সাংবাদিক রনীর ৫০ তম রক্তদান ও কিছু কথা

মোঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লাঃ
আমাদের বন্ধু বান্ধব কিংবা আত্মীয় স্বজন কোন দূঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে আমরা তাদের দেখতে যাই। সেখানে গিয়ে হয়তো শোনা গেল রোগীর রক্ত লাগবে। আত্মীয় স্বজনের রক্ত হলে ভাল হয়। এ অবস্থায় অনেকেই বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বিদায় নেন। কেউ বলেন আমার সমস্যা আছে, আমার স্বাস্থ্য ভাল না কিংবা আমি মনে হয় রোগে ভোগছি ;তাই রক্ত দিতে পারবনা। এ ভাবে অনেকেই পিছু হটে যান। এ ধরনের মরনাপন্ন রোগীদের পাশে ছুটে আসেন কেউ কেউ। তাদেরই একজন কুমিল্লার দেবিদ্বারের সাংবাদিক মোঃ সাইফ উদ্দিন (রনী)।
রনীর বর্তমান বয়স ৩৪ বছর। তার মায়ের নাম হাসনা বানু এবং পিতার নাম আলহাজ্ব মোঃ আমিন উদ্দিন, মাতা গৃহিনী, পিতা অবসরপ্রাপ্ত সরকারী চাকুরীজীবি। রনী এ পর্যন্ত ৫১ বার রক্তদান করেছেন। তবে কোন আত্মীয় স্বজনকে নয়, এসব রক্তদান করা হয়েছে বন্ধু- বান্ধবের পরিচিত জন কিংবা একেবারেই অপরিচিত নর -নারীকে।
রনীর জন্ম হয় কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার নবিয়াবাদ গ্রামে। তবে তার বাল্যকাল কাটে চান্দিনা উপজেলার পিহর গ্রামে। বাবা একদিন হাত ধরে নিয়ে গেলেন পিহর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ভর্তির পর এক সেট বই নিয়ে বাড়ীতে ফিরে এলো সে। তারপর ধীরে ধীরে দেবিদ্বারের বাতাপুকুরিয়া ও নবিয়াবাদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডি পেরিয়ে চান্দিনা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তী কালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজ ও চান্দিনা রেদোয়ান আহম্মেদ ডিগ্রী কলেজ ঘুরে শিক্ষা জীবন শেষ করেন। ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকেই রক্তদান শুরু করেন।
কিভারে রক্তদান শুরু করলেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৯৯৩ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজে এইচ এস সি বাণিজ্য শাখায় ভর্তির তৎকালীন ছাত্রনেতা নূরুর রহমান মাহমুদ তানিমের হাত ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করেন। তখন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ মেডিসিন কাবের মাধ্যমে রক্তদান শুরু করেন।
প্রথম রক্ত দিতে গেলে সকলেরই একটু ভয় হয়। রনীও কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তার মতো অনেকেই ধারণা করেন- রক্ত দিলে তিনি দূর্বল বোধ করবেন, স্বভাবিক কাজকর্ম করতে সমস্যা হবে, রক্ত কমে যাবে, রক্ত নেয়ার সময় ব্যাথা লাগবে, মাথা ঘোরাবে, বেহুশও হয়ে যেতে পারেন। প্রকৃত পক্ষে এগুলো সবই ভুল ধারনা।
মেডিসিন কাব ও তানিমের অনুপ্রেরণায় রনীর রক্তদান কার্যক্রম চলতে থাকে। ১৯৯৩ সালে দেয়ার পর তিনি দ্বিতীয় বার দেন ১৯৯৪ সালে সড়ক দূর্ঘটনায় আহত ভিক্টোরিয়া কলেজ ইন্টারমডিয়েট শাখার এক ছাত্রলীগ নেতাকে। এর পর থেকে প্রতি বছরই রক্তদান করেছেন। কোন কোন বছর ২/৩ বারও দিয়েছেন।
তিনি জানান রক্তদানের ৩ ঘন্টা পূর্বে পরিপূর্ন খাবার খেতে হয়। রক্তদানের পর হালকা নাস্তা এবং পানীয় পান করা ভালো। রক্তদানের আগের দিন ধুমপান করা যাবে না। এ ছাড়া রক্তদানের ৪৮ ঘন্টা পূর্বে মদ্য পান করা নিষেধ।
প্রতি দুবার রক্তদানের মধ্যে অন্তত তিন মাসের বিরিত রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এ নিয়ম তিনি সব সময় মেনে চলতে পারেন না। তিনি বলেন দেবিদ্বারের সবগুলো সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আমার মোবাইল নাম্বার দেয়া আছে। রোগীরা অথবা রোগীর আত্মীয় স্বজনগন যখন তাদের প্রিয়জনকে বাচাঁতে এগিয়ে আসতে বলেন তখন তাদের নিষেধ করতে পারিনা। তাই কোন কোন বছর ৪/৫ বারও রক্ত দিয়েছি।
স্বেচ্ছায় রক্তদানের ব্যাপারে সকল ধর্মের লোকেরা এগিয়ে আসতে পারেন। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা দেয়া আছে। পবিত্র কুরআন শরীফের সুরা মায়েদার ৩২ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে ‘‘একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করার মতো মহান কাজ’’। এছাড়া হিন্দুদের ঋগবেদ এ বলা হয়েছে নিশঃর্ত দানের জন্য রয়েছে অসাধারণ পুরস্কার, তারা লাভ করে আর্শীবাদ, ধন্য জীবন ও অমরত্ব।
মেডিসিন কাব ছাড়াও রনী রক্ত দিয়েছেন সন্ধানী, রেড ক্রিসেন্ট সহ বিভিন্ন সংগঠনে এবং সন্ধানী’র মরনোত্তর চক্ষুদান কর্মসূচীর একজন সদস্য। এসব প্রতিষ্ঠান রোগীদের বিশুদ্ধ রক্ত সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া রনী ব্যাক্তি পর্যায়ে অনেক লোককে রক্ত দিয়েছেন। তাদের নাম তিনি মনে রাখেন নি। তার কথা হচ্ছে- আমার রক্ত নিয়ে যদি কারও প্রাণ বাঁচে তাতেই আমার আনন্দ। তাই তিনি তাদের কৃজ্ঞতার বাধনে আবদ্ধ করতে চাননি। তবে খয়রাবাদ গ্রামের মতিউর রহমান মুন্সী, রামপুরের গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী, দেবিদ্বার পুরাতন বাজার এলাকা ক্যান্সারের রোগী মরম আলী সরকার ও শিবনগরের মোঃ মনতাজ উদ্দিনকে রক্তদানের কথা তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না।
তিনি একাই রক্ত দিচ্ছেন না, অন্যদেরও অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। গরীব ও অসহায় রোগীরা যাতে অতি সহজে নিরাপদ রক্ত পেতে পারেন সেজন্য তিনি দেবিদ্বারে ‘‘দৃষ্টান্ত’’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। ২০০৬ সালে তিনি এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।এ সংস্থার সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুন, আবু সায়েম, ডাঃ এনামুল হক, রিপন, মোস্তাক, ফারিয়া ,প্রমূখ নিয়মিত রক্তদান করছেন। ‘‘দৃষ্টান্ত’’ রক্তদানেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেনি বাল্য বিবাহ প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজ করে আসছে।
সাপ্তাহিক কুমিল্লার দেবিদ্বার প্রতিনিধি দিয়ে ২০০৮ সালে এই অকৃতদার ব্যক্তিটি সাংবাদিকতা শুরু করেন। তারপর ভোরের কাগজ ও মাই টিভি’র দেবিদ্বার প্রতিনিধি থেকে ভোরের কাগজ’র কুমিল্লা উত্তর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে মাই টিভি’র কুমিল্লা উত্তর প্রতিনিধি ও কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ময়নামতি প্রত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার এবং দৃষ্টান্ত নামে একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যাক্তিগত জীবনে ব্যাচেলার রনী ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ১০০ তম রক্তদান পূর্ন করা ও বাবা মায়ের নামে একটি বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করা।
দূঘটনায় আহত রোগী, সময়ের পূর্বে কখনো শিশু, বড় অস্ত্রপাচার, ক্যান্সার, রক্ত শূণ্যতা ও বিভিন্ন রোগের রোগীদের রক্তের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর রক্তের চাহিদা সাড়ে চার লক্ষ ব্যাগ। এর মধ্যে মাত্র ১০% বিশুদ্ধ রক্ত সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। বাকী রক্ত রোগীর আত্মীয় স্বজন কিংবা পেশাদার রক্ত বিক্রেতার নিকট থেকে কিনতে হচ্ছে।
চর্ম ও যৌন রোগে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ এম এন হুদা বলেছেন, পেশাদার রক্তদাতার রক্তে বিভিন্ন রোগের জীবানূ থাকার সম্ভবনা একশ ভাগ। রোগীর দেহে এসব রক্ত ঢুকানো আর বিষ ঢুকানো একই বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
তাই নিরাপদ রক্ত সরবরাহ বাড়াতে আমাকে আপনাকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থা এ জন্য কাজ করছে। রক্ত গ্রহনকারী রোগীরা স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছে ঋণী। যাদের সঙ্গে তাদের হয়তো কোনদিন দেখা হবে না, যারা তাদের রক্ত বিনামূল্যে দান করেছে। তারা নিশ্চয়ই মহৎ। আসুন আমরাও রক্ত দিয়ে মূমূর্ষ রোগীদের পাশে দাঁড়াই। তাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলি।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply