সরাইলে গরীবের দুম্বার মাংস ভিআইপিদের পেটে

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ॥
সৌদি আরব থেকে আসা দুম্বার মাংস অসহায় দুস্থ লোকজনদের না দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের নেতারা এবং এলাকার কিছু সমাজ সচেতন ভিআইপি লোকজন ভাগভাটোয়ারা করে নিয়ে গেছেন। দুম্বার মাংসের প্যাকেট(বিদেশে প্যাক করা) বিলি-বন্টনের সময় স্থানীয় বেশকিছু দুস্থ ও ভিক্ষুক প্রকৃতির লোকজন সেখানে উপস্থিত থাকলেও, তাদের দিকে কেউ নজর দেননি। ভিআইপিরা মাংসের প্যাকেট নিয়ে মুছকি হেসে চলে যান। উপস্থিত দুস্থ-ভিক্ষুেকরা অসহায় হয়ে শুধুই চেয়ে থেকেছেন। আর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেছেন এই বলে, ‘কার খাদ্য কে খায়। আমাদের হক স্যারেরা নিয়ে যায়।’

গত বুধবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় ট্রাকে করে ৭০ প্যাকেট দুম্বার মাংস আসে। মূহুর্তের মধ্যে আশপাশ এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা পরিষদ ভবন সংলগ্ন কাচারি পাড়া ও হাবলী পাড়া গ্রামের বিধবা, দুস্থ প্রতিবন্ধী লোকজন এবং সদর বাজারের ভিক্ষুকসহ শতাধিক অসহায় নারী-পুরুষ প্রশাসন পাড়ায় ভীড় জমায়। আর বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা দুম্বার মাংস আসছে এমন খবরে পরিষদ প্রাঙ্গনে আগে থেকেই অপেক্ষা করতে থাকেন। অনেককে সকাল থেকে প্রশাসন পাড়ায় তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতে দেখা গেছে। বুধবার দুপুরে জনপ্রতিনিধি, নেতা-কর্মী, সরকারি আমলা ও দুস্থ লোকদের প্রচ- ভিড়ের মধ্যে পুলিশের সহায়তায় ওই দুম্বার মাংসের প্যাকেটগুলো বিলিবন্টন করা হয়। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম তালিকা অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের লোকজনের মাঝে এসব প্যাকেট বিতরণ করেন। পিআইও’র দফতর সূত্রে জানা যায়, দুম্বার মাংস সরাইলে পৌঁছার আগেই উপজেলার কর্তাব্যক্তিরা একটি তালিকা তৈরী করেন। সেই তালিকা অনুযায়ী বিলি-বন্টন করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদের একাধিকসূত্র জানায়, ওই তালিকায় উপজেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, সরকারি দফতর সহ কতিপয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। গরীব, দুস্থ লোকজনদের দুম্বার মাংস না দিয়ে তালিকাভূক্ত সমাজ সচেতন ভিআইপি লোকজন নিয়ে গেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী লোকজন জানান, দুম্বার মাংস বিলি-বন্টনের সময়ে এলাকার শতাধিক গরীব, প্রতিবন্ধী, দুস্থ, ভিক্ষুক নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিল। তাদেরকে মাংস দেওয়া হয়নি। অসহায় মানুষদের চোখের সামনে দিয়ে খয়রাতির মাংস নিয়ে গেছেন বেশ’কজন সচেতন শিক্ষিত মানুষ। দুঃখী মানুষগুলোর দিকে তাকিয়েও তাদের বিবেক সাড়া দেইনি- এ কি করছি। খয়রাতির দুম্বার মাংস অসহায় গরীবের হক ও তাদের পাওনা। আমরা কেন এসব খাচ্ছি। বুধবার মাংস বন্টনের শেষদিকে পাশেই বিলাপ করতে দেখা গেছে কাচারি পাড়ার আজাহার মিয়ার স্ত্রী কুলসুম বেগমকে (৫৫)। অসহায় কুলসুম বেগম বলেন, আমার স্বামী অসুস্থ, বিছানায় পড়া মৃত্যুর পথযাত্রী। অনেকদিন ধরে মাংস খাওয়ার জন্য ছটফট করছে। ৩০০ টাকা কেজি মাংস। টাকার অভাবে কিনে খাওয়াতে পারি না। একটু মাংসের জন্য বহু আকুতি-মিনতি করেছি। স্যারদের দয়া হয়নি, উল্টো পুলিশ ধমক দিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন। কুলসুম বেগম আরো বলেন, আমার শ্বাশুড়ি বৃদ্ধ মানুষ, ভিক্ষা করে। এখানে মাংস দেখে খুশি হয়ে বলেছিলেন বউমা অনেকদিন পর আজ মাংসের তরকারি খাওয়া যাবে। আজাহারকেও খাওয়াব। বৃদ্ধ শ্বাশুড়ির ভাগ্যেও মাংস জোটেনি। উপস্থিত অন্যান্য দুস্থ লোকজন আক্ষেপ করে বলেন, স্যারেরা (ভিআইপি) আমাদের সব মাংস নিয়ে গেছে। তারা টাকা দিয়ে মাংস কিনে খাওয়ার ক্ষমতা আছে। প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক আলফু মিয়া (৭৩) অভিযোগ করে বলেন, ‘লেখাপড়া জানা স্যাররা মিসকিনদের (এতিম-অসহায়) নামে আসা খয়রাতির মাংস নিয়ে যাচ্ছে। ওনাদের কি আক্কেল জ্ঞান বলতে কিছুই নেই।” বিকেল পর্যন্ত প্রশাসন পাড়ায় অসহায় নারী কুলসুম বেগম ও প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক আলফু মিয়ার মতো অনেকে বিলাপ-আহাজারি করলেও এক টুকরো মাংস কারো ভাগ্যে জোটেনি। ওদিকে উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক ভিআইপি ব্যক্তি বাসায় ফ্রিজে দুম্বার মাংস রেখে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের নামে নেওয়া দুম্বার মাংস অন্যান্য সদস্যদের না দিয়ে নেতাদের মধ্যে ভাগভাটোয়ারা করায় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। উপজেলার একাধিক ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য, সদস্যা ও চৌকিদার-দফাদার জানান, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর উপজেলায় দুম্বার মাংস যে ক’বার এসেছে, তা ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত পৌঁছেনি। দলীয় ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে ওইসব বন্টন করেন উপজেলার কর্তাব্যক্তিরা। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায় কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মাহবুবুল আলম বলেন, বুধবার গরীব অসহায়, দুস্থ এতিমদের জন্য ৭০ প্যাকেট দুম্বার মাংস আসে। তালিকা অনুযায়ী উপজেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে বিতরন করা হয়েছে।

Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply