ক্ষমতার পালাবদল :কুবি’র ছাত্রদল নেতা ইলিয়াস এখন ছাত্রলীগ ক্যাডার

এম আহসান হাবীব, কুবি প্রতিনিধি:

ইলিয়াস
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) শিক্ষকের বাসায় হামলাকারী মো: ইলিয়াস হোসেন সবুজ ক্ষমতার পালাবদলে ছাত্রদল নেতা থেকে এখন ছাত্রলীগ ক্যাডার। দলীয় পরিচয় ভাঙ্গিয়ে একের পর এক অঘটন ঘটিয়ে চলেছে ছাত্র নামধারী এই ক্যাডার। বিভিন্ন সময়ে তার হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সাধারন শিক্ষার্থী। এমন কি তার হাত থেকে রেহাই পান নি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তারাও। গত ১ বছরে তার হাতে লাঞ্চিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা। সর্বশেষ তার দাবি অনুযায়ী পরীক্ষায় অবৈধভাবে বাড়তি নম্বর না দেওয়ায় বহিরাগত ১৪-১৫ সন্ত্রাসী নিয়ে গত সোমবার বিকেলে লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রভাষক মশিউর রহমানের বাসায় হামলা চালায় সে । তার এই ধারাবাহিক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে আতঙ্কগ্রস্থ ও ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মকর্তাবৃন্দ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বদরপুর গ্রামের অধিবাসী ইসমাইল হোসেনের ছেলে ইলিয়াস হোসেন সবুজ। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের সদর দক্ষিণ উপজেলাধীন পেরুল দক্ষিন ইউনিয়ন শাখার নেতা হওয়ার সুবাদে কুমিল্লা-৯ (বর্তমানে বিলুপ্ত) নির্বাচনী এলাকার বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর মাধ্যমে অবৈধভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় ইলিয়াস হোসেন সবুজ। জানা যায়, বাণিজ্য অনুষদে ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েও কলা,মানবিক ও সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের অধীনস্থ লোকপ্রশাসন বিভাগের ১ম ব্যাচে ভর্তি হয় ইলিয়াস। যদিও সে সংশ্লিষ্ট অনুষদে ভর্তি পরীক্ষাই দেয় নি। তার ক্লাস রোল ৩৮, অথচ সে সময় লোকপ্রশাসন বিভাগের মোট আসনসংখ্যাই ছিল ৩৫টি। তৎকালীন ভিসি প্রফেসর ড. গোলাম মাওলা রাজনৈতিক যোগসাজশে তাকে খেলোয়াড় কোটায় ভর্তি করেন। আশ্চর্যের বিষয় এ জাতীয় কোন কোটা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই।

ভর্তির পর থেকেই ইলিয়াস হোসেন নিজেকে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের মূল নেতা হিসেবে জাহির করে। এমন কি ছাত্রদলের পক্ষে একাধিক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়। ক্যাম্পাসে ক্ষমতার দাপট অব্যাহত রাখতে এবং ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখতে ইলিয়াস হোসেন এই সিদ্ধান্ত নেয়। দলবদলের পর থেকেই তার দুর্ধর্ষতার মাত্রা বাড়তে থাকে। ছাত্রলীগের পক্ষ হয়ে সে একাধিক সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। কথায় কথায় শিক্ষক কর্মকর্তাদের সাথে দুর্ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তোলা তার নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর ক্যাম্পাসে আধিপত্যতে কেন্দ্র করে সংগঠিত ছাত্র সংঘর্ষে ইলিয়াস অস্ত্র হাতে ভয়াবহরূপে আবির্ভূত হয়। তুচ্ছ ঘটনায় গত বছর ৭ এপ্রিলে তৈয়ব আলী নামের এক ইংরেজী ২য় ব্যাচের ছাত্র সাধারন শিক্ষার্থীকে ব্যাপক প্রহার করে। প্রক্টরিয়াল বডির নিকট এর বিচার দাবী করলেও রাজনৈতিক কারনে কিছুই হয়নি। গত বছর সহপাঠী এক ছাত্রী ও মার্কেটিং বিভাগের এক শিক্ষকের বোনকে উত্যক্ত করার অপরাধে প্রশাসনের নিকট আর উত্যক্ত না করার শর্তে মুচলেকা দিতে হয় তাকে। সে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের আবাসিক ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ২০১০ সালের শুরুতে হলে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে কবি নজরুল হলের প্রভোস্ট জি এম মনিরুজ্জামানকে লাঞ্চিত করে। নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের এক ছাত্র ক্লাসে পর্যাপ্ত উপস্থিতি না থাকায় পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে দেয়নি। ওই ছাত্রের ব্যাপারে সুপারিশ করতে গিয়ে সে নৃ বিজ্ঞান বিভারে প্রধান শামিমা নাসরীনের সাথে দুর্ব্যবহার করে। লিখিত অভিযোগ জানিয়েও কোন বিচার পাননি সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকা। গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত আন্তঃবিভাগ ফুটবল প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল খেলার ফলাফল নিয়ে তৎকালীন সহকারী প্রক্টর তাজুল ইসলামসহ কয়েক শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায়ও সে জড়িত ছিল বলে জানা যায়। কিছুদিন পূর্বে ক্ষমতাসীন দলের কাজ করতে গিয়ে পড়ালেখার সময় না পাওয়ার কথা বলে বিভাগের প্রভাষক মশিউর রহমানের নিকট তাকে পরীক্ষায় বাড়তি নম্বর প্রদানের অযৌক্তিক দাবি জানায় ইলিয়াস। সর্বশেষ তার দাবি অনুযায়ী পরীক্ষায় অবৈধভাবে বাড়তি নম্বর না দেওয়ায় বহিরাগত ১৪-১৫ সন্ত্রাসী নিয়ে গত সোমবার বিকেলে লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রভাষক মশিউর রহমানের বাসায় হামলা চালায় সে । এভাবে একের পর এক তান্ডব চালিয়েও বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে ইলিয়াস।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক নাম ভাঙ্গিয়ে চললেও তার অপকর্মের দায়িত্ব নিতে রাজি নয় কোন দলের নেতারাই। তার বিষয়ে ছাত্রদল কুমিল্লা (দক্ষিণ) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন কায়সার যায়যায়দিনকে বলেন, শুরু থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিমুক্ত থাকায় আমাদের কোন কার্যক্রম ছিল না। বর্তমানেও আমাদের কোন কমিটি নেই। ছাত্রদলের কোন কার্যক্রমেই ইলিয়াসকে আমরা দেখি নি। বরং শুরু থেকেই ছাত্রলীগ ক্যাডার হিসেবে তার বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড আমরা পত্র-পত্রিকায় দেখেছি। তবে সে যে দলেরই হোক আমি তার যথাযথ শাস্তি দাবি করছি।

ইলিয়াসকে ছাত্রলীগের কর্মী অস্বীকার করে ছাত্রলীগের কুমিল্লা জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক মুন্না যায়যায়দিনকে বলেন, শিক্ষকরা জাতির মেরূদন্ড। আমি ইলিয়াসের আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই। আমাদের কোন কমিটি কিংবা কার্যক্রম না থাকা সত্বেও নিজেদের সুবিধার্থে যারা দলের নাম ভাঙ্গিয়ে দলের ইমেজ ক্ষুন্ন করছে তাদের আমি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

এতসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ইলিয়াস হোসেন সবুজ সকল অভিযোগ স্বীকার করেন এবং এখন থেকে অতীতের সব কিছু ভুলে ভাল হয়ে যাবে বলে জানান।

তার কর্মকান্ডের বিষয়ে ভিসি প্রফেসর ড. আমির হোসেন খান জানান, ইতিমধ্যেই তার বিরূদ্ধে তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তার ভর্তির বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Check Also

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক দিবস পালিত

কুমিল্লা প্রতিনিধি :– বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০তম শাহাদাৎবার্ষিকী ...

Leave a Reply