জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দিশারি হব : একুশ পদক প্রাপ্ত হাজী আবুল হাশেম

স্টাফ রাপোর্টার, মুরাদনগর :

জীবন্ত কিংবদন্তি হাজী আবুল হাশেম
শেষ ইচ্ছা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের দিশারী হয়ে আর্ত পীরিতদের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা। দানবীর হাজী আবুল হাশেম এমএনএ। অজপাড়াগী থেকে উঠে এসে উদার সাধনার মাধ্যমে খ্যাতিমান সমাজ সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। দেশে-বিদেশে একক ও যৌথ বহু আয়োজনে অসংখ্য বার তাকে নিঃস্বার্থ সমাজ সেবেক হিসেবে ঘোষনা করা হয়েছে। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা পদকও পেয়েছেন অনেক। সর্বশেষ একুশে পদক পেয়েছেন চলতি বছর ২০১১ সালে। তাঁর নানা রঙের দিনগুলোর কথা বর্ণনা করেছেন এ প্রতিবেদকের কাছে। শৈশবের কিছু স্মৃতি দিয়েই। শৈশব কেটেছে সেই অজপাড়াগাঁ মুরাদনগরের চাপীতলায়। বড়ই মধুর ছিল সেই দিনগুলো, বলা যায় উজ্জলতম সময়। শৈশবে মা বাবা বড় ভাইদের অনুশাসনের মধ্যেই বেড়ে উঠা। গ্রামের পাশে বিশাল আকারের বিল (জলাশয়) । তার পর একটি গ্রাম। গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে গেছে উঁচু রাস্তা। রাস্তার দু’দারে সু-উচ্চ বৃক্ষগুূেলা মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে যেন। সেই পথ ধরে মক্তবে যেতাম। এখনকার মত পাকা দালানের মক্তব তখন ছিলনা। বাঁশের বেড়া, টিনের ছাউনী যুক্ত অনেকটা জড়াঝীর্ণ ঘরেই চলত পড়ালেখার কাজ। শ্রেণীকক্ষও মাত্র একটি। এক পাশে শিক্ষকদের বসার স্থান। প্রথমে লিখতে শিখেছি কলা পাতায়, তাল পাতায়। বাঁশের খাগ দিয়ে বানানো কলমে ভূষা কালি দিয়ে প্রথম প্রথম লিখতে হয়েছে। আঙ্গিনায় একত্রে হাত ধরাধরি করে বর্ণমালা শতকিয়া ও নামতা শিখেছি একত্রে সুর করে। শৈশবের সেই একত্রে থাকা নিয়েই নিজের সাধ্যমত পরোপকার করি। আমি মোটেও ডানপিটে ছিলাম না। তবে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতাম একধরনের উত্তেজনার মধ্যে। পাখি শিকার, পাখির বাসা থেকে বাচ্চা সংগ্রহ, শীতকালে কাউকে না বলে খেজুরের রস খেয়ে ফেলা এগুলো ছিল তখনকার নিত্য সঙ্গী। ক্ষেত খামারে খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো, বর্ষার পানিতে মাছ ধরা, শরতে মা, চাচী, ফুফুদের সঙ্গে নৌকায় চরে জ্যোত¯œা রাতে বিলে শাপলা তোলার অনুপম দৃশ্য মনে পড়লে প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। অনুভব করি সব কিছু মিলে শহরের চেয়ে গ্রাম অঞ্চলেই আমাকে বেশি টানে এখনো। আমার নাম মোঃ আবুল হাশেম। পেশায় প্রথম জীবনে চাকুরী (স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা’য়) বিক্রয় ব্যবস্থাপক পদে। পরে ব্যবসা ও রাজনীতিতে সক্রীয় হই। নেশা পরোপকার করা, জন্ম ১১ এপ্রিল ১৯২২ কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার চাপীতলা গ্রামে। বাবা বদিউল আলম ছিলেন সরকারী চাকুরীজীবি। মা অজিফা খাতুন দু’জনেই প্রয়াত। আমি বাবা মায়ের তৃতীয় সন্তান। বিয়ে করি ১৯৫২ সালের ১৫ মে ব্রাহ্মনবাড়ীয়ায়। আমার দুই ছেলে ও দশ মেয়ে। ছেলেরা পেশায় চাকুরীজীবি। মেয়েরা সবাই অ্যামেরিকায় প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪৩ সালে ঢাকা নবকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করি। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছি মাউথফুল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেট্রিকুলেশন পাশ করার পর ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানায় শিক্ষকতা শুরু করি ৩০ টাকা বেতনে। সেই থেকেই বেতনের অর্ধেক ১৫ টাকা ওই কলেজের অসহায় ছাত্র বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত ডাঃ লুৎফর রহমানকে লেখাপড়ার জন্য দান করি। তারপর আদিল-খলিল কোম্পানীর ব্যবস্থাপক পদে ছিলাম দীর্ঘ দিন, বেতন ছিল ১৫০ টাকা। পুঁজি জমিয়ে একদিন ছোটখাট ব্যবসা শুরু করি। সীমিত জমানো অর্থ নিয়েই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজ শুরু করি ওই সময় থেকেই। শুরুটা হয়েছিল ১৯৫৬ সালে, মুরাদনগরের কোম্পানীগঞ্জে বাবার নামে, বদিউল আলম উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে। তারপর ১৯৬৪ সালে বাখর নগর হাশেমিয়া ইসলামীয়া সিনিয়র মাদরাসা, ১৯৭০ সালে কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম ডিগ্রি কলেজ, চাপীতলা অজিফা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৭১ সালে মুরাদনগর নুরুন্নাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, হোমনায় কাশীপুর হাশেমিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৭২ সালে হোমনার রামকৃস্মপুরে কামাল স্মৃতি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, ফেনীর পশুরামে দক্ষিণ রাজেসপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দক্ষিণ রাজেসপুর করিমিয়া মাদ্রাসা ও মসজিদ, ১৯৮৬ সালে হোমনায় রামকৃস্মপুর কলেজ, ১৯৯৩ সালে মুরাদনগরে সলপা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কচুয়ার পাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২০০৩ সালে মুরাদনগরে অজিফা খাতুন জামে মসজিদ, ২০০৪ সালে ফুলগাজী দক্ষিণ রাজেশপুর থানা জামে মসজিদ ও ২০১০ সালে ঠাকুরগায়ের মিলনপুরে নুরুন্নহার হাশেম স্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করি। জানা যায়, মুরাদনগরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম ডিগ্রী কলেজটি জেলার ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, ও মুরাদনগর উপজেলার অন্যতম বিদ্যাপীঠ গুলোর একটি। কলেজ প্রতিষ্ঠার স্মৃতিচারন করে আবুল হাশেম বলেন, ঢাকায় একটি ইন্সুরেন্স এ আমার কিছু জমানো টাকা ছিল। সেই টকার বিপরীতে ৪৬ হাজা ৪শ টকা ঋণ নেই। সেটা দিয়ে ১৯৬৯ সালে ৮ একর ৪০দশমিক ৫ শতাংশ জায়গা ক্রয় করি। পরিকল্পনা অনুযায়ী পরের বছর প্রতিষ্ঠা করি কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম কলেজ। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও গড়েছেন আবুল হাশেম। ২০০৪ সালে তিনি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার দক্ষিণ রাজেসপুর গ্রামে একটি জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া মুরাদনগরের কামাল্লা হাফেজিয়া মাদরাসা, বাবুটিপাড়া চৌমুহনী হাফেজিয়া মাদরাসা, পাহারপুর মাদরাসা, খামারগ্রাম মাদরাসা, হোমনার রামকৃস্মপুর আকন্দপাড়া মাদরাসা, দৌলতপুর মাদরাসা, ব্রাহ্মণপাড়ার মাধবপুর মহিলা মাদরাসা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার বাঞ্ছারামপুরের চর লোহানীয়া মাদরাসা, হবিগঞ্জ মাধবপুরের হরশপুর মাদরাসা, গাজীপুর টঙ্গীর ফয়দাবাদ মাদরাসা, ঢাকার কেরানীগঞ্জ সোবাইদা চাঁনমিয়া মাদরাসা ও আজীমপুর মাদরাসায় তাঁর আর্থিক অনুদান রয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ্য বিমল বিকাশ ভৌমিক ভোরের কাগজকে বলেন হাজী আবুল হাশেমের মত উদার মনা মানুষ এ সময়ে খুবই দুর্লভ। উপজেলার রহিমপুর অযাচক আশ্রমের অধ্যক্ষ সাদা মনের মানুষ মানবেন্দ্রনাথ সরকার শিক্ষা প্রসারে দানবীর আবুল হাশেমের অবদানকে অনবধ্য বলে মন্তব্য করেন। মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমা বেগম বলেন, হাজী হাশেম সাহেবের পদক পাওয়ার ব্যপারে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র পাঠাতে পেড়ে আমি ভীষন খুশি কারণ আমি এ উপজেলায় দায়িত্বে থাকা কালিন একজন ভাল মানুষের মূল্যায়ন করলো সরকার। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশান কোম্পানী লিঃ (ডিপিডিসি)’র কারিগরি ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আলহাজ্ব রমিজউদ্দিন সরকার বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই হাজী আবুল হাশেম নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গরে তুলেছেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা জুগিয়ে থাকেন আবুল হশেম। চলতি বছর ঠাকুরগাও সদর উপজেলার মিলনপুর নিভৃত পল্লীতে তার গড়া নব প্রতিষ্ঠিত মরহুম নুরুন্নাহার হাশেম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে বিনা মূল্যে বই খাতা কলম পোষাক পরিচ্ছদ সহ নগদ অর্থ বিতরণ করেন। ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে ১ লাখ ২২ হাজার টাকা সাহায্য প্রদান করে ঠাকুরগাওয়ে ৮ ছাত্র-ছাত্রীর অভিবাবকের দায়িত্ব নিলেন আবুল হাশেম, একই মাসে “দরিদ্র পরিবারের সকলে একে একে অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন। কেন অন্ধ হচ্ছেন তা কেও বলতে পারেন না। ফলে মানবেতর জীবন যাপন করছেন পুরু পরিবারটি। প্রতিবেশিদের সহযোগীতায় সংসার চলে তাদের”। খবরটি জানার পর তিনি ঢাকা থেকে ছুটে যেয়ে পরিবারটির পাশে দাড়ালেন। সেদিন যশোর সদর উপজেলার চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ স্মপাদক সাহিন চাকলাদারকে নিয়ে পাগলাগহে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি পরিবারের অন্ধ ৪ সদস্যকে ৪ টি ভ্যান, মৃত মুসলেমউদ্দিনের স্ত্রী রাজীয়ার ঘরের ছাউনী দেওয়ার জন্য ৬ হাজার টাকা, অন্ধ মোজাম্মেল, মোফাজ্জল ও তোফাজ্জলকে ২ হাজার এবং তাদের বোন রূপালিকে ২ হাজার ৫শ টকা নগদ সহযোগীতা সহ তোফাজ্জলের দুই পুত্র বিল্লাল ও দুলালকে স্কুলে লেখাপড়ার ব্যায়ভার হিসেবে প্রতি মাসে ১ হাজার করে ২ হাজার টকা প্রদান করছেন। এস.এস.সি পরীক্ষায় ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলার অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের পাঁচ শিক্ষার্থীর জিপিএ ৫ পাওয়ার খবর ছাপা হয় পত্রিকায়। সে খবর পরে ছুটে যান তিনি। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ৭ হাজার টকা কওে ৩৫ হাজার টাকা দেন। ৯ম শ্রেণীর পড়–য়া এক শিক্ষার্থী সেখানে চা পান বিক্রি করে পড়াশুনার খরচ যোগাচ্ছে – এ খবর জানতে পেড়ে তিনি তাকে ভাড়া দিয়ে আয় কারার জন্য ৭ হাজার টাকা দিয়ে একটি রিক্সা কিনে দেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার জন শিক্ষার্থীকে তিনি মাসে মাসে আর্থিক সহায়তা দেন এদের মধ্যে দুই জন অর্থনীতি, এক জন বিবিএ এবং এক জন ইংরেজীতে পরেন। একজনকে মাসে দেড় হাজার এবং তিন জনকে এক হাজার টাকা করে দেন। দুই জনের বাড়ী পটুয়াখালিতে। কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার আছেন এক জন করে। তাছাড়া প্রতি মাসে মুরাদনগর উপজেলার বাবুটিপাড়া নহল চৌমুহনী হাফেজিয়া মাদরাসায় ৯ হাজার ৫শ টাকা করে অর্থ সহায়তা দিচ্ছেন তিনি। গতবছর বাউফলের ধুলিয়া গ্রামের এক “মুক্তি যোদ্ধার বিধবা স্ত্রীর ভিক্ষে করে জীবন চলে” ও রাজশাহীর দুর্গাপুরে “ঋণের টাকা শোধ করতে না পাড়ায় বিষ পানে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে একটি পরিবারের সব সদস্য” – এরকম খবর তার নজরে আসে। তিনি সরেজমিনে গিয়ে বিস্তারিত শুনে মুক্তিযোদ্ধার ওই বিধবা স্ত্রীকে ১ টি ঘর নির্মান করে দিয়ে মাসিক ১ হাজার টাকা করে ভাতা প্রদান করে আসছেন। আর ঋন গ্রস্থ পরিবারের ৭০ হাজার টাকা ঋণ পরিশোধ করেন এবং দুটি ভ্যান কিনে দেন। তাছাড়া ২০০৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর “তিন বোনের দরিদ্র জয়” এর আগে ১৮ জুন “গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছে বিত্তহীন পরিবারের শিল্পি মেয়ে তুলী” সংবাদ দুটি পরে হাজী আবুল হাশেম ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে এ তিন মেধাবী ছাত্রীর বাড়ীতে যেয়ে তাদেরকে মাসিক বিত্তিতে ব্যংক একাউন্টের মাধ্যমে মাসিক ৪ হাজার টাকা করে সাহায্য দিয়ে আসছেন। ওই একই বছরের ১৩ মে রাজশাহী চরঘাট উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের দিনমুজুর মাহবুল হকের সন্তান রীতার জটিল অস্ত্রপচার হয় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। রীতার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করেন আবুল হাশেম। আবুল হাশেম ভোরের কাগজের সাথে আলাপকালে বলেন, জনসেবার ইচ্ছা নিয়েই এক সময়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সত্তরের দশকে আওয়ামীলীগ নেতা কাজী জহিরুল হক কাইয়ুম, আবদুল আজীজ খান ও হাজী রমিজউদ্দিন আহমেদের সৌজন্যে তিনি জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্যিধ্যে রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ তাঁর জীবনে বিশেষ ভাবে রেখাপাত করে। পরে বঙ্গবন্ধুর মনোনয়নে ১৯৭০ এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে তিনি কুমিল্লার মুরাদনগর-হোমনা এলাকা থেকে জাতীয় গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। হোমনা মনিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের কথা স্পষ্ট মনে পরে তাঁর। “সেখানে আওয়ামীলীগ প্রার্থী হিসেবে আমি পেয়েছিলাম ২০০২ ভোট। আর আমার প্রতিদন্ধী মুসলিম লীগের হারুন অর রশিদ পান মাত্র ২ ভোট। সে সময় লোকজন আমাকে যে সম্মান জানিয়েছেন তা আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে” – স্মৃতিচারন করেন আবুল হাশেম। তবে ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ থেকে প্রতিদন্ধীতা করে হেরে যান আবুল হাশেম। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আওয়ামীলীগের মুরাদনগর উপজেলার সভাপতি ছিলেন তিনি। মানব সেবার বাসনা থেকে ১৯৫৪ সালেও ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচনে ৪ নং ওয়ার্ড থেকে কমিশনার পদে নির্বাচন করেন, তবে পরাজিত হন। বর্তমানে আবুল হাশেম রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেই সচ্ছন্দ বোধ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানকার রাজনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পাড়াই আমাকে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। তার পরও ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাছিনা আমাকে মনোয়ন বোর্ডে ডেকে নিয়ে কুমিল্লা- ০৩ মুরাদনগর আসনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি সরাসরি আমার অনিচ্ছার কথা তাকে জানিয়ে দেই। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধেও সেবা মুলক কাজ করেছেন আবুল হাশেম। তিনি বলেন, প্রথমে বাঞ্ছারামপুরের বিভিন্ন গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের নানা ভাবে সহযোগীতা করি। সেখান থেকে ১৮ মে চলে যাই ভারতের আগরতলার মেলাঘর কর্ণেল চৌমুহনীতে সেখানকার হাফাইন্যা ক্যাম্প ছিল ২ নং সেক্টরে মেঝর হায়দারের অধীনে। সেখানে সপ্তাহে ৫ শ মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজখবর সহ খাবার-দাবার যোগার করে এনে দিতাম আমি। ব্যবসা ও ব্যবসায়ীক নেতৃত্বে দুটুতেই সমান দক্ষতার প্রমান রেখেছেন আবুল হাসেম। ১৯৪৩ সালে মেট্রিকুলেশন পাশ করার পর কর্মজীবনে প্রবেশ করে জমানো অর্থ কড়ি দিয়ে ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করি গ্লোব প্রিন্টিং ওয়ার্কস, ১৯৫৫ সালে নিউ ঢাকা ব্রেইড ফ্যাক্টরী, রুমি মেডিকেল স্টোর, ১৯৬২ সালে জবা টেক্সটাইল মিল্স ও করিম ইন্ডাস্ট্রিয়াল করপোরেশন লি:। এ ছাড়া ১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তান টেক্সটাইল মিলস অনার্স -এর চেয়ারম্যান, ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ টেইপ লেইস এন্ড ব্রেইড ম্যানুফেকচার্রাস্ এসোসিয়েশন এর সেক্রেটারী, লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা নর্দানের পরিচালক ও ১৯৮৪ -১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল্স এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) চেয়ারম্যান ছিলেন। সমাজ সেবায় ১৯৫৮ হতে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ঢাকার বড়কাটরার হুসাইনিয়া আশরাফুল উলুম মাদরাসার সেক্রেটারী ও ১৯৭৩ সাল হতে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত নিজস্ব অর্থায়নে ১০০ টি চক্ষু শিবিরে বিনামূল্যে প্রায় ১ লক্ষ লোকের চক্ষু চিকিৎসা ও অপারেশন করা সহ চশমা সরবরাহ করেন তিনি। খেলাধুলা ও ক্রীড়া জগতে হাজী আবুল হাসেমের অবদান চোখে পরার মত। খেলা ধুলার প্রতি আগ্রহ থাকায় তৎকালিন ১৯৪৮ সাল হতে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ বছর যাবৎ তিনি মাউথতুলি স্পোর্টিং ক্লাবের সেক্রেটারী ছিলেন। সমাজ সেবায় বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে ২০০৬ সালের ২২ জুলাই তিনি স্বামী সরুপানন্দ ফাউন্ডেশন পদক, মুরাদনগরে বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী হিসেবে সংবর্ধনা পান। সব শেষে চলতি বছরে সরকারী ভাবে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। মানব সেবায় তাঁর প্রয়াত স্ত্রী নুরুন্নাহারের ভূমিকাকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরন করেন তিনি। প্রয়াত স্ত্রী নুরুন্নাহারের নামে ২০০৫ সালে কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম কলেজে ‘নুরুন্নাহার স্মৃতি পাঠাগার’ স্থাপন করেছেন তিনি। ৮৯ বছর বয়সেও আবুল হাসেম নিজেকে সম্পূর্ণ কর্মক্ষম বলে দাবী করেন। এখনো চশমা ছাড়াই খবরের কাগজ পরতে পারেন। তিনি এখন ঢাকার ধানমন্ডিতে ছোট মেয়ের সঙ্গে থাকেন। ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে হাঁটতে বের হন। ফিরে এসে খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে খুঁজে দেখেন কোথায় কার জন্য কী করা যায়। এর পর নিজের পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক ও সেবা কর্মের খোজ খবর নেন। আবুল হাশেম আরো অনেকদিন বাঁচতে চান শুধু মানব সেবার জন্য। তিনি বলেন, আমার অনুপস্থিতিতে আমার ছেলেমেয়েরা আমার অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নেয়ার সব ব্যবস্থা করে দিয়ে যাব আমি। আবুল হাশেমের দান-অনুদান , সাহায্য সহযোগীতার পরিমান টাকার অঙ্কে কত হবে, তা তিনি জানাতে চান না। তিনি বলেন, দানের ক্ষেত্রে ডান হাতে দিলে বা হাতও যেন না জানে।




Check Also

দেবিদ্বারের সাবেক চেয়ারম্যান করোনা আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যু: কঠোর নিরাপত্তায় গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ভাণী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান (৫৫) করোনায় আক্রান্ত ...

Leave a Reply