নিমসার কাচাঁবাজার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সবজিতে পরির্পূণ :বাজারদর কম হওয়ায় লোকসানে সবজি চাষীরা

ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু, কুমিল্লা :

কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহি জনপদ হিসেবে সুপরিচিত নিমসার। শতাধিক বছর পূর্বে এই নিমসার বাজারে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ত্রিপরা সম্প্রদায়ের লোকেরা নানারকম হাতের তৈরি পণ্যের পসরা সাজিয়ে বিক্রি করত এই বাজারে । কালের বির্বতনে হারিয়ে গেছে তাদের এই আদি পেশা। সেই জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ সবজি বাজার নিমসার। অর্ধশতবছরের ঐতিহ্যবাহি কুমিল্লার নিমসার কাচাঁবাজার ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের পাশেই রাস্তার দুপাশে বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থিত। ময়নামতি সেনানিবাস থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে রাস্তার দুপাশের ১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত অর্ধশতবছরের পুরনো এই বাজারটিতে প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ১০ টা পর্যন্ত চলে সবজি কৃষক,পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে চলে বেচাকেনা। এরপর শুরু হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে সবজি প্রেরণ,ব্যস্ত হয়ে উঠে পাইকারি ব্যবসায়ীরা। প্রত্যেক শীতের মৌসুমেই এই বাজারটি শীতের সবজিতে কানায় কানায় র্পূণ থাকে। এই শীতের মৌসুমেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। সরেজমিনে নিমসার কাচাঁবাজারে গিয়ে দেখা যায়,স্থানীয় ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকরা ট্রাক-ভ্যান ভর্তি করে এই বাজারে সবজি জড়ো করছে। স্থানীয় কৃষক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান,কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার বাতাইছড়ি,ফয়ালগাছা, আমড়াতলী,সদর দক্ষিণ উপজেলা,সদর উপজেলার বামিশা,ধনপুর,লালমাই,শ্রীমন্তপুর,চৌয়ারা,দেবিদ্বার উপজেলার সুলতানপুর,প্রজাপতি, রাজবাড়ী,বি-পাড়া উপজেলা,লাকসামের র্দুলভপুর,বুড়িচংয়ের ভরাসার,ইছাপুরা,নানুয়ারবাজার, শশীদল, সংকুচাইল, বাকসিমুল,নিমসার এলাকার মিতলমা,পাচকিততা,বারাইল,হামিদপুর,লোহারচর,কুমিল্লার বাইরে পাবনা,সিরাজগঞ্জ,বগুড়া,জয়পুরহাট,জামালপুর,নাটোর,নওগাঁ,মাগুরা,নিলফামারি,চট্রগ্রাম, প্রভৃতি জেলা থেকে প্রতিদিন কৃষক,পাইকারি ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা শত শত ট্রাক ভর্তি করে শতশত টন শীতকালিন সবজি এই বাজারে নিয়ে আসে।

বাজার সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন ৪/৫ ট্রাক আলু যার আনুমানিক পাইকারি দর প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা, ৬/৭ ট্রাক বেগুন যার আনুমানিক পাইকারি দর প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা, ৫/৬ ট্রাক টমেটো যার আনুমানিক পাইকারি দর প্রায় ৬ লক্ষ টাকা,৩০০/৪০০ ঝুড়ি ধনিয়াপাতা যার আনুমানিক পাইকারি দর প্রায় এক লক্ষ টাকা, ৫/৬ ট্রাক শিম যার আনুমানিক পাইকারি দর প্রায় সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা, ১৫/১৬ ট্রাক ফুলকপি ও বাধাকপি যার আনুমানিক পাইকারি দর প্রায় ২ লক্ষ টাকা, ২/৩ ট্রাক কাঁচামরিচ যার আনুমানিক পাইকারি দর প্রায় ৫ লক্ষ টাকা, ৫/৬ ট্রাক শসা যার আনুমানিক পাইকারি দর প্রায় ৪ লক্ষ টাকাসহ আরো বিভিন্ন ধরণের সবজি,মসল্লাসহ প্রায় ৫ কোটি টাকার নিত্যপণ্য এই বাজার থেকে পাইকাররা ক্রয় করে ঢাকা-চট্রগ্রাম,নোয়াখালী,ফেনী,চাদঁপুর,বি-বাড়িয়া,লক্ষèীপুর ও কুমিল্লার বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজারে প্রেরণ করে।

বাজার ঘুরে পাওয়া তথ্যে আরো জানা যায়,এখানকার প্রতিটি সবজির মূল্য জেলার বিভিন্ন বাজারের তুলনায় অনেক কম। তাই এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই বাজারে পটল,করল্লা,আলু,কচুর ছড়া, শিম,টমেটো,শিম,পাতা কপি,ফুল কপি, মুলা,লেকু,কাচাঁমরিচ, লাউ,পেপে,চালকুমড়া, ধনিয়াপাতা,শসা,জলপাই,লালশাক,পালং শাক ইত্যাদি শীতকালীন সবজি প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায়। এই বাজারে নিজের ক্ষেতের সবজি বিক্রয় করতে আসা কৃষকরা জানান, আমরা বর্তমান বাজারদরে সবজি বিক্রি করে ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছি। বতর্মানে সব সবজির দাম অনেক কমে গেছে। পারিশ্রমিক ছাড়া সবজি চাষ করে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে বর্তমান বাজারে কমমূল্যে সবজি বিক্রি করে আমরা সিংহভাগ লোকসানের সম্মুখীন হয়েছি। সবজি পচনশীল তাই বাধ্য হয়ে কমমূল্যে সবজি বিক্রি করে ফেলতে হচ্ছে। আলুর পাইকারী ব্যবসায়ীরা জানান, আমরা কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি আলু ৫ টাকা দরে কিনে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে ৬/৭ দরে বিক্রয় করছি। তারা আরো জানান, আলু মূলত আসে জয়পুরহাট ও মুন্সীগঞ্জ থেকে। আলু চাষী করিম জানান, এবার আলু চাষ করে লাভ করতে পারিনি। বর্তমানে বাজার দর অনেক কম,বিপরীতে ফলন হয়েছে অনেক বেশি। প্রতি মণে ২০০ টাকা করে লোকসান হচ্ছে। এক মাস পূর্বে আলু বিক্রি করে বেশ লাভ করেছিলাম, কিন্তু এখন মারাতœক লোকসানে আছি। পটলের পাইকারী ব্যবসায়ীরা জানান, পটল আসে রংপুর ও বগুড়া থেকে। আমরা কৃষকদের কাছ থেকে কেজি ১৬ টাকা দরে কিনে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে ১৯ টাকা দরে বিক্রয় করছি। রংপুরের পটল চাষী নাজমুল জনান, গত ২-৩ মাস ধরে পটল চাষে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। কচুর ছরা আসে চট্রগ্রাম থেকে। পাইকারী ব্যবসায়ী ইসমাইল জানান, কৃষকদের কাছ থেকে ১৪ টাকা দরে কিনে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে ১৬ টাকা দরে বিক্রয় করছি। টমেটো ব্যবসায়ী মাধাইয়া এলাকার আকমত আলী বলেন, টমেটো আসে মূলত ভারত থেকে। তবে এবার নাটোর ও রাজশাহী থেকে প্রচুর টমেটো এসেছে। এবার টমেটোর বাম্পার ফলন হওয়ায় বাজার দর অনেক কমে যাওয়ায় আমরা লোকসানের সম্মুখীন হয়েছি। গত ৫ দিন আগে আমি নাটোর থেকে প্রতিমণ ৫০০ টাকা দরে ৩০০ মণ টমেটো এনেছি। এখন তা লোকসানে বিক্রি করছি। আমরা পাইকারদের কাছে ১০ টাকা দরে টমেটো বিক্রি করছি। এখন আমার প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা লোকসান হয়েছে। দুই মাস আগে টমেটো বিক্রি করে আমি আড়াই লক্ষ টাকা আয় করেছিলাম। নাসির নামের রাজশাহীর এক টমেটো চাষী জানান, আমি ২ ট্রাকে করে সাড়ে ৬ শ মণ টমেটো এনেছি এই বাজারে । পাইকারদের কাছে কেজি ১০ টাকা করে বিক্রি করছি। এবার মারাতœক আর্থিক লোকসান হয়েছে। ৬ লক্ষ টাকা লোকসান হয়েছে। দুই মাস আগে ৪ লক্ষ টাকা আয় করেছিলাম। নিমসার বাজারে আসা ১৪/১৫ জন টমেটো চাষী ও ব্যবসায়ী প্রায় ৮০/৯০ লক্ষ টাকার মতো লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে বলে তারা জানান। নিমসারের লম্বা বেগুন ব্যবসায়ী নজরুল জানান, আমরা ৪ ট্রাক বেগুন এনেছি জামালপুর ও শেরপুর থেকে। প্রতি ট্রাকে ২০০/২৫০ মণ বেগুন আসে। অনেক সময় ৮ ট্রাকও আসে। আমরা কৃষকদের কাছ থেকে ৫/৬ টাকা দরে কিনে অন্য পাইকারদের কাছে ৭/৮ দরে বিক্রয় করি। দুই মাস আগের তুলনায় বেগুনের দাম অনেক কমে গেছে। নিমসার এলাকার মিতলমা, পাচকিততা, বারাইল,হামিদপুর,লোহারচরসহ ৭/৮ টি গ্রামের প্রায় ২ শতাধিক ধনিয়াপাতার চাষী প্রতিনিয়ত ধনিয়াপাতা নিয়ে এই বাজারে আসে। ধনিয়াপাতা চাষী আইয়ূব জানান, আমি ৬ শতক জমিতে ২ হাজার টাকা ব্যয়ে ধনিয়াপাতা পাতা চাষ করেছি। বাজার দাম কমে যাওয়ায় প্রতি পাল্লা (৫ কেজিতে ১ পাল্লা) এখন ২০/৩০ টাকা দরে বিক্রি করছি। ফলে ১৭০০ টাকা লোকসান হবে আমার । দুই মাস আগে ১৮০০ টাকা লাভ করেছিলাম। বি-পাড়া উপজেলার রশিদ নামের আরেক ব্যবসায়ী জানান,আমি ৯ শতক জমিতে ধনিয়াপাতা পাতা চাষ করেছি। আমার এবার ২ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। ফুলকপি ব্যবসায়ী মনির জানান,ফুলকপি ও বাঁধাকপি আসে চৌয়ারার ঢুলীপাড়া থেকে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি পিছ ফুলকপি ৪/৫ টাকা ও বাঁধাকপি ৬ টাকা দরে কিনে অন্য পাইকারদের কাছে ৭/৮ দরে বিক্রয় করে। শিম ব্যবসায়ী মাহমুদ জানান, শিম আসে যশোর থেকে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি শিম ১৪ টাকা দরে কিনে অন্য পাইকারদের কাছে ১৮ টাকা দরে বিক্রয় করে। কাচাঁমরিচ আসে যশোর থেকে । কৃষকরা জানান, তারা পাইকারদের কাছে প্রতি কেজি মরিচ ১৪ টাকা দরে বিক্রি করে। এখন মরিচ বিক্রি করে তেমন লাভ হচ্ছে না। করল্লা আসে সীতাকুন্ড থেকে। পাইকারী ব্যবসায়ীরা জানান, তারা কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি করল্লা ৩৫ টাকা দরে কিনে ৫০ টাকা দরে বাজারে বিক্রি করে।

নিমসার বাজারে কৃষকরা সবজি বিক্রি করে বর্তমানে লাভের মুখ না দেখলেও পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা অল্প দামে সবজি কিনে জেলার বিভিন্ন বাজারে ভালো দামেই বিক্রি করছে। একদিকে কৃষকদের হতাশা আরেকদিকে পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অধিক লাভ- এই দুই চিত্রই ফুটে উঠেছে অর্ধশতবছরের পুরনো এই বাজারে। তবে কৃষকরা আশাহত হলেও আশায় বুক বাধছেন আবার সবজি চাষ করে মুনাফা লাভের আশায়।




Check Also

দেবিদ্বারের সাবেক চেয়ারম্যান করোনা আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যু: কঠোর নিরাপত্তায় গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ভাণী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান (৫৫) করোনায় আক্রান্ত ...

Leave a Reply