সরাইলে বাড়ছে শিশু শ্রম :দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হাজারো পরিবার

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে খেটে খাওয়া হাজার হাজার মানুষ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জীবন কাটছে এখন অভাব-অনটন ও দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে। অনেক পরিবারে চলছে নীরব দুর্বিক্ষ। তারা পেট পুরে দু’বেলা ভাত খেতে পায় না। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও সন্তানদের মুখে দু’বেলা খাবার দিতে পারছেন না অনেক পিতা। দু’বছর আগেও যে রোজগারের টাকায় কোনো রকম সংসার চালিয়ে নেয়া যেত, বর্তমানে তা দিয়ে চাল কিনে মাছ-সবজি কেনার টাকা থাকে না। পিতার একা রোজগারের টাকায় সংসার আর চলছে না। অসহায় মা, ভাই-বোনের উপোস ও পিতার আহাজারি দেখে স্কুল পড়–য়া শিশু ছেলেটি রাস্তায় নেমে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের খাবার জোগাড় করতে ছেলেটি পিতার সাথে সংসারের হাল কাঁধে নিয়েছেন। যে বয়সে বইখাতা হাতে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে ছেলেটি ধরেছেন রিক্সার হ্যান্ডেল। এখন পিতার মত সেও টাকা উপার্জন শুরু করেছে।

গত এক সপ্তাহে উপজেলার গ্রামগুলোতে সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, সাধারণ মানুষদের দুঃখ-দুর্দশার কথা। সরাইল সদর ইউনিয়নের স্বল্প নোয়াগাঁও গ্রামের খুরশেদ মিয়া (১৫) পিতার পাশাপাশি সেও এখন রিক্সা চালায়। তার পিতা আব্দুল হামিদ মিয়াও একজন রিক্সা চালক। খুরশেদ বলেন, সংসারে সদস্য সংখ্যা ৯জন। প্রতিদিন চাল লাগে ৬ কেজি। রিক্সা চালিয়ে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায় সংসার চালাতে বাবা এখন হিমশিম খাচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম বেশী। ছোট ভাই-বোন পেট পুরে খেতে পায় না। আমাদের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারে না। তাই রিক্সা চালায়, সংসার চালাতে বাবাকে সহযোগিতা করছি। শিশু খুরশেদ আরও বলেন, লেখাপড়ার ইচ্ছে ছিল। সংসারে টানাটানি তাই পারছি না। গত ৬ মাস যাবত রিক্সা চালায়। সরকারি কোনো সাহায্য পায় না। একই ইউনিয়নের উচালিয়া পাড়া গ্রামের সুজন মিয়া (১৩) মাত্র ১ মাস আগে রিক্সা নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। পিতা মো. ছাদির আহমেদ একজন দিন মজুর। শিশু সুজন বলেন, ৬ সদস্যের পরিবার তাদের। চাল, ডাল, আটা, তেল, নূনের দাম খুব বেশী। দু’বছর আগেও বাবার রোজগার দিয়েই সংসার কোনো রকম চলত। এখন বেশী পরিশ্রম করেও বাবা সংসার চালাতে পারছে না। অভাব-অনটন লেগেই থাকে। বাবা আমাদের খাতা, কলম ও প্রাইভেট মাষ্টারের বেতন দিতে পারে না। সংসারে চাল নিলে সবজি কেনার টাকা থাকে না। ছোট ছোট ভাই-বোনের কান্না সহ্য করতে না পেরে রিক্সা নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। বাবা প্রথমে নিষেধ দিয়েছিল, এখন আর দেই না। ছোট বলে সবাই ভাড়া কম দেন। সারাদিন রিক্সা চালিয়ে ৭০/৮০ টাকা বাবার হাতে তুলে দেই। প্রতিদিন ৩০ টাকা রিক্সার ভাড়া দিতে হয়। শিশু সুজন আক্ষেপ করে বলেন, লেখাপড়াতেই ছিলাম, অভাব আমাদের রাস্তায় টেনে এনেছে। দু’মুঠো ভাতের জন্য রিক্সা চালায়। সরকার আমাদের দেখেন না। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় ও মহাসড়কে সুজন, খুরশেদ, সারুর মতো শত শত শিশু এখন রিক্সা চালিয়ে সাংসারের অভাব-অনটন দূর করতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সরকার অতি দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৬টি ওএমএস ডিলারের মাধ্যমে খোলা বাজারে ন্যায্য মূল্যে চাল বিক্রি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তাছাড়া ফেয়ার প্রাইজ কার্যক্রমের মাধ্যমে উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৯ হাজার ৩শ’ ৯০টি কার্ডের বিপরীতে ন্যায্য মূল্যে জনপ্রতি মাসে ১০ কেজি চাল ও ১০ কেজি গম দেয়া হবে। উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নে বরাদ্দকৃত ৮শ’ ১৫টি কার্ডের বিপরীতে খাদ্য শস্য বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

ওদিকে এলাকার সীমিত আয়ের মানুষ জানায়, ন্যায্য মূল্যে চাল পাওয়া গেলেও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। কালীকচ্ছে প্রাইস কার্ডের চাল নিতে আসেন বিধবা নুরজাহান বেগম (৪৫)। তিনি বলেন, ৭ সদস্যের সংসারে প্রতিদিন চাল লাগে সাড়ে ৫ কেজি। আর সরকার দিচ্ছেন মাসে ২০ কেজি। তাতে কোনোভাবেই মাস চলবে না। আমাদের উপোস থাকতেই হবে। সীমিত আয়, জিনিসপত্রের দাম চড়া এখন আমরা বাঁচব কিভাবে। চুন্টা ইউনিয়নের দাস পাড়া গ্রামের দিনমজুর মন্টু দাসের স্ত্রী সবিতা রানী দাস (৪৬) বলেন, স্বামীর রোজগারের ১৮০ টাকা দিয়ে সংসার আর চালানো যাচ্ছে না। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি কোনো সাহায্য পাচ্ছি না। চেয়াম্যান-মেম্বারের কাছে গিয়েছি কোনো কার্ড মেলেনি। তারা জানিয়েছেন এখন খাদ্য শস্যের কার্ডের তালিকা দলীয় নেতারা করছেন। চুন্টা ইউপির সংশ্লিষ্ট (৬নং) ওয়ার্ড মেম্বার সুবল চন্দ্র দাস বলেন, গত দু’বছর যাবত ভিজিডি-ভিজিএফ ও বর্তমান প্রাইস কার্ডের তালিকা দলীয় লোকজন দিয়েই করানো হচ্ছে। আমাদের মতমত নেয়া হয় না। গ্রামের তাজবানু (২৬), বাবুল মিয়া (৩০) ও আলী আফজাল (৪০) অভিযোগ করে বলেন, দলীয় লোকজন স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে এসব কার্ডের তালিকা করেছেন। অনেক দুস্থ অসহায় সরকারি এই কার্যক্রম থেকে বাদ পড়েছেন। লোপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ শাহবুদ্দিন (৮৭) বলেন, এখন না খেয়ে মরতে হবে। সরকারি সাহায্য পায় না। চেয়ারম্যান, মেম্বার ও নেতাদের কাছে একাধিবার ধর্ণা দিয়ে সাহায্য পায়নি। তারা শুধু একেঅপরের কথা বলেন। নিরূপায় হয়ে রাস্তায় ভিক্ষায় নেমেছি। বৃদ্ধ শাহাবুদ্দিন আরো বলেন, বাবারে এখন জিনিসপত্রের যে দাম, তা আমরা বাপের জন্মেও দেখিনি। উপজেলার বেশকিছু প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মেধাবী অনেক ছাত্র এখন ঝড়ে পড়ছে। কারণ হিসেবে শিক্ষকরা বলেন, অনেকে পিতার সাথে সংসারের হাল ধরছেন। চাল, ডাল, কেরোসিন, লবণ, তেল সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য এখন যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সীমিত আয়ের মানুষ দুর্দিন পার করছেন। অনেক পরিবারের সদস্যরা প্রায় দিন উপোস থাকতে হচ্ছে। নিরূপায় হয়ে শিশুরা রিক্সা চালনা, ইট ভাঙ্গার মত বিপদজ্জনক পেশায় কাজ করছে। সংসারে অভাব-টানাটানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও চড়া, সন্তানদের দু’বেলা পেট পুরে খাবার দিতে না পেরে অনেক মানুষ নেমে পড়েছে অপরাধ জগতে। এলাকায় বেড়েছে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই।




Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply