ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছাত্রলীগ নেতাদের মৃত্যুমিছিলে আরেকটি নাম যুক্ত হলো ॥ পালিত হচ্ছে শোক

লিটন চৌধুরী,ব্রাহ্মণবাড়িয়া (কুমিল্লাওয়েব ডট কম, ৬ ফেব্রুয়ারী) :
টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফেরার পথে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত ১০ ছাত্রনেতাসহ চালকের সাথে মৃত্যুর মিছিলে আরেকটি নাম যুক্ত হয়েছে। তিনদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মৃত্যুবরণ করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সভাপতি মোঃ আলমগীর মিয়া। গতকাল রবিবার বিকেল ৪টায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সে শহরের মধ্য মেড্ডা এলাকার প্রয়াত পুতুল নাচের শিল্পি রাজা হোসেনের ছেলে। রবিবার বিকেলে এ খবর পৌঁছলে মেড্ডা এলাকা সহ শহরে আবারও শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের লোকজনের আর্তচিৎকারে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পিতাহীন ছোট ২ ভাই ও ১ বোনসহ মায়ের সংসারে আলমগীরই ছিল একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ছাত্র রাজনীতি করাকালে পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক দায়িত্ব পালনের জন্য কর্ম নিয়ে এক সময় দুবাই পাড়ি দেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে এসেছিল আলমগীর। দিনরাত পরিশ্রম করে পছন্দের প্রার্থী উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীকে নির্বাচিতও করেছিল। কিন্তু নেতার সাথে দীর্ঘদিন কাজ করতে আর পারল না। একমাত্র রোজগারী ছেলেকে হারিয়ে দু’ চোখে অন্ধকার দেখছেন তার মা। ছোট ২ ভাইকে মানুষ করা, ছোট বোনটিকে বিয়ে দেয়াসহ কে নেবে মায়ের দায়িত্ব, এই প্রশ্ন মাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।

ছাত্রলীগ নেতা মুর্শেদের দাফন সম্পন্ন :

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত ১১ জনের মধ্যে জানাজা ও দাফনে বাকী থাকা ছাত্রলীগ নেতা মুর্শেদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল রবিবার বিকেলে শহরের কাউতলী এলাকায় ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে তার লাশ কাউতলী কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় ইমামতি করেন কাউতলী জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল হাফিজ জিহাদী। এসময় অন্যান্যের মাঝে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, জেলা প্রশাসক মোঃ আবদুল মান্নান, পৌর মেয়র হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি, উপজেলা চেয়ারম্যান বশিরউল্লাহ জুরু, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এডঃ সৈয়দ এমদাদুল বারী, সহ সভাপতি মোঃ হেলাল উদ্দিন, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মেজর (অবঃ) জহিরুল হক খান বীর প্রতীক, যুগ্ম সম্পাদক তাজ মোঃ ইয়াছিন, সাংগঠনিক সম্পাদক হেলাল উদ্দিন, মাহবুবুল বারী চৌধুরী মন্টু, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবকলীগ সহ সভাপতি মঈনউদ্দিন মইন। জানাজাপূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সংসদ সদস্য মোকতাদির চৌধুরী কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার সাথে জানাজায় উপস্থিত সকলই কেঁদে ওঠে। গত শনিবার তার সাথে মৃত্যুবরণকারী অন্যদের দাফন হলেও মুর্শেদ আলমের বড় ভাই ব্যারিস্টার রায়হান আলম, ব্যারিস্টার খুর্শেদ আলম লন্ডন থেকে এবং ব্যবসায়ী সাইফুল আলম আমেরিকা থেকে আসার কারণে তার লাশ বিশেষ ব্যবস্থায় ঢাকায় রাখা হয়। গতকাল রবিবার বিকেল ৪টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়ে আসা হয়।

লন্ডনে উচ্চ শিক্ষা নেয়া হলো না মুর্শেদের :

শহরের কাউতলী এলাকার প্রয়াত আবুল কাশেমের ৫ ছেলের মধ্যে সবার ছোট মুর্শেদ। এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে বি.কম পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল। এলাকার বড় ভাই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী আলম শান্ত’র উৎসাহে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয় হয়। মুর্শেদের বড় ভাই ও মোটর সাইকেল ব্যবসায়ী সাফায়েত আলম জানায়, বি.কম পরীক্ষা শেষে তার উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডন যাওয়ার কথা ছিল। তার বড় দুই ভাই রায়হান আলম ও খুর্শেদ আলম লন্ডনে পড়াশুনা করে ব্যারিস্টার হয়েছে। তারও ইচ্ছে ছিল উচ্চ শিক্ষা নেয়ার। কিন্তু মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় তার সাথে তার ইচ্ছারও মৃত্যু হলো। দীর্ঘদিন যাবৎ পিতাহীন ছোট ছেলে মুর্শেদকে মা ও বাবার দু’টো আদর দিয়েই বুকে আগলে রাখছিলেন মা রেনুয়ারা বেগম। ছোট ছেলের মৃত্যুতে তিনি গত ২ দিন যাবত বাকহীন। প্রবাস ফেরত ৩ ভাই ও বাড়িতে থাকা ২ ভাইয়ের কান্নায় এলাকার কেউ অশ্রু ধরে রাখতে পারেনি।

দূর্ঘটনার স্মৃতি চোখ থেকে সরছে না :

গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বিকেলে ভাঙ্গা উপজেলায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনার দৃশ্যগুলো এখনো চোখ থেকে সরছে না সংসদ সদস্য র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবকলীগ সহ সভাপতি মঈনউদ্দিন মইনের। ঘটনার পর থেকে তারা দুজন এখনো পর্যন্ত স্বাভাবিক হতে পারেনি। সময়ের প্রয়োজনে নেতাকর্মীদের জানাজায় অংশ নেয়াসহ তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের শান্ত্বনা দিলেও তাদের কান্নাই থামেনি। কারো সাথে কথা বলতে গেলে তারা কেঁদে ফেলছেন। মোকতাদির চৌধুরী তার কর্মীদের হারিয়ে তার সন্তানরা নেই বলেই বিলাপ করছেন। মঈনউদ্দিন মইন সুযোগ পেলেই নেতাকর্মীদের দূর্ঘটনায় কবলিত হওয়ার পর দূরাবস্থার কথা বর্ণনা করছেন। তার চোখ থেকে কোনো মতেই সরানো যাচ্ছে না নেতাকর্মীদের বিকৃত লাশ আর রক্তাক্ত রাজপথের ছবি। প্রিয় নেতাকর্মীদের লাশ যারা গাড়ি থেকে বের করা সহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আনা পর্যন্ত পাশে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা এমদাদুল হক চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আব্দুল খালেক বাবুল, ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান বুলেট, যুবলীগ নেতা সৈয়দ তৌফিক, তানজীল বারী, মশিউর রহমান লিটন, মিজান আনসারী, সালাউদ্দিন সরকার, রাকীব আহমেদ সোহেল, সামসুল হক মিল্লাত, ছাত্রলীগ নেতা হাসান সারওয়ার, আকবর হোসেন লিটন, মাসুকুর রহমান হৃদয় কেউই স্বস্তিতে নেই। অনেকেই দূর্ঘটনার স্মৃতিকাতর হয়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের স্মরণে পালিত হচ্ছে শোক কর্মসূচী :

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় ছাত্রলীগের ১১ নেতাকর্মীসহ চালক নিহত হওয়ার পর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে। গতকাল রবিবারও জেলা আওয়ামী লীগের তিনদিনের শোক কর্মসূচীর অংশ হিসেবে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাটে কালো পতাকা উত্তোলন এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা কালোব্যাজ ধারণ করেন। জেলা জাতীয়পার্টি আওয়ামী লীগের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে ৩ দিনের শোক কর্মসূচী পালন করছে। বাঞ্ছারামপুর আওয়ামী লীগ দিনব্যাপী শোক কর্মসূচী পালন করে। নবীনগরে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের স্মরণে শোক র‍্যালী উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। র‍্যালী শেষে শোকসভায় বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ নেতা জসিম উদ্দিন, নিয়াজুল করীম, ছাত্রলীগ নেতা খায়ের বারী ও আশরাফুল ইসলাম রিপন। ছাত্রলীগ নেতাদের স্মরণে গতকাল রবিবার বিকেলে ফুলবাড়িয়া জামে মসজিদে ৩ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছাত্রনেতাদের পরিবার ও মহল্লাবাসীর উদ্যোগেও মিলাদ মাহফিল, শোকসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইসলামী ফাউন্ডেশন ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়ের উদ্যোগে ছাত্রলীগ নেতাদের স্মরণে মিলাদ ও কুরআনখানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া আগামীকাল মঙ্গলবার বিকেলে স্থানীয় ইন্ডাষ্ট্রিয়াল স্কুল চত্বরে জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে নেতাকর্মীদের স্মরণে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply