পাঁচ বছরেও শহীদ মিনার হয় নি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে : ক্ষুব্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

এম আহসান হাবীব, কুবি :

ভাষা আন্দোলনই বাঙ্গালির তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল মাইলফলক । ভাষা শহীদদের যথাযথ শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৫২ সালে ঢাকায় নির্মিত হয় বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার। এরপর থেকে এ যাবত সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি এলাকায় ও স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে স্থাপিত হয়েছে শত-সহস্র শহীদ মিনার। শহীদ মিনারগুলো বাঙ্গালি জাতিস্বত্তার অনন্য ত্যাগ ও সংগ্রামের নিদর্শন এবং প্রেরণার একান্ত উৎস। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিটি ঐতিহাসিক দিবসেই সর্বস্তরের বাঙ্গালি শ্রদ্ধা জানায় শহীদ মিনারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) অদ্যাবধি কোন শহীদ মিনার নির্মিত হয় নি। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের তিন বছর পার হলেও শুরু হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ। দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো সত্ত্বেও শহীদ মিনার নির্মাণ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থী। শহীদ মিনার নির্মাণের দাবিতে দুই দফায় প্রশাসনকে স্মারকলিপিও দিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

জানা যায়, ২০০৬ সালের ৭ ফেব্র“য়ারি প্রতিষ্ঠার পর ২০০৭ সালের ২৮ মে একাডেমিকভাবে যাত্রা শুরু করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য প্রফেসর ড. গোলাম মাওলা ২০০৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী অধ্যাপক হাশেম খানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের একটি মনোরম নকশাও প্রনয়ণ করা হয়। সে বছর কাঠ ও বোর্ড দিয়ে একটি ডামি শহীদ মিনার নির্মাণ করে প্রথমবারের মত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মহান একুশে উদ্যাপন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কোটবাড়ি এবং শহর এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের ঘোষণা দেন তৎকালীন উপাচার্য। এর কিছুদিন পরই নানা কারণে বিদায় নিতে হয় তাকে। পরবর্তীতে দুইজন ভিসি (একজন ভারপ্রাপ্তসহ) পরিবর্তন হলেও অজ্ঞাত কারণে শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ আরম্ভ করা হয় নি। উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এইচ এম জেহাদুল করিমের সময়ে কুমিল্লাবাসী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক কুমিল্লার সন্তান শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নামে একটি আবাসিক হলের নামকরণ করা হলেও শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। প্রশাসনিক ভবন, একাডেমিক ভবন, ছাত্র-ছ্ত্রাীদের পৃথক আবাসিক হল, উপাচার্যের বাসভবন, শিক্ষকদের ডরমেটরী, মসজিদ, ক্যাফেটেরিয়া, পাওয়ার হাউজসহ বিভিন্ন নির্মাণ কাজ হলেও আলোর মুখ দেখে নি শহীদ মিনার। বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. আমির হোসেন খান ২০০৯ সালের ২৩ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি একাডেমিক ভবন, একটি আবাসিক হল, সীমানা প্রাচীর, ফটকসহ বেশ কিছু নির্মাণ কাজ এবং যানবাহন ক্রয়ের উদ্যোগ নিলেও শহীদ মিনার নির্মাণ কাজ এখন পর্যন্ত আরম্ভ হয় নি।

এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অতি শিগগিরই শহীদ মিনার চান সকল প্রগতিশীল ও মুক্তমনা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ দাবিতে উপাচার্যকে দুই দফায় স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে শহীদ মিনার স্থাপনের দাবি জানিয়ে একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম্স বিভাগের ছাত্র জিকরিয়া সিদ্দিকী জাকি বলেন, “ক্যাম্পাসে শহীদ মিনার না থাকায় আমরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যথাযথ শ্রদ্ধা জানাতে পারছি না। শহীদদের প্রতি এটা আমাদের শ্রদ্ধাগত দৈন্যতাই বটে।” ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী আর্থি দত্ত বলেন, “ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কেন্দ্রস্থল হচ্ছে শহীদ মিনার। জাতির ভবিষ্যৎ হিসেবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্রসমাজ যদি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগটুকুই না পায় তাহলে তারা দেশপ্রেমিক হয়ে গড়ে ওঠবে কি করে?” শহীদ মিনার প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, “পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা শহীদ মিনার নির্মিত হওয়ারই কথা। প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিদের জন্য একাধিক গাড়ি কেনা যায়, অথচ শহীদ মিনার করা যায় না!” তিনি আরো বলেন, ‘প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষাবাবদ য়ে আয় হয় তা থেকেও একটা শহীত মিনারের কাজ করা যেত। তাছাড়া অতীতে নকশা নির্মাণ ও সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত হলেও কেন কাজ শুরু হল না তা খতিয়ে দেখা দরকার।”

শহীদ মিনার নির্মাণ কাজের বিষয়ে সম্প্রতি গঠিত ‘শহীদ মিনার নির্মাণ কমিটি’র আহবায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জি এম মনিরুজ্জামান আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, “ইতিমধ্যেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং পরিবর্তিত স্থান ও নকশা নির্বাচন করা হয়েছে। বাজেট পাশ হলেই কাজ শুরু হবে।” বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, “প্রথম প্রকল্পে শহীদ মিনার না থাকায় এতদিন বিলম্ব হয়েছে। বাজেট নিয়ে ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ চলছে। অর্থ বরাদ্দ পেলেই শহীদ মিনারের কাজ শুরু হবে।”

আগামীকাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এবার না পারা গেলেও আগামীতে পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনারেই ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে চান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ ব্যাপারে ভিসি প্রফেসর ড. আমির হোসেন খান এক কথায় বলেন, “প্রক্রিয়া চলছে, ২০১২ সালের একুশে আমরা নতুন শহীদ মিনারেই করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।”

Check Also

কুবি সাংবাদিক সমিতির অভিষেক অনুষ্ঠান পালিত

মো শরীফুল ইসলাম,কুবি :– বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে ...

Leave a Reply