইজারাদারদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। বাহেরচর-কানাইনগর এলাকার ইজারাদার মাহাবুবুর রহমান ও আব্দুল করিমের অভিযোগ আড়াইহাজারের স্বপন, নূর হোসেন ও তার লোকজন সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মেঘনা নদীর বুকে চারটি ড্রেজার বসিয়ে ওই এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করছিলেন বলে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানা পুলিশকে অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে গতকাল বাহেরচর-কানাইনগর এলাকায় মেঘনা নদীর উপর ভ্রাম্যমাণ আদালত বসান বাঞ্ছারামপুরের ইউএনও। এ সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের সঙ্গে ছিলেন বাঞ্ছারামপুরের বাহেরচর-কানাইনগর বালু মহালের স্বত্বাধীকারী মাহাবুবুর রহমান ও আব্দুল করিম। তারা ৯টি স্পিড বোট,১০টি ট্রলার যোগে ৩ শতাধিক লোক নিয়ে মেঘনার বুকে যান। প্রশাসন সেখান থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে আড়াইহাজারের ইজারাদার নূর হোসেনের চারটি ড্রেজার জব্দ করে। এ নিয়ে দুই উপজেলার মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

জানা যায়, বাঞ্ছারামপুরের বাহেরচর ও আড়াইহাজারের কদমিরচর এলাকার উভয় গ্রুপই বৈধ বালু মহাল ইজারা নিলেও সীমানার বাহির থেকে তারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। শুধুমাত্র মেঘনার চরের বালু উত্তোলন এবং চর দখলের আধিপত্য নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গত ২০ বছরে দুই উপজেলার মাঝে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন নিহত এবং ৪ শতাধিক আহত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০২ সালে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বাঞ্ছারামপুরের বাহেরচর-কানাইনগর এলাকায় ৭৫ একর জায়গা জুড়ে কোয়ারি ইজারা দেওয়া হয়েছিল। নৌ চলাচলের সুবিধার্থে সীমিত পরিমাণ বালু উত্তোলন এবং পানি নিষ্কাশনের লক্ষ্যে এই কোয়ারি সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু ফসলি জমি,বসতবাড়ি ভাঙ্গনসহ জাতীয় গ্রিডের কানাইনগর বিদ্যুৎ পটহেট ভাঙ্গন রোধে এলাকাবাসীর বাধার মুখে কোয়ারিটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তিতে পুনরায় ২০০৭ সাল থেকে কোয়ারির বদলে এটিকে স্থায়ী বালু মহাল ঘোষনা করে ইজারা দেওয়া শুরু হয়। এলাকাবাসীর জমি ও বিদ্যুৎ পটহেট হুমকির কবলে পড়ায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি(বেলা) ২০১০ সালে মহামান্য হাইকোর্টে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের একটি রিট পিটিশন মামলা দায়ের করেন। তাতে জনস্বার্থে বালু মহালটি বিলুপ্তির জন্য আবেদন করা হয়। তারপরও বালু মহালটি পুনরায় ইজারা দেওয়া হয়।

এবিষয়ে জানতে চাইলে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মো.রাহেদ হোসেন বলেন, বাঞ্ছারামপুর-আড়াইহাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী বাহেরচর এলাকার মেঘনা নদীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আড়াইহাজার এলাকার চারটি ড্রেজার জব্দ করা হয়েছে। ড্রেজারে থাকা লোকজন পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা যায়নি। তিনি জানান, ড্রেজারগুলো ওই এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছিল। ভ্রাম্যমাণ আদালত চলাকালে বাহেরচরের বালু মহালের লোকজন আদালতকে সহযোগিতা করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, তবে আমার সামনে কোন রকম গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি।

এব্যাপারে আড়াইহাজারের কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম স্বপন বলেন, আমার ইউনিয়নের ডিগচর বালু মহাল থেকে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে পুলিশ নিয়ে এসে সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূতভাবে নারায়ণগঞ্জ জেলার ভিতর ঢুকে অবৈধ বালু উত্তোলনের মিথ্যা অভিযোগে চারটি ড্রেজার নিয়ে গেছেন। এই বিষয়টি প্রমাণ করেছে বাঞ্ছারামপুরের প্রশাসনের ক্ষমতার জোড়। তিনি বলেন, বাহেরচরের মাহাবুব ও করিমরা কমপক্ষে ২৫টি ট্রলার, ১০ থেকে ১২টি স্পিড বোটে করে ৩-৪ শ সন্ত্রাসী নিয়ে কমপক্ষে ২৫-৩০ রাউন্ড গুলি ছুড়ে বাঞ্ছারামপুরের প্রশাসনের উপস্থিতিতে বন্দুকের গুলি ছুড়ে আমাদের লোকজনদের মারধর করে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে বাঞ্ছারামপুরের প্রশাসন আমাদের এলাকার এক কোটি টাকারও বেশি মূল্যের চারটি ড্রেজার নিয়ে গেছে।

এবিষয়ে আড়াইহাজারের ডিগচর বালু মহালের ইজারাদার মো.নূর হোসেন বলেন, বাঞ্ছারামপুরের বাহেরচরের মাহাবুব ও করিম সন্ত্রাসী গ্রুপ নিয়া আমার লোকজনকে মারধর করে চারটি ড্রেজার জোড়পূর্বক নিয়ে গেছে।

বাঞ্ছারামপুরের বাহেরচর-কানাইনগর বালু মহালের স্বত্বাধীকারী মাহাবুবুর রহমান বলেন, অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে আড়াইহাজারের ৪টি ড্রেজার আটক করেছে বাঞ্ছারামপুরের বাহেরচর এলাকা থেকে পুলিশ ও ইউএনও এর সহযোগিতায়। এতে এলাকার লোকজনও পুলিশকে সাহায্য করে। আড়াইহাজারের লোকজন দুই/তিন রাউন্ড গুলি করেছে। আড়াইহাজারের বালুদস্যুদের ধরতে ৯টি স্পিড বোট ও কয়েকটি ট্রলার নিয়ে গেছি।

এ ব্যাপারে বাঞ্ছারামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো.আলাউদ্দিন বলেন, বাঞ্ছারামপুরের পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী বাহেরচর এলাকায় মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্র্রেটের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আড়াইহাজারের ৪টি ড্রেজার আটক করা হয়েছে। ওই প্রান্ত (আড়াইহাজার) থেকে গুলির দুই-তিনটি শব্দ শুনেছি। বাঞ্ছারামপুরের লোকজন গুলাগুলিতো দূরের কথা কোন রকম উশৃঙ্খলা করেনি।

এদিকে আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের আড়াইহাজার এলাকা থেকে ৪টি ড্রেজার বাঞ্ছারামপুরের ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু স্থানীয় চেয়ারম্যান ও বৈধ কাগজপত্র দিয়ে গেছে। সার্ভেয়ারকে ডাকছি মেপে সীমানার বৈধতা বের করা হবে। ৪টি ড্রেজার নিয়ে যাওয়ার এলাকায় কিছুটা উত্তেজনা রয়েছে।




Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply