আন্তর্জাতিক নারী দিবস :শত প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা

ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু,কুমিল্লা :

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই বিশ্ব নারী দিবসের রয়েছে গৌরব উজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ সালের এই দিনটিতে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের একটি সুই কারখানার নারী শ্রমিকরা অমানবিক কাজের পরিবেশ, নিম্নমজুরী এবং দৈনিক ১২ ঘন্টা খাঁটুনির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এক মিছিল বের করেন। তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিল পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বহু মহিলা এতে আহত হন। অনেককে পুলিশ গ্রেফতার করে। এর তিন বছর পর ১৮৬০ সালের ৮ই মার্চ সুঁই কারখানার মহিলা শ্রমিকরা তাদের নিজস্ব ইউনিয়ন গঠন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু নারী শ্রমিক নির্যাতন চলতেই থাকে। বিক্ষোভের দীর্ঘ ৫৩ বছর পরে ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে সাম্যবাদী নারীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব গৃহীত হয়। জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা সেৎকীন, যুগপদ নারী ও শ্রমিক আন্দোলনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনিই কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক নারীদের দ্বিতীয় সম্মেলনে এই দিনটির প্রস্তাব করেছিলেন। তারপর ৬৪ বছর শেষে ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরিবারে, সমাজে, কর্মস্থলে নারীদের সমানাধিকার দেয়া তো দূরের কথা, নিউইয়র্ক শহরের ওই কারখানার হতভাগ্য নারী শ্রমিকদের দাবিমত নারী-পুরুষ সমান মজুরি দেয়ার প্রস্তাব পাশ করা তো দূরে থাকুক, ওই দিনটি অর্থাৎ দাবিটির ন্যায্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ ওই দিনটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেতে বিশ্বের নারী সমাজকে একশত বছরের অধিককাল যাবৎ অপেক্ষা করতে হয়েছে।

দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও সকল ক্ষেত্রেই নারী সমাজ অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। শিকার হচ্ছে নানা ধরনের দৈহিক ও মানুষিক নির্যাতনের। আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্রে নারীরা বেশি বৈষম্যের শিকার হয়। তার বড় কারণ হচ্ছে সম্পদের উপর নারীর সমঅধিকার না থাকা। সম্পদের উপর নারীর সমঅধিকার না থাকার কারণে নারী শিক্ষা-দীক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নারীরা তেমন ভালভাবে এগুতে পারেছেনা। বিশেষ করে আমাদের বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক সমাজের শোষণ নিপীড়ন ও বৈষম্যের কারণে নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র পিতৃতান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক। উভয় তন্ত্রই নারী নির্যাতন নিপীড়নকে প্রশ্রয় দেয়। যদিও নারী তার অদম্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আজ পরিবার ও সমাজের তার অবস্থা অনেক দৃশ্যমান করতে সক্ষম হয়েছে। নারী এগিয়ে চলছে তার আপন মহিমা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

নারী শ্রমিকদের বর্তমান অবস্থা, সঙ্কট, সম্ভাবনার দিগন্ত ছোঁয়া রশ্মি আর সবকিছু পেরিয়ে একজন নারী শ্রমিকের দৃঢ় অথচ মমতা মাখানো দৃষ্টিসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে নিুের এই প্রতিবেদন।
আমাদের দেশে এখনও গৃহকর্মীদের অনেক নিম্ন শ্রেণির কর্মী হিসেবে দেখা হয় । বাড়িতে বাড়িতে তাদের সম্মান তো নয়ই বরং প্রতি মুহূর্তে তাদের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়। অনেকক্ষেত্রে নির্মম নির্যাতনের ফলে অনেকটা নিরবে পরপারে চির পাড়ি দিতে হয়। তেমনই এক বাড়ির গৃহকর্মী কাজল (১৬) । সে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার আনন্দ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের (অবঃ)এক শিক্ষকের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতো । বিগত বছরের ২রা এপ্রিল কাজলের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ষোড়শী সুন্দরী কাজলের প্রতি কুনজর পড়ে গৃহকর্তার বখাটে ছেলে আলী ইব্রাহিম ইমন(২৮)এর। ইমন কাজলকে ঘর বাধার প্রলোভন দেখিয়ে জোরপূর্বক তার অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করে নেয়। কাজলের সাথে ইমনের অবৈধ সর্ম্পক ইমনের বড় বোনের কাছে ধরা পড়লে কাজলকে শারিরীক নির্যাতন করে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়। কাজল অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে পুনরায় ওই বাসায় এসে ইমনের সাথে সর্ম্পকের কথা সবাইকে জানালে ইমনের পরিবার কাজলকে মারধর করে জোরপূর্বক মুখে বিষ ঢেলে,পরে ওড়না দিয়ে ফাসিঁতে ঝুলিয়ে রেখে আতœহত্যা বলে সবার কাছে প্রচার করে ইমনের পরিবার। বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্স এর কর্তব্যরত ডাক্তার ও নার্স জানায়, গত ২রা এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় মেয়েটিকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হলে কর্তব্যরত ডাক্তার কাজলকে মৃত ঘোষণা করে। কাজলকে হাসপাতালে নিয়ে আসা লোকজন তাকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। রাত ৮ টায় হাসপাতালে মেয়েটি বিষ খাওযা রোগীদের স্থানে পড়ে আছে এবং হাসপাতালের আশেপাশের লোকজন জানায়, তার শরীর থেকে বিষের গন্ধ বের হচ্ছে। এদিকে হাসপাতালে ভর্তি রেজিষ্টারে কাজলের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর বিষয়টি উলেখ্য রয়েছে। এই ব্যাপারে বুড়িচং থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু হয় । পরদিন ৩ই এপ্রিল তড়িঘড়ি করে কাজলকে কবর দেয়া হয়। স্থানীয় একটি অপশক্তি কাজলের হত্যার ঘটনাটিকে আতœহত্যা বলে চালিয়ে দিয়ে প্রকৃত সত্য গোপন করে বলে জানা যায়। আর পার পেয়ে যায় ঘাতকরা। এমনি করে কাজলের মত আরো অনেক কাজলকে কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় নির্মম পরিণতি মেনে নিতে হয়। বিভিন্ন সূত্রমতে, বিগত বছরে কুমিল্লায় বিভিন্ন শারিরীক নির্যাতনে ৯ জন গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। একজন গৃহকর্মীকে তিনবেলা খেতে দেওয়া এবং মাস শেষে কিছু টাকা দেয়ার মধ্যে দিয়ে তাদের কিনে ফেলার এ ধারণাকে ত্যাগ করতে হবে। গৃহকর্মীদের পরিবারের সদস্যই মনে করতে হবে। কুমিল্লা শহরের চকবাজার এলাকার একটি পরিবারের গৃহকর্মী সেলিনা। তার বয়স নয় বছর। সে যখন সাত বছর তখন এ বাসায় সে আসে। তার বাবা দিনমজুর। বাবার আয়ে পরিবার চলে না, তাই সাত বছর বয়সে জীবনের সব স্বপ্নকে ভেঙ্গে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করতে হয়। যে বয়সে তার খেলার কথা, পড়ার কথা, সে বয়সে রান্না বান্না থেকে শুরু করে, কাপড় ধোয়া, বাড়ির শিশুর দেখাশোনা, ঘর মোছা সবই তাকে করতে হয়। বাড়ির সবার খাওয়া শেষ হলে অবশিষ্ট ভাত, ডাল, মাছের কাটা, বাসি পুরানো খাবারই সারাদিন পরিশ্রম শেষে তার ভাগ্যে জোটে। একজন সাত বছরের শিশু হয়ে সারাদিনই তাকে খাটতে হয়। কিছু সময় বিশ্রাম পেলেও তা জোটে তার গৃহকর্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী। তার একান্ত নিজের কোনো সময় নেই, কোনো ছুটি নেই। যা এক কঠিন সত্য এবং সেটি মেনে নিয়েই বাচ্চা মেয়েটিকে তার জীবন চালাতে হবে। আজ যে কোনো দিনমজুর, শ্রমিক সকলেরই কাজের নির্দিষ্ট সময় আছে। কাজ শেষে নিজ ইচ্ছানুযায়ী চলার মতো কিছু সময় রয়েছে। কিন্তু একজন গৃহকর্মীর কাজের সময় তার সারাদিনই। নিজ ইচছানুযায়ী জীবনের সামান্যতম সময় কাটানোর সুযোগটুকুও তার নেই। যা নিতান্তই অমানবিক। কিন্তু সব নারী গৃহকর্মী একত্রিত হয়ে তাদের এ অবস্থার প্রতিবাদ করার ক্ষমতাও রাখে না। তাই প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব গৃহকর্মীকে একজন মানুষ হিসেবে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া, তাদেরকে পরিবারের একজন সদস্য মনে করা। নানা বিপদ-আপদে, জীবনে চলার পথে নিজেদের এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে তাদের উপকারের কথা উপলব্ধি করা, ভালোবাসা এবং তাদেরকে নিজ পায়ে দাঁড়াবার জন্য পথ করে দেয়া। এদিকে কুমিল্লার গার্মেন্টস গুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী। এদের বেতন খুবই কম। এছাড়া কাজের পরিবেশও তাদের সহায়ক না। বলতে গেলে অধিকাংশ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকে না। অন্যদিকে নারী শ্রমিকদের অন্যান্য হয়রানি তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিনত হয়েছে। এ নির্যাতনের বিচার পাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। চাকরি হারানোর ভয়ে, বেঁচে থাকার একমুঠো অন্নের জন্য সব কিছু চুপ করে মেনে নিয়েই তাদের কাজ করতে হয়। কুমিল্লা ইপিজেডে প্রায় ১৩-১৪ হাজার শ্রমিক কাজ করছে এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার হলো মহিলা শ্রমিক। তারা তিন শিফটে কাজ করছে, যেমন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা, বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা, কেউ আবার বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করছে। তাদেরকে আবাসিক কোন জায়গা দেওয়া হয় নাই। তারা অনেক দূর থেকে বাস, টেম্পু, পায়ে হেটে ইপিজেডে আসে কাজ করার জন্য। তাদের সর্বোচ্চ বেতন ৪৫০০ হাজার টাকা, সর্বনিু ১১০০ টাকা। তারপর আবার কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে তখন বেকার হয়ে যায়। রহিমা নামে একজন ইপিজেড শ্রমিক জানান, আমাদের বেতন খুবই কম, জীবন চালানো খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া মালিকদের র্দুব্যবহার শুনতে হয় সব সময়। তার পরেও কাজ পাওয়ার জন্য দরিদ্র মানুষের চেষ্টার কোন শেষ নেই। দুবেলা দুমুঠো ভাত পাবে এ আশায় পিতা-মাতা তাদের সন্তানকে কাজের লোক হিসেবে পাঠায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এদের কোন নির্দিষ্ট বেতন নেই। তারপর আবার কর্মক্ষেত্রে আসার সময় রাস্তার মোড়ে মোড়ে তাদের উদ্দ্যেশে ছুড়ে দেয়া বিভিন্ন বখাটের কুরুচির্পূণ মন্তব্য আর তাতে রাজী না হলে জোরপূর্বক শ্লীতাহানির ঘটনা ঘটছে। সব মিলিয়ে নানা হয়রানির শিকার হচ্ছে নারী শ্রমিকরা। নির্মাণ কাজেও কুমিল্লার নারী শ্রমিকরা অবহেলার শিকার। তাদের ১৫০-১৮০ টাকা দাম দেওয়া হয়। এমনই কিছু শ্রমজীবী নারীর এর সাথে কথা হয়। কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় টাউনহলের সামনে প্রতিদিন ভোরবেলায় শ্রমহাট বসে। এ হাটে শ্রমবিক্রি করতে দূর-দূরান্ত থেকে হতদরিদ্র মানুষ এসে জড় হয়। এখানে শ্রমবিক্রির উদ্দেশ্যে কয়েকজন মহিলা শ্রমিকও এসে জড়ো হয়। পেটের দায়ে পাঁচ বছর আগে ফুফুর সঙ্গে জামালপুর থেকে কুমিল্লায় আসে মরিয়ম বিবি। চার বছর বাসা-বাড়িতে কাজ করার পর এখন রাজমিস্ত্রির যোগালী হিসেবে কাজ করছেন তিনি। কেমন আছেন? দৈনিক হাজিরা কত পাচ্ছেন? উত্তরে মরিয়ম জানান, বাসাবাড়িতে কাজের চাইতে কামলাগিরিতে অনেক শান্তি। অনেক স্বাধীনতা। বকাবকি নেই। বেগম সাহেবদের হাতে গুঁতা খাওয়ার ঝামেলা নেই। বাসা-বাড়িতে সকাল থেইক্যা রাত পর্যন্ত কাম কাজ কইরাও বেগম সাহেবগো মন পাওয়া যাইতো না। সে জানান, এখন যোগালী কইরা প্রতিদিন ১২০-১৫০ টাকা পাই। মাসে ১০/১৫ দিন কাজ থাকে। মহিলা বলে কন্ট্রাক্টর তাকে ঠকাচ্ছে বলে জানান তিনি। কান্দিরপাড় শ্রম হাটে শ্রম বিক্রি করতে আসা রংপুরের মেয়ে জোছনা বেগম জানান, ৮ বছর সংসার করার পর গত বছর তাকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করে চলে গেছে স্বামী ফজল মিয়া। দু’মেয়েকে নিয়ে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছেন তিনি। বড় মেয়ের বয়স ৬ বছর। ছোটটার ৩ বছর। কেমন আছেন জানতে চাইলে জোছনা বলেন, গরিবের আবার থাকা। গরিবের কেউ পছন্দ করে না। আমার মনে হয় সৃষ্টিকর্তাও পছন্দ করেন না। যত কষ্ট যেন গরিবেরই। মহিলা বলে কেউ সহজে কামে নিতে চায়না। নিলেও টাকা কম দেয় ।
এক জরিপে জানা যায়, প্রতিবছর দেশে গড়ে পাঁচ লাখ নারী শ্রমবাজারে যোগ দেন যাদের ৯০ শতাংশর বেশি শ্রম আইনের কোন সুরক্ষা পান না। তাদের মতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত কর্মজীবী নারীর সংখ্যা প্রায় ৯৭ লাখ যারা শ্রম আইনের আওতাভুক্ত নন। আর আনুষ্ঠানিক খাতে যে ১৬ লাখ নারী কর্মরত আছে তাদের মধ্যেও একটি বিরাট অংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিধিমালার ভিন্নতার কারণে শ্রম আইনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এসব কারণে দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মিলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর সাথে কর্মক্ষেত্র, পেশা ও পদমর্যাদা নির্বিশেষে সকল নারীর জন্য অভিন্ন জাতীয় ন্যূনতম দাবিনামা ঘোষণা করেছে। নারী সংগঠনগুলো মনে করছে এটি বাস্তবায়ন করা গেলে প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয়ক্ষেত্রেই পদমর্যাদা নির্বিশেষে সব নারীর কর্মক্ষেত্রের মৌলিক সংরক্ষণ করা যাবে।
সমাজের ঘোর অন্ধকার ও কুসংস্কারের পথ অতিক্রম করে নারীরা আজ একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। অসংখ্য বাধা বিঘœ পেরিয়ে কুমিল্লার বিভিন্ন কর্ম ক্ষেত্রেও নারীরা কাজ করে যাচ্ছে। এদের মধ্যে অন্যতম হল কুমিল্লা কুটির শিল্পের রানী জাহান আরা বেগম। গত বছর তিনি পরলোক গমন করেছেন। তবে তিনি নারী সমাজের তথা সমাজের মঙ্গলের জন্য রেখে গেছেন অনেক অবদান।

স্বামী পরিত্যাক্ত, বিধবা ও হতদরিদ্র অনেক মহিলাদেরকে কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দু’মুঠো ভাতের বন্দোবস্ত করেছেন জাহান আরা বেগম। আবেগ তাড়িত এলাকাবাসী তাকে কুটির শিল্পের রানী বলে অভিহিত করেছেন স্বতঃস্ফুর্তভাবে। আর কুটির শিল্পের কান্ডারী উপাধি দিয়েছিলেন ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর আজম খান। ঐ একই বছরে কুটির শিল্পের রানী নজরে পড়েন ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথের। এলিজাবেথ ১৯৬২ সালে ঢাকা সফরে এসে স্টেডিয়ামের পাশে চারু ও কারু শিল্পের প্রদর্শনী দেখতে যান। দেখতে দেখতে তাঁর চোখ আটকে যায় ৩০ বছর বয়সী জাহান আরার হাতে গড়া বাঁশের তৈরি মনোরম চালুনী আর ফ্লাওয়ার বক্সের দিকে। ইংল্যান্ডের রানী মুগ্ধ হয়ে তাকে স্বর্ণপদক ও নগদ অর্থ প্রদান করে বললেন, তুমি ভবিষ্যতে অনেক উন্নতি করতে পারবে।

১৯৩৯ সাল থেকে তার কার্যক্রম শুরু হয় মাত্র ২/৩ টাকা পুঁজি হাতে নিয়ে তার জন্ম স্থান কুমিল্লা শহরের শুভপুর গ্রামে। জাহান আরা ও তার দল (বান্ধবীরা) বাঁশ দিয়ে ডুলা, ছাকনী, চালুনী, মোশতা ইত্যাদি তৈরি করত। খুব গর্বের সাথে জাহান আরা বলল আমাদের তৈরি ডুলা দুই দামে গোমতী নদীর তীরে মাছের আড়ৎদারদের কাছে বিক্রি হতো, চাহিদাও ছিল অনেক। ঐ সময়ে যা লাভ হতো তা সবাইকে সমান ভাবে বন্টন করে দেওয়া হতো। এই ভাবে জাহান আরার দলও প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করল। ১৯৪৯ সালে তিনি কুমিল্লা শহরের নানুয়াদিঘীরপাড়ে ২৫ টাকায় বাসা ভাড়া নেন। তার স্বামী কেরানীর চাকুরী করতেন। তিনি পুরো দমে শুরু করলেন কুটির শিল্পের কাজ। আস্তে আস্তে জাহান আরার কুটির শিল্পের প্রচার ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। বিভিন্ন স্থান থেকে নিঃস্ব গরীব মহিলা মেয়ে তার কাছে আসতে লাগলো। তখন জাহান আরা বিবাহিত গরীব মহিলাদের বাচ্ছাদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার খুললেন। যে মহিলারা কাজ করতে আসবে তাদের বাচ্ছারা এই সেন্টারে থাকবে এবং পড়া লেখা শিখবে। ফলে জাহান আরার কুটির শিল্পের জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা যোগ হল। জাহান আরা ৬০ দশকের শুরুর দিকে পাকিস্তানে বেশ কয়েকবার যান এবং মুলতান, পেশোয়ার ও হায়দারাবাদে তার কুটির শিল্পের পন্য প্রদর্শন করেন। ১৯৭৫ সালে প্রশিক্ষণের জন্য সরকারী খরচে ফিলিপাইন যান। এছাড়া তিনি ভারত, সৌদি আরব, ব্যাংকক ও হংকং সফর করেন। তাছাড়া বিভিন্ন ডিজাইনের উপর ট্রেনিং করানোর জন্য বাংলাদেশ রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর সহযোগিতায় সরকার তাকে পূনরায় ১৯৮৩ সালে ফিলিপাইন পাঠান। তিনি বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনিতে অংশ গ্রহন করে ১২৬টিতে প্রথম পুরস্কার এবং অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য ১৮টি স্বর্ণপদক, অসংখ্য ট্রফি পুরস্কার পেয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে সাবলম্বী হয়েছেন লক্ষাধিক নারী। তিনি ৮৭টি মহিলা সমিতি গড়ে তুলেছেন। তিনি জীবদ্দশায় বহু পুরুষ্কারে ভুষিত হয়েছিলেন। কুমিল্লার আরেকজন নারী ডাঃ যোবায়দা হান্নান, তিনি সমাজসেবা ও নারী উন্নয়নে এখনো অবদান রেখে চলেছেন। তিনি সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে একুশে পদক লাভ করেন। তাছাড়া কুমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তপন দাশ গুপ্তার নামও মানুষ চিরকাল মনে রাখবে। এছাড়া কুমিল্লার প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা ’ত্রিপুরা হিতৈষী’র সম্পাদিকা ছিলেন উর্মিলা সিংহা নামের এক নারী।এই পত্রিকাটি ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত হয়। কুমিল্লার সাংবাদিক অঙ্গনেও নারীরা এখন সমানভাবে এগিয়ে আসছে। যেমন ইয়াসমিন রীমা ( ডেইলি নিউ এইজ এর কুমিল্লা প্রতিনিধি), নেহা ( সাপ্তাহিক কুমিল্লার আলোর স্টাফ রির্পোটার- সম্প্রতি পরলোকগমন করেছে),সুরভী ও জেসি আলভীরা । তারা পুরুষদের পাশাপাশি সাংবাদিক অঙ্গনে অবদান রেখে যাচ্ছে।

আজ ৮ই মার্চ এই তারিখটিকে আর্ন্তজাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষনা করলেও নারীরা প্রকৃতপক্ষে শোষণ-অবহেলা

থেকে এখনো মুক্তি পায়নি। কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনো তাদের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেনা। তাই নারী দিবস তখনই সার্থক হবে,যখন নারীরা তাদের কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হবেনা, যখন তারা পুরুষদের সমতুল্য সুবিধা ভোগ করতে পারবে।




Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply