কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যা হচ্ছে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
কুমিল্লা তথা এতদাঞ্চলের মানুষের শতবর্ষের প্রাণের দাবী ছিল বিশ্ববিদ্যালয়। বঞ্চনার ধারাবাহিকতায় অনেক দাবী-দাওয়া আর আন্দোলনের মুখে একটি দাবীর বাস্তবায়ন ঘটে গেল জোট সরকারের আমলে। কুমিল্লার ঐতিহাসিক নিদর্শন লালমাই পাহাড়ের কোটবাড়ি এলাকায় মনোরম পরিবেশে স্থাপিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। অন্ততঃ একটি ক্ষেত্রে কুমিল্লাবাসীর বঞ্চনার গ্লানী মুছে যায়। আশার আলোকবর্তীকায় শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আমাদের স্বপ্ন আর প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু অনাকাংক্ষিত ঘটনা প্রবাহ আর বিতর্কিত কর্মকান্ডের ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা ও সমৃদ্ধির পথ রুদ্ধ হলে বা হোচট খেলে আমরা দুঃখ পাই, আমাদের কুমিল্লাবাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটে। আমরা আশাহত হই আমাদের সন্তানদের প্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ নিয়ে। পাঠক, নিশ্চয়ই একমত হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের পরিস্থিতি কোনভাবেই আমাদের কাম্য ছিল না এবং নেই।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হয়। নবগঠিত বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য (ভিসি) পদে নিয়োগ লাভ করেন ড. গোলাম মাওলা। তাঁর বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বারে। কুমিল্লার গর্বিত সন্তান বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ ড. গোলাম মাওলা ভিসি পদে দায়িত্ব গ্রহণ করায় সার্বিক ক্ষেত্রে একটি সমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখে কুমিল্লাবাসী। দুর্ভাগ্যজনক যে, কিছুদিন না যেতেই বিড়ম্বনা দেখা দেয় কাংখিত পথচলায়। দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়োগ ও ভর্তি বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎসহ বহুবিধ অভিযোগ উঠে ওই ভিসির বিরুদ্ধে। স্থবিরতা দেখা দেয় প্রশাসনিক কর্মকান্ডে। অভ্যন্তরীন ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দু’গ্র“পে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। যা’ছিল কুমিল্লাবাসীর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পরবর্তীতে একই ধারাবাহিকতা থাকে। ভিসি পদে দায়িত্ব লাভ করেন কুমিল্লারই আরেক প্রথীতযশা শিক্ষাবীদ ড. এ.এইচ.এম জেহাদুল করিম। তাঁর বাড়ি কুমিল্লার লাকসাম উপজেলায়। কুমিল্লাবাসী একটি সমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যাশায় আবারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু আমরা কী দেখছি! যা দেখছি তা’কী আমাদের বিবেক দংশন করে না? আমরা কী কা’রো ক্রীড়নক? কা’রাইবা এসব করছে? আজকের উদ্ভুত পরিস্থিতির নেপথ্যে কা’রা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কী ইট কাঠের খাচায় বন্দি হয়ে থাকবে? তা’যদি না হয় এমন পরিণতি রুখবে কে?

ড. এ.এইচ.এম জেহাদুল করিম ভিসি পদে ড. গোলাম মাওলার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর তাকে ঘিরেও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তার দায়িত্বকালেও দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়োগ এবং ভর্তি বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ উঠে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রকটতর হয়ে উঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বহিরাগতদের উচ্ছৃংখলতা এবং দো-টানা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তথা উস্কানী আর পৃষ্ঠপোষকতা। শিক্ষক লাঞ্ছিত করা, ভিসি অবরুদ্ধ হওয়া, শিক্ষার্থী আহত হওয়া, থানায় জিডি করা, বহিরাগতদের এনে ক্যাম্পাস উত্তাল করা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা সৃষ্টি করা, বিবদমান শিক্ষক গ্র“প পৃথকভাবে ভিসির পক্ষে-বিপক্ষে সাংবাদিক সম্মেলন করে অভ্যন্তরীন ক্ষেত্রে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি করা, পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে প্রশাসনের সহায়তায় ভিসির ক্যাম্পাস ত্যাগ করা, সর্বশেষ ভিসি পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. আমির হোসেন খান। জন্ম নেয় নতুন দাবি-দাওয়া আন্দোলন। ১৩ ফেব্র“য়ারী ১৬ দফা দাবিতে ৫টি বিভাগের ৬টি ব্যাচের সেমিস্টার ফাইনালসহ সকল পরিক্ষা বন্ধ করে দেয়া হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারী সোমবার ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষের ৫ম ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদের নবীণ বরন অনুষ্ঠানে ৪০/৫০ জনের একটি গ্রপ অনুষ্ঠান স্থলে ”জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিয়ে নবীনদের বের করে দিতে চাইলে চেয়ার ছোরা-ছোরীর ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় মুখ থুবড়ে পড়েছে নবগঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়। ক্ষমতাসীন দলের দু’সাংসদের ভূমিকাও এক্ষেত্রে জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ।সবমিলিয়ে নোংরা রাজনীতির সর্ব নাশা স্রোতের অতল গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে অনেক স্বপ্নের, আশা-আকাংক্ষার ও গর্বের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্্যালয়। আর এসবকিছুর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপর। অভিবাবকরাও আজ শংকিত, ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা হতাশাগ্রস্থ। অনেকেই বলেছেন অভ্যন্তরীন ভাগ-বাটোয়ারা নিয়েই এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্রেক ঘটেছে। আবার কেউ বলেছেন ভিসি ও তার পক্ষের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দুর্নীতির ফলে বিবদমান দু’গ্র“পের সৃষ্টি হয়ে এ ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত। আবার কেউবা বলেছেন আধিপাত্য বিস্তারের লক্ষ্যে ভিসি-শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দ্বিধা বিভক্ত করে ফেলায় নবগঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের শিকার। তাই এখনই সময় এ বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষায় বর্তমান সরকারের সঠিক প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা। সচেতন কুমিল্লাবাসীর প্রত্যাশাও তাই।

-লেখকঃ-সাংবাদিক মোবাইলঃ-০১৯১১-০০৮৪৬৯ ই-মেইলঃ shirajpressbd@gmail.com

Check Also

কুবি সাংবাদিক সমিতির অভিষেক অনুষ্ঠান পালিত

মো শরীফুল ইসলাম,কুবি :– বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে ...

Leave a Reply