নবীনগরে যুবক-যুবতীকে ১০০ দোররা, গ্রেপ্তার ১

লিটন চৌধুরী .ব্রাহ্মণবাড়িয়া ॥
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বড়িকান্দি গ্রামে যুবক-যুবতীকে দোররা মারার ঘটনা ঘটেছে। দোররা মারার ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রূপ মিয়া (৫৫) নামের একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠিয়েছে ওই মাতাব্বরকে। এঘটনার পর থেকে দোররা সালিশের গ্রাম্য মাতাব্বরদের চাপে এলাকা ছাড়া হয়েছেন ওই যুবক-যুবতী।

এলাকাবাসী ও পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, নবীনগর উপজেলার বড়িকান্দির স্বামী পরিত্যাক্তা এক সন্তানের জননীর (৩০) এর সঙ্গে একই গ্রামের খানে পাড়ার তিন সন্তানের জনক বাহাউদ্দিন (৩৫) এর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে ওই স্বামী পরিত্যাক্তা নারী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। প্রায় এক মাস পুর্বে বিষয়টি জানাজানি হয়ে পড়লে গ্রামের মাতাব্বররা গ্রামে গত মঙ্গলবার গভীর রাতে খানে পাড়ার মতিউর রহমানের বাড়িতে শালিস বৈঠক করে। শালিস বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন নাজিম উদ্দিন আহম্মেদ ওরফে ধিরু মিয়া। শালিসের জুড়িতে ছিলেন- স্থানীয় ইউপি সদস্য কামাল হোসেন, ছিদ্দিক মিয়া, হিরূ মিয়া, রূপ মিয়া, আব্দুল মালেক, স্বপন মিয়া, পলী চিকিৎসক শাহআলম, হাফেজ খা, তোফাজ্জল হোসেন, জহর মিয়া, সেলিম মিয়া, মো. মানিক, মো. দুলু মিয়া ও বেলাল হোসেন। শালিস বৈঠকে ওই যুবক (বাহাউদ্দিন)- যুবতী প্রত্যেককে ১০০টি দোররা এবং বাহাউদ্দিনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। পরে হাফেজ খা যুবককে এবং বেলাল হোসেন যুবতীকে তওবা পড়িয়ে ১০০টি করে দোররা মেরে শালিসের রায় কার্যকর করেন। এসময় বেতের আঘাতে কান্নায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন তারা দুজন। শালিস বৈঠকে ওই গ্রামের ২ শতাধিক নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন।

এ ব্যাপারে বড়িকান্দি গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য দানা মিয়া বলেন- ‘এঘটনা নিয়ে যেভাবে ছেলে মেয়েকে দোররা মারা হয়েছে তা অমানবিক, এই মেয়েকে গত জুন মাসের প্রথম দিকে গ্রামের কতিপয় সর্দারের নির্দেশে প্রথমে ওই নারীর জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানো হয়েছে।’

সালিশ বৈঠকের অন্যতম সদস্য ইউপি মেম্বার কামাল হোসেন বলেন,‘বিচারে ছেলে-মেয়েকে অসামাজিক কাজের অপরাধে ছেলেটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং উভয়কে (ছেলে-মেয়েকে) ২০/৩০টি বেত্রাঘাত করা হয়েছে, আর মৌলভী দিয়ে তওবা পড়ানো হয়েছে।’

গ্রামের চকেরহাটি জামে মসজিদের ঈমাম মাওলানা অলিউলাহ বলেন,‘আমাকে সর্দাররা বলেছিলেন ফতোয়া দিয়ে মেয়েটিকে গর্তে পুতে ঢিল মারার জন্য। কিন্তু আমি এসব করতে মানা করেছি, কারন মুফতি ছাড়া ফতোয়া দেওয়া যায়না। আমি শুধু মেয়েটিকে তওবা পড়িয়েছি।’

সালিশী সভার সভাপতি নাজিম উদ্দিনে আহমেদ বলেন,-‘সালিশী দরবারে ছেলেটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও আস্তে আস্তে ২০/২৫টি বেত্রাঘাত করা হয়েছে। পরে ছেলে-মেয়েকে ঈমাম সাহেবের মাধ্যমে তওবা করানো হয়েছে।’

এ বিষয়ে বড়িকান্দি গ্রামের এনামুল হক বাদল বলেন-‘মাতব্বররা দোররা মেরে ছেলে-মেয়েকে গ্রাম ছাড়া করা মোটেও উচিত হয়নি, অপরাধ করলে আইন আছে। এই ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচার হওয়া উচিত।’

এ ব্যাপারে নবীনগরের সলিমগঞ্জ নৌ-পলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আসাদুজ্জামান বলেন,‘ লোকমুখে দোররা মারার ঘটনার কথা শোনার পর বড়িকান্দি গ্রামে গিয়ে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছি। শুনেছি গ্রেপ্তার হওয়া রূপ মিয়ার কাছে অভিযুক্ত বাহাউদ্দিন ও ওই মহিলার জবান বন্দী মোবাইলে রেকর্ড করা আছে।’

এ ব্যাপারে বাহাউদ্দিন এর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,‘ পুরো ঘটনাটিই একটি ষড়যন্ত্র। এই ব্যাপারে এখন কিছু বলতে পারবনা পরে স্বাক্ষাতে বলব।’

নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন,‘এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টির তদন্ত করতে আমি শুক্রবার বড়িকান্দি গ্রামে গিয়েছিলাম। বাকী সালিশকারকদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’


Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply