ঝিলমিল সংঘঃ এক স্বেচ্ছাশ্রমের পাঠশালায়

স্মৃতির মুখচ্ছবিতে এক সংগ্রামী জীবন
দেলোয়ার জাহিদ :

দেলোয়ার জাহিদ

(স্মৃতির মুখচ্ছবিতে এক সংগ্রামী জীবন, একজন প্রতিবাদী, সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরশাসনের। একজন সংগঠক তৃণমূলে মানবাধিকার আন্দোলনের । সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে একজন কলম সৈনিক, একজন একাত্তুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা। একজন সাংবাদিক, কালের সিড়িতে পা দিয়ে যিনি স্বেচ্ছাসেবক থেকে একজন যোদ্ধা, একজন মরমী মানুষ থেকে একজন বোদ্ধায় পরিনত হয়েছেন। জীবন সংগ্রামের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর ধারবাহিক রচনা)

শৈশব ও কৈশোর :

নদীর ধারে ছোট্র একটি গ্রাম। সররাবাদ তার নাম।ভৈরবের অদুরে, ক্ষাণিক পশ্চিমে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের পাশে।এখানে ভর বর্ষায় নদীর জলে চোখ জুড়ায়।জলস্রোত প্রবাহিত যেন মানুষের জীবন। সারা গ্রামে চার হিস্যার ছোট্র একটি পরিবার। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্বত্ন্ত্র জীবনাচারে।

হাজী বাড়ী।পূর্ব পুরুষ, শিক্ষিত ও রক্ষণশীল।দাদা হাজী সোনাউল্লাহ নীতি, নৈতিকতা এবং দানশীলতায় ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। আর বাবা এম এ খালেক শৈশবেই হয়েছিলেন পিতৃহীন। ছেলেবেলা থেকে বাবা’র ইংরেজী শিক্ষার প্রতি ছিলো প্রচন্ড ঝোক। খুবই মেধাবী ছিলেন শৈশব থেকে কিন্তু ইংরেজী পড়ায় বাদ সাধলেন অভিবাবকেরা। নিজের লক্ষ্য অটুট রাখতে এক সময় বাড়ী ছাড়তে হলো তাকে। নারায়নগন্জে হাউস টিউটর থেকে কলেজ শিক্ষা সমাপন করলেন। এক জ্যেঠা ছিলেন সংস্কৃতে পন্ডিত, নাম তার সোবহান পন্ডিত। এক জ্যেঠা কোলকাতা আলীগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবীতে মাষ্টার্স-নাম তার এম এ রাজ্জাক, পেশা অধ্যাপনা, এ কাদের কৃষক, আর এম এ রহমান ও আব্দুল আউয়াল এর প্রথমজন ছিলেন প্রচন্ড ধর্মানুরাগী এবং অন্যজন কৃষক ও স্থানীয় কাজী। জ্যেঠা সোবহান পন্ডিত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ও নির্বাচিত হয়ে ছিলেন। পরিবারের কৃষি জমি ছিলো প্রচুর। আমার বাবা ছিলেন সর্বকনিষ্ট সকল চাচাতো জ্যেঠাতো ভাইবোনদের মধ্যে। পারিবারিক রক্ষণশীলতার জন্য এ বাড়ী’র পুরো অঞ্চলে রয়েছে সুনাম, সুখ্যাতি।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে জ্যেঠা পন্ডিত সোবহান ও বাবা খালেক ছিলেন কংগ্রেসের পক্ষে। বাবা মহাত্মা গান্ধী’র একজন ভক্ত ও অনুসারী হালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবে’র রাজনীতির সাথে হন সম্পৃক্ত। হোসাইন শহীদ সোরওয়ার্দী এসেছিলেন ভৈরবে, স্কুল থেকে ষ্টেশনে তাকে বরণ করতে আমাকেই বেছে নেয়া হয়েছিলো। ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে ছিলাম তাকে। আয়ুবখানের সামরিক শাসনের প্রারম্ভে বাবা’র বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। তখন তিনি ভৈরব বাজারে। রায়পুরা থানার রামনগর হাইস্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে সবে ব্যবসা শুরু করেছেন। বাবা ছিলেন খুবই উদার প্রকৃতির। তাই দাদী তাকে দয়াল খালেক বলে ডাকতেন।

তদানীন্তন রায়পুরার বাঘ বাড়ি বলে খ্যাত গ্রামের অপর এক পরিবার। শিক্ষা সংস্কৃতি ও আচারে সম্পূর্ণ বিপরীত। তারপর ও বহু বাধা বিপত্তি পার হয়ে আমার বাবার সাথে বিয়ে হয়েছিলো মা আনোয়ারা বেগমের। তখনও বাবা রামনগর হাই ইস্কুলের শিক্ষকতা পেশায়। এলাকায় সুপরিচিত খালেক মাস্টার হিসেবে।

পঞ্চাশের দশকের প্রারম্ভে এক ৬ই ফেব্রুয়ারী আমার জন্ম। আমার পিতৃহীন বাবা তখন আনন্দে আত্মহারা। জ্যেঠা রহমান ও আবদুল আউয়ালের তখনও নেই কোন পুত্র সন্তান। তাদের ও সীমাহীন আনন্দ। জ্যেঠা রহমানের আযানের ধ্বনিতে জানান দেয়া হলো আমার জন্ম বার্তা। নানা’র বাড়ীতেও খুশীর বন্যা বয়ে গেলো। সে বাড়ীতেও আমি বড় নাতি। নানা মুহাম্মদ আলী সরকার ফরমান জারি করলেন ও বড় হবে এ বাড়ীতে অর্থাৎ নানার বাড়ীতে। নানা’র ভাই অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ এম. এস. সি (গোল্ড ম্যাডেলিস্ট) ও তার খুশীর বার্তা পৌছে দিলেন বাবা খালেক মাস্টারকে।

আমার জন্ম থেকে অদ্যাবদি ঘটনা প্রবাহ নদীর মতই প্রবাহমান। পরিপার্শ্বে প্রতিটি চরিত্রই সমাজে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ঝঞ্জা বিক্ষুদ্ধ জীবনের শুরুতে যা ছিল জলের মতো সাবলীল। দেশ বিভাগ, ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুথান এবং প্রবাহমান রাজনীতির শেকড় কোন না কোন ভাবে আমাদের পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত। আমার এ কাহিনী ছড়িয়ে যাবে একটি গ্রামের ইতিহাস থেকে আরো অনেক অনেক গভীরে। যেমন ছড়িয়ে গেছে ম্যাক্সিম গোর্কির ছেলেবেলা।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী, যে নদী একদা ছিলো খরস্রোতা, ছিলো মানুষের দুর-দুরান্তে চলা এবং ব্যবসার জন্য নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের উপায় সে নদী নিয়েছে যেমন, দিয়েছে ও অনেক। আমার শৈশব কেটেছে নদীর ঢেউয়ের সাথে খেলা করে। নদীর জল আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকত। কৈশোরে আমাকে সামলে রাখা দায় ছিলো। খালামনি জ্যোস্না আমায় আগলে রাখতেন। তারপরও যা ঘটার তাই ঘটে গেলো। সকালে প্রতিদিনের মতো প্রিয় দুধভাত খেয়ে মায়ের চোখের আড়াল হলাম। তারপর নিখোঁজ। বাড়ীর সামনেই ভরা নদী। বর্ষায় ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ঘাটে কয়েকটা নৌকা বাধা, নদীতে জেলেরা মাছ ধরছে। ব্যস্ত সবাই এদিক ওদিক কিন্তু আমাকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘড়ির কাটার সাথে সবার উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ও বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে এ কান ও কান করে রটে গেলো…দিলু নেই। খুজে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। জড়ো হচ্ছে আত্মীয় স্বজন। কোথায় দিলু? দিলু? আমার ডাক নাম। আসল নাম দেলোয়ার জাহিদ। আদর করে সবাই গ্রামে দিলু বলে ডাকতো। বাবাই আমার নামকরণ করেছিলেন।

না্হ! কোথাও নেই। এবার নদীতে দেখার পালা। আশে-পাশের এঘাট ওঘাট, নেই কোথাও। খোজার সময় থেকে ৪৫ মিনিট গত হয়েছে। উৎকণ্ঠা বেড়েই চলছে। একজন বাদে সবাই পাড়ে উঠে এলো। পানিতে নেই, আর থাকলেও ভেসে গেছে অনেক দূরে-এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছিলেন একে অপরে।

পেয়েছি! জোরে চিৎকার করলো আমাদের বাড়ীতে থাকা বাৎসরিক কৃষি কর্মী। প্রায় ১৫ – ২০ হাত পানির নীচ থেকে তুলে আনলো আমাকে। বাড়ীর মসজিদের সামনে লবনের উপর আমার নিথর দেহটা রাখা হলো। নিশ্বাস প্রশ্বাস নেই। এলো ডাক্তার, অনেক দেরি হয়ে গেছে। তারপর ও একটা ইনজেকশান পুশ করে বিদায় নিলো ডাক্তার। জ্যেঠা রহমান বললেন ভরসা আল্লাহর, তোমরা ধৈর্য ধরো। আমার পেটে মাথা রেখে তিনি ও অন্যান্য’রা ঘুরাতে শুরু করলেন। মুখ দিয়ে তখন বের হচ্ছে কাদা আর পানি। সবাই সৃষ্টি কর্তার করুনার অপেক্ষায়। আবারো লবনের উপর আমার নিথর দেহটি রাখা হলো, হঠাৎ এলো এক দীর্ঘশ্বাস। সবাই চিৎকার করে উঠলো . . . . . . . . . বেঁচে আছে, বেঁচে আছে!!

খবর পেয়ে এরই মধ্যে বাবা পাগলের মত ছুটে এলেন ভর বর্ষার নদী সাতরিয়ে। ধক্কল কাটিয়ে উঠতে কিছু সময় লাগলো। গায়ের ছোট্র বন্ধুরা ছুটে এলো। ওদের প্রশ্ন একই, পানির নিচে আমি কি দেখেছি? মাছ দেখেছিস? অন্য কিছু? আমি শুধুই হাসতাম।

নদীর এই দস্যুপনার জন্য বাবা- মা গ্রাম ছাড়লেন। এলেন ভৈরব বাজারে। কিশোরগঞ্জ মহকুমার ছোট্ট একটি শহর। দেশের ব্যবসার প্রাণ কেন্দ্র। এছাড়া ও রয়েছেন আমাদের অনেক আত্মীয় স্বজন। সে এক ভিন্ন জীবন। স্কুলে ভর্তি হলাম। এভাবেই কাটছিল সময় হেসে খেলে। প্রথম কমাস বাবার ব্যবসায় ভালোই উন্নতি হলো। কাঠের ব্যবসা, তা বাড়ানোর চিন্তায় খুলনা যাওয়া আসা শুরু করলেন। এই অনুপস্থিতির সুযোগে শুরু হলো কর্মচারীদের লুটপাট। কিছু ঋণী হয়ে গেলেন বাবা।

মোজাফ্ফর আলী বাবার স্কুলের একজন সহকর্মী শিক্ষক। তিনি পরে কুমিল্লা বিসিকে বেগম ফ্লাওয়ার মিলস নামে ব্যবসা শুরু করেন কিন্তু পরিচালনার মতো লোক নেই, হাজির হলেন ভৈরবে। আমার বাবাকে ম্যানিজিং পার্টনার করার টোপ দিলেন। বাবা এরই মধ্যে ভৈরবে কাঠের ব্যবসার উপর থেকে আস্থা হারিয়া ফেলেছেন। স্থির হলো আমারা যাবো কুমিল্লায়।

বাবা ব্যাবসা থেকে বাড়ি ফিরেছেন। আমি তখনও জেগে, কোন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নেই। বাবা ঘরে ঢুকেই মাকে বললেন গুছিয়ে নাও সব পরশু সকালেই আমরা যাচ্ছি কুমিল্লায়। আমিও খুবই খুশী।ট্রেনে চড়তে পারব বলে।

বাবা! আমি কিন্তু জানালার পার্শ্বে বসবো।

হ্যা, হ্যা, তাই বসো। এখন ঘুমোতে যাও।

আমার দু’চোখেও স্বপ্ন। ছুটে চলছে ট্রেন . . . . . . কুমিল্লার পানে।

কৈশোর ও যৌবন

কুমিল্লা এসে পৌছলাম। দু’টি রিক্সায় চেপে ষ্টেশন থেকে ছোটরা মগবাড়ী চৌমুহুনী। বড় একটি ফ্লোর-পাকা টিন শেড ঘরে আমাদের সাময়িক আবাসনের ব্যবস্থা, খুব একটা মন্দ নয়। হয়ত ঠিক করে দিয়েছেন মায়ের মাতৃকুলের ভাই মরতুজ, ময়নাল, বা জাকির ওদের যে কেউ একজন। বাবার কর্মস্থল কুমিল্লা’ বিসিক-শিল্পনগরীতে, একটি মিলের জেনারেল ম্যানেজার। ছোটরা থেকে এর দুরত্ব নেহায়েত কম নয়। তারপরও আপনজনদের পার্শ্বে থাকা’র আনন্দই আলাদা।

ইস্কুল নেই। নেই কোন চেনা-জানা পরিচিত মুখ। আত্মীয় স্বজনদের ও ইতিপূর্বে দেখিনি কখনো। রাত পোহাতেই এটা ওটা নিয়ে হাজির স্বজনেরা। নানা’র বাড়ীর অভাবটা সহজেই ভুলে গেলাম।

আমার নানী বেগম রাহেলা খাতুনের বাড়ী কুমিল্লা’র দক্ষিন চর্থায়। নানীর সহোদর ভাই সুজাত আলী চৌধুরী ছিলেন শহরে সুপরিচিত ও সন্মানী ব্যক্তি। নানী ফয়জুন্নেছা স্কুলের ছাত্রী, গার্লস গাইড হিসাবেও তার যথেষ্ট পরিচিতি ছিলো। সে সময়ে এ ধরনের সুযোগ লাভ নারী সমাজের জন্য খুব সাধারন ছিলো না। আমার নানী রাহেলা খাতুন ছিলেন একজন বিনয়ী, দয়ালু, ত্যাগী এক মহিয়সি নারী।

আত্মীয় স্বজনদের মাঝে বেশীদিন থাকা হলো না। বাবার কর্মস্থল ও আমার স্কুলে ভর্তি সহ নানা কারণে প্রথমে অশোকতলা এবং পরে ঠাকুরপাড়ায় আমাদের বাসা নেয়া হলো। উত্তর ঠাকুরপাড়াস্থ নিরোধা সুন্দরী পাঠশালায় আমাকে ভর্তি করে দেয়া হলো। লম্বা একটি মাটির ঘরে প্রতিষ্ঠিত এ সরকারী প্রাইমারী স্কুলটিতে আশে পাশ্বের কয়েকটি পাড়া’র মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করত। আমি ও সামিল হলাম ওদের মাঝে। একজন মৌলানা স্যার প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকদের মাঝে গোপাল বাবু’র নাম স্মরণযোগ্য। গোপাল বাবু আমার হাউজ টিউটর ও ছিলেন দীর্ঘদিন। আমার বাবার ধারনা হিন্দু শিক্ষকেরা সকলেই নিবেদিত প্রান। গোপাল বাবু’র মেজাজ ছিল একটু চড়া, হয়তো প্রধান শিক্ষকের প্রভাবেই এমনটি হয়েছিলো। ছাত্র-ছাত্রীদের শাস্তিদানের প্রক্রিয়া ও পর্বগুলো প্রধান শিক্ষক কখনো নিজে কখনো বা গোপাল বাবুকে দিয়ে সেরে নিতেন।

আমি, রাখাল, মঈনাল ক্লাশে ১ম, ২য় বা ৩য় এভাবেই চক্রাকারে মেধাবস্থানে থাকতাম। আমার অভিবাবকদের এ নিয়ে কোন উদ্বেগ উৎকন্ঠা দেখিনি কখনো। কারন হয়তো তারা মনে করতেন আমার এ বোনাস জীবনে আমি যা করি তা’ই ভালো।

ফুটবল, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন খেলা ছাড়াও ঘুড়ি উড়ানো ছিলো আমার পছন্দ। যেদিন আমার ছোটভাই আনোয়ার ও ঘুড়ি উড়াতে শুরু করলো বাবা খুব ক্ষ্যাপে গেলেন। আমি বুঝে গেলাম এটা বাবার পছন্দ নয়। তাই নিজেই ঘুড়ি উড়ানো ছেড়ে ভাইয়ের পিছু নিলাম। সে ও কম যায়নি-দু’দিন আগেইতো তুমি ঘুড়ি উড়িয়েছো, এখন সাধু বনেছো। আব্বু এতদিন তোমায় কিছু বলেনি কেন?

আমার মামা এম আলাউদ্দিন তখন পশ্চিম পাকিস্তানে, সেনা বাহিনীতে কমিশন রেঙ্কে যোগ দিয়েছেন। আমার জন্য ৬ টাকা মানি অর্ডার এলো। টাকা পেয়ে আমি খুবই খুশি। আমার জন্য একটা ফুটবল এবং অন্যদের জন্য কিছু খেলার সামগ্রী ও চকলেট কিনে নিয়ে এলাম।

স্কুল শেষে বাড়ি ফিরেই ছুটতাম খেলার মাঠে। একটা ফুটবল টীম ও গড়ে তুলে ছিলাম। বন্ধুরা অন্য পাড়ার টীমের সাথে ম্যাচ ঠিক করলো। আমাদের দলের আমিই ক্যাপ্টেন। ছুড়ান্ত খেলার প্রায় শেষের দিকে আমারই পায়ে লাগা এক আত্মঘাতি গোলে দল হেরে গেলো। সে থেকে সক্রিয়ভাবে ফুটবল খেলা ছাড়লাম। বন্ধুরা শত মিনতি করেও আর ফুটবল খেলাতে পারেনি।

প্রাইমারী স্কুলে একবার সহপাঠিদের বাল্য সুলভ ষড়যন্ত্রের শিকার হলাম। ক’জন সহপাঠি এক সহপাঠিনির বইয়ের ভিতর এক প্রেমপত্র ঢুকিয়ে দিলো। ইতিতে প্রথমে আমার, এরপরে আরো ২-৩ জনের নাম লিখে দিলো। সেই কথিত প্রেমপত্র লেখার অপরাধে শুধু আমারই বিচার হলো । ইস্কুলের ক্লাশগুলো’র পার্টিশন খুলে বিচারের স্থান সংকুলান করা হলো। প্রধান শিক্ষক মহোদয় আমার কোন কথাই শুনতে চাইলেন না। যতদূর মনে পড়ে ৫০ ঘা বেত, ৫ টি বেত একত্র করে ১০ বার। গোপাল বাবু আমাকে বাচানোর হয়তো শেষ চেষ্টা করলেন।

স্যার, যদি হাত জোড় করে সবার কাছে মাফ চায়, তাহলে?

বলুন, চাইতে বলুন-

আমি কোন অন্যায় করিনি- মাফ চাইবো কেন? সরল জবাব আমার।

প্রধান শিক্ষক গর্জে উঠলেন- শুরু করুন গোপাল বাবু!

৫ বেত একত্র করে গোপাল বাবু হাতে ১ ঘা দিলেন। প্রচন্ড ব্যথায় আমি কুকড়ে গেলাম। তারপর ও চোখে জল এলো না। অভিযোগকারীনি কামরুন, বান্ধবী নিলুফার এবং ক্লাশের বন্ধুরা চোখ ফেরালো।

আমার গায়ে কেউ কখনো হাত দিয়েছে মনে পড়ছে না। তারপর ও এ প্রচন্ড ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা এলো কোথা থেকে!

আবারো হাত পাতো!

আমি হাত পাতলাম। না এবার বেতের ঘা পড়লো না। কেউ একজন জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। কোন এক মানুষ, বা হতে পারেন কোন এক ফেরেস্তা, যে উদ্ধার করবেন আমাকে এমন সাক্ষাত আজাব থেকে।

আমি এ স্কুলের চাকুরী ছেড়ে দিবো। ডাকুন, ওর বাবা-মাকে। একজন শিশুকে নির্দয়ভাবে আপনারা পেটাতে পারেন না। এটা কোন বিচার হলো? চিঠিতে নাম ৩-৪জনের আর পিটাবেন একজনকে, কেন? এটা কি প্রমান হয়েছে যে চিঠিটি ওই লিখেছে? ও কি এমন চিঠি লেখার ভাষা জানে? বা আদৌ জ্ঞান রাখে? প্রেমপত্র কি চারজনে লিখে, স্যার?

এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানালেন সদ্য ভার্সিটি থেকে বের হয়ে আসা এক প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষক। বিচার পন্ড হলো ওখানেই। বাড়ি ফিরে প্রচন্ড ঝর, স্কুলে যাওয়া হয়নি ২-৩দিন।

ব্যথাতুর মন নিয়ে স্কুলে ফিরলাম। এরই মধ্যে বাবা মা কাউকে কিছুই বলিনি। বাবা জানলে স্কুলে গিয়ে হাঙ্গামা বাধিয়ে ছাড়বেন। সে ভয়েই।

টিফিন পিড়িয়ড, একাই হাটছি। পাড়ার এক বড় ভাই আমায় কাছে ডাকলেন। শুনলেন আমার দূর্গতির কথা। আমি কিছুই জানিনা দাদা, অথচ!

আমি জানি- বলেই বললেন ঘটনাটি কারা ঘটিয়েছে। ওরা তোমারই সহপাঠি।

আমি হিতাহিত জ্ঞান শুন্য হয়ে দৌড়ে গিয়ে ধরলাম একজনকে। নারকেল গাছে মাথা ঠুকে ওকে রক্তাত্ত করে ধরে নিয়ে এলাম প্রধান শিক্ষক মহোদয়ের কক্ষে। পিছু পিছু সারা স্কুলের ভয়ার্ত ছাত্র- ছাত্রীরা দৌড়াচ্ছে। আমাকে এ রূপে আর কেউ দেখিনি কখনো।

হয়েছেটা কি?

শুনুন। তারপর, কথা বলুন স্যার।

ষড়যন্ত্রে’র সবিস্তার বর্ননা শুনে প্রধান শিক্ষক শুধুই মাথা নিচু করে রইলেন কিন্তু এবার ও সেই প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকই আমায় আইনের প্রতি শ্রদ্ধার কথা শিখালেন। বললেন ওকে এভাবে মেরে তুমি ঠিক করোনি। এটা তোমার কাজ ছিলো না। বলছি-এখুনি ক্লাশে যাও।

বের হতে হতে শুনলাম—মাফ করবেন, ওকে বেপরোয়া করে তোলা’র জন্য আপনারাই দায়ী, স্যার।

আমার মত একজন শান্ত, নিরীহ প্রাথমিক স্কুলের ছাত্র অন্য একজন ছাত্রকে এভাবে পেটানোর ঘটনার সাথে অনেক কল্প- কাহিনী যোগ হয়ে তা ছড়িয়ে পড়লো ছোট্র এ শহরে। বাবা মা শুনে হতভম্ব।

পাড়ি দিলাম হাইস্কুলে। স্কুলের নাম কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালা। এখানে ও রটে গেলো যে আমি খুবই বেপরোয়া। যাই হোক ক’জন ত্যাগি শিক্ষক পেলাম। যারা মনে প্রানে শিক্ষক। বাবু সুভাষ কর, বিনয় বাবু, বনিক বাবু, অমল বাবু, পল্টু বাবু ও মৌলানা মিজান সহ আরো কয়েকজন।

আমরা ক’জন হাতে গুনা মুসলিম ছাত্র। আমি, ইকবাল, তাজ, লিয়াকত, নজরুল, স্বপন, এয়ার, আর হিন্দু বন্ধুদের মধ্যে আশীস, নিতীশ, নারায়ন, স্বপন, সহ আরো অনেকে।

প্রধান শিক্ষক বাবু সুভাষ চন্দ্র কর ছিলেন একজন প্রগতিশীল মানুষ। স্কুলের অনেক বিষয়েই তিনি ছিলেন আপোষহীন। কাজেই মহেশাঙ্গনে তিনি ক্রমেই বন্ধুহীন হয়ে পড়ছিলেন। ছাত্র প্রতিনিধি হিসাবে আমার সাথে তার দ্বন্ধ সৃষ্টির প্লট কে বা কারা তৈরী করেছিলেন জানিনা তবে একবার খুবই ছোট্র একটা বিষয় নিয়ে তার সাথে আমার সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। স্যার আমাকে ফোর্স টিসি দিতে উদ্যত হন। আমার অপরাধ-আমি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রদের জন্য পর্যাপ্ত থিউরী ও প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশ চেয়েছিলাম। শিক্ষক ছাত্রদের প্রতিবাদের মুখে তিনি সে টিসিটি ছিড়ে ফেলতে বাধ্য হন। ঘটনাক্রমে আমি স্যারের হয়তো সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র হিসাবে পরিনত হই। বন্ধু নজরুল, লিয়াকত, তাজ কে নিয়ে স্কুলের নানাবিদ সমস্যা সমাধানে ব্রতি হই। আজো এর স্মৃতি সম্ভার স্কুলে দৃশ্যমান।
ঝিলমিল সংঘঃ এক স্বেচ্ছাশ্রমের পাঠশালায়

কুমিল্লার শিক্ষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে ছোট্র একটি নাম -ঠাকুরপাড়া ঝিলমিল সংঘ। ডঃ জাহিরুল হাসানের উদ্যোগ ও অনুপ্রেরনায় ১৯৬৭ সালের ২৩ শে মার্চ এর প্রতিষ্ঠা। শিশু কিশোরদের আমোদ-প্রমোদ ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা এ অরাজনৈতিক সংগঠন । এক পুরুষকালে কিভাবে এ’টি একদল মানুষ গড়ার পাঠশালায় পরিণত হলো এর এক জীবন্ত কাহিনী।

তখন কৈশোর। স্কু্ল থেকে ফিরে সূর্য্যপাল পুকুর পাড়ে সমবয়সীদের সাথে তখন খেলাধুলায় ব্যস্ত। হাসান সাহেব ডেকে পাঠালেন আমাদের । একটু ঘাবড়ে গেলাম, আবারো কেউ কোন নালিশ করেনি তো? মরুব্বিদের ও মরুব্বি তিনি। সবাই উনাকে মান্য করেন, উনার সরকারী পদ-পদবীর চেয়েও উনার ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্বের কারনে। এ দয়ালু স্বল্পভাষী মানুষটিকে হয়তো সৃষ্টিকর্তা ভুল করে জটিল এ পৃথিবীতে একজন মানুষ হিসেবেই পাঠিয়ে দিয়েছেন। উনার মতো আরো কিছু মানুষ তৈরী করলে হয়তো আর ফেরেষ্তা তৈরী’র প্রয়োজন হতো না।

এসো। এসো তোমরা। তোমাদের খেলাধুলায় ব্যাঘাত ঘটালাম। বসো সবাই। এভাবেই হাসান সাহেব আমাদের বরন করলেন।

তোমাদের ডেকে পাঠিয়েছি, কেন জানো? ঝিলমিল সংঘের কমিটি করতে হবে। কাল সবাই প্রস্তুত হয়ে এসো। কাকে কোন পদে চাও তা নিজদের মধ্যে ঠিক করে নিও।

খালু?

হ্যা, বলো! কিছু বলবে!

জ্বি! নাসির বললো-খালু, দেলোয়ার সেক্রেটারী—আমরা সবাই ওকে চাই।

হাসান সাহেব হেসে বললেন কাল মিটিং স্থির হবে সব কিছু।

পরদিন হাসান সাহেব সভাপতি ও আমি সেক্রেটারী নির্বাচিত হলাম, আলী আশ্রাফ ও শহীদ ভাই, নাসির, জহির, নাজরুল হাসান (বাবু), সহ অনেকেই স্থান পেলো কমিটিতে।

এভাবেই আমার জীবনে কোন একটি সংগঠনের কাজে হাতে খড়ি। তখনো আমি হাফ প্যান্ট পরি। একজন স্বনামধন্য (অবসরপ্রাপ্ত) সরকারী কর্মকর্তা যে সংগঠনের সভাপতি, একজন স্কুল বালক এর সেক্রেটারী তা নিজের কাছেই মানিয়ে নিতে ক’দিন সময় লেগেছে। সেদিন বন্ধুরা কেনই বা আমাকেই বেছে নিয়ে ছিলো তা আমি আজো বুঝে উঠতে পারিনি ।

আমার বাবা সব শুনে খুবই উচ্ছসিত হয়ে বললেন, জীবনে অনেক কিছুই শিখতে পারবে। ভদ্রলোক একজন জ্ঞানী লোক।

সাধারনতঃ সে সময়ে অভিবাবকেরা ক্লাব বা সংগঠন করা খুব একটা পছন্দ করতেন না বা মনে করতেন এগুলো বখাটেদের কাজ।

হাসান সাহেবের শিক্ষা-জীবন ও পশুপালন বিষয়ে গবেষনা ছিলো কোলকাতা, অষ্ট্রেলিয়া এবং তেহরানে। কুমিল্লা’র পশুপালন গবেষনা বিভাগে ও তিনি কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। মানুষের মাঝে পশুত্ব নির্মূলে তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞ পরামর্শক। তিনি হয়তো মনুষ্য কর্মকর্তা হলে মানব সমাজ আরো বেশী উপকৃত হতো।

তখনো মানব দর্শন বুঝে উঠার বয়স হয়েনি আমার। পিতৃস্নেহের দোলাচলে তখন দোলছি আমি। বাবা সাবেক স্কুল শিক্ষক, আর সংগঠন প্রধান ও একজন শিক্ষানুরাগী পিতৃতুল্য মানুষ। আমাকে গড়ে তুলতে দু’জনেরই ছিলো যেন এক স্নায়ু প্রতিযোগিতা।

হাসান সাহেব জানিয়ে দিয়েছেন সব দাপ্তরিক চিঠিপত্র আমাকেই লিখতে হবে। তখনো আমি স্কুলে চিঠি লেখাও শিখিনি। তিনি বলতেন আমি লিখতাম, কখনো লিখে নিলে তিনি তা সংশোধন করে দিতেন। একবার বৃটিশ হাই কমিশনকে “হার এক্সেলেন্সী” লিখে চিঠি দিতে মোটেই আমি সম্মত হচ্ছিলাম না কিন্তু তিনি আমায় বুঝালেন অপরকে সন্মান করলে মানুষ নিজেই সন্মানিত হয়।

একদিন কথাচ্ছলে হাসান সাহেব আমাকে বললেন পৃথিবীতে যে যত বড় নেতা সে একজন তত বড় কর্মী। কথাটি আমার হৃদয়ে গেথে গিয়েছিলো। তাই কখনো নেতা হতে চাইনি।

তখনো কচিকাঁচার মেলায় নিয়মিত আমার যাওয়া আসা । মোস্তফা চৌধুরী, তাজুল ইসলাম (তাজু) ভাই, দুলাল দা সহ বেশ ক’জন বড় ভাই আমাদের ফরিদা বিদ্যায়তনে নানাবিদ প্রশিক্ষন দিতেন। হাসান সাহেবের ছেলে নাজমুল হাসান পাখী ও ছিলেন কচিকাঁচার মেলায় বড়দের দলে। শৈশব থেকেই কচিকাঁচায় প্যারেড, পিটি, অভিনয়, আবৃত্তি ও সঙ্গীত চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছিলাম নিজেকে, ঝিলমিল সংঘের দায়িত্ব নেয়ার পর এ প্রশিক্ষনগুলোকে এখন বাস্তবে প্রয়োগের পালা।

পাকিস্তানের তদানীন্তন জাতীয় দিবসে ঝিলমিল সংঘ স্বতন্ত্রভাবে অনুষ্ঠানমালায় অংশ নেবে এ দাবি নিয়ে হাজির হলাম, আমাদের সংগঠনের ছেলেমেয়েরা ইতিপূর্বে কচিকাঁচা, খেলাঘর বা তাদের স্বস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নিতো। হাসান সাহেব খুবই উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন, কাজেই ভেতরের বাধাগুলো আর মাথা চাড়া’র সুযোগ পেলো না। তবে বাইরে এসে শুনা গেলো খারাপ হলে আমাকে এর মূল্য দিতে হবে। আমাদের টিমের ওপর আমার আস্থা ছিলো অসীম। আমি জানতাম ওরা আমাকে হারতে দেবে না কোনদিন। আমাদের আত্মবিশ্বাস ক্রমেই বেড়ে চললো- এ যেন সমুদ্রের ঢেউ’র উপর দাড়িয়ে এর গর্জন শোনা।

মাথার উপর ছাতা ছিল অনেক বড়। আমার ভয় ছিলো না মোটেই। হাসান সাহেব আমাদের ডেকে শুধু এটুকুই বলেছিলেন- তোমরা খুবই ভাল করবে। হয়েছিলো তাই। ঝিলমিল সংঘের তরুন-তরুনীদের পায়ের আওয়াজ জানান দিয়েছিল সেদিন দেশের অনাগত ভবিষ্যত নেতৃত্বের। সত্যি, আমরা ফিরে এসেছিলাম বিজয়ী’র বেশে।

একদিন হাসান সাহেব আমায় ডেকে পাঠালেন, বললেন তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে।

অভিযোগ?

হ্যা, শুনেছি, তুমি সব কাজ একা করে ফেলো। এটা ঠিক নয়। প্রত্যেককে তার কাজ করতে দিতে হবে। তুমি শুধু সমন্বয় করবে। এজন্যেই তুমি জেনারেল সেক্রেটারী।

হাসান সাহেব শাসালেন না প্রশংসা করলেন তা বুঝে উঠার বয়স তখনো হয়নি। ভেতর ভেতর খুবই অভিমান হলো। ক’দিন পরই বার্ষিক শিক্ষা শিবির। হাসান সাহেবের মত নিয়ে সভা ডাকলাম। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দায়িত্বগুলো ভাগ করে দেয়া হলো। এবার আমার তেমন কোন দায়িত্ব নেই। কারন আমি কাজ করে ফেলি। আমার শাস্তিটা মন্দ নয়। সভায় জানালাম আমি গ্রামের বাড়ী যাবো, ফিরবো শিক্ষা শিবির ৩/৪ দিন আগে। যাবার পূর্বে আমার করনীয় কিছু থাকলে তা ও শেষ করে যাবো। দুই-একজন ছাড়া কেউই খুশি হয়নি।

শিক্ষা শিবিরের আর মাত্র ৪দিন বাকী, কুমিল্লায় ফিরে এলাম। আশু ভাই আমাকে পেয়েই হা-হুতুস শরু করলেন। তেমন কিছুই হয়নি! মাঠ রেডি নেই, রেডি নেই পুরস্কার, সার্টিফিকেট, দেয়ালিকা কিভাবে কি হবে? তারিখ পিছাও!

হাসান সাহেব আমায় ডেকে বললেন-তুমি কি রাগ করেছো, বাবা? কেউই কিছু করছে না! শিক্ষা শিবির কি করা যাবে? সময়ও তো বেশী নেই।

সবাই এমনভাবে বেকে বসার কারন বুঝে গেলাম। আমাকে নিস্ক্রিয় করাকে সহজভাবে নেয়নি কেউ। হাসান সাহেবের অবস্থান থেকে অবশ্য উনি ঠিকই আছেন।

আমি বন্ধুদের সাথে মিলিত হলাম, তাদের জানিয়ে দিলাম ওরা এভাবে চুপচাপ থেকে ঠিক করেনি মোটেও। আমার অস্থিরতা দেখে ওরা ক্ষেপে গেলো। এখনো পুরো ৩দিন বাকী, বল কাকে কি করতে হবে? সাইকেল, রিক্সায় কর্মীদের ছুটাছুটি শুরু হলো। মাঠ রেডি নেই, এ যেন চষা ক্ষেত। কিভাবে কি হবে? পৌর চেয়ারম্যানকে ফোন করে রাস্তা ঠিক করার রোলার চেয়ে নিলাম। ছোট ভাইয়েরা দেড়-দু’মাইল ধাক্কিয়ে তা পাড়ায় নিয়ে এলো।

কাউসার, হোসেন, মনির, জাহাঙ্গীর, মিহির, কামরুল, কচি, এনাম, বাসার, জহির, জাকির, মজনু, মাহবুব, মন্টু, কুশুম, সফি, মাসুম, বাবুল, শাহজাহান, ও শাহালম সহ সবাইকে মাঠে ডাকলাম। সবাইকে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলাম । মাঠে গান, বাজনা আর রোলার নিয়ে ছুটাছুটিতে পিকনিকের পরিবেশ সৃষ্টি হলো। এলো কিছু হালকা খাবার। কিছু কেনা, কিছু এপাশ ওপাশ প্রতিবেশীদের। রাতেই তাবু গাড়া হলো। সকাল নাগাদ সেট হয়ে গেলো পুরো শিক্ষা শিবির। স্কাউটদের কায়দায় শুরু হলো ঝিলমিল সংঘের প্রথম শিক্ষা শিবির ।

স্মৃতিতে তখনো ‘৭১। ২৫ শে মার্চ, রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গুলি করে নানা স্থানে মানুষ হত্যা শুরু করলো। শহরে কার্ফু জারি হয়েছে। আমি নাসির, জহির, মিহির, বাবু সহ আরো ক’জন প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হাসান সাহেব আমাদের ডেকে সাবধান করলেন।

যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তখন আমি আমার ছোটভাই আনোয়ার সহ ঠাকুর পাড়ার বাসায়। আমাদের বাসাটি গলির ভেতর বিধায় বন্ধুরা অনেকেই রাতে আশ্রয় নিলো।

কার্ফু শিথিল হয়েছে। এদিক ওদিক থেকে মানুষ হত্যার খবর আসছে। আমার বাবা, মামা নজিবুল্লাহ কে নিয়ে ভৈরব থেকে হেটেই কুমিল্লায় চলে এলেন । দু’ তিন দিনে বেশ ক’বার জ্ঞান হারিয়েছেন বাবা। রাস্তায় শুনেছেন কুমিল্লায় গাছের পাতা ও নেই।

স্থির হলো কালই আমাদের চলে যেতে হবে গ্রামে, ভৈরব সন্নিকটে সর্রাবাদে। নিয়তির ঘড়ি তখনো দ্রুত এগিয়ে চলছে। বন্ধুরা সবাই আমাকে ঘিরে –আমিই প্রথম ছেড়ে যাচ্ছি সবাইকে-এক অনিশ্চিত গন্তব্যে।

বিদায় বেলায় শুধু বন্ধু নয় অভিবাবকদের চোখেও জল। আমি বুঝিনি কখনো ওরা আমায় এতো ভালবাসেন। সবার আবেগের মাঝে হয়তো আমার বাবার আবেগই হারিয়ে গেছে।
হাসান সাহেব মাথায় হাত রেখে বললেন-ফিরে এসো!

বাবা হয়তো জীবনে এই প্রথম উপলব্ধি করলেন যে আমি কেবল তার একা’র নই।

নাসির ও জহিরের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে তখন সম্পর্কের টান -পোরন চলছে। ক’দিন হল দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ। তারপর ও একজন আরেকজনের জন্য তুমুল মারামারি করে এসেছে কোন এক ইস্কুলে। একেই বলে বন্ধুত্ব।

শুরু হলো পথ চলা। বন্ধুরা দু’টি গ্রুপে হেটে চলেছে, কেউ নাসিরের সাথে কেউবা জহিরের, আমি কখনো ডানে কখনো বা বায়ে। জীবন চলার পথে এত সংক্ষিপ্ত সময়ে এত দীর্ঘ পথ হাটিনি কখনো।

গোমতীর পাড়ে আমরা ক’জন। নৌকা’র নোঙর যেমন মাটি চিরে জলে আছড়ে পড়ে তেমনি আমি ও অনেকগুলো হৃদয়ের শেকড় ছিঁড়ে নৌকা’য় উঠার অপেক্ষায়।

একে একে সবার পর পালাক্রমে জহির ও নাসির থেকে বিদায়ের ক্ষণ। নাসির আমায় বুকে চেপে ধরে বললো, আবারো দেখা হবে!

মিলে মিশে থাকিস—বললাম আমি। এখন বড়ই দূঃসময়।

তারপর নিঃশব্দ বিদায়। আমরা তিনজন ওপারের যাত্রী। খেয়া নৌকা এগিয়ে চলছে ওপারে, ওরা তখনো দাড়িয়ে আছে গোমতি’র তীরে। যতদূর চোখ যায় ফিরে ফিরে তাকাই—।




Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply