মরিশাসে নিহত ৩ জনই তিতাসের ॥ পরিবারের সামনে অন্ধকার

নাজমুল করিম ফারুক, তিতাস :

মরিশাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত তিতাস উপজেলার বন্দরামপুর গ্রামের সেলিম এর স্ত্রীর আহাজারি সাথে তার তিন সন্তান (ইনসেটে নিহত সেলিম)
গত বুধবার সকালে বাসা থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে বাংলাদেশী শ্রমিক বহনকারী মিনিবাসের সঙ্গে একটি লরির মুখোমুখো সংঘর্ষে নিহত বাংলাদেশী ১০ শ্রমিকের মধ্যে ৩ জনের বাড়ী তিতাস উপজেলায়। নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো বিভিন্ন ভাবে টাকা ধার, লাভ ও ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে তাদের সন্তানকে বিদেশে পাঠালেও অল্প সময়ের মধ্যে তাদের মৃত্যু হওয়ায় পরিবার গুলো ধার, লাভ ও ক্ষুদ্র ঋণ পরিশোধের চিন্তায় পরিবারগুলো অস্থিত হয়ে পড়েছে। সেই সাথে ভেঙ্গে গেছে রিক্সা চালক সেলিমের স্বপ্ন।

সরেজমিনে গিয়ে যানা যায়, তিতাস উপজেলার কড়িকান্দি ইউনিয়নের বন্দরামপুর গ্রামের রেনু মিয়ার ছেলে সেলিম (৩৩) গত ২৮ ডিসেম্বর মরিশাসে চাকুরীর উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেন। ভিটেমাটিহীন সেলিমের স্ত্রীসহ তিন সন্তান সহিদুল ইসলাম রানা (৮), আরিফুল হাসান রনি (৬) ও সাইয়ম হোসেন (৪)। স্বামীকে হারিয়ে ৩ সন্তান নিয়ে স্ত্রী বিউটি বেগম সারা দিন কান্নাকাটি করে লাশের অপেক্ষায় বসে আসেন। সন্তানকে হারিয়ে মা হালিমা বেগম কিছুক্ষণ পর পর মুর্চা যান। নিহতের চাচা খোকন মিয়া জানান, গত মাসের ২৮ তারিখে সেলিম বিভিন্ন জনদের কাছ থেকে হাওলাত ও লাভে প্রায় ২ লক্ষ টাকা দিয়ে বিদেশ গেছে। এখন হাওলাত ও লাভের টাকা পরিশোধ করতেও হিমশিম খেতে হবে। তিনি আরো জানান, সেলিম দেশে থাকতে রিক্সা ও অন্যের জমিতে কাজ করে দিন যাপন করতো। মরিশাসে যাওয়ার জন্য সেলিম স্থানীয় কিছু লোকজনদের কাছ থেকে টাকা হাওলাত করে এবং স্থানীয় একটি সমিতি থেকে লাভে টাকা নিয়ে একই উপজেলার দুঃখিয়ারকান্দি গ্রামের আদম ব্যবসায়ী জামাল এর মাধ্যমে মরিশাসে যান। সেলিমের ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সে সকলের বড়। তার আরেক ভাই ডালিম মরিশাসে থাকলেও অপর দুই ভাই আলম, বাবু ও এক বোন ডলি আক্তার থাকেন দেশে। ছোট ভাই ডালিমের ফোনের মাধ্যমেই প্রথম জানতে পারে সেলিম মরিশাসে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে আছে। পরে তার মৃত্যুর কথা জানানো হয়।

এদিকে একই উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়নের সোনাকান্দা গ্রামে গিয়েও দেখা গেল করুণ অবস্থা। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা জালাল মোল্লা ছেলে জাহিদুল (১৮) কে হারিয়ে তার মা জোসনা বেগম অজ্ঞান হয়ে ঘরে পরে আছে। ২ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে জাহিদুল সকলের বড়। নারান্দিয়া কলিমিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখা পড়া করে চাকুরীর জন্য বিদেশে পাড়ি জমায়। জাহিদের কাকা আক্তার মিয়া জানান, সেলিমের সাথে জাহিদুল ও মোক্তার একই তারিখে মরিশাসে যায়। কিন্তু এতো অল্প সময়ে তাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবে তা কেউ আমরা মেনে নিতে পারছি না।

একই গ্রামের মৃত মনু মোল্লার ছেলে মোক্তার (১৮) জাহিদুলের সাথে চলাফেরা করার কারণে সেও বন্ধুর সাথে বিদেশে চাকুরীর জন্য যায়। ৬ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে মোক্তার তৃতীয়। তার বড় ভাই দিদার সৌদি আরব থাকলেও সংসারের ছোট ছোট ভাই-বোনদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মোক্তার বিদেশে যায় বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়। সোনার ধন ছেলে মোক্তারকে হারিয়ে মা সখিনা বেগম একেবারে খাওয়া-দাওয়া বন্দ করে দিয়েছে। সন্তানের লাশ আসবে পথ চেয়ে অশ্র“সজল চোখে তাকিয়ে আছে। কথা বলতে পারে না। স্বামীর হারানোর ব্যাথাটা ভুলতে পারলেও ছেলে হারানোর ব্যাথাটা ভুলতে পারছেনা বলে স্থানীয় এক মহিলা জানান। মোক্তারের বড় বোন আয়েশা আক্তার জানান, লাভে টাকা নিয়ে ভাইকে বিদেশে পাঠিয়েছে। এখন ভাই মরে গেছে আমরা কি করে লাভের টাকা পরিশোধ করবো? ছোট ছোট ভাই-বোনদের দেখিয়ে বলে- দেখেন তাদের মুখে দিকে চেয়ে। স্থানীয় লোকজনদের সাথে আলাপ করে আরো জানা যায়, অত্র এলাকায় নিম্নবৃত্ত পরিবারের সংখ্যা বেশী হওয়ায় তার জীবিকার উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমায়। অনেক সময় পরিবারগুলোর জমানো টাকা পয়সা থাকে না বিধায় আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে, বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে অথবা লাভে টাকা নিয়ে তারা বিদেশে যায়। শর্ত সাপেক্ষে এই লাভ বা ঋণ দেওয়া হয়ে থাকে বলে জানানো হয়।

Check Also

কুমিল্লায় তিন গৃহহীন নতুন ঘর পেল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা সদর উপজেলায় গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ৪নং আমড়াতলী ইউনিয়নের গৃহহীন নুরজাহান বেগম, ...

Leave a Reply