নিজে বদলালেই দেশ বদলাবে

খালেদ সাইফুল্লাহ :

খালেদ সাইফুল্লাহ
‘‘লাশের দাম ১৭শ টাকা। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ?’’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয় অনলাইন পত্রিকা কুমিল্লা নিউজ টুয়েন্টি ফোর ডট কম সহ বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায়। অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও মর্মষ্পর্শী একটি প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য প্রথমেই ধন্যবাদ সম্পাদককে। কঠিন এই অভিজ্ঞতাটুকু কাগজে কলমে গেথেছেন আমাদের সহকর্মী আনোয়ার ভাই। বিবেক নাড়া দেয়ার মত অভিজ্ঞতার চিত্রটি সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য ধন্যবাদ তাকে। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতার হাজারো কথা আমাদের অজানাই রয়ে যায়। গীতিকার শিল্পী হায়দার হোসেন থাকলে হয়তো গানের কথায় তাকে আরো জীবন্ত করতে পারতেন। দেখার কথা কি দেখছি, শুনার কথা কি শুনছি, ৪০বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুজছি শিল্পী হায়দারের এ গানটি বিজয়ের মাসে বেশিই নাড়া দেয়। ৪০বছরের যৌবনে এমাসেই পা দিয়েছে আমাদের বাংলাদেশ। প্রিয় মাতৃভূমিটি বাংলাদেশ আজ হাটি হাটি পা পা করে যৌবন অতিক্রম করছে। কিন্তু কেন আমরা আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হই বারে বারে। রাষ্ট্র কি আমাদের মৌলিক অধিকারের দায়িত্ব যথাযথ পালন করবেনা। তবে কেন আমার লাশের দাম ১৭শ টাকা গুনতে হবে। দূঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের অধিকাংশের পকেটে ১৭ টাকাও থাকে না সব সময়। আমরা প্রতিনিয়তই পথিক। কাজের তাগিদে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে বেড়াই। কিন্তু প্রতিনিয়ত ঝড়ের তান্ডবতার মতো সড়ক দূর্ঘটনাগুলো কেড়ে নিচ্ছে আমাদের আপনজনদের। ঘর থেকে যখন বের হই তখন বলি আম্মা বের হচ্ছি। মা দরজায় ঝাড়– নিয়ে পরিস্কার করে দেন। বলেন যে ভালো ভাবে ফিরে আয়।

আমি কি ফিরতে পারবো আবার। দুপুরের খাবার কি মায়ের সামনে বসে খেতে পারবো? এর উত্তর কারো জানা নেই। কুমিল্লার এক সচিব ও তার পুরো পরিবার কি করে দু’দফায় সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন তা সবাই জানেন। ওই ঘরে এখন কান্নার লোকটিও বেঁচে নেই।
লাশের দাম ১৭শ টাকা। তাও সাংবাদিক পরিচয়ের কারণেই সম্ভব হয়েছে। তাহলে সাধারন মানুষের নিথর দেহগুলোর দাম কত? এ প্রশ্ন আজ বিবেকের। টিআইবি যখন সেবা খাতে পুলিশের দূর্ণীতির কথা বললেন তখন পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা খুব রেগে গেলেন। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়া পুলিশ বাহিনীকে বললেন তাদের কে ধৈয্য ধরার জন্য। তিনি টিআইবি রিপোর্টকে বিভ্রান্তিকর ষড়যন্ত্রমূলক অভিহিত করলেন। একই অবস্থা বিচার বিভাগেও। টিআইবি রিপোর্ট বলল তাদের দূর্ণীতির কথা। ক্ষুদ্ধ হয়ে কুমিল্লায় টিআইবি চেয়ারম্যানসহ ৩কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করলেন এডভোকেট তৌহিদ। তার বক্তব্য ছিল টিআইব রিপোর্টটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন। সকালে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করলো মহামান্য আদালত। কিন্তু একি… সন্ধ্যায় মামলাটিই খারিজ করে দিল আদালত। ঘটনাটির ব্যাখ্যা কি হবে তা আমার জানা নেই। তবে এডভোকেট তৌহিদ নিজের অভিজ্ঞতাটা কিভাবে মূল্যায়ন করবেন তা জানতে চায় অনেকে।
গত ২৮ডিসেম্বর চান্দিনায় সড়ক দূর্ঘটনায় ১১জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এ মৃত্যু কারো কাম্য নয়। আমরা কখনো তা প্রত্যাশা করে ঘর থেকে বের হই না। ৩০ডিসেম্বর কুমিল্লা নিউজ টুয়েন্টি ফোর সহ কুমিল্লার বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় বৈশাখী টেলিভিশন কুমিল্লা প্রতিনিধি আনোয়ার হোসাইন এর রিপোর্ট এর প্রতিক্রিযায় বিবেকের তাড়নায় কিছু লিখতে ইচ্ছে হল। হাইওয়ে পুলিশ সুপারের ভূমিকা ও তার অধঃস্থন সদস্যদের টালবাহানার অভিজ্ঞতার চিত্র ফুটে উঠলো রিপোর্টটিতে। তিনি বললেন কতগুলো দরজায় তাকে বারবার কড়া নাড়তে হয়েছে। হ্যা, সাধারন মানুষ এটা ধারনা করে যে সাংবাদিক হিসেবে পুলিশ হয়তো তাদের কথায় সহযোগিতা না করুক পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু এ কি চিত্র আমাদের নিরাপত্তার সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠানটির। যদি সাধারন মানুষ পুলিশকে ফোন করে তাহলে তাদের সাথে কি ব্যবহার করেন তারা?
সড়ক দূর্ঘটনায় আলতাফ হোসেনের মৃত্যুর পর তার পরিবারে শোকের মাতম চলছিল। বৃদ্ধ আলতাফ লাশঘরে পড়ে আছেন অবহেলিত হয়ে। একটু পর তার বুক চিরানো হবে। কিন্তু তা মানতে পারছেন না তার স্বজনরা। এ কোন নির্মমতা। কিন্তু হ্যা নিয়ম অনুযায়ীই তা করতে হবে। তাহলে নিহত হলে কেন আমাকে টাকা গুনতে হবে। আলতাফের স্বজনদের কাছে হয়তো কিছু টাকা ছিল। যদি না থাকতো তাহলে কি তারা তাদের বাবার লাশটা ফিরে পেত না। শোকার্ত হৃদয়ে হয়তো তাদের বুক ফেটে যায়। হয়তো বিশাল আকাশের অধিপতির কাছে দুহাত তুলে ফরিয়াদ করে, হে প্রভু কোন অপরাধে আজ আমাদের স্বজনকে কেড়ে নিলে, শুধু তাই নয় এখন তার লাশ নেবার জন্যও আমাকে পকেটে হাত দিতে হচ্ছে। আমাকে কি এই পৃথিবীর বৈচিত্রময় মানুষের মাঝে না পাঠালে হতো না?
সত্যিই আমরা সাধারন মানুষ যারা প্রতিনিয়ত এমন অসংখ্য দূর্ঘটনা আর দুর্ভোগের যাতাকলে নিষ্পেশিত হই। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের নিত্যদিনের গল্প। হয়তো সংবাদকর্মী হিসেবে মাঝে মাঝে আমরা কলমটাকে নাড়াাচাড়া দেই। কিন্তু যারা মুখ বুঝে সহ্য করছে এসব অনিয়ম, যারা বঞ্চনা আর লাঞ্চনার শিকার হয়ে নিপিড়িত হচ্ছে আমাদের সেবকদের দ্বারা তারা কোথায় লিখবে।
আমরা এসব অনিয়মের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে চাই। হয়তো রিপোর্টটি খুব নাড়া দিবে। তড়িত এ্যাকশন নেয়া হবে। কিন্তু তা কতক্ষণ। চেয়ার বদল হয় কিন্তু চেয়ারগুলোর চরিত্র বদল হচ্ছে না। এটাই আমাদের দূর্ভাগ্য। মৃত্যুর মিছিলে আর কত প্রাণ এভাবে ঝড়ে যাবে। আর কত দিন আমরা গুনতে থাকবো লাশ আর প্রতি লাশে এমন ১৭শ টাকার হিসেব। দেশ কি সামনের দিকে এগুবে না। বলতে লজ্জা হয় তবুও বলতে হয়, বিজয়ের এই মাসেও আমরা কি লাল সবুজ পতাকাটিকে সালাম দিয়ে দায়িত্বটাকে যথাযথ পালন করতে পারি না। কেন বার বার ভুলে যাই আমাদের স্বজনদের রক্তে ভেজা এই দেশটি এখনো অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করেনি, দারিদ্রতার কষাঘাতে আমরা প্রতিনিয়ত জর্জরিত, রাস্তায় বেরিয়ে লাঞ্চিত বোন বাসায় এসে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে চায় কেন? এর উত্তর কি আমরা আমার দিকে তাকিয়ে একবার জিজ্ঞেস করেছি? আমি যদি নিজেই ভালো হই তাহলেও তো অনেক কিছু। দেশ বদলাবে যদি নিজে বদলাই। তাই সবাই আমরা নিজেদের যায়গায় নিজেকে পরিবর্তনে অঙ্গীকার হই। পাঠকদের পক্ষ থেকে বন্ধুবর আনোয়ার হোসাইনকে অশেষ ধন্যবাদ। লেখাটি আমাদের অনেকের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। আর তা আমাদের হৃদয়ের সত্য বোধকে জাগরিত করেছে অনেকখানি।

লেখক- খালেদ সাইফুল্লাহ, রিপোর্টার, দিগন্ত টেলিভিশন, কুমিল্লা ব্যুরো ও নির্বাহী সম্পাদক- কুমিল্লা নিউজ টুয়েন্টি ফোর ডট কম

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply