কুমিল্লার সীমান্ত এখন চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী,কুমিল্লা :

বৃহত্তর কুমিল্লার সীমান্ত এলাকা এখন বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ভারত থেকে পানির স্রোতের ন্যায় প্রকাশ্যে ধেয়ে আসছে শত শত কোটি টাকার আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় ফেনসিডিল, বিভিন্ন ব্রান্ডের মদ,গাজাঁ, বিয়ার, হেরোইনসহ জীবন বিধ্বংসী মাদকদ্রব্য। তাছাড়া আরো আসছে শাড়ি-কাপড়, থ্রি-পিছ, সাইকেল,মোটরসাইকেল, গাড়ির খুচড়া যন্ত্রাংশ, প্রসাধনী সামগ্রী, গরম মসলা,ভারতীয় ডিম, কাঠ ,গরু সহ বিভিন্ন সামগ্রী ।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হচ্ছে সার,ডিজেল, কেরোসিন, মাছ, চাউল। সীমান্ত এলাকার শতকরা ৯০ ভাগ যুবক-যুবতী মাদক পেশায় সক্রিয় এবং মাদকাসক্ত। তাছাড়া সীমান্ত এলাকা এখন চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃত।

চোরাচালান এখন আর চোরাইপথে হয়না, চোরাচালান এখন ওপেন চালানে পরিণত হয়েছে। সীমান্তের প্রতিটি এলাকা এখন চোরাচালানীদের নিয়ন্ত্রনে। মাদকাসক্ত যুবকের কর্মকান্ড, চোরাচালান, মাদকের ব্যাপকতা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে নিয়ে এই প্রতিবেদন।

কুমিল্লার বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকার শতকরা ৯০ ভাগ যুবক মাদক পাচাঁরের সাথে জড়িত ও নিজেরাও মাদকাসক্ত। তারা মাদক ব্যবসায় জড়িত হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন মাদক যেমন-ফেনসিডিল, হেরোইন, গাজাঁ,মদ,রিকোডেক্স তাদের কাছে সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় তারা সহজে মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে। তারা চুরি-ছিনতাই ইত্যাদির সাথেও জড়িত।

সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এখন অরাজকতা, চুরি-ছিনতাই, অশ্লীলতা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাদক পাচাঁর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নারী ও কোমলমতি শিশুদের। তারা সকাল থেকে গভীররাত পর্যন্ত মাদক পাচাঁরের কাজে ব্যস্ত থাকে।

ছোট ছোট শিশুদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তেমন সন্দেহ করেনা বিধায় তাদের দিয়ে হেরোইন, গাজাঁ আনা হয়। আর মহিলাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে ফেন্সিডিল, হেরোইন, ভারতীয় শাড়ি বেঁধে পাচাঁর করা হয়।

কুমিল্লার বিভিন্ন সীমান্তের মধ্যে চৌদ্দগ্রাম এলাকার উজিরপুর, গোমারবাড়ী, দত্তসার, গাংরা,ফকিরবাজার, কেসকিমুড়া,ডিমাতলী, ,নানকরা, কালিকাপুর, বাতিসা, আটগ্রাম, চন্ডিপুর, লক্ষীপুর রোড, চৌদ্দগ্রাম জামে মসজিদ রোড, বালিকাবিদ্যালয় রোড, ডাকবাংলো রোড, হাউজবিল্ডিং রোড, বালুজুড়ি, নাটাপাড়া, বীরচন্দ্রনগর, পড়ি মর্দ্দার, মতিয়াতুলী ,খালাসী মসজিদ রোড, আমানগণ্ডা, ঘোলপাশা, জগন্নাথদীঘি, শালুকিয়া, বাবুর্চী,উত্তর বার্বুচী, ছুপুয়া, সোনাপুর, মীরমবানি, বেতিয়ারা, নোয়াবাজার, শিবেরবাজার, উজিরপুর,কৃষ্ণপুর, কোমারডগা, মিয়াবাজার, শীতলিয়া, চান্দঁশ্রী ও কাইছুটি,সদর দক্ষিণের রাজেশপুর, মথুরাপুর, লালবাগ, জগপুর, ভাটপাড়া, শুয়াগাজী, দড়িবটগ্রাম, লামপুর, সুবর্ণপুর, বাণীপুর, চৌয়ারা –কনেশতলা রাস্তা, বলারডেফা,একবালিয়া, তালপট্রি, যশপুর ও সুয়াগঞ্জ,সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর, শিবের বাজার, তেলকুপি, গোলাবাড়ী, শাহপুর, অরণ্যপুর, বিবিরবাজার, সাহাপাড়া,বালুতুপা, ব্রাহ্মণপাড়ার তেঁতাভূমি, নয়নপুর, আশাবাড়ী, বাশঁতলী, গঙ্গানগর, দক্ষিণ তেতাভূমি, সালদানদী ,বুড়িচংয়ের সংকুচাইল, চরানল, বারেশ্বর, রাজাপুর, পাহাড়পুর, গাজীপুর, কর্নেল বাজার, আনন্দপুর, ফকিরবাজার, নগরগ্রাম, কংশনগরসহ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ভারত থেকে পানির স্রোতের ন্যায় প্রকাশ্যে ধেয়ে আসছে শত শত কোটি টাকার আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় ফেনসিডিল,বিভিন্ন ব্রান্ডের মদ,গাজাঁ, বিয়ার, হেরোইনসহ জীবন বিধ্বংসী মাদকদ্রব্য।

আরো আসছে শাড়ি-কাপড়, থ্রি-পিছ, সাইকেল,মোটরসাইকেল, গাড়ির খুচড়া যন্ত্রাংশ, প্রসাধনী সামগ্রী, গরম মসলা,ভারতীয় ডিম, কাঠ ,গরু, সহ বিভিন্ন সামগ্রী ।এছাড়া বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হচ্ছে সার,ডিজেল, কেরোসিন, মাছ, চাউল।

কুমিল্লার সীমান্ত এলাকা এখন চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্য হিসেবে চিহিৃত। সীমান্তের ১১৯ কিলোমিটার এলাকা চোরাকারবারিদের নিয়ন্ত্রনে থাকায় দিনে-রাতে যখন-তখন এপারের মাল ওপার ও ওপারের মাল এপার পাচাঁর হচ্ছে নির্বিঘেœ ।

সীমান্তে লাইনম্যান নামধারীরা চোরাচালানিদের থেকে প্রকাশ্যে বখরা আদায় করে চোরাচালানে সহায়তা করে থাকে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, ভারত থেকে মদ, বিয়ার, রিকোডিক্স, ফেনসিডিল, সোনামুড়ার দিলীপ ও ভুট্টু নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকে আনা হয়। দিলীপ ও ভুট্টু সেখানকার সবচেয়ে বড় পাইকার। এদের অধীনে রয়েছে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০টি সিন্ডিকেট। দিলীপ ও ভুট্টু সোনামুড়াতে থাকে, তারা গত দশ বছর ধরে এদেশে মাদক ও বিভিন্ন চোরাচালান পণ্য পাচার করছে। তাদের সাথে রয়েছে আইন শৃংঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ কর্মকর্তার ভাল সম্পর্ক। যার সুযোগে তারা চোরাচালানকারী সম্রাটে পরিণত হয়েছে।

সূত্র জানায়, কুমিল্লা কোটবাড়ি বিডিআর মাঝেমধ্যে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে সীমান্ত এলাকায় ও ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা এলাকায় ট্রাক ও ভ্যান ভর্তি ভারতীয় মালামাল আটক করলেও সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে তারা থাকেন রহস্যজনকভাবে নির্বিকার। তাদের সামনে দিয়ে চোরাচালান পণ্য প্রতিদিন ২/৩ বার এদেশে নামছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়। তবে মাঝেমধ্যে স্থানীয় বিডিআর নূন্যতম লোকদেখানো কিছু মালামাল আটক করতে দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিগত এক বছরের মাদকবিরোধী অভিযানে আটক মাদকদ্রব্যের পরিসংখ্যান হতে দেখা যায় কুমিল্লায় বিগত এক বছরে মাদকের স্রোতে ভেসেছে । কুমিল্লা র‍্যাব-১১ এর সিপিসি-২ এর সূত্রে জানা যায়, বিগত বছরে (২০১০) মাদক বিরোধী বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে ৩২ হাজার ৯২৫ বোতল ফেন্সিডিল, ২ হাজার ৩১০ বোতল রিকোডেক্স, আধা কেজি হেরোইন, ২ হাজার ৩৪১ কেজি ৭শ গ্রাম গাজাঁ, ৬০৯ বোতল বিয়ার, ২৭৪ বোতল হুইসকি, ১৮ হাজার ৭১৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১ লক্ষ ৩১ হাজার ৫৩৭ পিস সেনেগ্রা ট্যাবলেট, ১১ হাজার ৮২০ পিস হটেগ্রা ট্যাবলেট, ৫৯ হাজার ৫৬৪ পিস টার্গেট ট্যাবলেট, ১ লক্ষ ৯২ হাজার পিস সিপ্রোজি ট্যাবলেট,১ হাজার ১৫০ পিস সিপ্রো ট্যাবলেট এবং ৬০০ পিস প্রকটিন ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে। র‌্যাব গত এক বছরে মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় ৩৩৭ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং বিভিন্ন থানায় মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় ১৫৯টি মামলা দায়ের করেছে।

এদিকে কুমিল্লা কোটবাড়ি ৩৩ রাইফেলস ব্যাটালিয়নস (বিডিআর) গত ১ বছরে মাদক বিরোধী বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে ১০৩ কোটি ২৬ লক্ষ ৪৩ হাজার ৫শ টাকা মূল্যের আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় ফেনসিডিল, রিকোডেক্স, গাজাঁ,মদ, হেরোইন, বিয়ার,হুইসকি, ইয়াবা,সেনেগ্রাসহ বিভিন্ন মাদক আটক করেছে। বিডিআর গত এক বছরে মাদকদ্রব্য আটক করার পাশাপাশি ৯৭ জনকে মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় গ্রেফতার করেছে এবং ৮৫ জন চোরাকারবারি বিডিআরের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply