প্রধান শিক্ষক যখন কেরানি !

স্টাফ রিপোর্টার, মুরাদনগর :
তিনি অনেক লাজুক প্রকৃতির। বেশি মানুষ পছন্দ করেন না। নিজ কক্ষে প্রবেশ করেন নীরবে, কাজও করেন নীরবে। উটকো ঝামেলা এড়াতেই এ অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। অসংখ্য অনিয়ম- দুর্নিতির অভিযোগে অভিযুক্ত তিনি চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী শাহজালালকে দিয়ে শিক্ষক- কর্মচারী সমিতির ফান্ড থেকে ৫ হাজার টাকা ঋন তুলে পরিশোধ না করেই পুনরায় তাকে দিয়ে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ তুলার জন্য পিরাপিরি করে। এতে ওই কর্মচারী ঋণ তুলে দিতে অনিহা প্রকাশ করায় গত ২০১০ সালের এপ্রিল মাস থেকে ৭ মাসের বেসরকারী বেতনের অংশের টাকা একাই তুলে নিয়ে ক্ষান্ত হননি। অবৈধভাবে ওই কর্মচারীকে তার দ্বায়িত্ব থেকে সরিয়ে রেখেছেন। তিনি মুরাদনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহি কাজিয়াতল রহিম -রহমান মোল্লা উচ্চ বিদ্যালয়ের আলোচিত প্রধান শিক্ষক ( ভারপ্রাপ্ত) জাকারিয়া। প্রধান শিক্ষক হলে কী হবে? অফিসের কেরানির কাজও তিনি করেন। যত জরুরী ফাইল, বিশেষ করে দৈনন্দিন হিসাব লেজার সহ যেসব ফাইল কেরানি সাহেব ব্যবহার করার কথা তিনি এসবে নিজে আয় -ব্যয়ের হিসেব লিখেন। এবং বিকেলে বাসায় যাওয়ার সময় এগুলো সঙ্গে করে নিয়ে যান! কারণ তিনি কাউকেই বিশ্বাস করেন না। বিদ্যালয়ের কর্মচারী শাহজালাল মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করায় সরেজমিন অনুসন্ধানে এ প্রধান শিক্ষক সম্পর্কে এসব তথ্যই জানা গেছে, মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমা বেগম তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান, তিনি এই প্রতিবেদকের সামনেই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষ অফিসার শামিম আহমদকে বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখা সহ একটি সচ্ছ তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক হলেও তিনি অবশ্যই কেরানীর কাজ করার পেছনে অনেক যুক্তি ও রহস্য রয়েছে। কারণ নির্ধারিত কেরানী যে কোন সময় তার অনিয়ম ও দুর্নিতির তথ্য ফাঁস করে দিতে পারে। তিনি নিবন্ধন বিহিন ২০০৫সালের জুলাই মাসে এ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তখন ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) পদে দায়িত্ব পালন করেন সহকারী শিক্ষক জামাল উদ্দিন খা। পরে ২০০৫ সালের ২৪ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নিবন্ধন বিহীন কোন শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার অযোগ্য ঘোষনা হওয়ায় ওই পদে সহকারী শিক্ষক কবির হোসেন দায়িত্ব পালন করে। সেও অসুস্থতা ও অনাগ্রহতার কারণে মাত্র ১ মাস দায়িত্ব পালন করার পর আরেক সহকারী শিক্ষক সুনিল দাসকে ওই পদে দায়িত্ব পালন করতে হয়। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ি নিবন্ধন বিহীন শিক্ষক নিয়োগ অযোগ্য ঘেষিত হওয়ায় ও সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক অন্যত্র চলে যাওয়ার সুবাধে শিক্ষক জাকারিয়া সবার চোখকে ফাকি দিয়ে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাথে গোপনে আতাত করে পেছনের তারিখে ২০০৪ সালের মে মাসে অবৈধভাবে ওই পদে নিয়োগ পান। অথচ ওই সময়ে আমান উল্লাহ নামে ১ ব্যক্তি সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, সে সময় থেকে তিনি হয়ে যান সহকারী প্রধান শিক্ষক, প্রধাণ শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় এ যাবৎ কাল তিনি কাজিয়াতল রহিম-রহমান মোল্লা উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি যে আসলে বিদ্যালয়ের আয় থেকে নিজের আখের গুছিয়েছেন, এমন অভিযোগ খোদ মেনেজিং কমিটির সদস্য, শিক্ষক- কর্মচারী সহ স্থানিয় সবার। আলোচিত শিক্ষক জাকারিয়ার ব্যপারে উপজেলার পুটিয়াজুঁড়ী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সহিদুল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, ২০১০ সালে প্রাথমিক সমাপনি পরীক্ষায় আমার স্কুল হতে অকৃতকার্য ছাত্র ছাত্রীদেরকে ও অবৈধভাবে ওই শ্ক্ষিক তার স্কুলে ৬ষ্ঠ শেণীতে ভর্তি করেছে। তার মধ্যে সব্দল কান্দা গ্রামের মবিনের মেয়ে সারমিন আক্তার, পুটিয়াজুুড়ি গ্রামের বাসু মিয়ার মেয়ে হেপি আক্তার উল্লেখযোগ্য। তাছারা বিদ্যালয়টির বেপক আয় থাকা সত্বেও তিনি গত ৭ মাস ধরে স্কুলের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী শাহজালালের বেতন দিচ্ছেন না। এমনকি সরকারী অংশের বেতন তুলতে শিক্ষক কর্মচারীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, স্কুলে শিক্ষার্থির সংখ্যা ৫ শত প্রত্যেকের মাসিক বেতন গড়ে ৫০ টাকা। সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সর্ব নি¤œ ৫৫০ টাকা থেকে ৫৯০ টাকা করে বার্ষিক চাদা নেওয়া হয়। এছাড়াও উন্নয়ন ফি, মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের রেজিষ্ট্রেশনের সময় বাড়তি ফি, প্রবেশপত্র নেওয়া এবং পাশ করার পর প্রশংসা পত্র নেওয়ার সময় অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বার্ষিক আনুমানিক প্রায় ৮ লাখ টাকা আয় হয় বিদ্যালয়টির। এর সঙ্গে সমাজের দানশীল ব্যক্তিদের নানা রকম অনুদান ও রয়েছে। স্কুলের একাডেমিক দিকে কোন নজর নেই। চলতি বছরেও রুটিন করেছেন প্রায় ৩ মাস পর। তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধাণশিক্ষক জাকারিয়াকে এসব বিষয়ে কেও প্রশ্ন করার নেই। বিদ্যালয়ের প্রায় সব শিক্ষকই এক বাক্যে প্রধান শিক্ষকের একনায়ক শুলভ আচরণ ও দুর্নিতিকে দায়ি করেন। কেরানিকে দিয়েও কাজ করান না আসল খবর ফাস হয়ে যাওয়ার ভয়ে। নামে বেনামে তিনি অনেক সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন অনেকে। চাকুরী হারানোর ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক শিক্ষিকা বলেন, আমরা কৃত দাসের ন্যয় খাটছি এখানে। কেউ প্রতিবাদ করলেই এক হাত দেখে নেওয়ার হুমকি দেন তিনি। বিদ্যালয়ের পড়াশুনা উন্নয়ন বা গুনগত মান বারানোর দিকে তার কোন মনযোগ নেই। তিনি চুপচাপ আসেন আর নিজের পকেট ভারি করে চলে যাচ্ছেন। তিনি মনে করেন, দৈনন্দিন হিসাব ও নিয়োগ সংক্রান্ত ফাইল পত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেই তার অনিয়ম ও অবৈধ নিয়োগ লাভের আসল চিত্র বের হয়ে আসবে। তার নিয়োগ ব্যপারে এ স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন আমি সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলাম আমানউল্লাহকে। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি চালাকি ও প্রতারনা করে আমানউল্লার স্থলে পেছনের তারিখ দিয়ে জাকারিয়াকে নিয়োগ দেয়। তিনি আরও বলেন প্রশাসনিক স্বচ্ছ তদন্ত হলে জাকারিয়াকে নিয়োগ দেওয়ার ব্যপারে জাকারিয়া সহ তার সহযোগীরা অবশ্যই আইনগত ভাবে সাস্তি ভোগ করতে হবে। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির দাতা সদস্য আজগর আলী বলেন, আমরা আমাদের সাধ্য মত চেষ্টা করার পরও ওই শিক্ষকের অনিয়ম রুখতে পারিনি। তাই আমি মনে করি ওনার যাবতীয় কর্মকান্ডের তদন্ত হওয়া দরকার। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যতের স্বার্থেই তা করা দরকার। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবদুল রহমান মোল্লার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় এ ব্যপারে তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাকারিয়ার সাথে বহু চেষ্টা করলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

Check Also

দেবিদ্বারের সাবেক চেয়ারম্যান করোনা আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যু: কঠোর নিরাপত্তায় গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ভাণী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান (৫৫) করোনায় আক্রান্ত ...

Leave a Reply