সরাইলে প্রবীণ নারীরা ভাল নেই : বয়স্কভাতা নয় যেন তদবির ভাতা

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল :

দুস্থ অসহায় রাবেয়া খাতুন
রোগে ভারাকান্ত সত্তরোর্ধ্ব ফটিক চাঁন। চোখে ঝাপসা দেখেন। হাত-পা থরথর করে কাঁপে। দুই পুত্র সন্তানের মা ভাগ্যের অদৃষ্টিতে বর্তমানে অন্যের বাড়িতে আশ্রিতা। লালজান বেগম বয়স ৬৩। রোগা-শোকা দেহ। বেদনার ভারে নুয়ে পড়েছে তার মাথা। একমাত্র ছেলে সাজুল হক দিনমজুর। বিয়ে করেছে দু’টি। বয়স হয়ে গেছে, ঝামেলা মনে করে ছেলে রান্না ঘরের এক কোণে মাকে ঠাঁই করে দিল। পেট পুরে খেতে পায় না। তবুও মা লালজান খুশি। তিনি বলেন, ‘বড় আশা বুকে নিয়ে ছেলেকে লালন-পালন করেছিলাম। আর যাই হোক ছেলেতো মাকে রাস্তায় ফেলে দেইনি।’ উপজেলার হাট-বাজারে সারাদিন হাঁটেন লালজান। বেঁচে থাকার জন্যে ভিক্ষা করছেন। জীবন সংগ্রামের যুদ্ধে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ লালজানকে ছুটতে হয় পথে-প্রান্তরে। গেলভানু বেগম বয়স ৬৫ বছর। ছেলেরা বিয়ের পর আলাদা সংসার পেতেছে। ভূমিহীন গেলভানু মৃত স্বামীর দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করছেন। তিনি বলেন, ‘আমার কোন কষ্ট নেই। শুধু ভাবি , আমাকে যারা তাচ্ছিল্য করেছে তারাও একদিন বৃদ্ধ হবে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলা সদরের আশপাশ এলাকার বাসিন্দা ফটিক চাঁন, লালজান, গেলভানু, রাবেয়া খাতুনের মতো অনেক বৃদ্ধ নারীই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের জীবনপঞ্জিই বলে দেয় কেমন আছেন আমাদের প্রবীণ নারীরা। উচ্চ ও মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারে প্রবীণাদের খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছেলে বলে, মায়ের বয়স হয়ে গেছে। সেবা-যতেœর জন্য একটা বুয়া রেখে দেই। বউমা বলে, ঘরে ঝামেলা রেখে লাভ কি, বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসলেই হয়। এরকম দীর্ঘশ্বাসের কথা শোনা গেছে অনেক প্রবীণ নারীদের মুখে। আর নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রবীণ নারীদের খবরতো কেউ রাখেই না। শহর কিংবা গ্রামের পথে-প্রান্তরে, অলিতে-গলিতে দেখা মেলে এসব অসহায় নারীদের। আদরের ছেলে বিয়ে করে ঘর-সংসার পেতেছে শ্বশুর বাড়িতে। বৃদ্ধা মাতা রাবেয়া খাতুনের খবর রাখার সময় নেই তার। রাবেয়া খাতুন এখন সরাইলের কালীকচ্ছ বাজারে ভিক্ষা করেন। অনাহার-অর্ধাহার তার নিত্যসঙ্গী। অন্যের বাড়িতে তার ঠাঁই। একই বাজারে ভবঘুরে প্রায় ৮৫ বছরের এক প্রবীণা। রাজপথ তার ঠাঁই। মাঝে মধ্যে কালীকচ্ছ মনিরবাগ হিন্দুসম্প্রদায়ের শশ্মানঘাট ও বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় সড়কের পাশে রাত কাটান। কথা হয় তার সাথে, মনে প্রচন্ড ক্ষোভ নাম-ঠিকানা বলতে নারাজ। তবে তিনি এটুকু বলেন, ৫/৬ মাস আগে বউমার কথামতো ছেলে টেম্পু করে এনে এই স্থানে ফেলে যায়। তার অপরাধ বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। ছেলের সংসারে আমি একজন অচল মানুষ। এ কথা বলে তিনি হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, অসহায় এসব বৃদ্ধ নারীদের অনেকেরই স্বামী, সন্তান নেই। আবার কারো কারো স্বামী, সন্তান আছে কিন্তু ইচ্ছা করে কেউ মাকে, অনেক পুরুষেরা তার স্ত্রীকে ভরনপোষণ না দিয়ে রাস্তায় ঠেলে দিচ্ছেন। যে বয়সে ওই মহিলারা আরাম-আয়েশ করার কথা, সেই বয়সে তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন। শখের বশে নয়। শুধু বাঁচার তাগিদে। প্রচন্ড শীতের মধ্যে যখন কোন সত্তোরোর্ধ্ব বয়সে বৃদ্ধ নারীকে পাতলা ছেঁড়া কাপড় পড়ে থরথর করে কাঁপতে দেখা যায়। তখন ধিক্কার ছাড়া কিছুই ভাগ্যে জুটেনা ওই নারীর স্বামী ও সন্তানদের। এরা পায় না বয়স্কভাতা, উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত ভালবাসা থেকে এসব প্রবীণারা বঞ্চনার শিকার। উপজেলার অনেক এলাকায় প্রান্তিক প্রবীণ নারীদের অবস্থা নাজুক। তারা বঞ্চিত তিনবেলা খাবার থেকে, বাসস্থান থেকে, বস্ত্র থেকে। আমাদের দেশে নারীদের প্রধান আবাসস্থল পরিবার। পরিবেশ পরিস্থিতি ভেঙ্গে দিচ্ছে যৌথ পরিবার। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠছে একক পরিবার। এ প্রক্রিয়া প্রবীণ নারীদের এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সুশীল সমাজের অভিমত। তাই নিরাপদ আশ্রয় আজ আর নিরাপদ ও ভালবাসাময় নেই। তাছাড়া অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ছেলে-মেয়ের সংসারে থাকার বিষয়টিকে প্রকট করে তুলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রবীণ নারীদের প্রধান সমস্যা উপযুক্ত পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব, একাকিত্ব, বিনোদনের অভাব, মানসিক সমস্যা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, পরিবারে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অবহেলা ইত্যাদি। তবে কিছু পরিবারে প্রবীণ নারীদের জীবনযাত্রা অন্য রকম দেখা গেছে। স্বামী, সন্তান ও বউমা নিয়ে সুখে শান্তিতে রয়েছে। নাতি-নাতনী নিয়ে প্রবীণারা যেন সুখের স্বর্গে বসবাস করছেন। নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রবীণ নারীদের অবস্থা করুণ অমানবিক। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা, বয়স্ক ভাতা সবকিছু হতে তারা বঞ্চিত। তাদের প্রধান সমস্যা হল জীবন যাপনের সমস্যা। এসব নারী স্বামী ও সন্তানদের সংসারে নির্ভরশীল। সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সরকার সমাজের অবহেলিত বৃদ্ধ নারী ও পুরুষদের জন্য রাজধানী ঢাকার অদূরে গাজীপুরে স্থাপন করেছেন বৃদ্ধাশ্রম। চাহিদার তুলনায় ওই বৃদ্ধাশ্রমে আসন ব্যবস্থা অতিনগণ্য। তারপরও ক্ষমতাশীল, প্রভাবশালীদের তদবির ছাড়া সেখানে আশ্রয় নেয়া দূরহ ব্যাপার। সরকার বয়স্ক নারী-পুরুষদের একটু সুখ স্বাচ্ছন্দের কথা বিবেচনায় এনে চালু করেছে বয়স্কভাতা কার্যক্রম। সেখানে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে ভাতাভোগীর বয়স ৬৫ বছর। অথচ এক জরিপে দেখা গেছে, আমাদের দেশে জনসাধারণের গড় আয়ু ৫৫ থেকে ৬০ বছর। ফলে বৃদ্ধরা চরম কষ্ট করলেও নীতিমালার কারণে বয়স্কভাতার কৌটা অনেক সময় পরিপূর্ণ হয় না। যেগুলো হয়, সেখানেও আবার মরার উপর খাঁরার ঘাঁ। স্থানীয় সরকারের উপর বয়স্কভাতা বিতরণের সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক তদবির ও নিজেদের অর্থনৈতিক ফায়দা পরিপূর্ণ না হলে বয়স্কভাতা তালিকায় কাউকে অর্ন্তভূক্ত করা হয় না। এ প্রকল্পে সচ্ছতা আনতে হলে ইউপি সদস্য-সদস্যাদের আরও আন্তরিক ও স্বচ্ছভূমিকা পালন করতে হবে বলে সচেতন মহলের অভিমত। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, এই উপজেলায় মোট ৫ হাজার ২শ’ ২৮ জন দুস্থ প্রবীণ নারী-পুরুষ বয়স্ক ভাতার সুবিধা ভোগ করছেন। এখানে স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে ভাতা ভোগী নির্বাচন করা হয়েছে।





Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply