লিবিয়ায় আটকা পড়েছেন বাঞ্ছারামপুরের ৭৯ শ্রমিক : স্বজনদের আহাজারী

লিটন চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ২৬.০২.২০১১ ॥

‘আমি গত ২ দিন ধইরা না খাইয়্যা আছি। বাসায় কারেন্ট,পানি,গ্যাস,টিএন্ডটি ফোন লাইন কাইট্যা দিছে। জানালা দিয়া দেখি বাইরে বন্দুক-বোমা দিয়া মারামারি করতাছে। মনে অয় যেন না খাইয়া মইরা যামু’। লিবিয়িায় আটকে পড়া বাঞ্ছারামপুর উপজেলার হায়দরনগর গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে জলিল মিয়া এভাবেই নিজের কষ্টের কথা মঙ্গলবার রাতে মোবাইল ফোনে বর্ণনা করেন তার পিতার কাছে। মঙ্গলবারের পর আর জলিলের সঙ্গে কোন রকম যোগাযোগ হয়নি তার স্বজনদের। জলিল এখন কেমন আছেন কেউ জানেন না।

শুধু জলিল-ই নয়, লিবিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশী শ্রমিকদের মধ্যে অন্তত ৭৯ জন শ্রমিক রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। তারা লিবিয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের হাতে জিম্মি আছেন বলে জানা গেছে। তাদের ভাগ্যে কি ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে আটকে পড়া শ্রমিকদের স্বজনদের। লিবিয়ার বেনাগাজি ও দারনা সিটিতে বসবাসরত এসব জিম্মি শ্রমিকদের অনেকেই গত তিন দিন ধরে না খেয়ে আছেন বলে মোবাইলে জানিয়েছেন তাদের স্বজনেরা। আটকে পড়া এসব শ্রমিক রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ ও সংঘাতের কারনে দেশে ফিরে আসতে চাইছেন। আটকে পড়া শ্রমিকদের স্বজনরা সরকারের কাছে দ;াবি জানিয়ে বলেছেন, সরকার উদ্যোগ নিয়ে তাদেরকে যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে।

টেলিফোনে লিবিয়ার ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের নিয়ন্ত্রনকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, লিবিয়ায় জুড়েই থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষ করে বেনগাজি এলাকা এখন বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ওই এলাকায় প্রায় ছয় হাজার বাংলাদেশী রয়েছেন। তারা এখন চরম আতংকে দিন কাটাচ্ছেন। জানা গেছে, আটকে পড়া শ্রমিকদের মধ্যে লিবিয়ার বেনগাজিতে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ৭৫ জন এবং দারনা সিটিতে চার জন পুরোপুরী গৃহবন্দী অবস্থায় রয়েছেন।

এদিকে জীবিকার প্রয়োজনে লিবিয়া যাওয়া এসব শ্রমিক কেম আছেন, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছেন- তার কোনটাই জানতে না পেরে আটক শ্রমিকদের বাড়িতে এখন রীতিমত শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অধিকাংশ শ্রমিকের বাড়িতে স্বজনদের কান্নার রোল শুরু হয়ে গেছে। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ঘুরে লিবিয়া প্রবাসীদের অনেকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সর্বত্রই যেন এক ধরনের শোক বিরাজ করছে। স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সহিংসতা শুরুর পর নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও গত বুধবার দুপুর থেকে জিম্মি শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের স্বজনরা কোন রকম যোগাযোগ করতে পারছেন না। ফলে চরম আতংক আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে এসব পরিবারের।

পাঠামারা গ্রামের বেদন মিয়া জানান, তিনি বহু চেষ্টা করে তার ছেলের সাথে সর্বশেষ মঙ্গলবার সকালে মোবাইল ফোনে কথা বলতে পেরেছিলেন। ওই সময় বেদন মিয়ার ছেলে বলেন, ‘আমি বাইচ্যা দেশে আইতে পারি কি পারি না বলতে পারতাছি না। বাংলাদেশ সরকারের কাছে এলাকার মন্ত্রী ক্যাপ্টেন তাজেরে (মুক্তযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী) দিয়া যদি পারো জানাইয়া দিও আমাগোরে দেশে ফিরাইয়া আনতে’। এ কথা বলার পর আর কোন যোগাযোগ করা যায়নি গত তিন দিনেও।

সফিরকান্দি গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী মমিনুল ইসলামের স্ত্রী আফছারী বেগম জানান,-‘আমার স্বামীর সাথে গত চার দিন ধরে কোন যোগাযোগ করতে পারছিনা। তার বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পেরেছি তিনি কোম্পানীর বিল্ডিং-এ বন্দী আছেন। সরকারের কাছে জোর দাবী আমার স্বামীসহ সকল লিবিয়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের অবিলম্বে ফিরিয়ে আনুন’।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শোয়াইব আহমাদ খান বলেন, ‘লিবিয়া প্রবাসী বাঞ্ছারামপুরের লোকজন খুবই আতংকে আছেন। ইতিমধ্যে অনেকেই তার সঙ্গে দেখা করে তাদের স্বজনদের খোঁজ-খবর জানতে চেয়েছেন। বিষয়টি উর্ধধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।




Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply