আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

এ কে এম ফজলুল হোসাইন (নওয়াব আলী)

কাজী নজরুল ইসলাম
ভারতের বিহার প্রদেশের রাজধানী পাটনা শহরের অনতি দূরে হাজীপুর গ্রামে ছিল আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পূর্ব-পুরুষদের আদিবাস । মোঘল আমল থেকেই কবির পূর্ব-পুরুষরা কাজী বা বিচারকের দায়িত্ব পালন কওে আসছিলেন বলে তার বংশটি কাজী বংশ নামে খ্যাত । ১৭৫৭ এর চক্রান্তোত্তর কালে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌলার প্রধান সিপাহশালার মীর জাফর আলী খাঁ অতি অল্প সময়ের জন্য নবাবী শিরস্ত্রান মস্তকে ধারন করেছিলেন । অুঃপর তার জামাতা স্বাধীন চেতা নবাব মীর কাশিম মসনদে সমাসীন হন । অচিরেই নবাব মীর কাশিমের সঙ্গে বেনিয়া ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্ণধারদের স্বার্থ-সংঘাত ও মনো-মালিন্য চরম আকার ধারন কওে । এ সুযোগে উড়িষ্যার ফৌজদার এলিস অতর্কিতে পাটনা আক্রমন করে শহরটি দখল করে নেয় এবং উপর্যুপরি কয়েকদিন হত্যা ও লুটতরঙ্গ চালায় । ঐ হত্যা, লুন্ঠন ও ধ্বংসের একমাত্র শিকার হয়েছিল ধনী, শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত মুসলমানরা ।
এতে পাটনার দেওয়নী, ফৌজদারী ও নিজামতের পদস্থ লোকেরা সম্পূর্ণ ভাবে নাজেহাল হলেন । তদুপরি ইংরেজ সৈন্যদেও উদ্দেশ্যমূলক নির্যাতন, হয়রানি ও তাড়া খেয়ে বাস্তুভিটা ছেড়ে অনেক মুসলমান পরিবার ফেরারি হয়ে যায় । এমনি দুর্দিনে নজরুলের পূর্বপুরুষেরা পার্শ্ববর্তী বর্ধ্বমান জেলার আসানসোল গিয়ে আশ্রয় গ্রহন করেন । চরুলিয়ার আশ্রয়হীন দারিদ্র পীড়িত কাজী পরিবারের আভিজাত্য বোধহয় আর অবশিষ্ট রইলনা । পরিচয় আতœগোপন কওে চুরুলিয়ার জামে মসজিদে ইমামতি ও মক্তবে শিক্ষকতা করে এবং গ্রামের মানুষের সাহায্য ও সহানুভূতির উপর নির্ভও করে অতিশয় দুঃখ কষ্টে পরিবারটি দিনাতিপাত করতে থাকে । চুরুলিয়ার এই কাজী পরিবাওে ১৮৯৯ ইং সনের পচিঁশে মে ঐক্যে বঙ্গাব্দের ১৩০৬ এর এগার ই জ্যৈষ্ঠ কাজী নজরুল ইসলাম জন্ম গ্রহন করেন । পর পর চারটি সন্তানের মৃত্যুও পরে সংসারে এলেন নজরুল । তাই ব্যথাতুরা মা হাযেরা খাতুন বড় দুঃখের সন্তানটির নাম রাখেন দুখু মিঞা, এ আশায় যে হয়তোবা এ সন্তানটির অকাল মৃত্যু হবেনা ।
শৈশবেই নজরলের মাঝে বিরল প্রতিভার আলামত প্রতিভাত হতে থাকে । গাঁয়ের মক্তবে পড়াশুনা শুরু কওে মুসলিম শাস্ত্রে পারদর্শী চাচা কামিল করিমের কাছে নজরুল আরবী এবং ফার্সি ভাষা শিখতে থাকেন । কাজী পরিবারের নিত্যদিনকার ব্যবহৃত ভাষা ছিল ফার্সি ও উর্দ্দু । তাই পরবর্তীতে নজরুলের লেখায় আরবী, ফার্সি ও উর্দ্দু শব্দের বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় । পারিবারিক ঐতিহ্যের কারনেই আজিবন দারিদ্রের সঙ্গে পানুতা লড়ে এবং আরুষ্ঠানিক কোন বিশেষ কোন পড়াশুনা না করেও অসাধারন প্রতিভাধর ধার্য বাংলাভাষা ও সাহিত্যে এক অভিনব ধারার প্রবর্তন করেন ।
শৈশব কাল থেকেই নজরুল অতিসুন্দর ভাবে কোরআন তিলাওয়াত করতে পারতেন । আবৃত্তির কন্ঠ ছিল তার অতি সুমধুর । উস্তাদের গড় হাজিরাতে মক্তবের পড়–য়াদের কোরআন শিক্ষা দিতেন এবং মসজিদে ইমামতি করতেন কিশোর নজরুল । নজরুলের আটবৎসর বয়ক্রম কালে তার আব্বা কাজী ফকির আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন । এতে সংসারে দারুন অভাব অনটন দেখা দেয় । বড়ভাই সাহেবজানের একক প্রচেষ্ঠায় মা-ভাই-বোনদের দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান হচ্ছেনা দেখে নজরুল পড়াশুনায় ইস্তফাদান করেন । এরপর থেকে শুরু হয় তার খাপছাড়া লাগামহীন জীবন । মক্তবে শিক্ষকতা, দরগাহে খাদেমগিরি, কখনোবা গ্রামের মোল্লা, মসজিদে ইমামতি, খৃষ্টান গার্ড সাহেবের বাসায় বাবুর্চিগীরি এবং আরো ছোট খাট এটা উটা ।
১৯১০ সালে নজরুল বাসুদেবের লেটুরদলে যোগদান করেন । গ্রামীন সংস্কিৃতির অন্যতম ক্ষেত্র লেটুর দলে সমপৃক্ততায় কৈশোরে নজরুলের প্রতিভার উম্মেষ ঘটে । ১৯১০ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত লেটুর দলে জড়িত থেকে নজরুল হিন্দু মুসলিম পৌরানিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা-ভিত্তিক ‘দাতাকর্ণ’, ‘মেঘনাদবধ’, ‘কবি কালিদাস’, ‘আকবর বাদশাহ’, ‘চাষার ঢং’, প্রভৃতি পালাগান সহ এগারটি নাট্য রচনা করেন এবং তাতে অভিনয় করে অতি অল্প সময়ে ‘উস্তাদ; খ্যাতি অর্জন করেন । ভোর হল দোর খুলো; ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি’ ও কুমিল্লার বীরেন সেন গুপ্তের বাড়ীর পেয়ারা গাছের কাঠবিড়ালির সঙ্গে ছোট মেয়ের ভাব জমানো কথাসম্বলিত ‘খুকী ও কাঠ-বিড়ালি’, খাদু-দাদু’, ‘লিচুচোর’, ‘ছোট হিটলার’, ‘নতুন খাবার’, ‘প্রজাপতি প্রজাপতি’, ‘শিশু যাদুকর’, ‘সারস পাখির মা’, ‘অমর কানন’ প্রভৃতি কৈশোরের অনবদ্ধ শিশুতোষ হাসির ছড়া-কবিতা, গণিত শিক্ষামূলক কবিতার মধ্য দিয়ে নজরুল বাংলা সাহিত্যে সাড়ম্ভরে প্রবেশ করেন ।
সর্বোপরি দুঃখই ছিলো নজরুলের চির সঙ্গী । দারিদ্র্যেও কশাঘাত সহ্য হলনা দুখুমিঞার । পুনরায় চলে গেলেন আসানসোলের ধামমুখর কোলিয়ারী গুলিতে সামান্য কাজের সন্ধানে । এত ছোট ছেলেকে কে চাকুরি দেবে ? অনেক চেষ্টা তদবির করে এম, বকমের রুটির দোকানে নাম মাত্র বেতনে একটি কাজের ব্যবস্থা করে নিলেন । দিনভর রুটির দোকানে হাড়ভাঙ্গা মেহনত করে রাত্রিতে চিলে কোঠায় বসে পুঁথি পড়তেন আর গান লিখতেন নজরুল । আসানসোল থানার সাব ইনসপেক্টর কাজী রফিজুল্লাহর সঙ্গে দৈবচক্রে নজরুলের একদিন সাক্ষাত হয়ে গেল নজরুলের একদিন । কাজী সফিজুল্লাহ নজরুলের মধ্যে প্রভূত সম্ভাবনার অস্তিত্বের টের পেয়ে তাকে নিয়ে এলেন নিজ গ্রাম ময়মনসিং এর ত্রিশালে । ১৯১৪ সনে নজরুলকে দরিরামপুর হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেনীতে ভর্তি করিয়ে দিলেন । কবির বাল্য বিদ্যাপীঠ এই মরিরামপুর হাই স্কুল হালে নজরুল একাডেমী নামে পরিচিত এবং এখানেই সম্প্রতি সরকারী ও বেসরকারী ভাবে নজরুল বার্ষিকী উদ্্জাপিত হয়ে আসছে । দরিরামপুরে সপ্তম শ্রেনীর পাঠ সম্প›ন করে নজরুল পুনরায় চলে এলেন বর্ধমানে । জ্যৈষ্ঠ্যের ঝড় নিয়ে ধরাধামে এসেছিলেন তিনি । স্বভাবে তেমন দুরন্ত-দুর্বার-চঞ্চল, দুরন্তপনার কোন চৌহদ্দী না থাকলেও শিক্ষকের তিনি ছিলেন নয়নের মনি । বাঁধন হারা নজরুল সুরে-গানে মাতোয়ারা থাকলেও স্কুলে ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র । খুব ছোট বেলায় অভাবের সংসারে হাল ধরতে হয় বলে, স্কুল-কলেজের প্রথাগত পড়াশুনায় মনোনিবেশ করতে পারেননি নজরুল ।একাধিক স্কুলে ভর্তি হয়েছেন, তাই ক্লাশে পাশ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি । তবু মনি মুক্তা অন্ধকারেও জ্বলে । ১৯১৫ সনে রানী গন্জে রহাই স্কুলে ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণীতে । এ সময়টাতে বাল্যব›ধু শৈলজানন্দেও সঙ্গে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে উঠে তার । দুই বন্ধুতে মিলে শুরু হয় কিশোর সাহিত্য চর্চা । নজরুল ’চড়–ই পাখির ছানা’, ’রাজার গড়’, রানীর গড়, প্রভৃতি ছড়া – কবিতা রচনা করেন ।
দশম মানের শেষ পর্যায়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমনি সময়ে প্রথম মতযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৯) দামামা বেজে উঠে । নজরুল ৪২ নং বাঙ্গালী প্লাটুন ভুক্ত হয়ে চলে যান আরব সাগরতীরস্থ করাচী সেনানিবাসে । সেখানে একজন পাঞ্জাবী মৌলভীর সাহচর্যে থেকে আরবী ও ফার্সি ভাষা আয়ত্ত করতে থাকেন । এসময় তিনি অনুবাদ করেন পারস্য কবি হাফিজ ও রুমীর কিছু কিছু কবিতা । যুদ্ধকালীন সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়ম রীতির ফরমাবরদারি করেও নজরুল করচী সেনানিবাসে থেকে নিজস্ব রীতিতে ’বাউন্ডেলের আতœকাহিনী’ রচনা করেন । তাছাড়া লিখেন আরো অনেক কবিতা, গল্প ও গান ; আর এগুলোকে পাঠাতেন কলকাতায় ছাপার জন্য । কলকাতার সওগাত পত্রিকায় নজরুলের ছোট গল্প বাউন্ডেলের আতœকাহিনী প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সনে । এরপর প্রকাশিত হয় তার মুক্তি বা ক্ষমা কবিতা । এতে খুব নাম হল তার । ক্রমে খ্যাতির সীমা ছড়িয়ে পড়তে থাকে । জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় । এমনি করে নজরুল বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন ।
মুসলিম প্রধান এ বাংলাদেশে হিন্দু- মুসলিম – বৌদ্ধ- খৃষ্টান মিলে যে জাতীয় মানস গড়ে উঠেছে, তার পকৃত রুপকার কবি নজরুল ইসলাম । কারন নজরুলের আগমনের পূর্বে বাংলা সাহিত্য কুঞ্জে মুসলিম পদচারনা ছিল অতিমাত্রায় সীমিত একভীরু । ‘১৭৫৭ তে পলাশী বিপর্যয়’, ১৭৯৩-তে কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারি বিলোপ, ১৮২৮ এর বাজেয়াপ্ত আইনে নিস্কও সম্পত্তির রায়তি স্বত্বলোপ, ১৮৩৭ এ ফার্সির রাজভাষাচ্যুতি ও ইংরেজী ভাষার অধিষ্ঠান এবং ১৮৫৭ তে সর্ব ভারতীয় প্রথম স্বাধীনতা বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে, বিদেশী ঔপনিবেশিক বেনিয়া ইংরেজদেও অত্যাচার, অপঘাত, নির্যাতন ও শোষনে এ যাবৎ কালের রাজদন্ড ধারী মুসলমানরা রাজনৈতিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ও সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি হারিয়ে একটি নিঃস্ব, অধঃপতিত, নিষ্ক্রীয় ও জীবম্মৃত জাতিতে পরিনত হয় । অবিভক্ত বাংলার জনগোষ্ঠীর শতকরা ছাপ্পান্ন জন মুসলিম হয়েও নির্দিষ্ট পরিমানের বিষয় সম্পত্তি ও নির্দিষ্ট মানের শিক্ষা না থাকার কারনে মুসলমানরা কোয়ালিফাইড ভোটার হতে পারেনি । ইংরেজ আশীর্বাদ পুষ্ট সংখ্যালঘু হিন্দুরা বাংলার আইন সভা থেকে শুরু করে শিক্ষাদীক্ষা, ব্যাবসা বানিজ্য ও চাকুরি ক্ষেত্রে একচেটিয়া সুযোগ ও অধিকার লাভ করে । মুসলমানদের শতাব্দী লালিত আরবী-ফার্সি-উর্দ্দু-তুর্কী শব্দ সম্ভার মিশ্রিত ভাষা সাহিত্য-সংস্কৃতির কন্ঠ রোধ করে একটি ঘনকালো যবনিকা টেনে দেওয়া হয় । ব্রিটিশ বংগীয় রাজধানী কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০) এর লর্ড ম্যাকলে, মার্শম্যান ও পাদ্রী ক্যারী সাহেবদেও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা অনুকূল্য এবং নির্দ্দেশনায় সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতেরা আরবী –ফার্সি-উর্দ্দু বর্জিত তদ্ভব শব্দ কন্টকিত সম্প্রদায়গত একটি সাহিত্য ধারা সৃষ্টি কওে বাংলাভাষার রেনেসাঁর সূচনা করে। ছয়শত বৎসর ব্যাপী যে বিদেশী মুসলমানরা ভারতবর্ষের একটি একক মানচিত্র তৈরী করে এদেশীয় হয়ে এদেশ শাসন করেন এবং যে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য সাড়ে ছয়শত বৎসরের অধিক কাল এদেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মনের খোরাক যুগিয়েছিল, সে মধ্যযুগীয় ইতিহাস ঐতিহ্য অবদান স্বীকৃতি পেলোনা এসম্প্রদায়গত সাহিত্যে এবং তাতে অনুল্লেখ্য রয়ে গেলো মুসলিম জীবন ও কবি সাহিত্যিকরা । হিন্দু মুসলিম মিলে যে বাঙ্গালি জাতি, তার সামগ্রিক আশা আকাংখা, উৎসাহ উদ্দীপনা চেতনা এ সাহিত্যে ছায়াপাত করলোনা । পশ্চিম বঙ্গীয় অধ্যাপক নারায়ন চট্রোপাধ্যায় বলেন বাংলা ভাষা থেকে আরবী ফার্সি শব্দ সম্ভার সরিয়ে মুসলমান প্রভাব বর্জন করতে গিয়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্যেও স্বাাভাবিক গতিপথ ব্যাহত কওে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধিও পথে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে ।
বেনিয়া ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর এদেশীয় দু-ভাষী বানিজ্যিক প্রতিনিধি, মুৎসুদ্দি ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকারী কৃতি ব্যক্তিরা যারাছিল ভারত বর্ষে ইংরেজ শক্তি ও স্বার্থের প্রথম ও প্রধান অবলম্বন নিজেদেও পারিবারিক ভিত প্রতিষ্ঠার জন্য ভাগীরথি নদীর তীরবর্তী ফিরিদিপাড়া, গোবিন্দপুর, সুতানুটি, চিৎপুর, কলকাতা প্রভৃতি গ্রাম নিয়ে ১৬৯০ সালে জবচানক ও ইংরেজ সৈনিক-নাবিকদেও কেন্দ্র কওে আজকের জ্বলজ্বলে কলকাতা গড়েছিল, সেই স্যাঁৎসেঁতে জঙ্গলোকীর্ণ গ্রাম গুলো নিয়ে গড়ে উঠা কলকাতা ক্রমে সমগ্র সুবাহ বাঙ্গালাহ তথা প্রাচ্যের সমৃদ্ধশালী ও মুসলিম ঐতিহ্য মন্ডিত রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের স্থান দখল করে নেয়। বেনিয়া শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের প্রভূত্বের পরাক্রমকে ক্ষোভে দুঃখে ও অব্যক্ত বেদনায় মুহ্যমান নিঃস্ব-রিক্ত মুসলমানরা মেনে নিতে পারেনি। উপরন্তু বিশ্বব্যাপী প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে মুসলিম জাহানের আশা আকাংখা ও ঐক্য এককেন্দ্রিকতার প্রতীক তুর্কী সালতানাত (১২৯৯-১৯২২) ইউরোপের ‘রুগ্নব্যক্তি’ সাব্যস্থ করে ভেঙ্গে ফেলার গোপন অশুভ পাঁয়তারাতে ভারতব্যপী অবদমিত মুসলমানরা আতঙ্কে নিমজ্জিত হয় এবং তারই প্রতিবাদে ভারতময় ‘খেলাফত আন্দোলনের’ সুত্রপাত ঘটে। এমনি সময়ে ১৯২০ সনের প্রারম্ভে বাঙ্গালী পল্টন ভেঙ্গে দেয়া হলো। পরনে হাবিলদারের পোশাক, পেশীতে সৈনিকসুলভ দৃঢ়বদ্ধতা,বুকে অসীম সাহস ও চোখে যেবিনের অমিত চাঞ্চল্য নিয়ে সৈনিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতার ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি ১৯১১’ অফিসে এসে উঠেন। বাংলার বীরত্ব তার বাহুতে টগ-বগ, আর দেশ প্রেমে তিনি তখন বাধনহারা। ‘তুই নির্ভও কর আপনার বার, আপন পতাকা কাঁধে তুলে ধর’ এ সংকল্প নিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্য চর্চায় আতœনিয়োগ করেন ।এক্ষেত্রে কবি কাজী সক্রিয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলেন লব্দ-প্রতিষ্ঠ সম্পাদক কবি মোজাম্মেল হকের । সাম্যবাদী নেতা কমরেড মোজাফ্ফর আহমেদ (সন্দ্বীপ) ও নজরুলকে ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য প্রদান কওে অতিমাত্রায় প্রভাবিত করেন। তাই বাংলা ভাষার সাম্যবাদী ও সমাজতন্ত্রী কবিতার অগ্রদূত হলেন কবি নজরুল ইসলাম।
মুসলেম ভারত, সওগাত, কল্লোল, নবযুগ, কালি-কলম, লাইল, ধুমকেতু পভৃতি পত্র-পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ইংরেজ জিঞ্জিরে শৃংখলিত বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নজরুলের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সূচনা করে। নজরুলের বিপ্লবাতœক, বীরত্ব ব্যঞ্জক সঙ্গীত, পরাধীনতার শৃংখল ভাঙ্গা ও জাগরন মূলক গান, কবিতা, কথা-সাহিত্য, সম্পাদকীয় এবং ভাষন ও অভিভাষনের মাধ্যমে ব্রিটিশ বিরুধী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন (১৯২০-২২) এ আলোড়িত ও সীমাহীন অসন্তোষ প্রজ্জ্বলিত গন-মানস কে জাগিয়ে তুলেন। তার সাহিত্য কর্মে, নতুন ভাব-ভঙ্গি, অভিনব ভাব-বস্তু, নির্মল উচ্ছাস এবং মুক্তজীবনের স্বাদ ও স্বাধীনতা মন্ত্রেও উত্তপ্ত পরশ পেয়ে সমকালীন জনগোষ্ঠী অকুন্ঠিতভাবে নজরুলকে বরন করে নেয়। বাংলার আকাশ-বাতাস ও বাঙ্গালীর মন-প্রাণ মাতাল করে, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ের মতো উদিত হলেন নজরুল ।তার মাঝে তারা সংগ্রামের অগ্রপথিক ও উদগ্র প্রেরনা খোজে পেলো, যা তাদেও হৃদয়তন্ত্রীতে অনুরনিত করলো এক নতুন ঝংকারের। সমগ্র বাঙ্গালীর কন্ঠে ধ্বনিত হলো- ‘দুর্গমগিরি কান্তার — যাত্রীরা হুঁশিয়ার’। তাইতো ১৯২৯ সনের ১৫ইং ডিসেম্বওে কলকাতার আলবার্ট হলে নজরুল সংবর্ধনায় সভায় বরেণ্য বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সভাপতির ভাষনে বলেন, ‘আমরা আগামী সংগ্রামে নজরুলের সঙ্গীত কন্ঠে ধারন করিয়া সুভাষ চন্দ্র বসুর মত তরুন নেতাদের অনুসরন করিব’। ফলে এ যাবত কালের ‘মরিতে চাহিনা এ সুন্দর ভূবনে’—। জয় হোক, জয় হোক ব্রিটিশের জয় —-ব্রিটিশ রাজ্য লক্ষী যেন স্থির রয়’ প্রভৃতি ঘুম পাড়ানি গানের মোহাচ্ছন্নতা ও ‘জন-গন মনের অধিনায়ক’ ব্রিটিশের তোষন নীতি প্রত্যাখ্যান কওে উতলা ধরনীর অশান্ত মানুষের অযুত কন্ঠে নজরুলের সঙ্গে গেয়ে উঠলো ‘বল বীর! বল উন্নত মম শির’—। হাতে গুনা কিছু রক্ষনশীল প্রবীনের আশীর্বাদ না পেলেও দেশবন্ধু, বিপনপাল, সুভাষচন্দ্র, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র সহ যুব মনের ভালবাসা ও বুকের মালা পেয়েছিলেন নজরুল। বাংলার আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হতে লাগল- ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর —প্রলয় নূতন শৃংখল বেদন’—। ‘আমি বেদুঈন’ আমি চেঙ্গিস, আমি আপনার ছাড়া করিনা কাহারে কুর্নিশ,—। কান্ডারী ! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর, বাঙ্গালীর খুনে লাল হলো যেথা ক্লাইভের খঞ্জর; ঐ গঙ্গায় ডুবিছে ভারতের দিবাকর, উদিবে সে রবি আমাদের খুনে রাঙ্গিয়া পুনর্বার’—-।
বাল্য-কৈশোওে দুঃসহ দারিদ্র্য পীড়িত একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন কবি তার বিপ্লবী লেখনি দ্বারা ব্রিটিশ রাজের ভারতীয় ভিত কাঁপিয়ে তুলেন। ব্রিটিশ শাসনকে স্রষ্টার আশীর্বাদ গন্য কওে সম-কালীন কবি-সাহিত্যিকরা যখন নীরব দর্শক, সে সময় নজরুলের বহ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত দেশ-প্রেমও স্বদেশ চেতনামূলক উন্মাদনা জাতির হৃদয়বীনায় ঝংকৃত করলো এক নূতন সুর এবং ঘুমন্ত জাতিকে অঙ্গুলি নির্দেশ কওে বললো ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু—–যাত্রীরা হুঁশিয়ার—’। ‘ঈশান ! বাজা তোর প্রলয় বিষান ধ্বংস নিশান উঠোক প্রাচীর, প্রাচীর ভেদী’ —। বিদ্রোহের সুর তুলে, ভাঙ্গার গান গেয়ে অশিক্ষিত, অর্ধচেতন জনগোষ্ঠীর হৃদয়ে ঝড় তুলেছিলেন বলেই তো ১৯২৯ সনের ১৫ইং ডিসেম্বর নজরুল সম্বর্ধনা সভার বিশেষ অতিথি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বলেছিলেন ‘কবি নজরুল যে স্বপ্ন দেখেছেন, সেটা শুধু তাঁর নিজের স্বপ্ন নয়, সমগ্র বাঙ্গালি জাতির’ । —–তাাঁর লেখার প্রভাব অসাধারন, তার গান পড়ে, আমার মতো বেরসিক লোকের জেলে বসে গাইবার ইচ্ছা হতো। আমাদেও প্রাণ নেই, তাই আমরা এমনি প্রাণময় কবিতা লিখতে পারিনি। আমি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সর্বদাই ঘওে বেড়াই । প্রাদেশীক ভাষায় জাতীয় সঙ্গীত শুনবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। নজরুলের ‘দুর্গমগিরি কান্তার মরু’ এর মতো প্রাণ মাতানো গান কোথাও শনেছি বলে মনে হয় না—।
নজরুল অক্ষয় কীর্তি ‘অগ্নিবীনা’ ও প্রথম প্রবন্ধের বই ‘যুগবানী’ প্রকাশ করেন বিশের দশকে (১৯২২)। অগ্নিবীনার বারটি কবিতার একটি-ই সুর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ভূমিকা । নজরুলের অসাধারন জনপ্রিয় কবিতা ‘বিদ্রোহী’ ১৯২২ সনের ৬ই জানুয়ারী- ঐক্যে ১৩২৮ এর ১২ই পৌষ সাপÍাহিক ‘বিজলি’তে ছাপাহলে তার সব কটি সংখাই বিক্রি হয়ে যায়।এবং ঐ সংখ্যাটির পুনঃমুদ্রন দিয়ে আজ থেকে প্রায় পৌনে একশত বৎসর পূর্বে একটি মাত্র কবিতার জন্য পত্রিকাটির ঊনত্রিশ হাজার কপি নিঃশেষে বিক্রি হয়ে যায় । ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে রাতারাতি বিপ্লব সৃষ্টি কওে বিশ্বেও অন্যতম শ্রেষ্ঠ জন নন্দিত কবির মর্যাদায় অভিীষক্ত হলেন নজরুল। সম্ভাষন জানিয়ে রবীঠাকুর নজরুলকে আশীর্বাদ বাণী প্রেরন কওে বলেন ‘বিপ্লবী বাংলার গৌরব তুমি, সারাদেশ তোমার কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে। তুমি অনেক বড় হবে; তোমার এ কবিতা সমগ্র জাতির জীবনে জাগরন নিয়ে এল ——-’। বিদ্রোহী কবিতার বিপুল জনপ্রিয়তা দল, মত -গোষ্ঠী নির্বিশেষে নজরুলকে সম্বর্ধিত করেছিল। ইংরেজ মাহেবরা অবহিত হয়েছিলেন ‘হি ইজ অওয়ার গ্রেটেষ্ট পোয়েট নেক্্স্্ট টু রবীন্দ্রনাথ’ । গ্রীককবি হোমারের ‘ইলিয়াড’ বাল্মীকির ‘রামায়ন’ এবং ব্যাসের ‘মহাভারত’ রচনায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রয়েছে সমকালীন মানুষের সংগ্রামশীল চেতনা এবং চারটি মহাকাব্যই যুদ্ধাবস্থাকালীন মহান সাহিত্য। নজরুল ও তাঁর ‘বদ্রোহী’ কবিতার সমকালীন প্রপীড়িত মানব-চেতনা ও মানব মুক্তির ভাবনায় উজ্জ্বল ঐতিহাসিক ঘটনাকে উপজীব্য করে সার্থক কাব্য রচনা কওে বিদ্রোহী কবি আখ্যায় ভূষিত হন। সমকালীন মেজাজ ও চাহিদাকে কবি যথাযথভাবে উপলব্দি কাব্যে রুপদান করেন। যুগের মনকে যা প্রতিফলিত কওে, তা শুধু কাব্যই নয়, মহাকাব্য। তাই বিদ্রোহী একটি মহা কাব্য এবং তার রচয়িতা কবি কাজী নজরুল ইসলাম একজন মহাকবি। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পুর্নাঙ্গ আলোচনা করতে গেলে সমালোচককে ‘গোলটেবিল কনফারেন্স’, সাইমন কমিশন, ‘বেলাল, জগলুল পাশাকে জানতে হবে। আন্তর্জাতিক ইতিহাসের সম্যক ধারনা নিতে হবে; ‘ভৃগু’ও ‘অর্ফিয়াস’ তাবে নিয়ে যাবে হিন্দু ও গ্রীক পুরানের দিকে; টর্নেডো, টর্পেডো কি তাজানতে হবে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞানের মাধ্যমে। তবেই বুঝা যাবে নন্দিত হয়েও ‘মহাপদ্য কার’ বলে নিন্দিত কবির জ্ঞানের চৌহদ্দী কত বড় !
চলতি শতাব্দীর বিশের দশক ছিল নজরুলের কবিতা লেখার সুবর্ণ সময়। এ দশকে তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখাও প্রচুর- যেমন, অগ্নবীনা (১৯২২), দোলন চাঁপা (১৯২৩), ভাঙ্গার গান (১৯২৪), ছায়নট (১৯২৪), ঝিঙ্গেফুল (১৯২৪), চিত্তনামা (১৯২৫), সর্বহারা, সাম্যবাদী (১৯২৬), ফনি মনসা (১৯২৭), সিন্দু হিন্দুল (১৯২৯), জিঞ্জিতর (১৯২৮), চন্দ্রবিন্দু (১৯৩০), বিষের বাঁশি, চক্রবাক, প্রলয় শিখা, হাফিজ, নতুন চাঁদ, রুদ্দ্রমঙ্গল, দুর্দিনের যাত্রী, পভৃতি কাব্য গ্রন্থ ; ব্যাথার দান, রিক্তের বেদন, পভৃতি গল্পগ্রন্থ; মৃত্যুক্ষুধা, বাধনহারা, কুহেলিকা প্রভৃতি উপন্যাস; আলেয়ার ঝিলিমিলি, সেতুবন্ধ, পুতুলের বিয়ে, প্রভৃতি নাটক; সাত ভাই চম্পা, পিলেপটকা পুতুলের বিয়ে, লিচুচোর, কাঠবিড়ালী, ঘুম-পাড়ানি পাখি, ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি প্রভৃতি শিশুতোষ হাসির কবিতা ও গান। ফলে বিংশ শতাব্দির বিশের দশক ছিল কবি কাজীর প্রতাপের কাল। কবি ভাবে-ভাষায়, ছন্দে-চিত্রকল্পে, ব্যঞ্জনায়, পুরাণ ও কোরআন প্রয়োদে বাংলার প্রচলিত ছক ভেঙ্গে নতুন ধারার সৃষ্টি করেন।
এ সময়টিও আবার ছিল রবী ঠাকুরের প্রতিভাও দীপ্তির সময়। রবী ঠাকুরের বিশ্ববিজয়িনী প্রতিভা তখন মধ্যদিনের সূর্যেও ন্যায় বাঙ্গালির কাব্য সাহিত্যে সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী প্রভাব বিস্তার কওে রেখে সমগ্র সাহিত্যিক চেতনা এবং সাহিত্যিক মনকে আচ্ছন্ন ও অভিভূত কওে রেখেছিল । রবী ঠাকুর তখন বাংলা সাহিত্যে একক বৈশিষ্ট্যে বিরাজমান। রবীন্দ্র যুগের সেই উর্বর মুহুর্তে নজরুল নিজ পরিমন্ডলে আবির্ভূত হন। রবী ঠাকুরের পওে কবি কাজী নজরুল ইসলামই হচ্ছেন বাংলা সাহিত্যেও সবচেয়ে প্রতিভাধর প্রথম মৌলিক কবি। রবী ঠাকুর বাংলা সাহিত্যেও অমূল্য সম্পদ হিসাবে নিজের স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের আলোচনা তিনি অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন। ব্যক্তি বেচে থাকে তাঁর কর্মে । রবী ঠাকুর সাহিত্য চেতনার আলোকে বেঁচে আছেন। নজরুল ও একজন শক্তিমান কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, উপন্যাসিক, অভিনেতা ও নাট্যকার। তিনি প্রচন্ডভাবে ঐতিহ্য প্রিয় লেখক ও উঁচুমানের বাগ্মী। তাঁর ঐতিহ্য-চেতনা, রবী ঠাকুরের বিপরীতে একটি শক্তিশালী সাহিত্য চেতনার প্রতিষ্ঠা করলেও নজরুলের উত্তরসুরীগন তাঁর সাহিত্যেও আলোচনায় এবং মূল্যায়নে নজরুলকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হননি। নজরুলের সাহিত্য মূল্য প্রতিষ্ঠালাভ করলে তাঁর ঐতিহ্য-চেতনার নব আলোক প্রাপ্ত মুসলিম বাঙ্গালি যুব সমাজ উজ্জীবিত হতো এবং তাঁকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যেতে পারতো। রবী ঠাকুর ও নজরুল দুজনই বাংলার কবি, বাংলা সাহিত্যের কবি। দুয়ের মধ্যে কোন সংঘাত নেই। কাউকে বর্জন করে নয়। যগের চাহিদা ও প্রয়োজনের নিড়িখে নজরুল কাব্য-চেতনার নব আলোকে বাঙ্গালি যুব সমাজকে নতুন পথের সঠিক দিশা দিতে হবে।
নজরুল ছিলেন অবিরাম সৃষ্টিশীল। প্রথম মহাযুদ্ধাবসানে জীবন যুদ্ধে জড়িত নজরুল সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিড়ম্বনা ও ভর্ৎসনার কুটজালে আটকে পড়লেও তাঁর সৃষ্টির আনন্দ ছিল অসীম। ভুদেব, হেমচন্দ্র, নবীন, যতীন, বঙ্গলাল, মোহিত লাল, মধুসুদন, শরৎ, বঙ্কিম, অমিয়, জীবনানন্দ ও সুকান্ত চক্রবতীঁরা যখন রবীন্দ্র বলয়ে আবর্তিত হয়ে হিন্দু বিষয় বস্তুকে তাদের কাব্যকৃতির উপজীব্য করে সাহিত্য রচনায় বিভোর, নজরুল সে মূহুর্তে তার ধুমকেতু জ্বালা ও বিদেশী শাসনের শিকল ভাঙ্গার রণসঙ্গীত গেয়ে ঝড়ের বেগে এসে বাংলা সাহিত্যের কেল্লায় বিজয় কেতন উড়িয়ে দিলেন। তাই ব্রিটিশের অন্তিম যৌবনকালে বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব ও প্রতিষ্ঠা রীতিমতো বিস্ময়কর। যুদ্ধ শেষে তিনি এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। অন্যান্য অপসৃয়মার কবি সাহিত্যিকদের মতো রবীন্দ্র স্তুতিতে লিপ্ত হননি নজরুল। রবী ঠাকুরের সমকালে (১৮৭৯-১৯৪১) জন্মেও নজরুল (১৮৯৯-১৯৭৬) স্বতন্ত্র্যেও অধিকারী। রবী ঠাকুরের দুর্দন্ড প্রতাপ সাহিত্যাকাশের চতুর্দিক উদভাসিত করে রাখলেও নজরুলের ভাষা প্রকাশভঙ্গীও কাব্যরীতি সম্পূর্ণ পৃথক পথে অভিব্যক্ত হলো। তার কাব্যে, গানে, কবিতায় কোথাও রবী ঠাকুরের ছায়াপাত ঘটেনি। অধিকন্তু, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের (১৮০০) পৌরহিত্যে রচিত মহাভারতীয় সহিত্যে অবোধ্য ও দুর্বোধ্য সংস্কৃত বহুলতার যে আড়ষ্টতা মুস্লিম কবি-সাহিত্যিকদের সম্মুখে এতকাল প্রতিবন্ধকতার একটি দুর্লংঘ্য প্রাচীর গাড় করিয়ে রেখেছিল, নজরুল নির্দ্বিধায় তা ঝেড়ে ফেলেদিলেন। আর্য-সাংস্কৃতিক যুগটা বাংলাভাষী মুসলমানের জন্যে ছিল একটা মহাসংকটের সময়। আর্য সাংস্কৃতিক রেনেসাঁর যুগে দুর্দশাগ্রস্থ ব্ংালাভাষী মুসলমানদের সমস্ত শংকা ও হীনমন্যতা ছুড়ে ফেলে দিয়ে ‘লা শরীক আল্লাহর’ তৌহিদের বাণী বাংলাভাষার শিরা-উপশিরা-অস্থি-মজ্জায় বেমালুম প্রবাহিত করে দিলেন নজরুল।
আরবী, ফার্সি ও উর্দ্দভাষায় মুসলিম জগতের শ্রেষ্ঠতম সাহিত্য, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞান লিপিবদ্ধ রয়েছে। তা সকলদেশের মুসলমানদের অবহিত হওয়া কর্তব্য। অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য যে কোন জাতির মারস চেতনার একটি অতি মজবুত ভিত্তি, যার উপর দাড়িয়ে ভবিষ্যত স্বপ্ন নির্মাণ করা যায়। তাই যে আরবি ফার্সি শব্দ সম্ভার একদা বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি সাধন করে বর্জিত হয়েছিল, সে ভাষার সাহিত্যিক প্রয়োগ করে নজরুল নতুন ভাষা সৃষ্টির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্য-তাহজীব-তমদ্দুন ও ইসলামী বীরত্ব গাঁথাকে সাহিত্যে রূপদান করে গেয়ে উঠলেন ‘লাল শিয়া অসিমান, লালে লাল দুনিয়া, আম্মা, লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া’ ‘কান্ডারী ! এতরীর পাকা মাঝি-মাল্লা, দাড়িমুখে সারি গান লা শরীক আল্লাহ’’ ‘‘দিকে দিকে পুনঃ জ্বলিয়া উঠিছে দ্বীন ইসলামী লাল মশাল ; ওরে বেখবর ! তুই ও উঠ জেগে, তুইও তোর প্রাণ প্রদীপ জ্বাল’’ । তৌফিক দাও খোদা ইসলামে মুসলিম জাহা পুনঃ হোক আবাদ। দাও সে সালাহ দ্বীন, পাপ দুনিয়ায় ফের চলুক জেহাদ। বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মুসলিম ধারা ও নব সাহিত্য চেতনা সূচিত হওয়ার ফলে বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষা ভিত্তিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্টতর হয়ে উঠে, যার কারনে ১৯৪৭ এ পশ্চিম বঙ্গ থেকে পৃথক হয়ে একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে সমর্থ হয়েছিলাম আমরা।
হামদ, নাত, কাওয়ালী, ভাটিয়ালী, মারফতি, মুর্শিদী, জারি, সারি, গান-গজল ও কবিতার সার্বজনীন আবেদনের জন্য নজরুল শুধু মুসলমানের নিকটই ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন্নি; বঞ্চিত ও নির্যাতিতের পক্ষে এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার লেখনি তাকে বাড়তি জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল। বর্তমান শতাব্দির বিশের দশকে বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে নজরুলের কাব্যে ভারতীয় জন-মানসের অস্থিরতা ও মুক্তির আকুলতা চিত্রিত হয়ে উঠে। প্রথম মহাযুদ্ধেও পর হতে ১৯৪২ সনের ৯ই আগষ্টে নির্বাক হয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সম্পাদনা, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, নাটক রচনা, অন্যের নাটকে সঙ্গীত রচনা, সুর সৃষ্টি, বক্তৃতা, মঞ্চও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নজরুল শুধুমাত্র বাংলার শিল্প রসিক ও সাহিত্য মোদীদের হৃদয়ই জয় করেননি; বিদ্রোহের সুর তুলে, ভাষার গান গেয়ে পদতলের উতলা ধরনীর অশান্ত-অবদমিত জনগোষ্ঠীর মানস পটে নিজের আসন প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছিলেন। ক্ষুদ্ধ ও বঞ্চিতের মাঝে অনিবার্য কওে তুলেছিলেন নিজের অস্তিত্বকে। পরম ¯েœহে শ্রদ্ধায় ও সমাদরে গ্রহনীয় করে তুলেছিলেন হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে নিজেকে।
বাল্য ও কৈশোরে রবী ঠাকুরের জীবন যাপন ছিল অপরিমিত পারিবারিক ¯েœহ-ভালবাসা, বিত্ত সাচ্ছল্য এবং প্রভুত শিক্ষা সুবিধাদি ঘেরা। তাই অঢেল বিত্ত বৈভব ও মান মর্যাদার অধিকারী রবী ঠাকুর সামাজিক জীবনে ছিলেন সুখী ও অতি মাত্রায় তৃপ্ত। তিনি প্রবলভাবে বেঁচেছিলেন। কার্যত ঃ বাল্য ও কৈশোরে নজরুল ছিলেন পুরোপুরিভাবে ¯েœহ-ভালবাসা বঞ্চিত ও অভিভাবকহীন। রবী ঠাকুরের জৌলুস পূর্ণ প্রলম্বিত জমিদারি জীবনের বিশাল বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও কাব্যকৃতির মজবুত পটভূমি সহায়-সম্বল হীন রাজনৈতিক উদ্বাস্তু ও রাজদ্রোহী নজরুলের সহিত্য চর্চার জীবন থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল। নজরুলের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া ছিল শিয়ালসোল হাই স্কুলের দশম শ্রেনী এবং স্বল্প সময়ের জন্য বাড়িতে কিছু কিছু আরবি-ফার্সি চর্চা। তাঁর স্কুল কলেজের প্রথাগত শিক্ষার শূণ্যতা পূরণ করেছিল বুনেদী পরিবারের ঘরোয়া পরিবেশ, তীক্ষè প্রতিভা, বিরাট ফার্সি-সাহিত্য সংস্কৃতি, হিন্দু শাস্ত্র ও পৃথিবীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কিত দারুন বুদ্ধিদীপ্ত আধুনিকতম ধারনা। নজরুলের চেয়ে তিন গুন বেশী সময়ে সাহিত্য সাধনা করে রবী ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে একক বৈশিষ্টে প্রতিষ্ঠালাভ করেন। নজরুল রবী ঠাকুরের পূর্ণ বিকশিত কালের সমসাময়িক। খেলাফত আন্দোলন থেকে ভারত ছার আন্দোলনের মধ্যবর্তী শান্ত সময়টুকুর মধ্যে নজরুলের যাত্রা শুরু হয় এবং এরই মধ্যে ঘটে তাঁর মহা প্রস্থান। রাজদন্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত, রুটিরুজির চিন্তামগ্ন যাযাবর সম নজরুল একটি বিশাল মহীরুহের ছায়া তলে ক্ষুদ্র কিশলয়সম রবী ঠাকুরের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও ছোঁয়া থেকে নিজেকে মুক্ত ও নিরাপদ অবস্থানে রেখে নিজস্ব রীতিতে সাহিত্য সাধনা করে এক নবযুগের আগমন বার্তা ঘোষনা করেন। তাই নজরুল একজন যুগ¯্রষ্টা কবি। বাংলার সাহিত্যাকাশে রবী রশ্মিও মাধ্যমিক প্রাচুর্য্যরে সময়ে নজরুলের আবির্ভাবে শুধু মুসলিম সাহিত্যই নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের মোড় ফিরে যায়। যে সময়ে মীর মোশারফ হোসেন ও মহাকবি কায়কোবাদ স্ব স্ব রচনায় ঈশ্বর ও পরমেশ্বর শব্দ ব্যবহার না কওে পারেন্নি, সে সময়ে নজরুলের লেখায় একদিকে যেমন রাজশক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন ধিকি ধিকি করে জ্বলে উঠে, তেমনি স্বীয় মহীমায় সমুজ্জল ইসলামের গৌরব দীপ্ত জয়গান ‘‘ধর্মের পথে শহীদ যাহারা, আমরা সেই সে জাতি, সাম্য মৈত্রি এনেছি আমরা, বিশ্বে করেছি জ্ঞাতি—’’, ‘‘ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ—’’, ‘‘খয়বর জয়ী আলী হায়দার জাগো আর বার, দাও দুষমন দর্গ বিদারি দুধারি তলোয়ার’’, ‘‘ কারো ভরসা করিসনে তুই, এক আল্লাহর ভরসা কর, আল্লাহ যদি সহায় থাকেন, ভাবনা কিসের, কিসের ডর’’ পাবিনারে তুই পাবিনা খোদাওে ব্যথা দিয়া তাঁর মানুুষের প্রাণে… সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে’’, ‘‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান, কোথা সে মুসলমানৃ’’ ‘‘বাজিছে দামামা, বাধঁরে আমামা শির উঁচু করি মুসলমান…’’, ‘‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে, এলো নবীন সওদাগর, দে যাকাত, দে যাকাত, ও তোর দিল খুলবে পরে, ও তোর আগে খুলুক হাত…’’, ‘‘তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখেছ কি তার প্রাণ; অন্তওে তার মমতা নারী, বাহিরে শাহজাহান… জেগে উঠ হীনবল ! আমরা গড়িব নূতন করিয়া ধূলায় তাজমহল…’’, প্রভৃতি আতœপ্রত্যয়ী আহবান আশান্ত-শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির দিগন্ত উন্মোচিত করে।
নজরুলের কোরবানি, মুহররম, রণভেরী, শব-ই-বরাত, সাত-ইল-আরব, খেয়াপারের তরণী, নওরোজ, ঈদেও চাঁদ, বকরীদ, ঈদ মোবারক, খোশ আমদেদ, অঘ্রানের সওগাত, মরুভাস্কও, আজাদ, খালেদ প্রভৃতি জাগরন মূলক রচনায় নজরুলের কন্ঠে ইসলামের অমিয় প্রাণ বানী ধ্বনিত হয়েছে। ইসলামের আদর্শ-দর্শন থেকে সরে পড়া মুসলমানদের কুসংস্কার ও গতানুগতিকতার পথ থেকে ফিরিয়ে এনে একটি অতীত সচেতন জনগোষ্ঠীতে পরিনত করে। অতীত সচেতন পশ্চাদ পদানত। এই অতীত সচেতনতাই এক সময়ে পাশ্চাত্যে অতীত-প্রিয়তার জন্ম দিয়ে রেনেসাঁর উদ্ভব ঘটায়। অতীত এবং বর্তমানের ভেদ থেকেই ভবিষ্যতের ভাবনা ও দিক নির্দেশনা স্ফুরিত হয়। এসকল জাগরনধর্মী গান ও কবিতাতে স্ব-সম্প্রদায়ের স্বপ্ন-আশা-আকাংখা চেতনার মূর্ত প্রতীক নজরুল। সকল নির্যাতন জুলুম-শোষন ও সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শোচ্চার ছিলেন নজরুল। একুশ বৎসর বয়সে বিদ্রোহী নামক জ্বালাময়ী কবিতা লিখে সকলের প্রিয় হয়ে উঠেন তিনি। শুধুমাত্র দেশীয় বা জাতীয় চেতনা-অনুভূতিই তাঁর রচনায় প্রতিভাত হয়নি। মানুষের স্বাধীনতা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি বলেন- প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদেও সর্বনাশ। বিদ্রোহী কবিতায় যখন নজরুল বলেন- আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার, নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শানিÍ, শান্ত উদার- তখন পাক-ভারত-বাংলা উপমহাদেশের স্বেচ্ছাচারী পাশব শক্তিকে উৎখাত করে অনাবিল শান্তি আনয়নই তার লক্ষ্য নয়, গোটা বিশ্বের শান্তি তাঁর লক্ষ্য। জগত জুড়িয়া এক মানব জাতির চিন্তা চেতনা দর্শণ তাতে পরিস্ফুট। আমি উত্থান, আমি পতন, আমি বিশ্ব তোরনে বৈজয়ন্তী মানব কেতন’ এখানে স্বদেশ চেতনা, স্বদেশ বা জাতি বিশেষিত হয়নি। স্বাজাত্যবোধ বা স্বাদেশিকতা তাকে সীমায়িত করে রাখতে পারেনি। এ উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খৃষ্টান সবাই মিলে-মিশে বাস করছে এবং সবার প্রথম পরিচয় মানুষ। নজরুল মানুষের কবি। ধর্ম হোক, শোষন হোক, অন্যায় অত্যাচার হোক সবক্ষেত্রেই মানুষের মর্যাদা দিয়েছেন তিনি। সবার উপরে মানুষ যে শ্রেষ্ঠ, তা তিনি ঘোষনা করেছেন উচ্চকন্ঠে। তিনি সেই মানুষের জয়গান করেছেন, অত্যাচারিত, শোষিত মানুষের কথা বলেছেন নির্ভয়ে, সত্যের পথে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে বারবার, অত্যাচার, জেল, জুলুম তাকে দমাতে পারেনি। জয় নিপীড়িত প্রাণ, জয় নব অভিযান, জয় নব উত্থান’। বিশ্বের ভাবানুভূতির প্রতিবিম্বন এখানে দৃশ্যমান।
আমাদের কন্যা, জায়া, জননীদের মহিমা প্রচারের লক্ষ্যে তিনি ঘোষনা করেন সর্ব প্রথম মুসলমান নর নহে, নারী। বিশ্বে যা কিছু চির কল্যাণকর, অর্দ্ধেক তার আনিয়াছে নারী, অর্দ্ধেক তার নর, বিশ্বে যা কিছু এলো পাপ-তাপ, অশ্রুবারি, অর্দ্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্দ্ধেক তার নারী। এখানে শুধু বাঙ্গালি নর ও নারী কবির দৃষ্টি আবিষ্ট করে রাখেনি। খালেদ ! খালেদ ! ভাঙ্গিবে নাকি হাজার বছরি ঘুম, মাজার ধরিয়া ফরিয়াদ করে বিশ্বের মজলুম। আমি কভু প্রশান্ত, কভু অশান্ত, দারুন স্বেচ্ছাচারী। যুবাদের লক্ষ্য কওে নজরুল বলেন- ধর্ম-বর্ণ, জাতির উর্দ্ধে জাগরে নবীন প্রাণ, তোমার অভ্যুদয়ে হোক সব বিরোধের অবসান; সংকীর্ণতা, ক্ষুদ্রতা ভূল, সকল মানুষের উর্দ্ধে তুলিয়া ধর। মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান। নারীরে দিয়াছি মুক্ত, নর সম অধিকার, মানুষের গড়া প্রাচীর ভাঙ্গিয়া, করিয়াছি একাকার। এ সবই হলো নজরুলের মানবতার গান। সকল গন্ডি ও সীমামুক্ত চেতনাই কাজ করেছে নজরুলের রচনায় যা কোন দেশ বা জাতির একার নয়, বরং সারা বিশ্বের।
খালেদ ! খালেদ ! ফজর হলো যে আজান দিয়েছে কে¦ৗম। ঐ শোন আস্্-ছালাত খাইরূম মিনান নৌম ! ঘুমাইয়া কাজা করেছ ফজর, তখনো জাগোনি যখন জোহর; হেলায়-খেলায় কেটেছে আছর, মাগরিবের ঐ শোন আজান; জামাতে শামিল হওগো এখনো জামাতে আছে স্থান। নজরুল বিহনে কেউ বল্তে পারতোনা ‘‘শহীদি ঈদগাহে দেখো আজ জমায়েত ভারী, হবে দুনিয়াতে আবার ইসলামী ফরমান জারি। ঘোষিল অহুদ আল্লাহু আকবার, ফুকারে তুর্য তুর পাহাড় ! মন্ত্রে বিশ্ব রন্ধ্রে রন্ধ্রে আল্লাহু আকবার… । তুমি জাগো মুক্ত বিশ্বের বন্য শিশু তুমি, তোমায় পোষ মানায় কে? আল্লাহু আকবার তোমার হুঙ্কার ! আলী তোমার হুঙ্কার। কবি কাজী নজরুল না এলে, বিশ্ব মুসলিম মানস এমনি স্বচ্ছ, সুন্দর, সাবলীল ভাবে সাহিত্যে ফুটিয়ে তুল্তে পারতোনা আর কেউ ? নজরুল নিজেকে সকল দেশের, সকল মানুষের বললেও তার কাব্য-সাহিত্যে নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ ও স্বরূপ তুলে ধরেছেন, যা একান্ত ভাবে খন্ডিত বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় স্পন্দন ও আতœার প্রতিবিম্ব। তাঁর সাহিত্য সত্ত্বায় ও চিন্তার আতœায় যে আদর্শ অঙ্গা অঙ্গি ভাবে জড়িত, তার কারনেই ওপার বাংলায় ক্ষুদ্রহয়েছেন নজরুল-উপেক্ষিত, অবহেলিত, অশ্রদ্ধেয়, সমালোচিত ও চর্চার অযোগ্য হয়েছেন তিনি।
নজরুলের সাহিত্যে-কবিতায় ও সঙ্গীতে শুধু হিন্দু-মুসলিমই নয়, সবধর্ম, বর্ণ, গোত্র-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের আবেগ-অনুভূতির স্বচ্ছ অভিব্যক্তি ঘটেছে। একদিকে যেমন ভক্তমনের গভীর অনুভূতি দিয়ে শ্যামা সঙ্গীতে নিজেকে উজাড় কওে দিয়েছেন- যেখানে হিন্দু বৈষ্ণব কৃষ্ণের লীলা খেলায় আতœভোলা; শাক্তহিন্দু কালির পদতলে আলোর নাচন দেখে উল্লোসিত হন; অচ্ছুৎক্ষুদ্র আপনার মাঝে রুদ্রের আবির্ভাব লক্ষ্য করেন-অপর দিকে তেমনি মুর্দে মুমিন আপন বক্ষে পবিত্র কাবার ছবি দেখেন, ঈদের চাঁদ দেখে খুশীর ফোয়ারা বইয়ে দিয়ে বলবেন ‘মোবারক হো’ এখানেই নজরুলের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও কৃতিত্ব। এ ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি নেই।
রবী ঠাকুরের অনন্য সাধারন ও ঐন্দ্রজালিক সৃষ্টি প্রতিভায় বাংলা কব্যেও ভাষাছন্দ, আঙ্গিক ও সামগ্রিক পরিবর্তন ও রূপান্তর সাধন করে স্বতন্ত্র্য রবীন্দ্রিক কাব্যভাষা তৈরী করেছেন। তাঁর চিরায়ত সাহিত্যের ব্যাপ্তি এতই বিরাট ও বিশাল যে এক জীবনে তা পড়া শেষ করা যায়না। রবী ঠাকুরের শ্রেষ্ঠত্বে কারো দ্বিমত নেই। বাংলা ভাষাভাষী বাঙ্গালি কবি হিসাবে তাঁর সাহিত্য কর্ম আমাদের গর্বের বস্তু। তাই রবী ঠাকুরকে নিয়ে আমাদেও গর্বে-শ্রদ্ধায় এতটুকুন কার্পণ্য নেই। তা তাঁর জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকী, কবিতা, সঙ্গীত, আলোচনা-আবৃত্তির আসরের সংখ্যা, ব্যাপ্তী-ব্যপকতা ও জৌলুস এবং মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ-উদ্দীপনা থেকে অতি সহজেই অনুমেয়। তারপরও স্বীয় ধর্ম ও জাতিগত অনুভূতি ও ভাবাবেগের বাইরে যেতে পারেননি রবী ঠাকুর। বাংলা ভাষার বিবর্তন ও বিকাশের ক্ষেত্রে ফার্সি সংস্কৃতি ও পার্সি ভাষার প্রভাব; আরবী-ফার্সি-উর্দ্দু-তুর্কী শব্দ ও অলংকার সম্ভার যে বাংলা ভাষার সৌন্দর্য্য, সাবলীলতা ও অর্থবহতা বৃদ্ধি করেছে তার কোন পরিচয় বা ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার রবী ঠাকুরের রচনায় নেই। স্ব সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যানু প্রিয়তা ছাড়া তাঁর সাহিত্যে মধ্যযুগীয় আরবী-ফার্সি-উর্দ্দু-তুর্কী শব্দ সম্বলিত ভাষার এবং ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমগ্র জন মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় মিলেনা। প্রকারান্তওে, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের তৎসম পন্ডিতদেও সৃষ্ট এবং সংস্কৃত শব্দ সমন্বিত ভাষার ক্রম বিবর্তিত ধারাটিই পরিদৃষ্ট হয়। মধ্যযুগে পারসিক ভাষা-সংস্কৃডু ও আধুনিক যুগে ইউরোপীয় সংস্কৃতির ছোঁয়াচ এসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে শুধু উপাদানগত দিক দিয়েই সমৃদ্ধ হয়নি, ভাষার রূপ-রীতি-শব্দ সম্ভার ও প্রকাশ ক্ষমতার দিক দিয়েও বলীয়ান হয়েছে। বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালি সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংমিশ্রনে শংকামুক্ত মন নিয়ে নজরুল যে বাংলা সাহিত্য রচনা করেছেন তা হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই সাহিত্য।
বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনের শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তিদের জীবনাচরন থেকে এটিই স্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত হয় যে, সৎ এবং মহৎ লেখকের কোন জাত বিভাজন নেই। তিনি শুধু ব্যাক্তি বা ব্যাষ্টি নন। তিনি সাকল্য এবং সমষ্টি। তার থাকেনা শ্রেনী ও বর্ণ বৈষম্য ও ধর্মাধর্ম ভেদ। তিনি সততঃই নিরপেক্ষ, নিরাসক্ত ও নিরহঙ্কার। তিনি সকল দেশের সকল কালের। চিত্তের শুদ্ধতায় ও মন মানসের প্রসারতায় তিনি দেশ-কাল ও কৌলিন্যেও কালিমা মুক্ত। দেশের সকল অঞ্চলের সব সম্প্রদায়ের মানুষকে ভালবাসাই তার লক্ষ্য। দেশের কোন সম্প্রদায়ের মানুষকে ঘৃণা-অবজ্ঞার চোখে দেখা বা স্বীয় শিল্প-সাহিত্যে অনুল্লেখ্য রাখার অর্থ জাতীয় ঐক্যে আঘাত হানা। সাবেক পূর্ব বাংলার কুষ্টিয়ার শিয়ালদহে, পাবনার সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ও নওগাঁর পতিসরে জমিদারে দেখতে এসে পানসি চড়ে কখনো বা আটবেহারা বাহিত পালকিতে বসে এ দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী মুসলমানদেও খুব কাছ থেকে দেখেছেন রবী ঠাকুর। তবু মানসিক কারনে সীমা ডিঙ্গিয়ে যেতে পারেননি তিনি। ঐতিহাসিক সচেতনতার অভাব, জাতিগত সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িক গন্ডিবদ্ধতার কারনে মুসলিম ইতিহার-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি তাঁর রচনা প্রচন্ডভাবে অনুপস্থিত। আপামর জনসাধারনের সকল অংশের অনুভূতির মূল্য ও স্বীকৃতি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি তার রচনায়। ক্ষেত্র বিশেষে উহা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আশা আকাঙ্খার সঙ্গে বিরোধ পূর্ণ তার আদি পুরুষ নীলরতন ঠাকুর মুসলিম দরবারে একজন আমিন বা সার্ভেয়ারের পদে অধিষ্ঠিত থেকে কলকাতার জোড়াসাকোঁর ভবিষ্যত জমিদারির ভিত রচনা করে দিয়ে গিয়েছিলেন। তদুপরি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আর্থ সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের ভিত্তিতে মধ্যযুগের শত শত বৎসর ব্যাপী মুসলিম শাসনামলে বেনিয়া ইংরেজ প্রদত্ত সুবিধা ভোগী হিন্দুদের পূর্ব-পুরুষগন মুসলিম পোষাক পরে, ফার্সি ভাষায় কথা বলে বাদশাহ-সুলতান-নবাবদের উদার অনুগ্রহ লাভে ধন্য হয়ে সুখী সুন্দর জীবন যাপন করলেও রবী ঠাকুরের মতো এক বড় প্রতিভা সে কৃষ্টিবান সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ভাষার স্থান দিয়ে অমরত্ব দানে দুঃখজনক ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এজন্যই অনন্য সাধারন প্রতিভা ও সৃষ্টিধর্মী ক্ষমতার অধিকারী যুগ ¯্রষ্টা কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালি সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রকৃত রূপকার।
নজরুলের আবির্ভাব না ঘটলে মধ্যযুগীয় মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্য রবী ঠাকুরের নিশীথ রাতের দুঃস্বপ্নের মতো সময়ের সমুদ্রে বুদবুদেও ন্যায় অলক্ষ্যে মিলিয়ে যেতো। রবী ঠাকুরের সাহিত্যে কদাচিত কোথাও মুসলিম প্রসঙ্গ এলে, মুসলিম চরিত্র চিত্রনে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কুৎসিত সাম্প্রদায়িকতার লাশ করা হয়েছে, যেমন- আব্দুল মাঝি ছুঁচলো তার দাড়ি, গোঁফ তার কামানো, মাথা তার ন্যাড়া; স্লেচ্ছ সেনাপতি এক মুহমদ ঘোরী তস্করের মত আক্রমিতে দেশ। পাঠান-মোঘলদের শাসন ভারতবর্ষেও ইতিহাস নয়, নিশীথ রাতের দুঃস্বপ্ন কাহিনী মাত্র। বহিরাগত আর্য অধঃস্তন রবী ঠাকুরের রচনায় বাংলাভাষী মুসলমানের কি অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা ও অনীহা মিশ্রিত চমৎকার মূল্যায়ন। এগার সিন্ধুর দুর্গের সম্মুখে রাজপুত্র সেনাপতি মানসিংহের সঙ্গে ঈশা খাঁনের ইতিহার খ্যাত যুদ্ধ ও সন্ধি সম্পাদিত হয়। রাজপুত্র সেনাপতি মানসিংহের ভগ্ন তরবারির সুযোগ পেয়েও অসহায় প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি বীরোচিত উদারতা ও সৌজন্য প্রদর্শন করে ঈশা খাঁ স্ব সম্প্রদায়গত মানসিক প্রশস্ততার অত্যুজ্জ্বল আদর্শ স্থাপন করে গেছেন। হত্যার বৈধ সুযোগ হাতের মুঠোয় পেয়েও মুসলিম বীর ‘‘মারি অরি পারিযে কৌশলে’’ যুদ্ধনীতির আশ্রয় নেননি। মানবতার এরূপ বিরল ঘটনা রবী ঠাকুরের রচনায় অনুল্লেখ্য থাকলেও, মুঘল সেনাপতি আফজাল খাঁর সঙ্গে এটে উঠতে না পেরে শঠতার ভান কওে নিজ শিবিরে আমন্ত্রন করে এনে কাপুরুষ শিবাজী আপোস-আলোচনার নাম করে নিরস্ত্র অবস্থায় অতর্কিত আক্রমন করে আফজাল খাঁকে হত্যা করেও সে ধূর্ত পার্বত্য মুষিক পতিত পাবন শিবাজী রবী ঠাকুরের পরম পূজনীয়। এক ধর্ম রাজ্য পাশে খন্ড, ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত ভারতকে বেধে দেওয়ার প্রশস্তি গেয়েছেন রবী ঠাকুর। জানিয়েছেন সশ্রদ্ধ পনতি। ছেলে ঘুমাল পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে, সেই বর্গী বা মারাঠা লুন্ঠনকারীরা ছিল বাংলার ত্রাস। তাদেরই কেন্দ্রীয় ব্যাক্তি শিবাজীকে দিয়ে পাঞ্জাব, সিন্ধু, গুজরাট, মারাঠা, দ্রাবিড়, উৎকল, বঙ্গ নিয়ে অখন্ড ভারত গড়ার লক্ষ্যে রবী ঠাকুর বলেন- এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে, এক কণ্ঠে বলতো জয়তু শিবাজী, মারাঠীর সাথে আজিহে বাঙ্গালি এক সঙ্গে চলো মহোৎসবে সাজি। তারপরও রবী ঠাকুর মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক। রবী ঠাকুরের সাহিত্যে বিধৃত সংস্কৃতির মূল উৎস আর্য সংস্কৃতি, যা নীরেট হিন্দু জাতিয়তাবাদ থেকে উদ্ভূত, যার সঙ্গে বাংলাভাষী মুসলমানের আহার-বিহার, আচার-আচরন, সমাজ সংগঠন, মন-মানস-চেতনার কোন প্রকার সংগতি বা মিল নেই। একমাত্র ভাষাগত মিলের কারনে এদেশীয় বচনবাগীষ বঙ্গসংস্কৃতি সেবীরা অধূনা রবী ঠাকুরকে বাঙ্গালি জাতিয়তাবাদের রূপকার ও পথিকৃত বলে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। সামাজিকভাবে বাহ্যিক কিছু কিছু মিল থাকলেও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ বলে কোন সংস্কৃতির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব আজও কেউ খুঁজে পায়নি। আর যদি স্বার্থবাদী কোন মহলের দৃষ্টিতে এমন জিনিসের অস্তিত্ব ধরা পড়ে থাকে, তাহলেও দুয়ের মধ্যে কোন আতিœক সম্পর্ক নেই। সেই জন্যই ঋষিরাজ বলেছেন- বাংলা শুধু দেহেই দুই নয়, অন্তরেও দুই। তারপরও ভারত পন্থী বুদ্ধিজীবীরা এ দেশে রবীন্দ্রিক ভাব বিপ্লব ঘটানোর অপপ্রয়াসে সদাব্যস্ত।
বাংলা ভাষাভাষী রবী ঠাকুরকে এপারে যতোই ধূপ-ধূনাবেষ্টিত বিশাল আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হোক না কেন- ভারত কখনো রবী ঠাকুরকে জাতীয় ভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেনি; বরং ভারতের পঁচিশটি প্রদেশের একটি মাত্র প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্র চর্চাও রবীন্দ্র শ্রদ্ধা ক্ষুদ্র পরিসরে সীমায়িত রাখা হয়েছে। এপারে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে গিয়ে যে আন্দোলন ও আতেœাৎসর্গেও উজ্জ্বল নজীর স্থাপন করা হয়েছে, তার বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গে ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তা গড়ে উঠেনি। পশ্চিবঙ্গবাসীরা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের গ্যাঁড়া কলে আটকে গেছে। আধুনিক বাঙ্গালি হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা মধ্যযুগীয় মুসলিম বাদশাহ-সুলতান-নবাবদের আস্তাবল ও পিলখানার লস্করদের কথ্যভাষা হিন্দিকে এককালে খুবই ঘৃনা করতেন। সেই হিন্দিকে হিন্দু সংস্কৃতির ধারক বাহক হিসাবে ১৯৬৫ সনের ১১ই ফেব্রুয়ারী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা বিনা প্রতিবাদে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা প্রদান করে। সারা ভারতের শতকরা পঁয়ত্রিশ ভাগ লোকের মুখের ভাষা হিন্দির বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত পশ্চিবঙ্গের তুখোর বাঙ্গালীরাও একদিন আন্দোলনে নামেনি। আমরা সগৌরবে আমাদেও বাঙ্গালিত্ব বজায় রেখে চলছি। নিজেদেও বাংলাভাষাটি ও টিকিয়ে রাখতে পারেনি তারা। বাঙ্গালিদের রাষ্ট্র ভাষা হলো হিন্দি এবং জাতীয়তা হল ভারতীয়। বাঙ্গালি বলে বিশ্বে কোন পরিচয় দেবার সুযোগটিও রইলনা তাদের। তারপরও এপারে এসে বাঙ্গালি বলে শুঁড়-শুঁড়ি দিয়ে আমাদের একতাও সংহতি বিনষ্ট করার অশুভ পাঁয়তারা করছে। অধিকন্তু, রবী ঠাকুর নিজের হিন্দুত্ব বজায় রাখার জন্য বাঙ্গালি নয়, ভারতীয় জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল ছিলেন। বঙ্গ সংস্কৃতি সেবীরা হয়তো ওয়াকেফহাল নন যে, হালে দুরদর্শনের বাঙ্গালি সঙ্গীত শিল্পীরা ভীষনভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন, আকাশ বানীর কর্তৃপক্ষীয় বিমাতাসুলভ আচরনে। কলকাতার সাহিত্যিকরা মনে করতেন বাংলা সাহিত্য চর্চা কেবল কলকাতাতেই হয়, অন্য কোন খানে হয়না। সেদিন আর নেই। বর্তমানের কলকাতায় বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য হিন্দু ভাষা ও হিন্দুয়ামী সংস্কৃতির চাপে মৃতপ্রায়। তাইতো কলকাতার সাহিত্যিক সম্পাদকদের দেখা যায় বাংলাদেশে তাদের বই-পত্র-পত্রিকার বাজার খুঁজতে, কেননা সমাদরের অভাবে কলকাতার উঁচুমানের পত্রিকা দেশ বাংলাদেশের বাজার হারিয়ে অপমৃত্যুর প্রহর গুনছে।
ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনা ও ভেদবুদ্ধির উর্দ্ধে থেকে লেখক যদি আপন দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহিত্য বিচার নিরপেক্ষ ও আবেগহীন না রাখেন, তাহলে সাহিত্য কর্মের রূপ পালটে যায় এবং সত্য চলে যায় বহু দুরে। রবী ঠাকুরের প্রতিভার শ্রেষ্ঠত্বে কারো কোন রূপ মত বিরোধ না থাকলেও, তাঁর কাছ থেকে আমাদের যতটুকু নেবার, তা আমরা নেব তাঁর মাঝে যা আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার পরিপন্থী, তা আমরা মেনে নিতে পারিনা। তাই রবীন্দ্র বঙ্গসেবীদের উপলব্ধি করা উচিত রবী ঠাকুরের প্রতি আমাদেও শ্রদ্ধা-অনুরাগ সাহিত্যের পরিমন্ডলে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি দোষনীয়।
পর সম্প্রদায়কে বিন্দুমাত্র আঘাত না করে স্বধর্ম ও স্বদেশের উন্নয়ন ও সংহতি সাধনের আন্তরিক প্রয়াস ও নির্মল বানী অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীকী পুরুষ নজরুলের সাহিত্যে দেদীপ্যমান। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি কোন বিদ্বেষ কোন ঘৃণা বা কটুক্তি নজরুল সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। হিন্দু ও মুসলিম ধর্ম-কৃষ্টি, সমাজ ব্যবস্থা ও জীবন যাত্রা প্রনালীর বিভিন্নতা সত্বেও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের আদর্শ, সাম্য ও মৈত্রীর সদিচ্ছা লালন করে কবি কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কবি হিসাবে সমাদৃত। তাইতো পশ্চিম বঙ্গেও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অন্নদা শংকর রায় বলেন- ভূল হয়ে গেছে বিলকুল, আর সব ভাগ হয়ে গেছে, ভাগ হয়নি কেবল নজরুল। তারপরও ওপারের দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায় ও দীপক রায়ের আধুনিক বাংলা কবিতা সংকলন-এ ৬৩ জন কবির কবিতা স্থান পেয়েছে। সম্প্রতি এদেশের কবি শামছুর রহমান যাদবপুর য়ুনিভার্সিটি কর্তৃক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত হলেও বাবুদের আধুনিক বাংলা কবিতা সংকলনে কোন বরাদ্দ পাননি। এ কুলের জীবনানন্দ দাস সীমান্ত পেরিয়ে কোন রকবে বাংলা কবিতা সংকলনে ঠাঁই কওে নিতে পারলেও আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, ফররুখ আহম্মেদ, আল-মাহমুদ প্রমুখ বাংলাভাষী একজন মুসলিম কবি ও ওপারে কবিদের পংক্তিভূক্ত হতে পারেননি। এরূপ একটি নিকৃষ্ট সাম্প্রদায়িক দুর্গন্ধময় মনোভাব নিয়ে সম্পাদিত গ্রন্থ ও এদেশের কতিপয় বই বেপারী তাক সাজিয়ে রেখেছেন ঢাকার বাজারে।
মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্য ও অনুষঙ্গ যেমন রয়েছে নজরুলের জারি, সারি, মুর্শিদি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, গানে-গজলে-সঙ্গীতে যা বিদেশী সা¤্রাজ্যবাদেও বিরুদ্ধে এক জেহাদী ফরমানের ন্যায় মর্দে মুমীনের দীলকে উদ্বেলিত করেছিল তেমনি হিন্দু ঐতিহ্য মন্ডিত ভজন-কীর্তন-শ্যামা-বাবু-ভক্তি গীতি ও পদাবলীতে হিন্দুমাহাতœ্য বর্ণনা করেছেন। বিদ্রোহী কবিতায় আরবী-ফার্সি-উর্দ্দু-তুর্কী শব্দের পাশাপাশি হিন্দু পুরাণের অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছেন নজরুল। এ জ্যোতির্ময়ী প্রতিভার কারনেই বঙ্গ সরস্বতী ও নজরুলকে সম-সাময়িকতার স্বচ্ছ দর্পণ পদবী প্রদানে কুন্ঠিত হননি। কোরআনও পুরানের সমন্বয় প্রয়াস নজরুলের প্রায় সব কবিতাতেই পরিদৃষ্ট হয়। দুর্ভাগ্য বশতঃ এ অখন্ডকে খন্ডিত করে কেউ কেউ বলেন- নজরুল ইসলামী কবি। আবার কারো কারো দৃষ্টিতে উনি শ্যামা সঙ্গীত রচয়িতা। আর কেউ বলেন- তিনি খন্ডিত কবি; তিনি সার্বজনিন কবি নন। মুসলমানের সদিচ্ছাকে সহিত্য রূপ দিতে গিয়ে নজরুল হয়েছেন সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল। ব্যাক্তি ও কর্ম জীবনে বরাবরই নজরুল ছিলেন বিরূপ পরিস্থিতির শিকার। প্রতিকুলতা ও বহুবিধ প্রতিব›দ্ধকতা তার প্রতিভার সম্যক বিকাশ দারুনভাবে ব্যাহত করেছে। এরূপ পরিবেশ ও পরিস্থিতির শিকার না হলে নজরুল আরো বড় হতে পারতেন, আরো মহত্তর কবিতা-সঙ্গীত-সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারতেন। ধর্মেও প্রতি বিশ্বাসই যদি নজরুলের অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে স্বধর্মের প্রতি বিশ্বাসের কারনে রবীঠাকুর বড় অপারাধী। হিন্দুত্ব ছাড়া অন্য সব কিছুর অস্তিত্ব মুছে ফেলার লক্ষ্যে তিনি বলেছেন ‘‘এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে, এ মহাবচন করিব সম্বল’’। মহাতœা গান্ধীও ইয়াং ইন্ডিয়াতে বলেছেন ‘‘আমি আমার নিজের মক্তির জন্য সব কিছুর চেয়ে বড় করে দেখি ধর্মকে। তাই আমি সর্বপ্রথম হিন্দু, তারপর দেশ প্রেমিক’’।
নজরুলের কবি-মানসের সঙ্গে একটি অতি উজ্জ্বল মুসলিম সাংস্কৃতিক চেতনা ও প্রদাঢ় ধর্মীয় অনুভূতি কাজ করেছে। তিনি বলেছেন –‘‘আল্লাহ আমার প্রভূ, রসূলের আমি উম্মত, আল-কোরআন আমার পথ-প্রদর্শক’’। তদুপরি জীবন সায়াহ্নে আমাদেও জাতীয় কবি গেয়েছিলেন- মসজিদের পাশে আমার কবর দিয়ো ভাই, যেনো গোর থেকে ও মুয়াজ্জীনের আজান শুনতে পাই।’’ মনের গভীরে ধর্মীয় আকর্ষন তথা ধর্ম নিষ্ঠার কারনেই তিনি সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল। তাঁর ত্রিভূবনের নবী মুহম্মদ ‘আমার প্রিয় হজরত নবী কমলিওয়ালা, ‘সাহারাতে ফটলরে ফুল’ ‘ওমন! রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ, ধর্মের পথে শহীদ যাহারা, খয়বর বিজয়ী আলী হায়দার, জাগো জাগো মুসলমান, প্রভৃতি ধর্মীয় গানে মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তুলেন, এবং বাঙ্গালির শ্যাম-কন্ঠে ইরানী সাকীর লাল সিরাজীর আবেগ-বিহবলতা দান করেছেন বলেই তিনি প্রতিক্রিয়াশীল এবং কারো কারো কাছে অনাদৃত ও আলোচনার অযোগ্য।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টানদের ধর্মাচরনে কোনরূপ বাধা নেই, এ সাম্ম্য-মৈত্রী ও অসাম্প্রদায়িকতার পবিত্র ভূমি-বাংলাদেশে। কিন্তু মুসলমানি কিছু হলেই মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক। ধর্মেও প্রতি অনুরাগ ধর্মান্ধতা বা সাম্প্রদায়িকতা নয়। এটা সর্বধর্মাবলম্বীর জন্মগত অধিকার। কাজেই তো এখানে যে আবেগ, আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধার গভীরতা দিয়ে নজরুল চর্চা চলে, সে আবেগ আন্তরিকতার মধ্যে ওপারের বাঙ্গালি হৃদয়ে নজরুল বেঁচে নেই। ১৯৭১ সালের পরে সরকারী নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত পজ্ঞাপন জারির পর থেকে কবির জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গে নজরুল জয়ন্তি পালিত হয়না। ১৯৭২ এর মে/জ্যৈষ্ঠ মাসে বাংলাদেশে নজরুলকে বিসর্জন দেয়ার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গীয় সাহিত্য অঙ্গন থেকে নজরুল অপসৃয় হয়েছেন। চুরুলিয়ার নজরুল একাডেমী অঙ্গন তছনছ হয়ে পুুর্বেকার গাম্ভীর্য হারিয়ে ফেলেছে কারন নজরুল মুসলমানের কবি।
অঢের ভজ্জন-কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত, বাবুভক্তি গীতি রচনা কওে এককালে সমাদৃত হলেও; সাম্যবাদী, প্রলয়শিখা, সর্বহারা লিখে কট্রর সমাজবাদীদেও প্রিয় পাত্র হলেও তিনি মুসলমান। স্বধর্মনিষ্ঠাই তাঁর কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তিনি অপরাধী। ভূদেব, হেমচন্দ্র, নবীন, যতীন, রঙ্গলাল, মোহিত লাল, মধুসুদন, শরৎ, বঙ্কিম, রবীন্দ্র, অমীয়, জীবনানন্দ, সুকান্ত চক্রবর্তীরা ধর্মীয় গন্ডির মাঝে থেকে মহাভারতীয় জাতীয় সহিত্য রচনা করলেও, নজরুল তাঁদের মতো আলোচিত বা মূল্যায়িত হননি। তাইতো নজরুলকে এড়িয়ে চলা হীনমন্যতা গ্রস্থ বুদ্ধিজীবীদের রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নজরুলের প্রতি অনীহা ও উৎক্ষেপন, নজরুলের অবমূল্যায়ন ও সমালোচনার অন্তরালে একটি ঘৃন্য ষড়যন্ত্র কাজ করছে। ব্রিটিশ আমলে নজরুল ছিলেন বিদ্রোহী/রাজদ্রোহী। ‘৪৭ উত্তর কালে অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে অনাদৃত হয়েছিলেন বাঙ্গালি বলে। ‘৭১ উত্তর কালে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক ও দলীয় দৃষ্টিকোন থেকে দেখার এবং দেখানোর চেষ্টা করতে গিয়ে নজরুলের ন্যায় দুরদর্শী, উদার হৃদয় মনীষির জীবন ও সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। নজরুলের চেয়ে ছোট মাপের কবি-সাহিত্যিকদেও আজকাল বিলক্ষন মাতামাতি হলেও, সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল বলে সঠিকভাবে মূল্যায়িত বা আলোচিত হচ্ছেন না নজরুল।
রবী ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের অক্ষয় সম্পদ। রবীন্দ্র সৃষ্টি উৎকর্ষ বিশালতাও বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশ্ব সাহিত্য পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তিনি একটি যুগ। বাংলাভাষাভাষী মানুুষের জন্য রবী ঠাকুর একটি বিস্ময়। তাঁর সাহিত্য-কবিতা-গান মানুষকে আনন্দ দেয়। তাই তিনি নিঃসন্দেহে বরনীয় ও স্মরনীয়। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বনি¤œ স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পর্ব পর্যন্ত পাঠ্য সূচীতে এক সুউচ্চ আসনে সমাসীন রয়েছেন। আল্পনা এঁকে, বন্দনা গেয়ে, ধূপ-ধূনা-মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে অষ্ট প্রহর এদেশের অলি গলি শিক্ষাঙ্গন, একাডেমী, নাট্যসংঘ, মথত, মাঠ-ময়দান, পার্ক-চত্বর মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, সঙ্গীত-কবিতার আসর, সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ়করন জলসা সহ রবীন্দ্রিক ছাড়াছড়িতে ভরপুর। করজোড়ে সূচনা সঙ্গীত গেয়ে, মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে ঋষি-বন্দনা করলে এদেশের মানুষের মনে হিংসার উদ্রেক হয় না। কেননা, এদেশবাসীর মন-মগজে, চিন্তাভাবনায় উদারতার ঘাটতি নেই। চুরুলিয়ার নজরুল একাডেমী তছনছ কওে, বোর্ড পুড়িয়ে নজরুল মুসলমানের কবি বলে পোষ্টারিং করা হলে, মসজিদ-মাযার-কবরস্থান ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিলেও এদেশের মানুষ আতœকেন্দ্রিকতার ঘৃন্য অভিশাপে অভিশপ্ত নয়। যার যতটুকু পাও না, তাকে ততটুকু দেয়ার মধ্যেই মনের ঔদার্য্য প্রকাশ পায়; সমন্বয়-সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রশস্ত হয় এবং পারিপার্শ্বিকতার কিছুর পরিমিত অবস্থান ও শৃঙ্খলা মন্ডিত উপস্থাপনার মধ্যে যথাযথা সৌন্দর্য্যরে বিকাশ ও শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হয়। মানসিক সংকীর্ণতা ও সম্প্রদায়গত ভেদবুদ্ধি, ক্ষুদ্র স্বার্থ চিন্তা ও বিচ্ছিন্নতা বিদুরিত হয়। রবী ঠাকুরের জন-গন-মনের অধিনায়ক ও ভারত ভাগ্য বিধাতা ইংরেজ ও পার্বত্য মুষিক শিবাজির বর্গী প্রীতির কথা সম্যক জেনেও বঙ্গমাতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত, সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারনা সম্বলিত প্রতিমা পূজার বানী বাহক বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের উত্তেজক সঙ্গীত সোনার বাংলা-কে এদেশের জাতীয় সঙ্গীত বানানো হয়েছে। এতে বাংলাদেশ বা তার জনগনের সকল অংশের অনুভূতির মূল্য ও স্বীকৃতির প্রতিফলন নেই। তবু শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশীরা টু শব্দটি করছেনা। পান্ডিত্যে যথেষ্ট উন্নত মানের বঙ্গ সংস্কৃতি সেবীরা হিন্দু জাতীয়তাবাদের কবি রবী ঠাকুর কে শুধুমাত্র ভাষা ও ভাষাগত মিলের কারনে হালে রাজনীতি, দেশপ্রেমও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের সঙ্গে জড়িত করে তাকে ক্রকান্বয়ে বিতর্কিত কওে তুলছেন। ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ন জাতীয়তাবাদ নহে। একারনেই গ্রীক ও তুর্কী সাইপ্রিয়টদের মধ্যে, কিংবা আইরিশ ও ইংলিশ স্বার্থের মধ্যে এতো রক্তারক্তি ও হানাহানি চলছে। এতেই বুঝা যায়, এক ভাষার ভিত্তিতে কোথাও জাতি বা জাতীয়তার সৃষ্টি হয়নি। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ কিংবা মাতৃভাষা প্রীতির সুত্র যদি এতই মজবুত হতো তাহলে ১৯৪৭-এ বঙ্গবিভাজন হতোনা। তারপরও এদেশীয়রা কুট প্রশ্নের অবতারনা করে, রবী ঠাকুরকে ছোট করতে চায়নি। বাংলাদেশের গনমাধ্যম-রেডিও-টেলিভিশন-ই নয়, দেশের সর্বত্র মহাসমারোহে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা পালিত হয়। দেশের পত্র-পত্রিকা সাময়িকী গুলো নিঃসঙ্কোচে সেখবর পরিবেশন করে থাকে। এমনকি নজরুল বার্ষিকীতেও এদেশের আতœবিশ্লেষনের ক্ষমতা বঞ্চিত সুচতুর বঙ্গ সংস্কৃতি সেবীরা ধূতির আচল ধরা শিশুর মতো রবীন্দ্র কৃতির আতিœকরনে-সৌন্দর্য্যরে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন কওে স্বীয় সাংস্কৃতিক সচেতনতার অভবের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে থাকে।
নজরুল আমাদের স্বতন্ত্র্য জাতি প্রতিষ্ঠার অগ্রসৈনিক ও জাতীয় কবি। জাতীয় পর্যায়ে অন্য যেকোন কবি থেকে নজরুলের মর্যাদা বেশী এবং নজরুলের উপর যে অনুষ্ঠান হবে তা জাতীয় অনুষ্ঠানের দাবী রাখে। অন্যদিকে রবীন্দ্র ভক্তিতে শ্রেষ্ঠদের কারসাজিতে রবীন্দ্র জয়ন্তি এখন জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান মালার সিড়ি ডিঙ্গিয়ে জাতীয় অনুষ্ঠানমালার পংক্তিভূক্ত হতে চল্ছে। অথচ নজরুলকে বিচার করতে গেলেই তাঁর কাব্যও সঙ্গীতের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় তাঁর ব্যাক্তিগত জীবনাচরন কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস। সেকুলারিষ্ট মনোভাবাপন্ন পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রাভাবান্বিত বুদ্ধিজীবীরা তাঁর নাড়ীতে মুসলমানের গন্ধ পান। তাঁর স্বধর্মনিষ্ঠা অনেকেরই চক্ষুশূল। আমেরিকা, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়ার মানুষেরা ইংরেজী ভাষী হলেও উইলিয়াম সেক্সপীয়ার কিন্তু তাদের মহাকবি বা জাতীয় কবি নন। সেকুলার বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীভূক্ত ডঃ নীলিমা ইব্রাহীম অন্যান্য সেকুলারিষ্ট মনোভাবাপন্ন পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবান্বিত বুদ্ধিজীবীর মতো ব্যথিত হয়ে বলেছেন- রবীকে প্রতিপক্ষ করে নজরুলকে দাঁড় করানো জাতীয় কবি রূপে। একাজ কোন গন্ডমূর্খ করেনি, করেছেন আমাদের তথাকথিক বুদ্ধিজীবীরা। পাক আমলে আল্লামা কবি ইকবালের উপস্থাপনাও ঐগোষ্ঠীর মর্মবেদনার কারন ছিল। কি অসহনীয় অন্তর্জ¦ালা তাদের !চিতার আগুন নিভে গেলেও তাদের চিত্তের আগুন নিভ্বেনা।
আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম তাঁর জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গেও স্বীয় পাওনা থেকে নির্মমভাবে বঞ্চিত। ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের শেষ পর্বে রবী ঠাকুরের জন্য তিন অংকের নম্বর বরাদ্দ থাকলেও পশ্চিম বঙ্গেও সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, যথা-যাদবপুর, কল্যানী, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রভারতী, বিশ্বভারতী, কলিকাতা-এমনকি বর্দ্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়েও নজরুলের কোন রচনা পাঠ্য সূচীর অন্তর্ভোক্ত নয়। কলকাতার আলবার্ট হল, বেকার হল, রবীন্দ্র সদন, মহাজাতি সদন, বিড়লা একাডেমী, এরনকি তালতলার পুরনো মুসলিম ইনস্টিটিউট-এও নজরুলের জন্ম মৃত্যু লগ্নে কোন আয়োজন-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় না। ওপার বাংলার পথের মোড়ে মোড়ে, অফিস-আদালতে, প্রতিষ্ঠানের ফটকে, লেকে, পার্কে-চত্বরে রয়েছে ঈশ্বরচন্দ্র, বিপিনচন্দ্র, বিধানচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, মদনমোহন, লালা লাজপাত, স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, বঙ্কিম, মাইকেল, শরৎ, চিত্তরঞ্জন, ক্ষুদিরাম, প্রফুল্লচাখী, সুরেন্দ্র নাথ, দেবেন্দ নাথ, রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দ, বিপীন পাল, জহরলাল, গান্ধী, ঈন্দিরা, রাজীব, সোনিয়া –আরো কতো নাম জানা-অজানা ব্যক্তিদের অসংখ্য মূর্তি। কিন্তু কবি তীর্থ (আজকাল কবি কাজীর জন্মস্থান বা জন্মভিটা বলা হয়না ওপারে) চুরুলিয়ার পথে আসানসোলের মোড়ে কালো পাথরের একটি আবক্ষ প্রতিকৃতি ছাড়া আর কোথাও গন-মানুষের কবি কাজীকে কোন সন্ধানী খঁজে পাবেনা। কলকাতার পাতাল রেলের দ্বাদশটি ষ্টেশনের মধ্যে রবীন্দ্র সদন রবীন্দ্র সরোবর নামের রেল ষ্টেশন থাকলেও কবি নজরুলের নামে কোন রেল ষ্টপেজ নেই। আমাদের রেডিও টিভির প্রাত্যহিক অনুষ্ঠান সূচীতে রবীন্দ্র সঙ্গীতের সঙ্গে ভজ্জন-কীর্তন-শ্যামা সঙ্গীত ও গীত প্রচারিত হলেও অলইন্ডিয়া রেডিও, যার জন্য এক কালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম হাজার হাজার গান লিখে দিতেন, সে আকাশ বানী থেকে নজরুল বিলকুল অনুপস্থিত। এগারই জ্যৈষ্ঠ বা ঊনত্রিশে আগষ্টে কলকাতার পত্র-পত্রিকা ও গন মাধ্যমগুলো কবি নজরুলকে স্বরণ করেনা, ছাপা হয়না তাঁর কথা কাহিনী, পরিচিতি। ঐ বিশেষ লগ্নগুলোতে চিতপুর বা তালতলা মুসলিম ইনস্টিটিউটে কোন সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় না। ওখানটাতে যেন তেন কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে প্রচুর মাতামাতি হলেও, ঐ বিশেষ দিন গুলোতে তাদের কল্পনা রাজ্যে নজরুল স্থান নেই। অতি সম্প্রতি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ ক্ষেত্র গুপ্ত ঢাকা সফরে এসে বলে গেলেন- ওপারে নজরুলকে যতোটা বিদ্রোহী হিসাবে দেখা হয়, ততোটা সাহিত্যিক হিসাবে ভাবা হয় না। তথায় নজরুলের কবিতা, কবিতা হিসাবে বিশ্লেষিত হয়না। এমনটা ওপারের সুধিমনের বহিঃপ্রকাশ। আর এপারে রবীন্দ্র কর্ম, সার্বজনীন, রবীন্দ্র চর্চা কারো কারো কাছে ইবাদত তুল্য। রবীন্দ্র স্তোত্র ও বন্দনা বিহনে মোদের কোন কর্ম সাধিত হয়না। আবার কেউ বা রবীন্দ্র আদর্শে জীবন গড়ে তোলার এবং সময়-সুযোগে ঠাকুম্মার সঙ্গে বৃন্দাবন গমনের নছিয়ত খয়রাত করেন।
অধূনা বাংলাদেশে একাডেমিকভাবে রবীন্দ্র চর্চাও পদ্ধতিগতভাবে রবীন্দ্র গবেষনার কাজ চলছে। সামর্থবানদের ড্রইংরূমের সেলফ্্ ভরে আছে রবীন্দ্র রচনাবলীতে। অথচ নজরুল সৃষ্টি দুষ্প্রাপ্য রাজধানী শহর ঢাকাতেও। নজরুল একাডেমিকভাবে আজো উপেক্ষিত। এপারে একাডেমিক স্তর থেকে গন-মাধ্যম, রেডিও টিভি, নাটক, চলচ্চিত্র গুলোও রবীন্দ্র ইলিউশনে আক্রান্ত। বুদ্ধিজীবী, আমলা, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, মঞ্চ-নাটক, মিউজিক, অডিও ভিযুয়্যাল কার্যক্রমেও চলছে রবীন্দ্র সংক্রমন যা আসলে প্রকৃত মূল্যায়ন বা প্রতি তুলনাতো নয়ই, বরং সুকৌশলে নজরুলকে পিছে টেনে রেখে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো, দুই কবির ভক্তদের মাঝে বিভাজন রেখা টেনে দেয়া এবং নজরুলকে ছোট কওে, হেয় কওে দেখা ও দেখানোর অপপ্রয়াস মাত্র। তবু নজরুল বিদ্রোহের কবি, বিপ্লবের কবি, শান্তির কবি, সাম্যের কবি। প্রেম-প্রীতি, হিংসা-ভালবাসা, মিলন-সংঘাতে সব কিছু মিলে নজরুল ইসলাম কবি।
১৯১৪ থেকে ১৯২৪-এর দশকে শুধু ভারত বর্ষেই নয়, প্রায় সারাবিশ্ব জুড়ে নানাবিধ তুমুল আন্দোলন, বিপ্লব ও রাজনৈতিক ভাঙ্গাগড়া সংঘটিত হয়। এ সময়টিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব ও নব্য তুরস্কের আবির্ভাব। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতবর্ষকে প্রদত্ত ব্রিটিশের নানা প্রতিশ্রুতি এবং ঐ সকল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ- প্রভৃতি ঘটনাবলী নজরুলকে তীব্রভাবে বিচলিত, পীড়িত ও উজ্জীবিত করেছিল। তাই ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরুধী ও স্বাধীনতাকমী সংগ্রাম-আন্দোলনের পটভূমিতে উদ্ভূত হয় নজরুলের সাড়া জাগানো কিছু কবিতা। তৎকালীন রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ১৯২২ সনের ১১ই আগষ্ট নজরুলের ‘ধুমকেতু’ সর্বপ্রথম ভারতবর্ষেও স্বাধীনতা দাবী করে। ব্রিটিশের অন্তিম যৌবনকালে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ উপমহাদেশের স্বাধীনতা-শান্ত-প্রগতির পথে এক দুর্লংঘ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যও মৈত্রীর জন্য নজরুল ছিলেন শান্তির অগ্রদূত। তিনি সারাজীবন হিন্দু-মুসলিম মিলনের জয়গাঁথা লিখেছেন-‘মোরা এক বৃন্তে দুটি ফুল হিন্দু-মুসলমান, মুসলিম তার নয়নমনি, হিন্দু তার প্রাণ। হিন্দু না মুসলিম ওরা জিজ্ঞাসে কোন জন… সন্তান আপন মায়ের। আমি কেবল হিন্দু মুসলমানকে একজায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালীগালাজকে গলাগলিতে পরিনত করার চেষ্টা করেছি। দুই সম্প্রদায়ের মিলনের মিলনের জন্যে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের (১৯২০-১৯২২) নেতৃবৃন্দেন আলোচনা, সভা-সম্মেলন, সন্ধি-চুক্তি, যেমন- লক্ষেèৗ চুক্তি ১৯১৬, ন্যাশনালপ্যাক্ট ১৯২৩, ব্যাঙ্গলপ্যাক্ট ১৯২৩, দি ইউনিটি কনফারেনস্্ ১৯২৪ এবং বহু ঐক্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও রবী ঠাকুরের ভাষায় ভেতরের ন্যাজটি কাটা গেলোনা। ১৯২৩ থেকে ১৯২৬ সন পর্যন্ত হিন্দু-মুসলিম রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা সংঘটিত হয়। জাতিগত নৃশংসতায় ও উন্মত্ততায় বিচলিত হয়ে হিন্দু-মুসলিম মিলনের লক্ষ্যে হিন্দু-মুসলিম ভাই-ভাই মিছিল সহ ‘প্যাক্ট’ ‘তোবাহ’, হিতেবিপরীত ইত্যাদি গানও ‘মন্দির-মসজিদ’ গদ্য রচনা করেন নজরুল। তিনি বলেন- ‘এসভাই হিন্দু, এস ভাই মুসলিম, এস বৌদ্ধ, এস ক্রিশ্চিয়ান, আমরা সব গন্ডি কাটাইয়া, সব সংকীর্নতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি।
যুবসমাজকে একীভূত করার লক্ষ্যে কবি গেয়েছেন- ধর্ম, বর্ন, জাতির উর্দ্ধে জাগোরে নবীন প্রাণ; তোমার অভ্যুদয়ে হোক সব বিরোধের অবসান..। বৃহত্তর ভারতের সুস্থতার জন্যে সংঘাত বিক্ষুদ্ধ ভারতবাসীকে ঐক্যের মিলন সুত্রে গ্রথিত করার আন্তরিক প্রয়াসের কারনে শিবনারায়ণ বলেন- নজরুল একমাত্র বাঙ্গালি সাহিত্যিক যিনি হিন্দু-মুসলিম দুটি সংস্কৃতিকে পুরোপুরি আতœস্থ করেছিলেন এবং দুয়ের উপরে উঠে হিন্দু-মুসলিম, এ দুই সংস্কৃতির সম্মিলনে সাহিত্য সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িকতার উর্দ্ধে উঠেছিলেন। নজরুলের চেয়ে অধিকতর প্রতিভাবান হয়েও রবী ঠাকুর তা পারেননি। হিন্দু-মুসলিম উভয় সংস্কৃতির এক সার্থক প্রতিফলন নজরুল ছাড়া বাংলা সাহিত্যে অন্য কোন কবি সাহিত্যিক ঘটাতে পারেননি।
ব্যক্তি জীবন ও সাহিত্য রচনায় নজরুল কখনো এক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকেননি। গভীর স্বজাত্যবোধ থাকলেও, তিনি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের তাঁর চিন্তা ভাবনাকে সমুন্নত রেখেছেন। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, পার্থক্য-স্বাতন্ত্র্যেও ব্যাপ্তী ঘটলেও, স্বাদেশিকতাবোধ নজরুলকে সীমায়িত করে রাখতে পারেনি। তাই কবি কাজী বলেছিলেন- আকাশের পাখিকে, বনের ফুলকে, গানের কবিকে তারা যেন সকলের করে দেখেন। আমি এদেশে, এ সমাজে জন্মেছি বলেই, শুুধু এদেশেরই, এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের সকল মানুষের। কবি কাজীর রাজনৈতিক রচনার মূলে প্রথম প্রেরনা- বিশ্বজাগরন অর্থাৎ বৃহত্তর গণ আন্দোলন। তাঁর দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো- জাতীয় বা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। দেশমুক্তির আন্দোলনের পাশাপাশি বিশ্বমানবতা জাগ্রত করার লক্ষ্যে নজরুল বলেন- জাগো অনশন, বন্দী উঠরে যতো, জগতের লাঞ্চিত ভাগ্যাহত…। কবি কাজীর মধ্যে একজন মানব দরদী, মানব হিতৈষী, সার্বজনীন মঙ্গল সাধনায় আতœত্যাগী কবিকে প্রত্যক্ষ করা যায়। কবির কুমিল্লা অবস্থান কালে রচিত ‘প্রলয়োল্লাস’ (১৯২২) নামক অনন্য রাজনৈতিক কবিতার স্বাদেশিকতা ও স্বাজাত্যবোধই নয়- বিশ্বমানবতাবোধ- আজ মহাবিশ্বে মহাজাগরণ, আজ মহা যাত্রীর মহা আনন্দের দিন। আজ মহামানবতার মহা উদ্বোধন…, এ সমগ্র মানবতার জন্য কবির আকুল উদাত্ত আহবান। নজরুলের আস্থা-শ্রদ্ধা, স্বদেশ, স্বজাতি ও স্বধর্মের সীমা ছাড়িয়ে সকল মানুষের মহৎ ঐতিহ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাই সগর্বে তিনি ঘোষনা করেন- ‘বন্ধু বলিনি জুট, এইখানে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট, এই হৃদয়, সেই নিশাচল, কাশী, মথুয়া, বৃন্দাবন, বুদ্ধগয়া- এ জেরুজালেম, এ মদিনা-কাবা ভবন। মন্দির এই, মসজিদ এই, গীর্জ্জা এই হৃদয়।
মানুষের মধ্যে ক্ষুদ্রতা ও বিদ্বেষ-বিশৃঙ্খলার প্রাচীর ভেঙ্গে নব অভিযানের জন্যে- জাতের নামে বজ্জাতি, জ্বাল-জালিয়াত খেলছে জুয়া, ছোলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া। হুঁকুর জল, আর ভাতের হাড়ি, ভাবলি এতেই জাতির প্রাণ। তাই তো বেকুব, করলি তোরা একজাতিকে একশোখান। মুসলমান বিজাতীয় সেবাদাসদের হুঁশিয়ার করে নজরুল বলেন- আনোয়ার! আনোয়ার! কে বলে সে মুসলিম, জিভ ধরে টানো তার; বে-ঈমান জানে শুধু জানটা বাঁচাতে তার। আতœ-বিস্মৃত সংকীর্নতার প্রাচীর ভেঙ্গে মানবতাকে সুসংহত করার কি উদাত্ত আহবান!
নজরুল একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গ্রন্থকার, সাংবাদিক, পত্রিকা পরিচালক, সম্পাদক, সৈনিক, বিদ্রোহী, উপন্যাসিক ও শিশু-সাহিত্যিক। নাট্য সাহিত্যেও নজরুলের রয়েছে প্রশংসনীয় অবদান। বাংলার নাট্য জগতে নজরুলকে পাওয়া যাবে পৃষ্ঠপোষক, নির্দেশক, রচয়িতা, সংগঠক, অভিনেতা, উদ্যোক্তা, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসাবে। ১৯১৪ সনে দরিরামপুর হাইস্কুলে শাহজাহান নাটকে আল মসিরের ভূমিকায় এবং ১৯২১ সালে কুমিল্লার কান্দিরপারে সীতার বনবাস নাটকে রামের চরিত্রে প্রাণমাতানো অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন নজরুল। নিজের রচিত ৪৮ টি নাটক ছাড়াও চুরাশিটি নাটক ও নাট্যকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। ব্যাপক গভীর ও সৎ অনুসন্ধান নজরুলের রতœসম্ভারকে বিস্মৃতি, লুপ্ত ও গুপ্তাবস্থা থেকে উদ্ধারের সহায়তা করবে। প্রসিদ্ধ নাট্যকার মনমথ রায়ের নি¤েœ উৎকালিত উদ্বৃতি থেকে পরিস্ফুট হয়ে উঠবে নজুরুল কতো মহীয়ান- যে আন্তরিক ¯েœহে তিনি আমার মহুয়ার কন্ঠে গান গেয়েছিলেন; এবারও আমার কারাগার এর জন্য গান রচনা করিয়াই ক্ষান্ত হননি, পরমোল্লাসে উহাতেও স্বয়ং সুর যোজনা করিয়াছেন। সাবিত্রীর পরম সম্পদ হয়েছে তাঁর গান। লিখিতে গর্বে ও গৌরবে আমার বুক ভরিয়া উঠে। নাট্যকার হিসাবে কতো স্বচ্ছ, মূল্যবান স্বীকাসোক্তি।
ঐতিহাসিক নাটক সিরাজউদ্দৌলার জন্য লিখিত নজরুলের গান আজো মানুষের চোখের কোনে পানি এনে দেয় ও বদনে বিষাদের আলো ফেলে-
ক) পথহারা পাখি কেঁদে ফিরিয়া একা
আমার জীবনে শুধু আঁধারের লেখা।
ঊাহিরে অন্তরে ঝড় উঠিয়াছে-
আশ্রয় যাচি কাহার কাছে,
বুঝি দুঃখ নিশি মোর, হবেনা ভোর,
ফুটিবেনা আশার আলোক রেখা।

খ) নদীর একুল ভেঙ্গে, ও কুল গড়ে,
এইতো নদীর খেলা-
সকাল বেলায় আমিররে ভাই,
ফকির সন্ধ্যাবেলা- এইতো নদীর খেলা।
কি অব্যক্ত বেদনা ফুটে উঠেছে প্রতিটি চরনে। তারপরও দুর্মূখরা কবি কাজী নজরুল ইসলামকে মৃত কবি বলে নিচ মনের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তিনি নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের অবাক জ্যোতিষ্ক একজন অসন্য শিল্পী। তিনি ছিলেন অপরিসীম প্রাণের স্ফুর্তিতে ভরপুর। তাঁর প্রতিটি মূহুর্ত ছিল দুরন্ত আবেগে টলমল। সকলের থেকে দুরে সরে গিয়ে, লোকচক্ষুর অন্তরালে একাগ্রমনে শান্ত, সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশে সাহিত্য সাধনায় নিমগ্ন হতে পারেননি তিনি। ভিড়ের মধ্যে আসর জমিয়ে, হৈ-হুল্লোড় করে পান-সুপুরির কৌটা খুলে গাল-গল্প করার ফাঁকে ফাঁকে তিনি লিখেছেন অনেক অসাধারন কবিতা, এক একটি আশ্চর্য্য স্মরনীয় গান। তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর মন্তব্য করেছেন- মাত্র আধঘন্টা, কি আরো কম সময়ের মধ্যে পাঁচ-ছয়খানি গান লিখে পাঁচ ছয়জনের হাতে বিলি করে দিতেন, যেন মাথার মধ্যে গানগুলো সাজানোই ছিল, কাগজ কলম নিয়ে সে গুলো লিখে ফেলতে যা দেরী। … সঙ্গে সঙ্গে হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে পাঁচ-ছয় জনকে সেই গান শিখিয়ে দিয়ে রেহাই দিতেন তিনি..।
রবী ঠাকুরের পরে কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে প্রতিভসম্পন্ন মৌলিক কবি। তিনি ছিলেন অবিরাম সৃষ্টিশীল। সৃষ্টির আনন্দ তাঁর মাঝে ছিল অপরিসীম। সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিড়ম্বনা ও ভর্ৎসনার কুটজালে আটকে পড়ে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় দিশেহারা হলেও আমরা তাঁকে যেভাবে কল্পনা করি, যে ভাবে খুঁজি, যেভাবে পেতে চাই, ঠিক সেভাবেই আমরা তাঁকে পাই। নিজের তুলনা তিনি নিজেই। তাঁর সমতুল্য এমন সর্বতোমুখী, স্বতোজ্জ্বল প্রতিভা সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে বিরল। কোন একক গীতিকার নজরুলের মতো এত অধিক সংখ্যক গান রচনা করতে পারেন নি। নজরুলের সঙ্গীত সৃষ্টির কাল খুবই স্বল্প। অদ্যাবধি গবেষনায় প্রাপ্ত তাঁর গানের সংখ্যা চারি হাজার আটষট্রিটি। এছাড়াও হিন্দু ধর্ম মাহাতœ বিষয়ক কালী-দর্গা-শ্যামা-বাবু-ভক্তি গীতির সংখ্যা পাঁচশত চল্লিশটি। বানী, সুর এবং রাগ-বৈচিত্র্যেও উপমহাদেশের বাংলা সঙ্গীত জগতে নজরুল সঙ্গীত এক বিচিত্র রতœ ভান্ডার। গানের ক্ষেত্রে নজরুল নিজেকে অতি সার্থক ভাবে দান করেছেন । তাঁর সমগ্র রচনাবলীর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টিই হলো তাঁর গান। রবী ঠাকুরের যাবতাীয় গান গীতিবিতান গ্রন্থে সংকলিত করা হয়েছে। তাঁর স্বরলিপি, সুরবিতান, মুদ্রিত আছে। তদুপরি বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড, কবির বানী ও তার নির্ভূলতা নিরূপনের কাজে সর্বক্ষন ব্যাপৃত রয়েছে। অপর পক্ষে, পৃথিবীর মধ্যে সব চেয়ে অধিক সংখ্যক গানের রচয়িতা হলেও, কবি নজরুল ও তার গানের সংরক্ষন ও চর্চার কোন সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। নজরুল একাডেমী, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, হিন্দোল সঙ্গীত একাডেমী, সরকারী সঙ্গীত বিদ্যালয়, দোলন চাঁপা সঙ্গীত নিকেতন, অগ্নিবীনা সঙ্গীতায়ন প্রভৃতি সংস্থাও পারস্পরিক মতানৈক্যের টানাপোড়েনেও আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে কোন সুশৃঙ্খল সমন্বিত ব্যাবস্থা নিতে পারছেনা বা নেয়া হচ্ছেনা। উল্লেখিত কারনে, একাডেমীক নজরুল চর্চাও পদ্ধতিগত নজরুল গবেষনার তেমন কোন অগ্রগতি সাধিত হচ্ছেনা। তাছাড়া নজরুলের সঙ্গীত সম্পর্কীয় যাবতীয় কার্যকলাপের কেন্দ্রভূমি ছিল চিৎপুর-কলকাতায়। ১৯৭২ সালে ঢাকায় নজরুলকে নির্বাসন দেয়া হয়েছিল মাত্র। আজকাল ব্যবসায়িক মনেবৃত্তির কারনে ওপার থেকে নজরুলের সবকিছু তচনচ হয়ে, উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে এপারে এসে ভিড়ে। সংকীর্ন মানসিকতা ও বিদ্বেষের কারনে ব্যঙ্গভরে তারা আধুনিক মানুষের রুচির উপযোগী করে এপারে পাঠাচ্ছে নজরুলের গান। গানের আদি ¯্রষ্টার রুচি-মানসিকতা ও যুগলক্ষনের তোয়াক্কা না করে মানুষের মনোরঞ্জনের জন্যে সব করছে তারা। কবির রচনা অনেকে হুবহু নকল করে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন।
বাংলা সঙ্গীত জগতের দিকপাল- বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস, রজনীকান্ত, রামপ্রসাদ, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল ও রবী ঠাকুরের সমান্তরাল প্রতিভাও যশের দাবীদার হলেন সঙ্গীত ও গীতিকার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বিচিত্র প্রতিভার অপূর্ব সমাবেশ ছিল তাঁর মধ্যে। তাই নজরুল সঙ্গীত বঙ্গ সংস্কৃতি জগতের এক উল্লেখযোগ্য গৌরবময় সম্পদ। নজরুল সঙ্গীতের বৈচিত্র্যে, সুরে ও বানীর আকর্ষনে ওপার বাংলার অনেক শিল্পীই অব্যাহত অনুশীলনের মাধ্যমে ঈর্ষনীয় জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি প্রতিষ্ঠার শীর্ষে আরোহন করে আমাদের প্রাণপ্রিয় কবিও কবি প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিলেও, হীনমন্যতা ও স্বীয় সাংস্কৃতিক সচেতনতার অভাব হেতু আমাদেও শিল্পজগতে এমনকি আমাদের মাঝে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে নজরুল যথাযথভাবে অনুশীলিত হচ্ছেনা। হিন্দু রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পীরা নির্দ্বিধায় ও নিঃসঙ্কোচে তাদের ধর্মীয় গীতি গাইলেও মুসলিম রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পীরা রবীন্দ্র সঙ্গীত ও আধুনিক গীতি পরিবেশেন করেন কিন্তু নজরুলের হামদ, নাত ও গজল গেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল হতে চান না। নজরুল প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ও তীক্ষè বুদ্ধিদীপ্ত ছিলেন। তৎসম ও তদ্ভব ভাষায় সুপন্ডিতদের অবোধ্যও দুর্বোধ্য সংস্কৃত কন্টকিত সাহিত্যকে এড়িয়ে গিয়ে, মুসলমানের যে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট আছে, তার আচার অনুষ্ঠান-উৎসব, সাহিত্য-সঙ্গীত- ভাষার যে পৃথক রূপে বৈশিষ্ট আছে, নজরুল তা তাঁর নতুন সৃষ্টির সৌন্দর্যে রূপায়িত করেছেন। আরব-ইরান-তুরানের সুর অনুরনিত হলো তার জাগরনধর্মী ইসলামী গান-গজল-কাওয়ালী-মারফতি-মুর্শিদী-হামদ-নাতে। তাইতো ১৯২৯ সালের জাতীয় কবির সম্বর্ধনার মাতপত্রে সন্নিবেশিত হয়েছিল- তুমি বাংলার শ্যাম-কুয়েলার কন্ঠে ইরানের গুলবাগিচার বুলবুলের বুলি দিয়াছ। তাছাড়া কবি কাজীর সাহিত্য চর্চার পাঁচ বৎসর অতিক্রান্ত হবার পূর্বেই মাত্র ৪০ বৎসর বয়ঃক্রম কালে নজরুল রবী ঠাকুরের স্বীকৃতি লাভ করেন।
১৯২৩ সনে জেলখানায় নজরুলের অনশনের খবর পেয়ে আসামের শিলং থেকে রবী ঠাকুর টেলিগ্রাম করেন- ‘অনশন ভঙ্গ করো । আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়।’ নজরুলের দীপ্তময় ভূবনের আলোকছটা দেখে রবী ঠাকুর বিস্মিত হয়েছিলেন। নজরুল বলেছিলেন- বিশ্ব কাব্য লক্ষèীর একটি মুসলমানি ঢং আছে। ও সাজে তার শ্রীহানি হয়না। মুসলিম সাহিত্য-সংস্কৃতির একটি ভিন্নতর রূপ আছে বলেই তাঁর রূপ-প্রতীক-ঊষাময় আমরা দেখি চাঁদ-মিতিরা, গোলাপ-নার্গিস-সাকী-সরাব, লাইলী-মজনু; শিরি-ফরহাদ। তাতে প্রতিবিম্ব হয় নবী পয়গম্বও, ইব্রাহীম-ইয়াকুব-ঈসা-মুসা, দিগ¦ীজয়ী বীর খালেদ-তারিক-মুছা; রাজনৈতিক মনীষী- কামাল, আনোয়ার, আব্দুল্লাহ, পাহলভী, হারুনুর রশীদ, জগলুল পাশা। মুসলিম বিদুষী নারী ফাতিমা, হাজেরা, আয়িশা, মরিয়ম, নুরজাহান, মমতাজ, চাঁদসুলতানা, রাজীয়ারা ভিড় জমায়েছে কবি কাজীর লেখায়। ইরান, তুরান, হিন্দ, বোখারা, সমরকন্দ, আন্দালোশিয়া, স্পেন, কর্ডোভা; আর রুমী, জামী, সাদী, হাফিজ, উমর খৈয়াম, খলদুন তাঁর কাব্যের ছত্রে ছত্রে ভেসে উঠেছে। এমনিভাবে নজরুল আমাদের অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য ও জাতীয় আশা-আকাঙ্খার সার্থক শিল্পরূপ দিয়ে অমরত্ব দান করেছেন।
রবীঠাকুর ১৯২৩ সালে তাঁর গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ উৎসর্গ করতে গিয়ে লিখেছিলেন- উৎসর্গ শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ¯েœহভাজনেষু, ১০ই ফাল্গুন, ১৯২৯ বাংলা। উৎসর্গ পত্রে কবি শব্দটির প্রয়োগ রবী ঠাকুর সচেতনভাবেই করেছিলেন। রবী ঠাকুর যাকে কবি বলেছিলেন তাঁকে মহাপদ্যকার বলা অপরাধ। রবী ঠাকুর বলেন- আমার বিশ্বাস, তোমরা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষন করছো। আর পড়ে থাকলেও, তার রূপ ও রসের সন্ধান পাওনি। অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র। নজরুল আমাদের জাতীয় সাহিত্য সংস্কৃতির দিশারী। মোহিত লাল মজুমদার নজরুলের খেয়াপারের তরনী পড়ে বলেছিলেন- বহুদিন কবিতা পড়িয়া এতো আনন্দ পাইনাই, এমন প্রশংসার আবেগ অনুভব করি নাই। রবী ঠাকুর জোড়াসাঁকোতে নিজে নজরুলের মুখে তাঁর বিদ্রোহী কবিতার আবৃত্তি শুনে তাঁকে আলিঙ্গল করে বলেছিলেন-হ্যাঁ কাজী , তুমি আমাকে হত্যা করবে। আমি মুগ্ধ হয়েছি তোমার কবিতা শুনে। তুমি যে বিখ্যাত কবি হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তোমাম কবি প্রতিভায় জগত আলোকিত হবে। রবী ঠাকুরের প্রখর প্রতিভার পূর্ণ প্রভাবের যুগটাতে নজরুল কলম ধরেন। নজরুলের লেখায় বাংলা কাব্য লক্ষèীর মুসলমানি ঢং দেখে তৎসম ও তদ্ভব ভাষার যুগপন্ডিতরা বিস্মিত হয়ে গেলেন। রবীন্দ্র মন্ত্র গন্ডির মোহাচ্ছন্ম আবেশে আবর্তিত না হয়ে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যে অবস্থান করে নজরুল সাহিত্য সাধনা করে রবী ঠাকুরের মায়াজালকে ভঙ্গ করে ফেলেন। তাই রবী ঠাকুর কবি কাজীকে উদ্দেশ্য করে লিখেন- আয়, চলে আয়রে ধুমকেতু! আঁধারে বাধ অগ্নিসেতু। দুর্দিনের এ দুর্গ শিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
আশি বৎসরের জীবন কালে পয়ষট্রি বৎসর জোড়াসাঁকোর জমিদার বাড়ীর শান্ত সমাহিত জাঁকালো পরিবেশে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্য সাধনা করে ভারতের ভাগ্য বিধাতা ব্রিটিশদের দেয়া নাইট উপাধিধারী রবীঠাকুর যা করতে পারেননি, সামরিক বাহিনীর লোক হয়ে, ব্রিটিশ সিংহের নখরের বারংবার আঁছড় খেয়ে, ফেরারী হয়ে রাজ দ্রোহীতার দায়ে কারাদন্ড ভোগ করেও নজরুলের ধুমকেতু সর্বপ্রথম ভারতের স্বাধীনতার দাবী করে এবং নজরুল বিজয় দুন্দুভি বাজিয়ে বিশ্বের নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের বেদনাপ্লুত হৃগয়বীনার ঝংকার দিয়ে গেয়েছিলেন-‘জাগো ! অনশন বন্দী উঠরে যতো, জগতের লাঞ্চিত ভাগ্যাহত। এটি বিশ্বব্যাপী শৃঙ্খলমুক্ত মানুষের শান্তিময় এবং সম্প্রীতি দীপ্ত মানব জীবন প্রতিষ্ঠার মহা আহবান। অন্য কারো সৃষ্টিতে এমনটি পরিদৃষ্ট হয়না। তাই রবী ঠাকুর, অমীয় চক্রবর্তী, সুকান্ত ভট্রাচার্য, জীবনানন্দ দাস ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম- প্রত্যেকেই নিজ নিজ সাহিত্য ভূবনে, প্রত্যেকে প্রজ্ঞা, মনীষা ও জনপ্রীয়তায় স্বকীয়। সাহিত্য-সৃষ্টির বিচারের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্যের ক্ষেত্রে এমনটি না হলেও নজরুলকে বিচার করতে গেলেই কাব্যও সঙ্গীতের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনচরন বা ধর্মীয় মূল্যবোধ; তাহয়ে যায় সম্প্রদায়ও রাজনৈতিক পক্ষপাত দুষ্ট।
১৯২৯ সনের ১৫ই ডিসেম্বও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবী ঠাকুরের বিদ্যমানতায় অবিভক্ত বাঙ্গালি জাতি তথা বাঙ্গালি হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে কলকাতার আলবার্ট হলে বিজ্ঞানাচার্য স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্সি ম্যাজিষ্ট্রেট ব্যারিষ্টার এস ওয়াজেদ আলীও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু প্রমুখ তৎকালীন ভারতীয় রাজনৈতিক ও সাহিত্য অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের সমাবেশে রবী ঠাকুরের ¯েœহভাজন অনুজ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসাবে সম্বর্ধনা জানানো হয়। জাতীয় কবি হিসাবে বরণ করে নেবার লক্ষ্যে বিভিন্নস্তরের হিন্দু-মুসলিম নেতৃবৃন্দ সম্মিলিত ভাবে যে সম্বর্ধনার আয়োজন করেছিলেন, সেখানে উদ্বোধনী সঙ্গীত হিসাবে পসিদ্ধ গায়ক উমাপদ ভট্রাচার্য গেয়েছিলেন নজরুলের লেখা- ‘চল চল.. উর্দ্ধ গগনে বাজে… নিন্মে উতলা ধরনী তল’’ নজরুলের উদ্দেশ্যে দেয়া অভিনন্দন পত্রে সন্নিবেশিত হয়েছিল স্মরনীয় কটি পংক্তি – ‘‘ তোমার অসাধারন প্রতিভার অপূর্ব অবদানে বাঙ্গালি জাতিকে চির ঋনী করিয়াছ তুমি। আজ তাহাদের কৃতজ্ঞতাসিক্ত অভিনন্দন প্রহন হরো। ভবিষ্যতের ঋষি তুমি, তুমি চিরঞ্জীব। … তুমি বাঙ্গালীর ক্ষীন কন্ঠে তেজ দিয়াছ…। … তোমার কবিতা বিচার-বিশ্লেষনের উর্দ্ধেৃ…। ’’ সম্বর্ধনা সভায়-সভাপতি বরেন্য বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেন-‘‘ নজরুল শুধু মুসলমানের কবি নন…। তিনি বাংলার কবি…, বাঙ্গলির কবি…। …হিন্দু- মুসলিম মিলে বাঙ্গালি…। আজ নজরুলকে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই শ্রদ্ধা নিবেদন করিতেছেন…।’’ তাই সেই ১৯২৯ সাল থেকে গন-মনে কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় কবি হিসাবে আদৃত হয়ে আসছেন।
তারপরও নজরুল বিরোধিরা তাঁর লেখায় অশ্লীলতার গন্ধ পেয়ে নাসিকা কুন্ঠিত করতো। কবিকে ‘আড়ি চাচা বলতো’ তাঁর কবিতাকে ‘চক্কুখান সামা’ আর ফেকু উস্তাগারের কথা বলে ব্যঙ্গ করতো। তিনি প্রতিভাবান বালকের মতো আজীবন লেখে গেছেন…তাঁর বিপুল সৃষ্টির সামান্য অংশই উৎকৃষ্ট কবিতা … তিনি চারন কবি…তিনি সর্বদা কবি নন…। তিনি ভাসমান বাস্তুহারা …। তিনি একজন মহাপদ্যকার …। তিনি বিদগ¦ কবি নন…। তিনি সার্বজনীন কবি নন …। … তিনি একটি যুগের কবি…। … তিনি শ্লোগানের কবি…। … পার্শি শব্দে কবিতা লেখে এ পাত নেড়ে… কিছুকাল পরে শ্লোগানের ভাষার জন্যও কেউ নজরুলকে সন্ধান করবেনা…। … তাঁর লেখায় হৈ চৈ বেশী, কবিত্ব নেই… । … তিনি খন্ডিত কবি…। তার ইসলামী গানের আবেদন এবাংলা থাকলেও পশ্চিম বাংলায় তা অনুপস্থিত…। শ্যামা সঙ্গীত পশ্চিমবঙ্গে থাকলেও এ বাংলায় তার আবেদন নেই…। …নজরুল উভয় বাংলায় সমাদৃত নন। … তিনি আবেগ প্রবন, তাই শব্দ প্রয়োগে সতর্ক নন …। … অভিনয়ের সঙ্গে কন্ঠ দান করলেও তিনি মৃত কবি, ইত্যাকার বেসুমার অভিযোগ নজরুলের বিরোদ্ধে। নজরুলের শব্দ ব্যবহার কৌশল তাঁর নিজের। তিনি নিজের স্বপ্ন নিজে দেখেছেন এবং নিজ হস্তে তার কাব্যরূপ দান করেছেন। কারো মোহে আবিষ্ট হননি। পুচ্ছধারিতা বা অনুকরন প্রিয়তা নজরুলের মধ্যে অনুপস্থিত। তিনি বলতেন- তুই নির্ভর কর আপনার পর, আপন পতাকা কাধে তুলে ধর…। তাই নিজেই ভাঙ্গা কিল্লায় বিজয় ঝান্ডা উড়িয়েছেন নিজ হাতে।
নজরুলকে ভর্ৎসনার ক্ষেত্রে তাঁর স্বগোত্রীয়রাও কম যাননি। ‘ইসলাম দর্পন’, ‘মোহাম্¥দী’, ‘মুসলেম দর্শন’ ইত্যাদি পত্র-পত্রিকা নজরুলের বিস্তর বিরূপ সমালোচনা করতো। কেউ কেউ বলতেন- ‘লোকটি ধর্মজ্ঞান হীন বুনোবর্বর’, ‘দেব-দেবীর নাম মুখে আনে, সনে দাও পাজিটার জাতমেরে’, ‘লোকটা মুসলমান, না শয়তান’..‘তাঁর মুন্ডপাত হওয়া উচিত’.. ‘সে হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছে, ছেলেদের নাম হিন্দু নাম রেখেছে’.. ‘হিন্দু দেবী কালী, দুর্গাকে নিয়ে কতোই না কবিতা লিখেছে..। পাঁচ শত চল্লিশটির অধিক ভজ্জন-কীর্তন-বাবু-ভক্তি গীতি রচনা করে নজরুল শ্যামা সঙ্গীত রচয়িতা হয়েছেন। তাঁর লেখনিতে ‘মৃত্যুক্ষুধায়’ খৃষ্টান ধর্মের মাহাতœ্য বর্নিত হয়েছে। তিনি রাজনৈতিক উদ্বাস্তু..। তিনি পুরোপুরি মুসলমান কিনা তাও প্রশ্ন উঠেছিল। আশালতা সেন গুপ্তা ওরফে প্রমিলা নজরুলের মৃত্যুর পর তার অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী কবর দেয়া হলেও, নজরুল তাঁর স্বগৃহ পরিবেশ হিন্দুত্ব মুক্ত করতে পারেরনি কারন প্রমিলা নজরুলের মা গিরিবালা দেবী, যিনি রক্ষনশীল হিন্দু ঘরের বিধাব মহিলা স্বীয় সমাজকে উপেক্ষা করে একদিন হাত ধরে প্রতিভাবান বাঁধনহারা কবির সঙ্গে গা ভাসিয়ে ছিলেন। হিন্দু কন্যা প্রমিলাকে বিয়ে করায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বর্ণবাদী হিন্দু নেতা, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, সাংবাদিক, জমিদার, স্বদেশী নেতারাও নজরুলের বিরুদ্ধে তেড়ে আসেন। তাঁকে আক্রমন করার জন্য প্রকাশিত হয় শনিবারের চিঠি। মোহিত লাল মজুমদার বলেন-‘ আমি ব্রাক্ষ্মন। দিব্য চক্ষে দুর্গতি হেরি তোর; অধঃপাতের দেরী নাই আর, ওরে জাতি চোর..’’। এমনকি করে কবিকে হিংসার খড়গহস্ত ও লেখনি সর্বদিক থেকে বারংবার আঘাত হেনেছে। হিন্দু মেয়ে বিয়ে করে, শ্যামা সঙ্গীত লিখেও, তিনি যে মুসলমান, সে পরিচয় লুকাতে পারেননি।
নজরুলের প্রথম কবিতার বই ‘অগ্নিবীনা’ ও প্রথম প্রবন্ধের বই ‘যুগবানী’ ১৯২২ সনে প্রকাশিত হলে, ভারত সরকার ‘যুগবানী’ গ্রন্থখানা নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করেন। অগ্নিবীনা নিষিদ্ধ না হলেও তার কোন সংকলন কোথাও পাওয়া গেলে আট্কে ফেলা হতো। নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি আদি পুরুষ আদম থেকেই মানুষের লোভ বেশী। তাছাড়া, যুব মন নতুন কিছু দেখলে আকৃষ্ট হয়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আগুন ঝরা প্রতিটি ছত্রই তখন উতলা ধরনীর অশান্ত তরুন যুবাদের মুখে মুখে প্রচারিত হয়ে ছুটলো দেশের আনাচে কানাচে। পুলিশ-গোয়েন্দা-আমলারা বেসামাল হয়ে পড়লো। ১৯২২ সনের ২৬শে সেপ্টেম্বর ধুমকেতু পত্রিকায় ‘ আনন্দময়ীর আগমনে’ ও ‘ বিদ্রোহীর কৈফিয়ত’ সম্পাদনার দায়ে ভারতীয় দন্ডবিধির ১২৪-ক ধারা মোতাবেক কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘রাজদ্রোহী’ হিসাবে অভিযুক্ত হলেন। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় দর্গাপূজার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিক ঐতিহ্যের উপর রাজনৈতিক চেতনা আরোপ কওে নজরুল লিখেছিলেন- ‘আর কতো কাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তির আড়াল; দেব-শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি; ভূ-ভারত আজ কসাই খানা, আসবি কখন সর্বনাশী।
ধুমকেতু ও নবযুগ পত্রিকার জামানত সহ প্রতিটি সংখ্যা বাজেয়াপ্ত হলো। তারপর অন্যান্য পত্র-পত্রিকা-সাময়িকী -যে গুলোর সংগে নজরুলের সম্পৃক্ততা ছিল, বাজেয়াপ্ত করা হল। নজরুলের নামে জারি হলো গ্রেফতারি পরোয়ানা, নজরুল গা ঢাকা দিলেন। এসময় জনৈক আলী আকবর খাঁনের সঙ্গে কুমিল্লার দৌলতপুরে বেড়াতে এলেন নজরুল। সেখানে আলী আকবর খাঁনের ভাগ্নি সৈয়দা খানম ওরফে নার্গিস আরা খানমের সঙ্গে নজরুলের বিয়ে হয়। পারিবারিক কারনে এ বিয়েটা টিকেনি। এ বিবাহ বিচ্ছেদের অব্যাবহিত পরেই কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে অবস্থানরত মানিকাগঞ্জের ‘তেওড়া’ গ্রামের আশালতা সেন গুপ্তা ওরুফে প্রমিলার সঙ্গে নজরুলের দ্বিতীয় বিবাহ হয়।
গা ঢাকা অবস্থায় কুমিল্লা থেকে নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে আলীপুর জেলে এবং পরে ওখান থেকে হাওড়া জেলে নীত হন নজরুল। ১৯২৩ সনের জানুয়ারী মাসে বিচারে নজরুলের সশ্রম কারাদন্ড হলো। নজরুল কারারুদ্ধ হলেন বটে, তাঁর স্বাধীনতার অভিযান, সাম্যও মানবতার অভিযানে কোন বিরতি ঘটেনি। কারান্তরালে নজরুল লিখলেন ‘রাজবন্দিও জবান বন্ধী’। রাজদ্রোহের অপরাধে কারাদন্ড প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর লেখা বই-পত্র-পত্রিকা-সাময়িকী নিষিদ্ধ হলো এবং বাজেয়াপ্ত করা হলো। প্রবঞ্চিত, নিপীড়িত, স্বাধীনতা হারা মানুষ তথা ভারতকে জাগাতে ব্রিটিশ রাজের কোপানলে পড়ে নজরুলই প্রথম বাঙ্গালি লেখক যিনি সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করেন। ১৯২৩ সনের ১৬ই ডিসেম্বও নজরুল কারামুক্ত হলেন। এমনি করে অপঘাত, নির্যাতন ও দুঃখের মধ্যে দিয়ে দুখুমিঞার জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। এরই মধ্যে তাঁর জন্মদায়িনী দুঃখিনী মায়ের মৃত্যু ঘটে। চার বৎসরের শিশুপুত্র বুলবুলকে হারালেন তিনি। জীবন সঙ্গিনী প্রমিলা পক্ষপাতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। পরিবারের বিরহ ব্যথা, অপর দিকে সংসারের দুঃসহ অভাব-অনটন এবং রাজনৈতিক নির্যাতন কবিকে অস্থির করে তুলে। পাকিস্তান কায়েমের পর কবি পরিবার জীবন ধারনের মৌলিক প্রয়োজন- তথা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার জন্য পাকিস্তানে আসতে চেষ্টা করেন। প্রথম দিকে পাকিস্তান সরকারের উদাসিনতা এবং পরে ভারত সরকারের কবিকে পাকিস্তানে না পাঠানোর প্রচেষ্টা নজরুল পরিবারবে ভীষন বিপাকে ফেলে। কবির জীবনে দুর্ভাগ্য অনেক গভীর। রাজনৈতিক নির্যাতন ও সামজিক অপপ্রচার তথা বহিরাঙ্গনের কথা ছেড়ে দিলেও কবির পারিবারিক জীবনেও ছিল সীমাহীন অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা। হিন্দু শাশুড়ীর দাপটে পরিবারে মুসলিম আচার-অনুষ্ঠান না করতে পারার বিড়ম্বনা, গোড়াপন্থীদের চোখ রাঙ্গানি, অসুস্থাবস্থায় কবির প্রতি তাঁর বন্ধুও পরিচিত জনের অবহেলা, নোংড়া, আলো-বাতাসহীন বদ্ধ ঘরে রোগগ্রস্থ কবির দুঃসহ জীবন যাপন কবিকে অস্থির করে তুলে। এর কিছু দিন পর নানা টানা-পোড়েনে ব্যাথিত ও উপেক্ষিত কবি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ভারত সরকার তখন চিকিৎসার জন্য কবিকে রাঁচি হাসপাতালে প্রেরণ করেন। ১৯৫০ সনের ১০ই মে কবি নজরুল ও প্রমিলাকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডনে পাঠানো হয় এবং ঐ বৎসরের ১৪ই ডিসেম্বর কবি দম্পতি কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৬০ সনের ৩০শে জুন প্রমিলা নজরুল দেহ ত্যাগ করেন।
নজরুল প্রিয়জন হারিয়ে দীর্ঘদিন কলকাতায় রোগগ্রস্থ অবস্থায় নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেন। অবশেষে ১৯৭২ সনের ২৪শে মে/১০জ্যৈষ্ঠ মাসে কবিকে ঢাকায় নিয়ে আশা হয়। কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দান হয় এবং ঢাকার ধানমন্ডিতে কবিভবনে তার বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। তাঁর সাহিত্য কর্মের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার ‘২১শে স্বর্ণ পদক এবং ১৯৭৪ সনের ৯ই ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করেন। দুর্মুখদের বিরোধের কারনে তাঁর প্রতিভার বিলম্বিত স্বীকৃতি এলো। ব্রিটিশ ভারতে সমকালীন মেজাজও চাহিদার নিরিখে নজরুল তাঁর রচনায়-কবিতায়-গানে-ভাষনে আমাদের জাতীয় আশা-আকাঙ্খার সার্থক শিল্পরূপ দান করে ‘বাংলাদেশ’ নামের বর্তমান সার্বভৌম সত্ত্বাসম্পন্ন জনপদটির স্বাধীন অস্তিত্বের সাংস্কৃতিক অবকাঠামো বিনির্মান করেন। তিনি আমাদের স্বতন্ত্র্য জাতি প্রতিষ্ঠার অগ্রসৈনিক। তাই আজ আমরা একটি স্বাধীন জাতি। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি অতি জনপ্রিয় নাম। জাতির হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন বলেই তাঁর অবিস্মরনীয় স্মৃতিকে চিরজাগরূক রাখার লক্ষ্যে তাঁকে ‘জাতীয় কবি’-র অভিধায় বিভূষিত করা হয়েছে। এ সম্মান প্রদর্শন তাঁকে বড় করতে পারেনি। পক্ষান্তরে, এ স্বীকৃতি আমাদের জাতিকে বড় করেছে, সম্মানিত করেছে। তাই জাতীয় পর্যায়ে অন্য যেকোন কবি থেকে নজরুলের মর্যাদা বেশী। কাজেই তাঁর জন্ম-মৃত্যু জার্ষীকী জাতীয় অনুষ্ঠানের সমতুল্য। এর সঙ্গে অন্য কারো কোন অনুষ্ঠানকে টেনে আনা অনুচিত। পরাধীন জাতি যেভাবে নজরুল সঙ্গীতের উন্মাদনায় একদা উদ্বেল হয়ে জেগে উঠেছিল, তেমনি আজো স্বাধীন জাতির পরিপূর্ণ বিকাশে নজরুলের সম্যক পরিচিাত, সঠিক মূল্যায়ন ও সঙ্গীতের উদ্দীপনা নব শক্তির সঞ্চার করবে এবং বিরূপ পরিবেশ-পরিস্থিতিতে ও এদেশীয় ঐতিহ্য-বিরোধী তৎপরতা এবং বাঁধ-ভাঙ্গা বন্যার মতো ওপারের গায়ক-গায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রী, সাহিত্যিক, নৃত্যশীল্পীর অবাধ অযাচিত আগমন, তথা বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবিলায় খাপছাড়া তলোয়ারের মতো জ্বল্সে উঠে সঠিক নির্দেশনা দান করবে। নজরুলের স্মৃতি, জীবন ও সাহিত্যের উপর গবেষনা, কবির ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রচনাবলী সংগ্রহ ও সংরক্ষন, প্রকাশনাও প্রচার-তথা, সামগ্রিকভাবে নজরুল চর্চার উদ্দেশ্যে কবির অমর স্মৃতিবাহী ধানমন্ডির ‘কবিভবনে’ নজরুল ইনস্টিটিউট, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৮৫ সনের ফেব্রুয়ারীতে। নজরুল ইনস্টিটিউট, নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ড-এ ডক্টরেট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হলেই নজরুল বিষয়ক কাজ কর্মের পূরো দায়িত্ব অর্পণ করা সমীচিন নয়। নজরুলকে চর্চা করতে গেলেই ইসলামী ঐতিহ্যও সংস্কৃতিকে মেনে নিতে হয় বলেই অনেক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী তথাকথিত বচন বাগীষ বুদ্ধিজীবীরা মন খুলে কাজ করতে পারেনা। দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যমূলক বক্তৃতা-বিবৃতি অনেক সময় মূল লক্ষ্যকে ব্যাহত করে বিভ্রান্তি ছড়ায়। তাই নজরুল চর্চার আঙ্গিনায় আজোও যথেষ্ট অন্তরায়ও দুঃখজনক দিক রয়েছে। নজরুল বিষয়ক কাজের প্রতি ভক্তি, আনুগত্য, প্রাণের টান, অনুসন্ধিৎসা, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার ভিত্তিতে- কোন সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে নয়- এসব সংস্থার কর্নধার নির্বাচন করতে হবে। নজরুল বিষয়ক গঠনমূলক কাজে কোন বিদ্বেষ-অনীহা নেই বা অন্তরায় নহেন, এরূপ ব্যক্তিত্বের প্রতিনিধিত্বই জাতির কাম্য। অন্যথায়, এ মহান কর্তব্য ব্যাহত ও বাধাগ্রস্থ হবে। জাতীয় কবির পাশে তাঁর সমসাময়িক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক ও ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে প্রাপ্তদের যেমন, কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ এবং কবির সহচর লুৎফুর রহমান, কবি মোজাম্মেল হক, কমরেড মোজাফ্ফর আহম্মেদ, আব্দুল কাদির, খাঁন মঈন উদ্দীন, আবুল মনসুর আহমেদ, অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর, সিকান্দার আবু জাফর-এর ছবিগুলো থাকলেই একাডেমীতে রবী ঠাকুরের ছবি প্রতিস্থাপনের সার্থকতা প্রতিপন্ন হতো।
একাডেমীক নজরুল চর্চা ও পদ্ধতিগত নজরুল গবেষনার দায়িত্ব নিয়ে এগীয়ে আসতে হবে সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষকদের এবং আমাদের গণ-প্রচার মাধ্যম, একাডেমী, মহত সংস্থাগুলোকে। জাতীয় কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন কালে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান জাতীয় অনুষ্ঠান এবং জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানমালার প্রতি যথাযথ দৃষ্টি দিতে হবে। পুরস্কৃত করতে হবে নজরুল গবেষকদের- যেমন, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কবিতীর্থ চুরুলীয়ার নজরুল একাডেমী নজরুল বিষয়ক কাজের জন্য এপার বাংলার কবি আব্দুল কাদির, কবি তালিব হোসেন, সোহরাব হোসেন, নিতাই ঘটক, জগত ঘোটক, ধীরেন্দ্র মিত্র, ডঃ রফিকুল ইসলাম, শেখ লুৎফুর রহমান, সাহাবুদ্দিন ও ফেরদৌসী রহমানকে নজরুল পদক প্রদান করেছেন।

আমাদের সরকারী অনুদান পুষ্ট সংস্থা-প্রতিষ্ঠান গুলোকে বা এব্যাপারে বস্তুনিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এপার বাংলার মানুষ যে ত্যাগ-তিতিক্ষা-আন্দোলন-সংগ্রামের অম্লান নজীর স্থাপন করেছে, এদেশের ভাষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক-গবেষকদের ঢাকাকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের রাজধানী মনে করে দেশজ স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যকে প্রাধান্য দান করে নিরবিচ্ছিন্ন চর্চা, সাধনা ও শ্রমদান করে ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের বুনিয়াদকে মজবুত করতে হবে। প্রাক-মুসলিম আমলে ব্রাক্ষ্মন্য সংস্কৃতির বিকৃতি ঘটবে বলে দেশীয় ভাষা চর্চা পাপ বলে ধারনা করা হলেও গোটা মধ্যযুগ ব্যাপী মুসলমান বাদশাহ-সুলতান-নবাবরা নিজস্ব রাজভাষা ফার্সি থাকা সত্বেও ব্যাপক সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে বাংলা সাহিত্যের মজবুত ভিত্তি সৃজন করেছিলেন। তাই দীনেশচন্দ্র সেন বলেন- মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এদেশে বাংলা ভাষার বিকাশ সম্ভব হতো না। বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যত শ্রেষ্ঠরাগ রচিত হবে এ দেশেই। শিক্ষাকৃষ্টিতে অগ্রসর পশ্চিমবঙ্গবাসীরা বাংলা ভাষার গৌরবময় স্বকীয়তায় সচেতনতার অভাব প্রদর্শন করলো যখন পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা ১৯৬৫ সনের ১১ই ফেব্রুয়ারী ভোটের মাধ্যমে মায়ের জবানকে আটকে দিয়ে, হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করলো। হিন্দির দৌরাতেœ্য বাংলা ভাষার ভবিষ্যত নিয়ে পশ্চিমবঙ্গবাসীরা বেজায় উদ্বিগ্ন। হিন্দির একচ্ছত্র দাপটে তাদের বাংলা-ভাষা-সংস্কৃতি দিনকে দিন কুঁকড়ে যাচ্ছে। এখন তারা অখন্ড ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদের অন্তর্ভূক্ত। তারা দুরদর্শনে কি দেখবে এবং বেতারে কী শুনবে তা নির্ভর করছে দিল্লির মর্জির উপর। তার সীমান্তের ওপারে চোখ ফেলে নয়। পুচ্ছধারীও চর্বিত চর্বণ করে আতœ প্রতিষ্ঠা লাভ করা যায় না। অনুকরনপ্রিয়তা নিজের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে রাখে। বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস-আচরন-চেতনা-স্পৃহাকে অবলম্বন করেই বাংলাদেশের মানুষের ভাষার প্রকৃতি ও অর্থবোধ গড়ে উঠেঠে। তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সাহিত্যের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশে সাড়ম্বরে বেঁচে আছেন। পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব এদিককার কারো কারো চোখের ধাঁধাঁ। এক কালের ইংরেজ উপনিবেশ আমেরিকায় আমেরিকান ইংরেজী গড়ে উঠেছে, অবিকল ইংলেন্ডের ইংরেজী নয়। ইংলেন্ডের রাজা-রানীরা আজও কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশের সাংবিধানিক প্রতীকী প্রধান রয়েছেন। ওসব দেশগুলোতে ভৌগলিক সীমায় অবস্থানরত অধিবাসীরা ইংরেজী ভাষাভাষী হলেও, তাদের চেতনা-স্পৃহা ও আশা-আকাঙ্খাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে স্ব-স্ব দেশের ইংরেজী ভাষা। আমেরিকা, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়ার লোকেরা ইংরেজী ভাষী হলেও বিশ্বনন্দিত ইংরেজ কবি উইলিয়াম সক্সপীয়ার তাদের কারো মহাকবি বা জতীয় কবি নন। এমনকি মার্কিনীরা কোন কোন শব্দের বানানও উচ্চারন ক্ষেত্রেও ব্রিটিশদের থেকে পার্থক্য রক্ষা করে চলে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখার লক্ষ্যে। মিশর, জর্ডান, ইয়েমেন, কাতার, কুয়েত, ওমান ও ইরাকীদের ভাষা আরবী হলেও তা আরবের আরবী ভাষা নয়। মিশরের লেখক নাগব মাহফুজ মিশরীয় আরবীতে সাহিত্য রচনা করে তামাম আরব বিশ্বের প্রথম নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী হয়েছেন।
তাই কবি কাজী নজরুল ইসলামের বানী- তুই নির্ভর কর আপনার পর, আপন পতাকা কাঁধে তুলে ধর’-এর মর্ম অনুধাবন করে জাতীয় কবির বৈশিষ্ট ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। এদেশীয় রবীন্দ্র ভক্তিতে শ্রেষ্ঠদের পশ্চিমবঙ্গ বাংলা সাহিত্যের মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়ে ১৯৪৭-এর পর দুটি বাঙ্গালি জাতির সৃষ্টি হয়েছে এবং দুই বাংলার সাহিত্য আলাদা- এ বাস্তবতা মনকে বড় করে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিতে হবে। ব্রিটিশযুগে এবং অবিভক্ত ভারতে শোষিত-বঞ্চিত-নিগৃহীত মুসলমানদের অবাধ আতœবিকাশের সুবিধা এবং তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল বলেই মুসলমানদের টিকে থাকা আর ইংরেজ সমর্থন পুষ্ট হিন্দুদের আধিপত্য বিস্তারের বিরোধের কারনেই, ‘৪৭-এ ভারত খন্ডিত হয়েছিল। একই ভৌগলিক সীমায় বসবাসরত অধিবাসীরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বেচে থাকার সমানাধিকার ভোগ করতে পারলে সেই বিভাজন ঘটতনা। এ বিভক্তিই ছিলো উত্তরকালে বাংলাদেশ অর্জনের প্রথম সিড়ি। দুই বাংলার মানুষের অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যত গড়ার পথও ভিন্ন। তাই এপার বাংলা ও ওপার বাংলার মানুষগুলো ভাষাগতভাবে এক জাতি এবং ক্ষেত্র বিশেষে প্রেক্ষিত ব্যতীরেকে দুই বাংলার সাহিত্য এক হলেও ভাষা চর্চা একচেটিয়াভাবে কারো এখতিয়ার ভূক্ত নয়। দুই বাংলার মানুষেরাই ভাষাভিত্তিক বাদালি জাতি, যেমন- ইংরেজ, চীনা, জাপানী, ফরাসী, তুর্কী জার্মান পভৃতিরা। দুদিককার বাঙ্গলিদের মধ্যেও উপরোক্ত ভাষাভিত্তিক জাতিগুলোর মতো রক্ত ও ধর্মের মিল নেই। তাইতো রবীঠাকুর তাঁর ভাষাও সাহিত্য- ১৯৩৯, শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন- বাংলা একটা নয়, দুইটা…, বাংলাদেশের ইতিহাস খন্ডিত ইতিহাস। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ ভাগ শুধু কেবল ভূগোলের ভাগ নয়; অন্তরেরও ভাগ। সমাজেরও মিল নেই। এতকাল যে আমাদের বাঙ্গালি বলা হয়েছে, তার সংজ্ঞা হলো, আমরা বাংলায় কথা বলে থাকি। তথাকথিত বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের অগ্রপথিক রবীঠাকুর মহারাজ শিবাজীর ছত্রছায়ায় পাঞ্জাব, সিন্ধু, গুজরাট, মারাঠা, দ্রাবিড়, উৎকল, বঙ্গ নিয়ে এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে, এক কন্ঠে বলতো-জয়তো শিবাজী। মারাঠীর সাথে আজি হে বাঙ্গালি এক সঙ্গে চলো মহোৎসবে রাজি। এক ধর্ম রাজ্য পাশে খন্ড, ছিন্ন,বিক্ষিপ্ত ভারতকে বেঁধে দেয়ার ধারনা পোষনের কারনেই রবী ঠাকুর বাঙ্গালি বলে সংজ্ঞায়িত হতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। তাই এদেশীয় উন্মাতাল রবী ঠাকুরের ভক্তদের বুঝতে কষ্ট হচ্ছে কেন রবী ঠাকুর ভেতরের ন্যজ্যটি কাটতে পারেননি।
ডঃ কাজী মোতাহার হোসেন বলেন- আমাদের ভৌগলিক অবস্থান ও জাতি ভিন্ন। এমনকি উচ্চারনে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা। সেইজন্য আমাদের সাহিত্য ভিন্নতর হবে, যেখানে আমাদের ঐতিহ্য ও চেতনা ভিন্ন। ত্রয়োদশ শতকে সেলজুক তুর্কী মুসলমানদের শাসনামল থেকে মুলুক-ই বাঙ্গালাহ-এর যে রাজনৈতিক চৌহদ্দী সৃষ্টি হয়েছিল, কালের প্রবাহে আবর্তন-বিবর্তন তাতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মন-মানসিকতায়, ঐতিহ্য-কৃষ্টি-স্থাপত্যে ও সামাজিকতার মৌলিক প্রভেদ দ্বারা যে স্বাতন্ত্র্যের সৃষ্টি হয়েছে, ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, নীরোদ রঞ্জন চৌধূরী প্রমুখ হিন্দু পন্ডিতেরা এই স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন। অন্নদা শংকর রায় বলেন- কেবল ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমরা বাঙ্গালি বৈশিষ্ট্য রক্ষা করি। ভাষা ও ধর্ম- কোনটাই একজাতি বা এক রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে পারেনা। স্বার্থের সঙ্গে স্বার্থের একত্ব থাকা প্রয়োজন। ভেদ রক্ষা করে মিল হয় না। একই ভাষায় কথা বললেও সকল মানুষের জীবনবোধ এবই হয় না। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সনে ঢাকাকে কেন্দ্র করে পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং তার সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য-তথা বাংলা সভ্যতার অভিব্যক্তি কেন্দ্রিভূত হয়েছে। একবিংশ শতকের অগ্রযাত্রায় ঢাকাই হবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তৎপরতার ভিত্তি। ধানের দেশ, গানের দেশ- বাংলাদেশ একটি গৌরবময় স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যের উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে সামনে এগোচ্ছে। এ ধারাটিকে বাধাগ্রস্থ করার জন্য নানা স্টাইলে, ঢং, পোষাক-আবরনে হররোজ বিরামহীন আগ্রাসন চলছে। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, মাইকেল জ্যাকসনী স্টাইল, ড্রাগন-পপ-ব্যান্ড নৃত্য-মিউজিক, ইংরেজী বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান, একুশের উৎসব, বসন্ত ও বৈশাখী মেলা এবং অন্যান্য জাতীয় উৎসব-অনুষ্ঠানাদিতে বাঘ, ঘোড়া, হাতি. কুকুর, বাঁদড়ের মুখোশ পরে ঢাকের বাদ্য, কাঁসার ঘন্টা, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি সহকারে যুবক-যুবতীদের আকর্ষনীয় দেহ-বল্লরীর কুৎসিত উত্তেজক নর্তন-কুর্দন আমাদের সমাজের রুচি-নৈতিকতার মানকে নে¤œগামী করে জনমানস ও জনমনকে প্যারালাইজিড করে দিচ্ছে। ক্যাসেট নির্ভর সংস্কৃতি তথা ইউরো-মার্কিন-ইন্দো বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সুরুচি, শালীনতাও সম্ভ্রমবোধকে ধ¦ংস করে দিচ্ছে। আমাদের তরুন প্রানের সজীবতা অবনৈতিকতার অতল গহবরে তলিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে সহিংসতা, আগ্রাসী ভাবধারা ও অসুস্থজীবন বোধ জন্ম নিচ্ছে। ক্রকে আমাদের সংস্কৃতির রং বদলে যাচ্ছে। জাতীয় পতাকা যেমন একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র্য জাতির পরিচয় বহন করে, তেমনি সংস্কৃতিও একটি স্বতন্ত্র্য জাতির পরিচায়ক। একটি পতাকার রং বদলের মতো সংস্কৃতির রূপ পাল্টে দিয়েও একটি জাতির পরিচয় মুছে দেয়া যায়, ব্যয়-বহুল সামরিক অভিযানের কোন প্রয়োজন নেই। আজকে আধিপত্যবাদীরা আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য চিনে-বৈশিষ্ট্যগুলো মুছে ফেলে দিয়ে আমাদের যুব সমাজকে বিভ্রান্তিতে নিক্ষেপ করছে। এ নতুন টেকনিক আমাদেরকে জয় করে নেবে, দেশও দেশবাসী তাদের বংশবদ হয়ে যাবে। তা রুখতে হবে। ঢাকাকে কন্দ্রে করে বাংলা সাহিত্যের যে বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে, তাকে জোরেসোরে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কলকাতা কেন্দ্রিক সাহিত্য আকর্ষন হ্রাস করতে পারলেই নিজকে চেনা যাবে, প্রতিষ্ঠা লাভের পথ সগম হবে। স্বকীয়তা বা নিজস্বতাতে একটি গর্ব আছে, আছে শান্তি ও স্বস্তি। নিজস্বতার গর্ববোধের অনুভূতি প্রতিটি স্বাধীন ব্যাক্তি ও জাতির সবচেয়ে বড় জিনিস, তাইতো ইংরেজী ভাষী মার্কিনীরা অনেক শব্দের বানান ও উচ্চারনে ব্রিটিশদের থেকে পার্থক্য রক্ষা করে চলে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখে।
এ ক্রান্তিলগ্নে আমাদের জাতীয় কবির কর্মময় জীবন ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে; যাতে করে প্রবীনদের সাথে সাথে নবীনরাও অনুপ্রানিত হয়। তাহলে নজরুল প্রেরনা তথা স্বজাতীয় বোধ জন-জীবনের প্রেরনার উৎস হবে। তাহলে কবি নজরুল সাধারন্যে সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবেন। নজরুলের ঐতিহ্য-চেতনার নব আলোকে প্রাপ্ত মুসলিম বাঙ্গালি যুব সমাজ নজরুল ও তাঁর ঐতিহ্য-চেতনাকে আঁকারে ধরে সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র্য রক্ষা করতে সমর্থ হবে। নজরুলের কাব্য-চেতনার নব আলোকে বাঙ্গালি যুব সামজকে নতুন পথের দিশা দিতে হলে সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান ব্যাক্তিবর্গকে নজরুল ইনস্টিটিউট, ট্রাস্টিবোর্ড, একাডেমী ইত্যাদির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাহলেই অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পন্ন হবে। শুধু রাঁচি, কাশী, দিল্লী, গৌহাটী ও পশ্চিম বঙ্গের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়েই বাংলাভাষা ও সাহিত্যে এম, এ, ক্লাশে-কোন বাঙ্গালি মুসলমান এর লেখা পড়ানো হয়না; যে বিশ্ববিদ্যায়য়ের মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সমাহিত করা হয়েছে, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এখানকার আর সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে রবী ঠাকুরের সবকিছু পাঠ্য এবং তার সাথে রয়েছেন বিহারীলাল, বিদ্যাসাগর, ঈশ্বরচন্দ্র, বঙ্কিম, মধুসুদন, শরৎ প্রমুখ অনেকের লেখা। পাঠ্য রয়েছে আবশ্যিকভাবে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী-ও আরো অনেক কিছু। শুধু অবশ্য পাঠ্য নয় নজরুল, ডঃ লুৎফর রহমান, এম ওয়াজেদ আলী, ডঃ মুহঃ শহীদুল্লাহ প্রমুখ মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় যথেষ্ট পরিচ্ছন্নতা ও গভীরতা থাকলেও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হচ্ছেন না উনারা। কোন মুসলমানের লিখা না পড়েও, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম, এ, পাশ করা যায় বা করানো হয়। আবার এ পাশ করা ছেলে-মেয়েরাই কালক্রমে পাশের দেশের অখ্যাত-অজ্ঞাত য়ুনিভার্সিটি থেকে কুড়িয়ে আনা ডক্টরেট ডিগ্রী ঝুলিয়ে এ দেশীয় বিভিন্ন একাডেমী, টিভি-রেডিও ও নানা কর্মক্ষেত্রের উঁচু কেদারায় আসীন হয়ে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের তৎসম পন্ডিতজনের দৃষ্টিভঙ্গি ও পদাঙ্ক অনুসরন-অনুকরন করে। তারাই আরবী-ফার্সি-উর্দ্দু-তুর্কী শব্দের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান ও মুসলিম ইতিহার-ঐতিহ্য-চেতনার পরিপন্থী কর্মতৎপরতায় লিপ্ত হয়। ধর্মবোধ থেকে উৎসারিত জীবন-বোধই বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মানুষের সংস্কৃতির উৎসমূল। আর তারা ধর্মীয় বিশ্বাসকে শিথিল করে দিয়ে মুসলিম সংস্কৃতি ধ্বংসের চেষ্টায় অহোরাত্র নিয়োজিত রয়েছে। ফলে ধর্মের বাঁধন শিথিল হচ্ছে, দিনের পর দিন ধর্ম চর্চায় ভাটা পড়ছে। সমাজে অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিঘিœত হচ্ছে সুখী-সুন্দর সুস্থ জীবন ধারা। ক্রমে অশ্লীলতার পরিমান, বিশৃঙ্খলার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নানা কৌশলে, নানা উপচার-উপকরনের মাধ্যমে আমাদের যুব সমাজকে ধর্ম থেকে দূরে আনা হচ্ছে, তাই বাড়ছে যুব সমাজের অস্থিরতা ও অধঃপতন।

৪৭-এর দেশ বিভাগের পরে পাকিস্তান আমলে এদেশে শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে বিপুল উন্নতি-অগ্রগতি ও স্বাতন্ত্র্য সাধিত হয়েছিল, তাকে অতলে তলিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে এবং এপার-ওপার বাংলার শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে এক মঞ্চে এনে সমভাবে ভারতীয় করনের মতলবে ১৯৭২ সনে ভারত-বাংলাদেশ শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি সংসদ গঠিত হয়। তৈরী হলো নতুন ছকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য স্যচী। এই সংসদের সুবাদে এদেশটাকে অবাঙ্গালি করনের মহাপরিকল্পনা প্রনয়ন করা হলো। এদেশের ভারতপন্থী বাঘা বুদ্ধিজীবীরা প্রচারনা শুরু করেন-ধর্মের নামে পাকিস্তান হয়েছে, আর পকিস্তান মানে ইমলামের প্রতিছায়া। পাকিস্তানের কারনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। ইসলাম শুধু ধর্মমতই নয়-একটি পূর্ণ জীবনাচার-যার ব্যাপ্তী ও প্রভাব সমগ্র ইহলৌকিক ও পরলৌকিক জীবন ব্যাপী। এধর্মই অশান্তির কারন, ধর্মকে রাজনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন ও সংস্কৃতি থেকে সরিয়ে দিতে হবে। তাই ইসলাম রাষ্ট্র ধর্মের মর্যাদা হারালো। পাশের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সূচনা সঙ্গীত হিসাবে বন্দেমাতরম; বৃটেনে খৃষ্টীয় ধর্ম অনুসারে প্রার্থনা খৃষ্টান-অখৃষ্টান সকল ছাত্র-ছাত্রীর জন্য বাধ্যতাম্যলক হলেও, এদেশের বিদ্যাপীঠের শিখন্ডি সেজে ¯œাতক, প্রভাষক, প্রভাষিকা, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রাধ্যক্ষ, উপাচার্যরা আমাদের শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রনের হাল কষে ধরেছেন।
অধূনা কলেজ, ইউনিভার্সিটি, পাঠ্যক্রম, বিভিন্ন প্রকাশনা, বইপত্র, খবরের কাগজ, পাক্ষিক, সাময়িকী, সুভ্যেনির ইত্যাদিতে ষড়যন্ত্র ম্যলক হীনমন্যতার কারনে আরবী-পার্সি শব্দ, মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্য, নামাবলী ও পদ বর্জিত হয়ে এমন সব শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে যার প্রভাবে আমাদের জাতীয় আশা আকাঙ্খাই ধূলি-ধূসরিত হচ্ছে না, আমাদের ভাষাভিত্তিক বৈশিষ্ঠ্য-স্বকীয়তাও প্রায় বিলুপ্ত হবার পথে। স্বরস্বতী, রামকৃষ্ণ, চিত্তরঞ্জন, মানময়ী, ভারতেশ্বরী, সিদ্ধেশ্বরী, জগন্নাথ, হলিফেমিলি, হলিক্রস, সেন্টযোশেফ, সেন্টগ্রেগরিয়াস, সেন্টপল, সেন্টগ্রেগরি, নটরডেম বহাল তবিয়তে রয়েছে। প্রগতির নামে শেরে বাংলা ফজলুল হক গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ হয়েছে নারী শিক্ষামন্দির, ফজিলাতুননেসা হল রূপান্তরিত হয়ে হয়েছে মুক্তি জয়তী হল। প্রগতির ভরা জোয়ারে ভেসে গেছে কায়দে আজম কলেজ, জিন্নাহ হল, ইকবাল হলের কায়দে আজম, জিন্নাহ, ইকবাল, নজরুল প্রভৃতি পদবাচ্যগুলো। পাকিস্তানী ধ্যান-ধারনা মুছে ফেলতে গিয়ে বিদুরিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের মনোগ্রাম থেকে ‘রাব্বি জেদনি ইলমা’, ইক্বরা বেইসমি রাব্বিকা’। প্রগতির ছাপ লাগাতে গিয়ে জাহাঙ্গীর নগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক মুসলিম হলের ‘মুসলিম’ মুসলিম শব্দকে বর্জন করা হয়েছে। দ্রুত অপসৃয় হচ্ছে তেলাওয়াত, ছালাম, খোদা হাফেজ, খোশ আমদেদ। এখানে-সেখানে নির্মিত ইট পাথরের অবয়ব নিয়ে দাড়িয়ে গেছে অনেক বীর। মোনাজাতের বদলে অগ্নিশিখার সামনে দাড়িয়ে নীরবতা পালন করা হচ্ছে। মঙ্গল ঘট বসিয়ে সূচনা বা বন্দনা সঙ্গীত গেয়ে শুরু হচ্ছে অনুষ্ঠান মালা। কদাচ ঢাকার পাঁচিলে দেখা যায় ‘রামের দেশে রাবন বধিতে আয়, আয় ছুটে আয় জনতা’। ভাবটা মনে হয় মধু-যদু ‘পাচুরাম’ সঙ্গে আছে যোগীরন নেড়ে দেখলে টিবি নেড়ে তেড়ে আসবে মারতে’।
ভাষার সঙ্গে কৃষ্টির স্বকীয়তা সংযোগ প্রত্যক্ষ। যে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের উপলব্ধি থেকে দুইশত বৎসরের ইংরেজ সৃষ্ট কোলকাতা কেন্দ্রিক বেঙ্গলের পূর্বাংশে ১৯৭১ সনে পৃথক জাতি সত্তার উত্থান ঘটেছিল, নির্মল জাতীয় পরিচিতি ও কৃষ্টিক স্বকীয়তার অভাব হেতু রবী ঠাকুরের ভাষায় ‘বাংলা শুধু দেহেই নয়, অন্তরেও দুই’ এর ব্যবধানের অবলুপ্তির প্রক্রিয়া দ্রুত অগ্রসরমান। মগজ-বেচে বুদ্ধিজীবিদের বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের কারনে ধর্ম নিরপেক্ষ মুসলমানরা সর্বক্ষেত্রে অবাঙ্গালী মুক্ত ধারন প্রক্রিয়া সুকৌশলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয়ত্বের মাধ্যাকর্ষনে কেন্দ্রমুখী ধাবিত হচ্ছে। হিন্দি আদলে বাংলা হরফের লিখা আজকাল শুধু ভারত বিচিত্রাতেই সীমাবদ্ধ নয়। টিভি-রেডিও, পত্র-পত্রিকা সহ অন্যান্য সব প্রচার মিডিয়া গুলোতে ও সেবা দান ক্রয়ের জন্য পঁড়শীরা অজস্র রুপী ঢালছে। কাজেই অবাংলাদেশী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবিলায় সময়োপযোগী সুষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহনে কালক্ষেপন করা হলে, সময়ের গতিময়তায় যদি সাহিত্য-সংস্কৃতি ও কৃষ্টিক বিজয় হয়ে যায়, পশ্চাতে সামরিক বিজয় আপসে এসে যাবে। ভাষা-সাহিত্য-শিল্পকলা-ভাস্কর্য্য, নাম-পদবি, চিরায়ত মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে নির্মিত সাম্প্রদায়িক সম্পীতি, জাতিগত ঐক্য ও সংহতির দেশটির নিজস্ব সংস্কৃতির প্রগতিশীল রূপায়নে দেশ প্রেমিক, আদর্শ সচেতন, আতœমর্যাদা সম্পন্ন ও স্বাধীন চেতা অধ্যবসায়ী লোকের প্রয়োজন অধিক।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সম্যহে নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে একজন সম্মানিত অধ্যাপকও রয়েছেন। নজরুল চেয়ার অলংকৃত করা উচিত ঐ সমস্ত প্রাজ্ঞজন, যারা নিষ্ঠার সঙ্গে নজরুলকে খুঁজে নিয়ে নিশ্চিন্তে ও সার্বিক নিরাপত্তায় হাতখুলে লেখা বলার মনন ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন। বিলক্ষন প্রতিবন্ধকতার সহায়-সম্পদের সীমাবদ্ধতা স্বত্বেও নজরুল সাহত্যকর্মের সময়ানুক্রমিক পূর্নাঙ্গ মূল্যায়ন করতে হলে, বিভিন্ন শাস্ত্র ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও পৌরানিক বিপর্যয় সম্পর্কে প্রচুর পড়াশুনা, চিন্তা-ভাবনা ও ভাষা-ভিত্তিক জ্ঞান থাকতে হবে। বচন বাগীষ বুদ্ধিজীবীদের মতো নজরুলের এ কবিতার কিছু অংশ, ঐ রচনার দুই লাইন, কোন প্রবন্ধ-নিবন্ধের কয় পংক্তি নিয়ে লিখলেই নজরুল জীবন ও সাহিত্য কর্মেও মূল্যায়ন হয় না। ধারাবাহিকভাবে অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিরলস শ্রমদান করেই কবির অমর প্রতিভাকে জনসমক্ষে হাজির করতে হবে। তাই জন্ম-মৃত্যুদিনের অনুষ্ঠান মালায় নজরুলকে বন্দী করে রাখলে চলবেনা। মানুষের কবি, মানুষের মুক্তির কবি ও আমাদের স্বাধীনতার অগ্রপথিক নজরুলকে আরো জানতে হবে, জানাতে হবে, এবং গবেষনা করতে হবে। গায়ক, শ্রেুাতা, প্রকাশক ও পাঠকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বনি¤œস্তর থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত নজরুলকে আবশ্যিক পাঠ্য করতে হবে, যিনি একদিন কচি-কিশোরদের ভোর হলো দোর খুলো; তুমি নহ শিশু দুর্বল, তুমি মহৎ ও গরীয়ান, জাগো দুর্বার, বিরাট, বিপুল অমৃতের সন্তান-বলে ডাক দিয়েছিলেন এবং যাবার বেলায় নবীনদের বলেছেন-জাগো চির অমলিন দর্জয়, ভয়হীন। আসুক শুভদিন, হোক নিশিভোর। সমাজের সংঘাত-সংঘর্ষ বিদুরিত করে সুখী, সুন্দর-সুস্থ সমাজ গড়ার লক্ষ্যে তিনি যুবাদের আহবান জানিয়েছেন ধর্ম, বর্ণ, জাতির উর্দ্ধে জাগোরে নবীন প্রাণ; তোমার অভ্যুদয়ে হোক সব বিরোধের অবসান, তাই যুবা-কিশোর, নবীন-প্রবীন সবাইকে পিছন ফিরে তাঁকে খুজে নিতে হবে। কেননা, অপসংস্কৃতি রোধ এবং ভাষা-সাহিত্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং জাতীয়তা বোধকে প্রতিষ্ঠিত ও মজবুত করতে ব্যপক নজরুল চর্চার প্রয়োজন। ঘটা করে কবির জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকী উদযাপন করে দু-চারটি দৈনিকের পৃষ্ঠায় লেখা লেখিতে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

-:সমাপ্ত:-

Check Also

প্রবাসে বাংলা ভাষার প্রসারে সরকার ও আমাদের ব্যর্থতা

—দেলোয়ার জাহিদ ‘দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে নিজকে সংশোধন করা এবং সবচেয়ে সহজ কাজ হচ্ছে ...

Leave a Reply