বাংলাদেশে সাংবিধানিক শুন্যতার আশংকা!

দেলোয়ার জাহিদ :

দেলোয়ার জাহিদ
সম্প্রতি পঞ্চম সংশোধনীর অবৈধ ঘোষণা সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে। এটি সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে উপস্থাপিত হলে কমিটি’র অষ্টম বৈঠকে এ বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সংবিধান সংশোধনীর এখতিয়ার নিয়ে প্রথমেই বিরোধীদল সরব হয়ে উঠে। আবার অন্যদিকে আদালতের নির্দেশনার অতিরিক্ত পরিবর্তনের অভিযোগ এনে পুনর্মুদ্রিত সংবিধান স্থগিত করার ও দাবি জানায় প্রধান বিরোধীদল বিএনপি । এমতাবস্থায় দেশে কি কোন সাংবিধানিক শুন্যতার পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে কিনা এ বিষয়টি জরুরী ভিত্তিতে পর্যালোচনার দাবী রাখে।

সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি’র অষ্টম বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংশোধিত সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ও ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ থাকা, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্য ধর্মের জন্যও সমান অধিকার রাখা, এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতার সাংবিধানিক স্বীকৃতি, সেই সঙ্গে সব সরকারি, আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতির পিতার প্রতিকৃতি টাঙানোর বিধান রাখা ও উচ্চ আদালতের রায় অনুসারে জাতীয়তা ‘বাঙালি’ এবং নাগরিকতা ‘বাংলাদেশি’ করা। বৈঠক শেষে কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এ বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন এবং আরও কয়েকটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে ও তিনি জানান।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ নির্দেশনার অতিরিক্ত পরিবর্তন সম্বলিত পুনর্মুদ্রিত সংবিধান স্থগিত করা এবং একই সঙ্গে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রতি যে আবেদন জানিয়েছেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখর“ল ইসলাম আলমগীর ও অভিযোগ করেছেন যে সরকার বেআইনিভাবে সংবিধান পরিবর্তন করছে (আমাদের সময় , ফেব্রোয়ারী ২৩, ২০১১০)। তার মতে বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিয়ে আজ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব টিকে থাকবে কি না? স্বাধীন দেশ হিসেবে মানচিত্রে এর অবস্থান থাকবে কিনা? এমন সব অভিযোগ করে তিনি আরো বলেন, সম্পূর্ন বেআইনিভাবে সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে । সংবিধান সংশোধন করার এখতিয়ার শুধু সংসদের কিন্তু তা না করে সংশোধন করা হয়েছে আদালতের হুকুমে, রায়ের মধ্য দিয়ে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ও সংবিধান পুনর্মুদ্রণকে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার বহি:প্রকাশ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম সংশোধনী মামলায় সংবিধানের ৮টি অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছে কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় সেই নির্দেশ অমান্য করে ৫০টি অনুচ্ছেদ পরিবর্তন-বিবর্তন করেছে।

বুদ্ধিজীবি মহল থেকে ’৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে অস্পষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে, সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ও ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’থাকা ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক কিনা এ বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে সেন গুপ্ত বলেন, রাষ্ট্রের আনুকূল্য পেলে রাষ্ট্রধর্ম রেখেও সব ধর্মকে সমান অধিকার দেওয়া সম্ভব। অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কমিটির কাজের মূল ভিত্তি জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের রাজনীতি, দর্শন ও ইতিহাস। এগুলো মাথায় রেখেই বর্তমানে কাজ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সংবিধান কোনো বায়বীয় বিষয় নয়। প্রত্যেক জাতির সংবিধানে তার নিজস্ব রাজনৈতিক সংগ্রাম, ইতিহাস ও দর্শনের প্রতিফলন ঘটে।

আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী কিন্তু সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম সাংঘর্ষিক কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে সুরঞ্জিত দাবী করেন,ধর্মনিরপেক্ষতার মূল বিষয় হচ্ছে ‘সকল ধর্মের সমঅধিকার’। যারা এর শত্রু তারা অপব্যাখ্যা করে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলে দেখাতে চায়।

পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্য্যতঃ বিএনপি’র রাজনৈতিক উত্তোরাধিকারের মূলে কঠোর আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিষয়ে বিএনপি’র অবস্থান খুব স্পষ্ট নয় যেহেতু এবিষয়ে আদালতের রায় ও নির্দেশনা রয়েছে এবং যেহেতু আওয়ামী লীগ ও জোটভুক্ত দলগুলো’র সংসদে সংখ্যাগরিষ্টতা ও রয়েছে। কাজেই সংবিধান সংশোধনে আওয়ামী লীগকে খুব বেশী বেগ পেতে হবে না। বিএনপি’র অভিযোগগুলো যদি সত্যি হয় যে সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম সংশোধনী মামলায় সংবিধানের ৮টি অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছে অথচ আইন মন্ত্রণালয় সেই নির্দেশ অমান্য করে ৫০টি অনুচ্ছেদ পরিবর্তন-বিবর্তন করেছে। তাহলে বিএনপি বা কোন সংক্ষুব্ধ নাগরিক অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। তবে যতদূর মনে হয় যে আইন মন্ত্রণালয় পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের খসড়া কমিটির কাছে উত্থাপন করেছে এবং পুনর্মুদ্রিত সংবিধান নিয়েই কমিটি কাজ করছে। এটা কোন চুড়ান্ত কিছু নয়। এর আগে বিশেষ কমিটির গত ৯ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে সংশোধনীসহ নতুন সংবিধান আসার আগ পর্যন্ত পঞ্চম সংশোধনী সংক্রান্ত আদালতের রায়টি ‘কেইস ল’ হিসেবে রাখার ও সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিএনপি’র এ অভিযোগ কতটা বস্তুনিষ্ট? কতটা ই বা বস্তুনিষ্ট এ অভিযোগ যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংকটের মুখে? এবং এমন সংশয় যে, স্বাধীন দেশ হিসেবে মানচিত্রে এর অবস্থান টিকে থাকবে কিনা? বিএনপি এমন সব প্রশ্ন উৎ্থাপন করার মূলে কি রয়েছে? বিএনপি নেতৃবৃন্দ আসলে কি বুঝাতে চাচ্ছেন- তাদের কি ধারনা সংবিধান পরিবর্তন হয়ে গেছে? নাকি আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এর উপর বিশেষ কাজ করছে। বিএনপি’র তরফ থেকে বলা হচ্ছে সংবিধান সংশোধন করার এখতিয়ার শুধু সংসদের অথচ সেই সংসদেই তারা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত। সরকারী ভাতা ও সুযোগ সুবিধা নেয়া ছাড়া কোন কার্যক্রমে তাদের কোন অংশ গ্রহন নেই।

তারপর ও আমরা আশা করব যে ক্ষমতাসীন জোট সংবিধান পরিবর্তনের মতো একটি জাতীয় বিষয়ে বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়ার চেষ্টা করবে এবং সংবিধান সংশোধনের পদক্ষেপগুলো জনগনকে অবহিত করবে।

লেখকঃ দেলোয়ার জাহিদ নোটারী পাবলিক অব সাস্কাচুয়ান, হিউমান রাইটস এডভোকেট, একজন সাংবাদিক, জাতীয় সংবাদপত্রে নিয়মিত প্রবন্ধ, ফিচার ও স্তম্ভ লেখক। কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি,বর্তমানে কানাডা’র লয়েড মিনিষ্টার সিটি নিবাসী। ফোনঃ ১ (৫৮৭) ৩৩৩ ২০৬৮।




Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply