সরাইলে আ’লীগ নেতাদের মদদে খাস জমি দখল ও মাটি কেটে ইট তৈরীর মহোৎসব

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল :

সরাইলে স্থানীয় ভূমি অফিস ও কিছু প্রভাবশালী ভূমিখেকো আ’লীগ নেতাদের সহায়তায় সরকারি খাস জমি দখল করে মাটি কেটে ইট তৈরীর মহোৎসব চলছে। ধ্বংস করছে কয়েক’শ বছরের পুরোনো গোচারণ ভূমি। তৃশা ব্রিকস এর মালিক আ’লীগ কর্মী গৌর চন্দ্র সাহা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে টাকার জোরে সবকিছু ম্যানেজ করে এমনটি করছেন বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। কোন ধরনের সরকারি বিধি-নিষেধের তোয়াক্কাই করছেন না তিনি। স্থানীয় একাধিকসূত্র জানায়, একটি মাত্র লাইসেন্স দিয়ে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একই নামে একাধিক ব্রিকস মিল চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তিনি অধিকাংশ ইটা পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে পাচার করছেন। সেখানে তিনি একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৌশলে সরকারকে ফাঁকি দিয়ে বাণিজ্য করে যাচ্ছেন। ওদিকে মাটি কেটে গোচারণ ভূমিকে খালে পরিণত করায় কৃষকদের এখন মাথায় হাত। স্থানীয় ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার শাহজাদাপুর গ্রাম থেকে প্রায় ২/৩ কিলোমিটার দূরে হাওর এলাকায় লালখান কান্দি নামক সরকারি জায়গাটির অবস্থান। শাহজাদাপুর মৌজার ১নং খাস খতিয়ানভূক্ত ৫৩৬৮ দাগে মোট জায়গার পরিমাণ ১৮ একর ৮০ শতাংশ। ১৯৮৭ সালের জরিপে অবৈধ পন্থায় শাহজাদাপুর গ্রামের মাতাব্বর আবদুল কাদের ৪ একর ৭০ শতাংশ জায়গা নিজ নামে রেকর্ড করে নেন। সরকারি জায়গা উদ্ধারের জন্য তার বিরুদ্ধে দেওয়ানী মামলা করেন জেলা প্রশাসক। মামলার রায় সরকারের পক্ষে আসে। গত মঙ্গলবার শাপলা বিল সংলগ্ন ওই খাস জায়গায় সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তৃশা ব্রিকস থেকে প্রায় ২শ গজ দূরের ওই জায়গাটি থেকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ৪টি ট্রাক্টর দিয়ে দেদারছে মাটি কাটছেন। দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছেন শাহজাদাপুর গ্রামের একাধিক অর্থলোভী প্রভাবশালী ভূমিখেকোরা। নিরীহ একাধিক কৃষক জানায়, প্রায় ৪শত বছরের পুরাতন এ জায়গাটিতে আশপাশের ৪/৫টি গ্রামের গরু-বাছুর ঘাস খেয়ে জীবন ধারন করে। ভূমিহীন অনেক বর্গাচাষী এখানে ধান মাড়াইয়ের কাজ করেন নির্বিঘেœ। এখন শাহজাদাপুর ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি সৈয়দ জামাল মাষ্টার, আ’লীগ কর্মী বাবুল খাদেম, গোলাম মওলা ও দুলাল খাদেমের প্রভাবে মাটি কেটে গোচারণ ভূমি ধ্বংস ও কৃষকদের ধান মাড়াইয়ের মত কাজ চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। অনেককে কাটা জায়গার পাশে মাথায় হাত দিয়ে বসে নির্বাক হয়ে কাঁদতে দেখা গেছে। এলাকাবাসী জানায়, স্থানীয় তহশিলদার লোকমান মিয়া ও উর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা প্রায় ১৯ লাখ টাকার বিনিময়ে তৃশা ব্রিকসকে মাটি কাটতে সহায়তা করছেন। সুযোগে গৌর বাবু কোটি কোটি টাকার মাটি কেটে কৃষি কাজ ও কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি করে যাচ্ছেন। ট্রাক্টরের ধূলায় আশ-পাশের প্রায় ২/৩ একর ফসলি জমি বিনষ্ট হওয়ার পথে। স্থানীয় অসহায় কৃষক হামদু মিয়া(৬২), অহিদ মিয়া (৫০), শিশু মিয়া (৬০) ও কুনু মিয়া (৩৮) ক্ষোভের সাথে বলেন, সাবেক ও বর্তমান তহশিলদার সহ ভূমি অফিসের লোকজনকে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে এখানে মাটি কাটছে। নদীর পাড়ও কাটছে। আমাদের গুরুগুলি এখন না খেয়ে মরবে। ভূমিহীন কৃষকদের ধান শুকানোর জন্য এখন আকাশে যেতে হবে। তৃশা ব্রিকস এর ব্যবস্থাপক মো. হারুন মিয়া ৮ বছর যাবত মিল চালানোর কথা স্বীকার করে বলেন, মওলা মিয়া ও দুলাল মিয়ার কাছ থেকে মাটি ক্রয় করেছি। সরকারি লোকজন বাঁধা দিয়েছিল। আমাদের মালিক যোগাযোগ করার পর আবার অনুমতি দিয়েছে। তাই মাটি কাটছি। শাহজাদাপুর ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম খাদেম বলেন, সরকারি জায়গার মাটি কেটে ইট তৈরী করছে তৃশা ব্রিকস। বিষয়টি তহশিলদার, এ্যাসিল্যান্ডসহ অনেককে বার বার জানিয়েছি। কে শুনে কার কথা। কোন কাজ হয়নি। সরকারি কর্মকর্তারা সবই পারে। শাহজাদাপুর-চান্দুরা সড়কের পাশ থেকে কয়েকবছর যাবৎ ফাইভ ষ্টার ব্রিকস এর মালিক ইচ্ছে মত মাটি কাটছে। কেউ কিছু বলছে না। এখন আমি রাস্তা মেরামতের মাটি পাচ্ছি না। এদের বিচার হওয়া উচিত। শাহজাদাপুর ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. অলিউর রহমান সরকারি খাস জায়গা থেকে তৃশা ব্রিকস কর্তৃক মাটি কাটার কথা স্বীকার করে বলেন, আমি সরজমিনে গিয়ে গৌর চন্দ্র সাহা, গোলাম মওলা, দুলাল খাদেম, খাদেম আলী ও সোলাইমান খাদেমকে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে মাটি কাটতে দেখেছি। তাদের বিরুদ্ধে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি স্মারক নং-০৭ মারফত প্রতিবেদন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করেছি। ভূমিহীনরা সরকারি জায়গা পেতে পারে। তবে ওই জায়গা বিক্রি বা শ্রেণী পরিবর্তন করতে পারে না। প্রশিক্ষণে থাকা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মুনিরুজ্জামান মুঠো বলেন, আমি বিষয়টি দেখছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে প্রতিবেদন প্রাপ্তির কথা স্বীকার করে বলেন, প্রশিক্ষণ থেকে এসে বিষয়টি দেখে ব্যবস্থা নিব। এ ব্যাপারে তৃশা ব্রিকস এর মালিক আ’লীগ কর্মী গৌর চন্দ্র সাহার মুঠো ফোনে (০১৭১১৭৯৯৩২১) যোগাযোগ করলে তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন, এলাকার ডাকাতি দেখেন না। সরকারি জায়গায় মাটি কাটি সেইটা ভাল দেখেন। পরে ফোন দিয়েন। পরবর্তীতে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।




Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply