বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত : আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এগিয়ে

লিটন চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১৩মার্চ॥

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌর নির্বাচন চলাকালে শহরের দক্ষিণ মৌড়াইল থেকে র‌্যাবের উদ্ধার করা রাম দা ও হাত বোমা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি কেন্দ্রে বোমাবাজি ও কয়েকটি কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই বহু আকাঙ্খিত পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি প্রার্থী হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি ৫টি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ আনলেও তার পরিবারের বিরুদ্ধে সীল মারার অভিযোগ এনেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুর রহমান অপু। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে দাবী করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হেলাল উদ্দিন জানান, আমার অবস্থা যেখানেই ভাল সেখানেই বিএনপি প্রার্থী অভিযোগ করছেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোঃ হেলাল উদ্দিন এগিয়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল রবিবার সকাল ৮টা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ৪০টি কেন্দ্রে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিতিতে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সকাল সাড়ে ৯টায় সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থী সুভাষ দাস ও অজিত বণিকের সমর্থকদের মধ্যে প্রথমে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান জেলা প্রশাসক মোঃ আবদুল মান্নান ও পুলিশ সুপার জামিল আহমেদ। সকাল ১১টার পর থেকেই বিএনপি প্রার্থী হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি শহরের উত্তর ও দক্ষিণ পৈরতলা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ আনেন। সকাল ১১টায় দক্ষিণ পৈরতলা কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থী ইকবাল চৌধুরী ও আনোয়ার হোসেনের সমর্থকদের মধ্যে বাদানুবাদ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ এসময় এ কেন্দ্র থেকে কাউন্সিলর প্রার্থীর ব্যালট পেপার সহ ইউসুফ (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে নিয়ে আসে। এসময় কিছু সময়ের জন্য ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সকাল সোয়া ১১টায় সরকারি কলেজ কেন্দ্রের পেছনে দুটি হাত বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসময় কলেজ রোড ও ডাক বাংলা মোড় এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পুনিয়াউট কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থী শাহ নাসিম ও ফারুক সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। দুপুর দেড়টার দিকে শহরের কলেজ পাড়ার আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী হেলাল উদ্দিনের সমর্থকদের সাথে বিএনপি প্রার্থী হাফিজুর রহমান মোল্লা কচির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া তীব্র আতংকের কারণে বন্ধ হয়ে পড়ে। কলেজের সামনের রাস্তায় দু’ পক্ষের মধ্যে বৃষ্টির মত হাত বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সারা শহর জুড়ে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে র‌্যাব ও পুলিশের বিশেষ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এসময় লাঠিচার্জে ৫/৬ জন আহত হয়। র‌্যাব-৯ ভৈরব ক্যাম্পের অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লীডার শেখ মোহাম্মদ আলী সরকারি কলেজ কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ মৌড়াইল কবরস্থান এলাকা থেকে ৪টি হাত বোমা ও ৮টি রাম দা উদ্ধার করে। সংঘর্ষের সময় সন্ত্রাসীরা ফোকাস বাংলার ফটো সাংবাদিক মাসুকুর রহমান হৃদয়কে বেধরক মারধর করে। সংঘর্ষ চলাকালে সরকারি কলেজ কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থী হাফিজুর রহমান মোল্লা কচির পরিবার পরিজন কর্তৃক ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সীল মারার অভিযোগ উঠে। জেলা প্রশাসক মোঃ আবদুল মান্নান ও পুলিশ সুপার জামিল আহমেদের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুর রহমান অপু জানান, কচি মোল্লার বোন, ভাগ্নি ও পরিবারের লোকজন ১ নং ও ২ নং বুথ থেকে বেশ কিছু ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সীল মেরে বাক্সে ঢুকানোর চেষ্টা করে। এসময় আমার এজেন্ট আবু সুফিয়ান সহ আমি বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে আমাদের উপরও তারা চড়াও হয়। এ ব্যাপারে দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জহিরুল ইসলামকে জানালে তিনি আমাকে শাসিয়ে দেন। খবর পেয়ে পুলিং এজেন্টরা বিএনপি প্রার্থী হাফিজুর রহমান মোল্লা কচির চশমা মার্কায় সীল মারা অর্ধশত ব্যালট পেপার জব্দ করে বাতিল করেন। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে পুলিশ চশমা মার্কার এজেন্ট আকরাম (৩০) কে আটক করেন। ২ নং বুথে পুলিং অফিসার শফিউল আলম ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়ার কথা স্বীকার করেন। অবশ্য হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি এটিকে সাবোটাজ বলে উল্লেখ করে উল্টো তার এজেন্টকে বের করে দেয়ার অভিযোগ করেন। দুপুর ২টার পর কাজীপাড়া হোমিওপ্যাথিক কলেজ কেন্দ্রের ৫ নং বুথে এক কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকরা ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এসময় ছবি তুলতে গেলে সন্ত্রাসীরা এনটিভির ক্যামেরা ম্যান খালিদ বিন হাবিব রুমেলকে বেধরক পিটুনী দেয়। এ ঘটনার পর থেকে দুপুর আড়াই টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে। প্রিজাইডিং অফিসার মোঃ ইব্রাহিম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষ ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে পরিবেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। এ ঘটনায় ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কাজীপাড়ার পৌর আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাউন্সিলর প্রার্থী শাহআলম ও শাহনেওয়াজের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সোয়া ১টা থেকে পৌনে ৩টা পর্যন্ত কেন্দ্রটি বন্ধ থাকে। এ কেন্দ্রের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌর নির্বাচনে ভোটারদের সারি।

প্রিজাইডিং অফিসার কাজী আব্দুল কাইয়ুম খাদেম জানান, পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে হয়। দুপুর আড়াইটার দিকে দক্ষিণ মৌড়াইল সাহেরা গফুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থী শাহ নাসিম ও ফারুক সমর্থকদের মধ্যে বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়। এছাড়া মেড্ডা হুমায়ুন কবীর বিদ্যা নিকেতন কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থী জামাল হোসেন ও সাদেকুর রহমান শরীফ সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। রবিবার অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনকে জেলা প্রশাসন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হিসেবেই দেখছেন। জেলা প্রশাসক মোঃ আবদুল মান্নান জানান, দু’ একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে। আমি পুলিশ সুপারকে সাথে নিয়ে ২০টি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। জেলা আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের অন্যান্য শরীক সংগঠন এ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন। তবে বিএনপি ও বিএনপি প্রার্থী এ নির্বাচনে অনিয়ম সহ বোমাবাজির অভিযোগ করেছেন। বিএনপি প্রার্থী হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি শহরের উত্তর ও দক্ষিণ পৈরতলা, কাজীপাড়াস্থ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ, পৌর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি কলেজ কেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে জানান। বিএনপির প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট এডঃ গোলাম সারোয়ার খোকন এ ব্যাপারে উত্তর ও দক্ষিণ পৈরতলায় নির্বাচনে অনিয়মের ব্যাপারে রিটার্নিং অফিসার বরাবর এবং হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও সরকারি কলেজ কেন্দ্রে অনিয়মের ব্যাপারে প্রিজাইডিং অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভায় আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি মোঃ হেলাল উদ্দিন এগিয়ে রয়েছেন বলে নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে।




Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply