পতাকা বিক্রেতা ৭ বছর বয়সের শিশু উজ্জলের কথা

লিটন চৌধুরী,ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১৮ মার্চ ॥
১৭ই মার্চ ছিল জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯১তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বুক দিয়ে পতাকা কাঁধে নিয়ে পৌর আধুনিক সুপার মার্কেট এলাকা থেকে মঠের গোড়া এলাকায় হেঁটে যাচ্ছিল একটি শিশু। পরনে ছিল একটি অতি পুরনো চেক হাফ শার্ট, হাফ প্যান্ট। ডাক দিতেই চলে আসে এবং আমার কাছে আগ্রহ ভরে জিজ্ঞাসা করে, স্যার একটা পতাকা নিবেন? বলছিলাম, ৭ বছর বয়সের শিশু উজ্জলের কথা। থাকে শহরের মধ্যপাড়া বর্ডার বাজার এলাকায় চাচার বাসাতে। চাচার বাসায় কেন থাকে জানতে চাইলে উজ্জল জানায়, আমাগোর বাড়ি নবীনগরের বিদ্যাকুট। হেইখানের শাহআলম স্যাররে চিনেন, আমি তার কাছে কেলাশ ওয়ানে পড়তাম। ৩/৪ মাস আগে আমার বাবা খায়ের মিয়া প্যারালাইসেস হইয়া মারা যায়। হেরপর বাড়িত ঠিকমত থাকা-হাওয়ার সমস্যা হই দিক্কা চাচারা আমি, আমার মা সুহানা বেগম, আমার ছোটু এক ভাই আর বইনেরে তাইনের বাসাত নিয়া আহে। পতাকা বিক্রির কথা উজ্জলের কাছে জানতে চাইলে খৈ ফোটা শব্দের মত উত্তর দেয় উজ্জল, আমার চাচা লোকমান মিয়া বহুত বছর ধইরা রাস্তায় ঘুইরা ঘুইরা পতাকা বেছে। চাচায় আমারে কইছে, আজাইর থাকনের চেয়ে কাম করন ভাল। এর লাইগ্যা চাচা আমার আতে তুইল্যা দিছে এই পতাকা। কইছে ডেলী তিনশ টেকার পতাকা বেছতে পারলে আমারে, আমার বই বইনেরে তিনবেলা হাইয়াইব আর পড়াইব। আমি আমার পরিবারেরে বাঁচানের লাগি চাচার কথামতে এইকামে নামছি। ইচ্ছা আছিল পড়ালেহা কইরা বড় মানুষ অমো। এইকথা চাচারেও কইছিলাম। কিন্তু চাচায় কইছে, আগে টেহা, পরে পড়ালেহা। আমিও চিন্তা কইরা দেকলাম, টেহা না থাকলে ইস্কুলের বেতন, বই খাতা কিনুম কইত্যে। প্রতিদিন কত টাকা রোজগার কর পতাকা বিক্রি করে জানতে চাইলে শিশু উজ্জল ঝটপট উত্তর দেয়, চাচার কথা ডেলী তিনশ টেকার পতাকা বেছতে অইব। কিন্তু তিনশ টেহার পতাকা ত ডেলী বেছতারি না। হুনছি আইজ শেখ মুজিবের জন্মদিন। হের লেইগ্যা আশা করতাছি তিনশ টেহা বেচবার পারুম। শেখ মুজিবকে তুমি চিন বললে উজ্জল জানায়, শুনছি তাইনে বাংলাদেশটারে স্বাধীন করবার লাগি বহুত লড়াই করছে। এর বাইরে আর কিছছু জানি না। এরপরেই উজ্জল চলে আসে তার পতাকা বিক্রির প্রসঙ্গে। বলতে থাকে, বুচছেন স্যার, চাচায় জানে ডেলী তিনশ টেহা বেচন সম্ভব না। জাইন্যাও আমারে কইছে তিনশ টেহা বেচনের লাইগ্যা। সারাবছর কি মাইনসে পতাকা কিনে। বালা, বালা দিন আইলে রুজিডা একটু বেশি অয়। যেদিন চাচাত আতে তিনশ টেহা দিবার পাড়ি এদিন চাচা বালা, বালা হাওয়ায়, আদর করে। আর যেদিন বেচবার পারি না, চাচায় দুরু দুরু করে আর দমকাইয়া কয়, সারাদিন করছসটা কি?

কথাগুলো বলতে, বলতে উজ্জলের চোখে হালকা পানি জমে যায়। পরক্ষণেই উজ্জল ব্যাকুল সুরে বলতে লাগে, স্যার আমারে ছাড়েন, আমার টার্গেট তিনশ টেহা। না বেচতারলে আমার চাচায় আমারে, আমার মা, বইনেরে ঠিকমত হাওন টাওন দিব না। আমি যাইগা স্যার, দোয়া কইরেন আমার লাইগ্যা। বলেই শিশু উজ্জল গুটি পায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বুকে নেমে পড়লো তার প্রতিদিনের টার্গেট তিনশ টাকা অর্জনের জন্য।




Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply