অরক্ষিত লাকসাম রেলের ৪৭টি লেভেল ক্রসিং ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন

জামাল উদ্দিন স্বপন :

সাবধান এই লেভেল ক্রসিংয়ে কোন গেইটম্যান নেই। নিজ দায়িত্বে পারাপার হউন। পারাপারে দূর্ঘটনার জন্য রেল কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে। আবার কোথাও কোথাও লিখা রযেছে , ইহা একটি অবৈধ লেভেল ক্রসিং। নিজ দায়িত্বে পারাপার হবেন। লাকসাম-নোয়াখালী রেলরুটের লেভেল ক্রসিংগুলোর উভয় পাশে ছোট ছোট সাইনবোর্ডে এই কথাগুলো লিখে টাঙ্গিয়ে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। চলাচলকারী যানবাহন ও জনসাধারনের উদ্দেশ্যে সতর্কতার জন্য এই সাইন বোর্ড দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এই সর্তকতার পরও থেমে নেই দূর্ঘটনা। প্রাণহানী ঘটনাও ঘটেছে।

লাকসাম-নোয়াখালী রেল সেকশনের ৫০ কিলোমিটার রেলরুটে এমন অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ৪৭টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এই লেভেল ক্রসিংগুলো দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী পন্যবাহী ছোট বড় যানবাহন চলাচল করে থাকে। ওই সব ক্রসিং পারাপারের সময় প্রায় প্রতিনিয়তই ঘটে দূর্ঘটনা। দূঘর্টনা রোধকল্পে এবং নিরাপদ ট্রেন ও অন্যান্য যানবাহন চলাচলের জন্য ওইসব লেভেল ক্রসিংগুলোর গেইট নিমার্ণসহ গেইটম্যান নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরী। সড়ক ও রেল একই মন্ত্রনালয়ের কেবল চিঠি চালাচালি করছে। কিন্ত অত্যন্ত জরুরী ও জনগুরুত্বপূর্ন লেভেল ক্রসিংগুলোর এই সমস্যাটির সমাধান হচ্ছে না বলে রেলওয়ের একটি সূত্র জানিয়েছেন।

ওই সূত্রে আরও জানা গেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), জেলা পরিষদ, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ, রেললাইনের উপর দিয়ে যে সড়কগুলো নির্মাণ করছে তা একবারে অবৈধ।

লাকসাম রেলওয়ে জংশনের উধর্বতন উপ-সহাকারী প্রকৌশলী (পূর্ত) মো. হানিফ পাশা জানান, লাকসাম-নোয়াখালী রেলরুটে ৫০টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে।

তার মধ্যে ৯টি বৈধ্য এবং ৪১ অবৈধ লেভেল ক্রসিং। বৈধ ৯টি লেভেল ক্রসিং গুলোর মধ্যে মাত্র ৩টি লেভেল ক্রসিংয়ে গেইটম্যান রযেছে। জনবল সংকটের কারনে বৈধ ৬টি লেভেল ক্রসিংয়ে কোন গেইট স্থানপন এবং গেইটম্যান দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে ওইসমব লেভেল ক্রসিং দিয়ে সাবধানে ও নিজ দায়িত্বে পারাপার হতে সতর্ক বানী লিখে সাইনবাের্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া অবৈধ লেভেল ক্রসিং গুলোতেও অনূরুপ সাইনবোর্ড লাগিয়ে সর্তক করে দেওয়া হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, রেললাইন পার করতে হবে এমনস্থানে সড়ক নির্মাণ করার আগে নির্মাণকারী সংস্থা রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ব অনুমতি নেয়ার বিধান রয়েছে। তবে সড়ক নির্মাণকারী ওইসব কর্তৃপক্ষ এই নিয়মনীতি মানছে না। আর এই কারনেই ওইসব লেভেল ক্রসিং অবৈধ। অবৈধ ওইসব লেভেল ক্রসিং গুলো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হওয়ার সময় অধিকাংশ দূর্ঘটনা ঘটে থাকে।

রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, লাকসাম-নোয়াখালী সেকশনে লাকসাম পৌরসভার পাশে লাকসাম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন রেল লাইন পার করে দুটি সড়ক নির্মাণ করেছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ যথাযথ নিয়মনীতি মানেন নি। লাকসাম-নোয়াখালী রেলরুট ছাড়াও লাকসাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলরুটে পৌরকর্তৃপক্ষ অনুরূপ ভাবে রেলওয়ের নিয়মনীতির পরিপন্থী রেললাইন পার করে একাধিক সড়ক নির্মাণ করেছেন।

লাকসাম রেলওয়ে জংশন প্লাটফরম থেকে মাত্র ১০০ গজ উত্তরে রয়েছে একটি বৈধ লেভেল ক্রসিং। এ ক্রসিং ছেদ করেছে ৬টি লাইন। এই ৬টি লাইন অতিক্রম করে যে রাস্তাটি রয়েছে ওইটি রেলওয়ের আবাসিক এলাকা। রাস্তাটি এক সময় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করলেও বর্তমানে এটি পৌরকর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে। অত্যন্ত গুরুত্ব পূর্ন ওই লেভেল ক্রসিংটি বৈধ হলেও একটি অত্যন্ত ঝুঁকি পূর্ন। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেটগামী বিরতীহীন বিভিন্ন দ্রুতগামী ট্রেন এ ক্রসিংয়ের ওপর দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে। এছাড়া এখানে লোকোসেড যাওয়ার লাইন ও শান্টিন ট্রেন লাইনও রয়েছে। অথচ এখানে কোনো গেইট এমনকি গেইটম্যানও নেই। ওই রেলক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে স্কুল ও কলেজের শত শত শিক্ষার্থী এবং রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী , এলাকার লোকজনসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করছে।

অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ন এই লেভেল ক্রসিংয়ের পূর্ব পাশে রয়েছে রেলওয়ের অফিসার্স রেষ্ট হাউস, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি উচ্চ বিদ্যালয়। পশ্চিম পাশে রয়েছে দু’টি কিন্ডারগার্টেন ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কোমলমতি শিশুরা প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ন এই লেভেক্রসিং পারাপার হয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করে। এখানে গেইট ও গেইটম্যান না থাকায় যে কোনো সময় দূর্ঘটনার আশংকা করছেন অভিভাবকসহ এলাকাবাসী।

এদিকে, মনোহরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে কুমিল্লা জেলা শহরসহ অন্যান্য উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সড়কটির লাকসাম পৌর শহরের ফতেপুর এলাকায় লাকসাম-নোয়াখালী রেললাইনে রয়েছে একটি লেভেল ক্রসিং। এ সড়কে প্রতিদিন বাস, ট্রাক, ট্যাক্সিসহ বিভিন্ন ধরনের শত শত যানবাহন ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীসহ সাধারন মানুষ চলাচল করে। অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ন এ লেভেল ক্রসিংয়েও কোনো গেইট ও গেইটম্যান নেই। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ‘সাবধান! এ লেভেল ক্রসিংয়ের কোনো গেইট ও গেইটম্যান নেই, নিজ দায়িত্বে চলাচল করবেন।’- এমন ধরনের একটি সাইনবোর্ড দিয়ে তাদের দায়ভার শেষ করছেন।

একটি সূত্র জানায়, গত ২৮ নভেম্বর দৌলতগঞ্জ রেলষ্টেশনের হোম সিগনালের কাছে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার মিলের প্রবেশ পথে লেভিক্রসিংটিতে ট্রেন-ট্রাক্টর সংঘর্ষে ট্রাক্টর চালক পৌর এলাকার গাজীমুড়া গ্রামের আবদুর রহিম (৩০) ঘটনাস্থলে মারা যায়। দু’দিন ৩০ নভেম্বর ওই রেল রুটের বাটিয়াভিটা নামক স্থানে একটি লেভেল ক্রসিংয়ে অনুরূপ ভাবে ট্রেন ট্রাক্টর সংঘর্ষ ঘটে। এছাড়া গত বছর ৪ ডিসেম্বর রাতে লাকসাম-মনোহরগঞ্জ সড়কের পৌরএলাকার ফতেপুর লেভেল ক্রসিং পার হওয়াকালে লাকসাম উপজেলার গাইনেরডহরা গ্রামের সিএনজি অটোরিক্সা চালক হুমায়ুন কবির নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ট্রেনের ধাক্কায় ঘটনাস্থলে নিহত হন।একইদিন সকালে ওই রেলরুটের উপজেলার বাটিয়াভিটা নামকস্থানে একটি লেভেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় মারা যান উত্তরদার ইউপির গ্রাম পুলিশ বাতাবাড়িয়া গ্রামের আবদুস ছাত্তার।

২০০৮ সালের ২ আগষ্ট সকালে লাকসাম-নোয়াখালী রেলরুটের মনোহরগঞ্জ তুগুরিয়া মুন্সিরহাট সড়কের লেভেলক্রসিং পার হওয়ার সময় নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা একটি ট্রেন ও বেবী টেক্সী সংঘর্ষে মনোহরগঞ্জ উপজেলার লক্ষনপুর ইউনিয়নের নারায়ানপুর গ্রামের একই পরিবারের তিনজন আবদুল কাদের (৫২) , তার স্ত্রী আমিরের নেছা (৪২), ছেলে ইব্রাহিম (১০) ঘটনাস্থলে নিহত হয়। বেবীটিক্সেী চালকসহ আহত হয় আরও তিনজন। একই বছর ওই রেলরুটের নাথের পেটুয়া সাতেশ্বর লেভেলক্রসিং পারাপারের সময় মারা গেছেন তিনজন।

মো. আবু হানিফ পাশা বলেন, লাকসাম-নোয়াখালী রেলরুটে ৪১টি অবৈধ লেভেলক্রসিং রয়েছে। সে গুলোতে বিধিমোতাবেক গেইট স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ওইসব কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

এ ব্যাপারে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ (ডিইএন) মো. আবুল কালাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, লাকসাম-নোয়াখালী রেলরুটে অনুমোদিত ৬টি লেভেল ক্রসিংয়ে জনবল ও আর্থিক সংকটের কারনে গেইট স্থাপন কিংবা গেইটম্যান নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে ওইসব লেভেল ক্রসিং গুলোতে গেইটস্থাপনসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগে প্রক্রিয়া চলছে।

বিভাগীয় প্রকৌশলী আরও জানান, ওই রেলরুটে অননুমোদিত ৪১টি লেভেল ক্রসিংয়ে গেইট স্থাপনসহ লোকবল নিয়োগের ব্যাপারে পরিকল্পনা মন্ত্রানালয়সহ সংশ্লিস্ট মন্ত্রানালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবগুলো অনুমোদন সাপেক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

Check Also

নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর ১১২তম মৃত্যু বার্ষিকী পালন

স্টাফ রিপোর্টার :– নানা কর্মসূচী পালনের মধ্যদিয়ে কুমিল্লার লাকসামে নারী জাগরণের অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর ...

Leave a Reply