ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাম্যই বড় ধর্ম

এম আহসান হাবীব :

ইহকালীন জীবনে মানবজাতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য বিভিন্ন ধর্মে দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ধর্ম মানুষকে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা, জীবনের নিরাপত্তা, সম্মান ও মর্যাদা সহকারে সমাজের সঙ্গে মিলেমিশে শান্তি বিনির্মাণের সুবর্ণ সুযোগ দিয়েছে। জন্মগতভাবে বিশ্বের সব মানুষ রক্তসম্পর্কীয় গভীর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। কারণ আমরা সবাই মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) ও আদি মাতা বিবি হাওয়া (আঃ)’র সন্তান। এ কারণেই বিশ্বের সব মানুষ পরষ্পর ভাই ভাই। একই পিতা-মাতা থেকে জন্মগ্রহণ করে বংশ পরম্পরায় মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। অনন্তর পৃথিবীতে মানবসন্তানের বংশবৃদ্ধির ফলে তারা বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত হয়ে যায়। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে মহান আল¬াহ তায়ালা বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। আর আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো।” তাই ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের বন্ধনই মানুষের মূল বন্ধন।
ধর্মের সব বিধিবিধান ও আচার-অনুষ্ঠান শান্তি বিনির্মণ, মানবকল্যাণ এবং মানুষকে সত্য-সুন্দর ও সুখ-শান্তির সন্ধান প্রদানে নিয়োজিত। পৃথিবীর সব ক’টি প্রধান ধর্মের প্রচারক মহামানবের সদা মানবকল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ), যীশু খ্রিস্ট, শ্রী কৃষ্ণ, বাবা লোকনাথ, গৌতম বুদ্ধ, স্বামী বিবেকানন্দ সকল মহামানবের জীবনে সাম্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠ^ার অসংখ্য উদাহরণ আমাদের জ্ঞাত।
ধর্মগ্রন্থগুলো হল ধর্মীয় মূল্যবোধ তথা দিক নির্দেশনার লিখিত বা সংকলিত রূপ। পবিত্র কোরআনের একাধিক জায়গায় বলা হয়েছে, “আমি প্রত্যেক গোত্রের কাছে সময়ে সময়ে পথ প্রদর্শকরূপে আমার মনোনীত ব্যাক্তিকে পাঠিয়েছি। আর তাদের সহায়তা হিসেবে পাঠিয়েছি ঐশী বাণী।” সকল ঐশীবাণীই পাঠানো হয়েছে সংশি¬ষ্ট জাতির স্বভাষায় ও সমসাময়িক সমস্যা সমাধানের নিমিত্তে। শুধুমাত্র তা পাঠ করে করে ধর্ম প্রচার কিংবা পূণ্য অর্জন কখনোই এসবের মূল লক্ষ্য ছিল না। বরং মানবতার কল্যাণ, সমপ্রীতি স্থাপন ও সাম্য প্রতিষ্ঠায়ই সকল ধর্মগ্রন্থে জোর দেওয়া হয়েছে।
ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি স্বীকৃত ও বিরাজমান থাকায় বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা পারষ্পরিক ভাব বিনিময়, আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি প্রভৃতির চর্চা করতে পারে। এতে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানের মাঝে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য, সংহতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি এতে করে আন্তঃধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময়েরও সুযোগ বিস্তৃত হয়। একজন ধর্মভীরু লোক যখন অপর ধর্মের মর্মবাণী উপলব্ধি করতে পারবেন, তখনই তাদের মধ্যে উদার দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নেবে। এমনিভাবে ধর্মের মূল সুর শান্তি, ঐক্য, সম্প্রীতি, সহনশীলতা, মানবতাবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, ন্যায়-নীতি, ক্ষমা, উদারতা, মহানুভবতা প্রভৃতি গুণাবলী বিশ্বব্যাপী প্রতিটি সমাজে ছড়িয়ে পড়বে এবং সুপ্রতিষ্ঠা লাভ করবে।
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে সনাতনী-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মেলবন্ধন সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তবে স্বার্থলোভী কিছু ধর্মান্ধ মাঝে মাঝে এতে ব্যাত্যয় ঘটানোর অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও লিপ্ত থাকবে বলে বোধ হয়। কিন্তু সচেতন নাগরিকমাত্রই আমাদের সকলকে এর বিরূদ্ধে সদা সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে।
মানুষের মধ্যে যেসব গুণবালী থাকলে তাকে মানুষ বলা যায় এবং যা না থাকলে মানুষে ও পশুতে কোন পার্থক্য করা যায় না, সে সমস্ত গুণই মানুষের ধর্ম। মানুষের শান্তি, কল্যাণ ও পারষ্পরিক সুসম্পর্ক রক্ষার জন্যই পৃথিবীর তাবৎ আইন, নিয়ম-কানুন ও ধর্মের আবির্ভাব। তাই ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদের দেয়াল তৈরিই সবচেয়ে জঘণ্য অধর্ম।
প্রকৃত ধর্ম মাত্রেরই মূল লক্ষ্য মানুষকে সত্য, সুন্দর, কল্যাণ ও ন্যায়নীতির পথ প্রদর্শন। যারা ধর্মের খোলসে অসত্য, অসুন্দর, অশান্তি, অকল্যাণ ও অন্যায়ের বিষবাষ্প ছড়ায় তারা কখনোই ধার্মিক নয়, বকধার্মিক। ধর্ম প্রতিষ্ঠাকারী নয়, ধর্ম ব্যবসায়ী।
পৃথিবীতে আগে মানুষ এসেছে, তারপর যুগে যুগে উৎসারিত মানবজাতির নানা পাপ-পঙ্কিলতা, অন্যায়-অশ¬ীলতা, অনাচার ও সমস্যা দূর করতেই বিভিন্ন ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে। তাই আবারো বলি মানতার কল্যাণ, পারষ্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সাম্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতিই সবচেয়ে সেরা ধর্ম।
সাম্যের কবি নজরুলের ভাষায় বলতে চাই,
“গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান।”

– এম আহসান হাবীব
সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়





Check Also

দেবিদ্বারে মাদ্রাসার ফলাললে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে : পিছিয়ে কলেজ

দেবিদ্বার প্রতিনিধি :– কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলায় এবারের এইচ এস সি ও আলিম পরীক্ষায় মোট জিপিএ-৫ ...

Leave a Reply