কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও পথিকৃৎ কুমিল্লার সাংবাদিকতা

দেলোয়ার জাহিদ :

আশি’র দশকে সমাজসেবা ও অধ্যাপনা থেকে যখন সাংবাদিকতার পেশায় এলাম তখন মনে ছিলো সমাজ পরিবর্তনের এক আকাশ ছোয়া স্বপ্ন। আমার সম্পাদনায় সমাজকন্ঠের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হলে প্রচন্ড ঝাকুনি এলো প্রচলিত ধারার সাংবাদিকতায়। শুভানুধ্যায়ী কিছু সাংবাদিক ও সুধীজন উদ্বিগ্ন হলেন আমার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যত নিয়ে। আমাকে বুঝাতে ও চেষ্টা করলেন যে এটা সাংবাদিকতা নয়, সাংবাদিকতায় কৌশলী হতে হয়। অন্যায়কে কৌশলে অন্যায় বলা শিখিনি আজো তবে ব্স্তুনিষ্ট হয়েছি নিশ্চয় । আমার বাবা মরহম কবি এম এ খালেক শুধু বলে ছিলেন বাবা তোমার নিজ হৃদয়ের কথা শোন। তাই সেদিন হৃদয়ের কথা শুনলাম, আজো শুনি তাই।

কুমিল্লা’র সাংবাদিকতায় তৎসময়ে যারা ছিলেন দিকপাল তাদের মধ্যে মরহুম ফজলে রাব্বী, মরহুম অধ্যাপক আবদুল ওহাব, মরহুম গোলাম মোস্তাফা চৌধুরী, মরহুম আফতাবুর রহমান ও মমতাজ ভাই ছিলেন অন্যতম আর তরুনদের মধ্যে আলী হোসেন, প্রদীপ, শামীম ও আবুল হাসানাত বাবুলের নাম উল্লেখ্য। কেউ কেউ রয়েছেন যারা সাংবাদিকতাকে চাটুকারিতা আর ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ও গৌরবকে ধুলিসাৎ করেছেন তাদের নাম এখানে উল্লেখ না করাই ভাল। আমার মতোই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা কুমিল্লার অধিকাংশ সাংবাদিক যাদের জীবনে অভাব, অনটন, দুঃখ, দারিদ্র ছিলো নিত্য দিনের সঙ্গী। তাই তাদের কাছ থেকে সেবা নেবার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে ফরাক থাকা বিচিত্র কিছু নয়।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে গনমাধ্যমে কিছু খবর বের হয়েছে। কুমিল্লা প্রেসক্লাবে তালা ঝুলছে,প্রকাশিত এ প্রতিবেদন গুলোর উপর আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হিসাবে আমি গভীর মর্মাহত হয়েছি। কারন একদা ঢাকা, চট্রগ্রামের পরই কুমিল্লা প্রেসক্লাবের নাম উঠে আসতো। সাংঠনিক কর্মকান্ড ও পেশাদারীত্বের এক সন্মিলন কেন্দ্র ছিলো কুমিল্লা প্রেসক্লাব। একশ্রেনীর তরুন ও উদিয়মান সাংবাদিকদের নিয়ে কুমিল্লা প্রেসক্লাবের কার্যক্রমকে গনতান্ত্রিক ও আইনের আওতাধীন করা হয়েছিলো । একে কোম্পানী আইনের সোসাইটিস রেজিষ্ট্রশান এ্যাক্টের অধীনে এনে নিবনন্ধন করা হয়ে ছিলো । এর জন্য আমাদের অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবকে গনতন্ত্রায়নের পথে যারা নৈপথ্যে পৃষ্টপোষকতা করেছিলেন তাদের মধ্য অন্যতম ছিলেন দৈনিক রূপসী বাংলার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মরহুম অধ্যাপক আবদুল ওহাব। এক পর্যায়ে এ প্রক্রিয়ায় শামিল হন মরহুম গোলাম মোস্তাফা চৌধুরী সহ অন্যান্যরা। কুমিল্লা প্রেসক্লাবকে গড়ে তুলতে আমার সাথে যারা নিরলস শ্রম দিয়েছিলো তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক আবদুস সামাদ, গোলাম মাহফুজ, নজরুল ইসলাম বাবুল, আবদুল আজিজ মাসুদ, খায়রুল আহসান মানিক, সৈয়দ নূরুর রহমান, মরহুম বদিউল আমিন দুলাল, ফিরোজ মিয়া, আবুল কাশেম, আমিনুল হক, আলী আকবর মাসুম, শামীম আহসান, কুদরত-ই-খোদা, ওমর ফারুকী তাপস, জসিম, রমিজ খান ও সহীদ সহ আরো অনেকে। এছাড়া ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসে কুমিল্লার সাংবাদিকতাকে অনেকে সমৃদ্ধ ও অর্থবহ করেছেন এমন কিছু সাংবাদিক ও রয়েছেন।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের অতীত কার্যক্রম শুধুমাত্র ক্লাবের সীমিত পরিসরেই সীমাবদ্ধ ছিলো না বরং জেলার প্রতিটি উপজেলায় এর শেকর গ্রথিত ছিলো, জেলার প্রতিটি পেশার ও শ্রমজীবি মানুষের মিলনষ্থল ছিলো কুমিল্লা প্রেসক্লাব। মানবাধিকার লংঘন, দূর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে কুমিল্লার সাংবাদিকেরা ছিলো সদা অকুতভয়। কুমিল্লা প্রেসক্লাবের মাধ্যমে সংগঠিত সাংবাদিকেরা সেবার এক অনন্য নজীর স্থাপন করেছিলো যার মধ্যে উল্লেখ্যঃ নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগন্জ উপজেলাধীন চরাঞ্চলগুলোতে জলোচ্ছাসের পর ত্রান বিতরন ও হৃদয়স্পর্শী সংবাদ প্রতিবেদন প্রেরন, দাউদকান্দি’র চরাঞ্চলে লাঠিয়ালদের আক্রমনে মিশে যাওয়া এক বিরান জনপদের কথা লিখে দেশব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি, তৎকালে কুমিল্লা বিমানবন্দর এলাকার ১১ গ্রাম বাচাও আন্দোলন, হালিমা সুতাকলের শ্রমিকদের আন্দোলন, লাকসাম ও সদর দক্ষিন উপজেলার মাছের বাড়া অপসারন আন্দোলন নিস্পতিতে কার্য্যকর ভুমিকা পালন, ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার কৃষি ঋণ কারচুপির বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলনে সহায়তা,কুয়েত প্রত্যাগত শ্রমিকদের দাবি আদায়ে সহায়তা এবং কয়েকটি খুন ও বিচার ব্যবস্থায় চিহ্নিত দূর্নীতির বিরুদ্ধে লিখনী সহ আরো অনেক বিষয়ই রয়েছে।

কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়ন পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের যেকোন রূপ বাধা, বিপত্তি, নিপীড়ন ও নিগ্রহ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছে। জেলার গনমানুষের দাবি দাওয়া ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অগ্রনী ভুমিকা রেখেছে। কুমিল্লায় দ্বিতীয় হাউজিং এর প্রকল্প প্রস্তাবনায় একটি শিক্ষা জোন স্থাপন, সাংবাদিকদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের চুড়ান্ত পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিলো তৎসময়ে এবং গণপূর্ত মন্ত্র্র্রনালয়ের প্রধান প্রকৌশলী তা অনুমোদন ও করে ছিলেন। জেলা প্রশাসন থেকে কুমিল্লা প্রেসক্লাবের জন্য যায়গা ও অর্থ বরাদ্ধ সহ সব কিছুই হয়েছিলো প্রেসক্লাবের কর্মকান্ডের স্বীকৃতি হিসাবে।

কুমিল্লা প্রেসক্লাব ছিলো বাংলাদেশের তৃণমূলে মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম চর্চা কেন্দ্র। সীমানা নির্বিশেষে নিপীড়িত, নিগৃহীত ও নির্যাতীত সাংবাদিকদের পার্শ্বে দাড়াতে ছিলো সদা অকুতভয় কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সদস্যরা। জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় আমাদের সাংগঠনিক ভিত্তি ছিলো । কুমিল্লা প্রেসক্লাবের পৃষ্টপোষকতায় লাকসাম, চৌদ্দগ্র্রাম, বুড়িচং, ব্রাহ্মনপাড়া সহ বিভিন্ন উপজেলায় ছিলো আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম, স্থানীয় প্রেসক্লাব ও মানবাধিকার সংগঠনের বিস্তৃতি । আমাদের ছিলো ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস, ছিলো সাহস প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের। আমাদের সহযোগী ছিলো জেলা আইনজীবি সমিতি সহ সকল পেশাজীবি সংগঠন এবং ক’ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদ যারা দলমতের উর্দ্ধে উঠে প্রেসক্লাব পূনর্গঠনে সহায়তা করে ছিলেন।

এই সেই কুমিল্লা প্রেসক্লাব যেখানে একদা চর্চা হতো সিটিজেন জার্নালিজমের। যেখানে জনগনের অংশগ্রহন ও গণতান্ত্রিক অংশীদারিত্ব ছিলো, ছিলো একজন ভুমিহীন হতদরিদ্র মানুষ থেকে একজন রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত সকলের সন্মানজনক প্রবেশাধিকার। তারই ফলশ্রুতিতে কুমিল্লা প্রেসক্লাব শ্রেষ্ঠ সংগঠন হিসাবে জাতীয় পুরষ্কার ও পেয়েছিলো। এর সবই সম্ভব হয়েছিলো তরুন সাংবাদিকদের নিঃস্বার্থ শ্রম ও প্রচেষ্টার কারনে। কুমিল্লা প্রেসক্লাবের তৎসময়ের সভাপতি হিসাবে সকল ব্যর্থতার দায়ভার আমার আর সফলতাগুলো তোলা রইল তরুন সাংবাদিকদের জন্য। কুমিল্লা প্রেসক্লাবের উপর কুমিল্লাবাসীর প্রত্যাশা অনেক, সে প্রত্যাশা প্রাপ্তির মাঝে ফরাক হলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

জীবন জীবিকার টানে দীর্ঘ ১৫ বছর দেশের বাইরে। ঘুরেছি নানা দেশে তম্মধ্যে ইউরোপের জার্মান, নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পূর্তুগাল থেকে সর্বশেষে স্পেন হয়ে কানাডায় এসে স্থায়ী হয়েছি জীবনের এক ক্রান্তিলগ্নে। জীবন চলার পথে সবচেয়ে ঘটনা ও স্মৃতিবহুল সময় কেটেছে কুমিল্লা প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে। কথিত আছে সাংবাদিকদের দ্বিতীয় বাড়ী প্রেসক্লাব আমার ক্ষেত্রে হয়তো ছিলো এর বিপরীত। সে নিজ বাড়ী যখন সংকটে, যখন ঐক্য বিনাসী’রা স্বার্থান্ধ তৎপরতায় লিপ্ত তখন হৃদয়ে শুধুই রক্তক্ষরণ হয়, মনে হয় এ ব্যর্থতার দায়ভার আমার ও এড়াবার নয়।

আজকে কুমিল্লার সাংবাদিকতায় এসেছে তারুন্যের জোয়ার। দেশের শীর্ষ স্থানীয় সবগুলো গণমাধ্যমের ষ্টাফ রিপোর্টার বা জেলা প্রতিনিধি রয়েছে কুমিল্লায়। এ পেশায় সন্মিলন ঘটেছে একশ্রেনীর শিক্ষিত, মার্জিত ও মেধাবী তরুণের, যারা জেলার সাংবাদিকতার বিকাশে গঠনমূলক ভূমিকা রেখে আসছে । তাদের রয়েছে যে কোন দল ও রাজনৈতিক মতাদর্শের উদ্ধে উঠে কুমিল্লার স্বার্থকে সমুন্নত করার প্রচেষ্টা। আর এর জন্য প্রয়োজন কুমিল্লা প্রেসক্লাবের মতো একটি প্রতিষ্ঠান এবং এতে গণতান্ত্রিক ও নির্লোভ নেতৃত্ব। প্রয়োজন সকল সাংবাদিকদের ইস্পাত কঠিন ঐক্য্ ও পেশাদারীত্ব। মত ও পথের ভিন্নতা সত্বে নীতি, নৈতিকতা ও পেশার ঐতিহ্যকে সন্মান প্রর্দশন করে সাংবাদিকদের সামনে এগুতে হবে।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবকে সুসংগঠিত করা এবং সকলের সন্মিলিত প্রচেষ্টায় আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। কুমিল্লার আপামর জনগনের স্বার্থে পেশাদার সাংবাদিক ও শুভানুধ্যায়ীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে এ সংকট আশু নিরসন হবে বলে আশা করি।

লেখকঃ
দেলোয়ার জাহিদ,কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি,নোটারী পাবলিক অব সাস্কাচুয়ান,জাতীয় সংবাদপত্রে নিয়মিত প্রবন্ধ, ফিচার ও স্তম্ভ লেখক। বর্তমানে কানাডা’র লয়েড মিনিষ্টার সিটি নিবাসী। ফোনঃ ১ (৫৮৭) ৩৩৩ ২০৬৮।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply