কুমিল্লার গোমতী বাঁধের ভেতরে অপরিকল্পিত বনায়ন নাব্যতা হারাচ্ছে বেশ কয়েকটি নদনদী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী,কুমিল্লা :
কুমিল্লায় মরে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি নদনদী। উৎসমুখে গতিরোধ, দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, অবৈধ বনায়ন, অপরিকল্পিত ব্রিজ, কোন নিয়ম ছাড়াই মাটি কাটা ও বালু উত্তোলনের কারণেই ধীরে ধীরে মরতে বসেছে এসব নদনদী। একদিকে যেমন নদী দখল হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে পানির গতিপথে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। জেলায় রয়েছে বেশ কয়েকটি উলেখযোগ্য নদী ও খাল। এখানে প্রধান নদী গোমতী। ডাকাতিয়া ও কাঁকড়ি নামে আরও দুটি নদী আছে। ডাকাতিয়া একটি অন্যতম পুরনো নদী। খালগুলো হচ্ছে, গঙ্গাইজুড়ি, ঘুংঘুর ও সোনাইছড়ি। গভীর নলকূপের পাশাপাশি নদী ও খালের পানি দিয়ে একসময় এ জেলায় সেচকাজ চলত। ডক্টর আখতার হামিদ খানের উদ্যোগে সোনাইছড়ি খাল এবং প্রয়াত এক রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে কাটা কোদালিয়া খাল দক্ষিণ কুমিল্লার কৃষি বিপ্লব এনেছিল। এর বাইরে নাম না জানা অনেক খালের পানি সেচকাজে ব্যবহার হতো। আজ এগুলো কোন কোনটি মৃতপ্রায়, কোনটি বা হারিয়েছে অব্যবস্থাপনার কারণে। এছাড়া নদী ও খালের দু’পাড়ে বসতি গড়ে ওঠায় ও যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা- বাণিজ্যও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দাউদকান্দির মেঘনা নদীর কুমিল্লার অংশ শুকিয়ে যাওয়ায় এবং অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় সম্ভাবনাময় এই অংশটি ব্যবসা-বাণিজ্যও দিন দিন কমে যাচ্ছে। জেলার নদী গোমতী। এদেশের প্রবেশ মুখে উজানের অংশে ভারত সরকার পাম্প হাউস নির্মাণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধার জন্য ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চলের পানি সরিয়ে নেয়। এতে নদীর পানি প্রবাহ একেবারেই কমে গেছে। চলতি বছর যে কারণে নদীটি প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে গোমতী অববাহিকায় সেচকার্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে। গোমতী, ডাকাতিয়া, কাঁকড়ি নদীর ওপর সরকার বেশ ক’টি ব্রিজ নির্মাণ করছে। ব্রিজ নির্মাণে সড়ক ও জনপথ বিভাগ দায়িত্ব পালন করলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডেরও মতামত নেয়া হয়নি। নদী বিষয়ে অনভিজ্ঞতার কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথে তারা বাধার সৃষ্টি করে। এতে পলি জমে নদীর নাব্যতা নষ্ট হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী জানান, জেলার তিনটি নদীর যে প্রশস্ততা তাতে কোন গার্ডার ছাড়াই ব্রিজ নির্মাণ সম্ভব হতো। এতে পানি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হতো না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতামত নিয়ে ব্রিজ নির্মাণ করলে নদীতে পলি জমত না। বেইলি সেতুর পিলার অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করায় সেখানে নদীর নাব্যতা দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। এর বাইরে তিনি আরও বলেন, পালপাড়া বেইলি ব্রিজটির দৈর্ঘ্য কমাতে নদী ভরাট করা হয়। এদিকে চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার এলাকায় কাঁকড়ি নদীর ওপর ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের ব্রিজটিও নদীতে ছোট করে নির্মাণ করা হয়। গোমতী বাঁধের ভেতরে বনায়ন চলছে অপরিকল্পিতভাবে। গোমতী ছাড়াও কাঁকড়ি, ডাকাতিয়া অববাহিকায়ও অনেক ফলজ ও বনজ বৃক্ষ রোপণ করে বাগান সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্ষাকালে পানির প্রবল স্রোত এসব গাছপালায় বাধাগ্রস্ত হয়ে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে চাপের সৃষ্টি করে। এতে বাঁধ ভাঙার উপক্রম হয়। কুমিল্লা সদর উপজেলার চাঁনপুর ও ছত্রখীলে বেশ ক’টি বাগান রয়েছে। সেখানকার গাছগুলো বেশ বড় বড়। বর্ষাকালে পানি প্রবাহ বেড়ে গেলেও সব বাগান বাধার সৃষ্টি করে। গোমতীর বহু জায়গাই দখল হয়েছে। পাউবি কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে বহুবার দখলদারদের নোটিশও করা হয়েছে কিন্তু প্রভাবশালীদের উচ্ছেদ সম্ভব হয়নি। কারণ হিসেবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে দায়ী করেন নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক পাউবি সূত্র। সূত্র মতে, গোমতীর ৩০.৩ কিলোমিটার অংশে জেলার ব্রাহ্মণপাড়ার মনোহরপুর এলাকায় এ রকম বেশ ক’টি বাড়ি রয়েছে। এছাড়া কুমিল্লার গোমতী অংশের দু’তীরে ৩ শতাধিক নতুন, ডাকাতিয়ায় ৫০টিরও বেশি এবং কাঁকড়ি নদীতে ৬০টিরও বেশি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। অর্থাৎ নদীগুলোর অবৈধ স্থাপনা রয়েছে ৪০০টিরও বেশি। আস্তে আস্তে গাছপালা, মাটির ঘর, আধাপাকা ঘর ও সর্বশেষ পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নদী দখল করে বাড়ি, গতিপথে প্রতিবন্ধতা, অবৈধ উপায়ে মাটি কাটা, বালু উত্তোলন ইত্যাদির মাধ্যমে নদীগুলোর দুরাবস্থার বিষয়ে ভূমি আইনের উদ্ধৃতি দিয়ে অ্যাডভোকেট আনোয়ার বলেন, নদীতীর দখল, মাটি কাটা, বাগান সৃজনের নামে জায়গা দখল, বাঁধের ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল প্রভৃতি বিষয় পৃথক পৃথক বিভাগ বা মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ন্ত্রণ হয় বলে সমন্বয়হীনতার কারণে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।




Check Also

দেবিদ্বারে অগ্নিকান্ডে ১কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ– কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামে রান্না ঘরের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরনে ১৫টি ...

Leave a Reply