সরাইলে ভারতীয় সংগঠনের অনুষ্ঠান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া: সম্মেলনের অন্তরালে অন্য কিছু

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল ২৬.২.১১ :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে শনি ও রবিবার দুই দিনব্যাপী পার্শ্ববতী দেশ ভারতে প্রতিষ্ঠিত ‘কালীকচ্ছ সম্মিলনী’ নামক সংগঠনের তৃতীয় মিলন মেলা-২০১১ অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য জাপা’র কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভার উদ্বোধন ঘোষণা করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। স্থানীয় এম এ বাশার আইডিয়াল ইন্সষ্টিটিউট মাঠে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এককালে কালীকচ্ছ গ্রামের অধিবাসী বর্তমানে ভারতের পশ্চিম বাংলা, আসাম ও ত্রিপুরায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী প্রায় শতাধিক ভারতীয় নাগরিক অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনে যোগ দিতে গত শুক্রবার বিকালে তারা ভারত থেকে সীমান্তের চেকপোষ্ট ও হযরত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। শুক্রবার বিকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি জাপা’র কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা আখাউড়া চেকপোষ্টে উপস্থিত থেতে ভারতীয় অতিথিদের বরণ করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন, সরাইল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আ’লীগ নেতা রফিক উদ্দিন ঠাকুরসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংকৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটির বিশ্বস্তসূত্র জানায়, শুক্রবার বিকালে সীমান্তে ভারতীয় অতিথিদের বরণের সময় চেকপোষ্টে জটলা বাঁধে। ৭০ জন ভারতীয় নাগরিকের ভিসা পাসপোর্ট থাকলেও বেশক’জনের বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তাদের আটক করে কর্তৃপক্ষ। একপর্যায়ে এমপি পর্যায়ের লোকজন কাগজপত্র ছাড়াই তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। সম্মেলনে যোগদানকারী ভারতীয় অতিথি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন, একাধিকবার নির্বাচিত ভারতের লোকসভার সাবেক সংসদ সদস্য শ্রী অমিতাভ নন্দী এবং ত্রিপুরা বিধান সভার বিধায়ক সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী পবিত্র কর। আগত অতিথিদের মধ্যে অনেকে ভারতে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী রয়েছেন বলে একাধিকসূত্রে প্রকাশ।

এদিকে সম্মেলনের অনুষ্ঠানকে ঘিরে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে বিষয়টি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ’কজন সমাজকর্মী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ভারতে গড়া একটি সংগঠনকে এখানে শো করে পাতানো খেলা শুরু হয়েছে। এটা ভবিষ্যত ব্যবসা-বাণিজ্যের এক ফন্দি। ভারত-বাংলাদেশের ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র চালু হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেদের ফায়দা হাসিল করতে-ই এতসব আয়োজন। বিগত ক’য়েক মাস পূর্বে ত্রিপুরার সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী পবিত্র কর মাতৃভূমি কালীকচ্ছ গ্রামে সফর করতে এসে আশুগঞ্জের বিলাসবহুল হোটেলে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলের সাথে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়ে বৈঠক করে গেছেন। দুই দেশের ট্রানজিট চুক্তি হওয়ায় আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বিশ্বরোড মোড় ও আশুগঞ্জ হয়ে ভারতের পন্যবাহী গাড়িগুলো রাজধানী ঢাকায় পৌঁছবে। শুধু ব্যবসা বাণিজ্য চাঙ্গা এবং এবিষয়ে লেনদেন ও চুক্তি সম্পন্ন করতেই আজকের এই সম্মিলনী। তারা ক্ষোভের সাথে বলেন, সম্মেলনের নামে এলাকার বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছ থেকে রশিদের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হয়েছে। অনুষ্ঠান সরাইল উপজেলার কালীকচ্ছের হলেও বেশিরভাগ চাঁদা দিয়েছেন বন্দর নগরী আশুগঞ্জ উপজেলার কতিপয় ব্যবসায়ীরা। অনুষ্ঠানে আগত এলাকার লোকজন প্রশ্নতুলেন, গত ৪০ বছরে শুনিনি কালীকচ্ছের বংশদ্ভোত ভারতের লোকজনের জন্মস্থান প্রীতির কথা। হঠাৎ করে এ প্রীতি কেন। শনিবার কার্ডের মাধ্যমে দাওয়াত পেয়ে অনুষ্ঠানে আগত উপজেলার বেশক’জন জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা আসন না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। তবে সম্মেলন উদ্বোধক র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপিকে একনজর দেখতে ও তাদের প্রিয় নেতার বক্তব্য শুনতে সম্মেলনে এলাকার মানুষের ঢল নামে। এসময় উপজেলার অনেক জনপ্রতিনিধি ও এলাকার গন্যমান্য ব্যাক্তিদের মঞ্চের পাশে খালি মাঠে দাঁড়িতে প্রধান অতিথির বক্তব্য শুনতে দেখা গেছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, সংরক্ষিত মহিলা আসন-১২ এর এমপি জোবায়ইদা খাতুন পারুল, উপজেলা চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিন ঠাকুর, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হক খান (বীর প্রতীক), পরিসংখ্যান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হরিপদ সেন, আ’লীগ নেতা একেএম ইকবাল আজাদ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন প্রমূখ। অনুষ্ঠানের সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা এমপি তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, বাহির থেকে আগত অতিথিগণ বর্তমানে ভারতের অধিবাসী। তাদের পূর্ব পুরুষ ছিল কালীকচ্ছ গ্রামে। এখানে তারা নাড়ীর টানে ছুটে এসেছেন। কালীকচ্ছ সম্মিলনী সংগঠনটির উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের সাথে আমাদের বন্ধুত্বের সেতু বন্ধন। এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে জিয়াউল হক মৃধা এমপি বলেন, হৃদয় আর মনের আদান-প্রদানের লক্ষ্যেই এ মিলন মেলা। এখানে অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। প্রধান অতিথির বক্তব্যে কালীকচ্ছের সন্তান ভারতের সাবেক এমপি শ্রী অমিতাভ নন্দী বলেন, রাজনৈতিক কারণে আমাদের এক হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু মিলিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমরা খুব দ্রুত দুই প্রতিবেশী দেশ একই মঞ্চে ভাষা দিবস পালন করব। ব্রিটিশসম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কালীকচ্ছ থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত। বিল্পবী উল্লাসকর দত্তের উপর অত্যাচার নির্যাতন নিপিড়ন দেখেছি। ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। ভারতের সাবেক এমপি বাংলাদেশ সরকারকে ইঙ্গিত করে বলেন, বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর বাড়িটি দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা করুন। এছাড়া ভারত থেকে আগত অতিথিদের মধ্যে কালীকচ্ছের বংশদ্ভোত ত্রিপুরার সাবেক মন্ত্রী পবিত্র কর, পশ্চিম বঙ্গের সাবেক মেয়র ইলা নন্দী , ডাঃ আশীষ নন্দী, ডাঃ পাপিয়া নন্দী, শান্তিপদ চক্রবর্তী, মানিক চক্রবর্তী অনুষ্ঠানে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন। অতিথিরা বলেন, প্রায় ৪০ বছর পর জন্মস্থানে আসতে পেরে উদ্দ্যোক্তা কবি সুধীর দাস ও জিয়াউল হক মৃধার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।




Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply