জনগনের কাঠগড়ায় বিচার বিভাগঃ সময় আত্ম-সমালোচনা ও সংস্কারের

দেলোয়ার জাহিদ :

বিচার বিভাগের দুর্নীতির উপর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ এবং এর উপর সরকারের ক’জন দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও আমলা’র দ্রুত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা এবং এরই ধারাবাহিকতায় গত রবিবার টিআইবির চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন, নির্বাহী প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান ও ওয়াহিদ আলমের বিরুদ্ধে কুমিল্লায় গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি এবং পরে তা খারিজ হয়েছে। চট্টগ্রামে দায়েরকৃত বিচার বিভাগের মানহানি মামলায় আদালত থেকে সমন জারির ঘটনা প্রবাহ সচেতন নাগরিকদের ভাবিয়ে তুলেছে।

সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগ নিয়ে টিআইবির প্রকাশিত প্রতিবেদনের উপর তথ্যপ্রমাণ চেয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার বদরুল আলম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এ চিঠিটি পত্রবাহকের মাধ্যমে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বরাবরে পাঠানো হয়েছে। উল্লেখ্য, টিআইবির সেবা খাতে দুর্নীতিবিষয়ক জাতীয় খানা জরিপ-২০১০-এর ফলাফলে প্রকাশ, বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে ৮৮ শতাংশ মানুষকে ঘুষ দিতে হয় এবং তাদের নানা অনিয়মের শিকার হতে হয়। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, জজকোর্ট ও হাইকোর্ট—বিচার বিভাগের এই তিনটি স্তরে দ্রুত শুনানি হওয়া, মামলার রায় প্রভাবিত করা, তথ্যপ্রমাণ উত্তোলন, শুনানির তারিখ পেছানো, নথিপত্র গায়েব ইত্যাদি কারণে সাধারণ মানুষকে ঘুষ দিতে হয়েছে মর্মে প্রকাশ।

প্রথম আলোকে সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার বদরুল আলম ভূঁইয়া জানান কারও বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা জানাতে বলা হয়েছে টিআইবিকে। তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান এবং যদি কেউ প্রকৃত অপরাধী হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে বিচার বিভাগ ব্যবস্থা নেবে বলেও আশ্বস্থ করা হয়েছে। বিচার বিভাগের এ উদ্যোগ অবশ্যই সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষন ও বিশ্লেষনের দাবী রাখে।

প্রথমেই বিবেচনায় নিতে চাই আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের বক্তব্যকে যিনি শনিবারই গণমাধ্যমকে বলেছেন, টিআইবির প্রতিবেদন তথ্যভিত্তিক নয়, এর কোন সারবস্তুও নেই।

পুলিশ ও বিচার বিভাগ সম্পর্কে টিআইবির প্রতিবেদনটি মোটেই সঠিক নয় মর্মে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম এবং ঢাকা মহানগর (ডিএমপি) পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ। পৃথক অনুষ্ঠানে তাঁরা টিআইবির প্রতিবেদনটির তীব্র সমালোচনা করেন। তবে শিক্ষা বিভাগে অনিয়ম ও দুর্নীতি কমে আসা সম্পর্কে টিআইবির প্রতিবেদনকে যথার্থ বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। (প্রথম আলোঃ ২৫-১২-২০১০) ।

আইন প্রতিমন্ত্রী আরো একটি গুরতর অভিযোগ করেন,যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য যারা ষড়যন্ত্র করছে,টিআইবি পরোক্ষভাবে তাদের পক্ষেই আছে। বঙ্গবন্ধু একাডেমি আয়োজিত ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর করা এবং সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে তিনি আরো বলেন, ‘বিচার বিভাগে নিম্ন বেতনভুক কিছু কর্মচারী থাকতে পারে, যারা হয়তো ফাইল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য পাঁচ, দশ বা কুড়ি টাকা উৎকোচ নিতে পারে কিন্তু তারা ঢালাওভাবে বিচার বিভাগকে যেভাবে দোষারোপ করেছে, বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালিয়েছে,মন্ত্রী মনে করেন, আমাদের বিচার বিভাগকে এই মুহূর্তে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এটা একটা ষড়যন্ত্র।’ একই অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া আরো বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা পরিষ্কার করে যখন সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, তখন কিন্তু বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে। আমরা সুস্পষ্টভাবে বলতে চাইছি, টিআইবির ওই রিপোর্ট সেই ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ।’

পুলিশ বিভাগেরপ্রতিক্রিয়া: টিআইবির প্রতিবেদনকে ‘অনুমাননির্ভর’ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মহানগর (ডিএমপি) পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ। মহানগর পুলিশ সদর দপ্তরে সস্প্রতি এক ব্রিফিংয়ের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, এ-জাতীয় প্রতিবেদন অনুমানভিত্তিক না করে গবেষণাভিত্তিক হওয়া উচিত। জরিপকারীদের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি রয়েছে ইত্যাদি, ইত্যাদি ।

এছাড়াও বিচার বিভাগ সম্পর্কে জরিপ প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে তা নিয়ে ও প্রশ্ন তুলেছেন জুডিশিয়াল সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘এ গবেষণায় বিচার বিভাগ বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। বিচার বিভাগে যেমন বিচারকরা কাজ করেন তেমনি এখানে বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কাজ করেন।’ জনাব হোসেন বিচারকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেন।

প্রতিবাদগুলোর সার-সংক্ষেপ হলোঃ টিআইবির প্রতিবেদন তথ্যভিত্তিক নয়, এর কোন সারবস্তুও নেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য এটি একটি ষড়যন্ত্র, প্রতিবেদনটি গবেষণাভিত্তিক নয় অনুমানভিত্তিক এবং জরিপ প্রক্রিয়াগত ত্রুটিযুক্ত।

অপরদিকে প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান তার ভাষনে বলেছেন,এটি দুর্নীতির আংশিক চিত্র, দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা আরো অনেক বেশি। দুর্নীতির সার্বিক চিত্র দেখতে হলে উচ্চপর্যায়ে যে দুর্নীতি হয়, তাও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে জাতীয় অর্থনীতির ৫০ শতাংশই কালো টাকা। দুর্নীতি কমিয়ে এ অবস্থা থেকে জাতিকে বেরিয়ে আসতে হবে ।

বিচার বিভাগের সন্মানহানীর কথিত অভিযোগ নিয়ে শুরু হয়েছে মামলা দায়েরের এক অশুভ প্রতিযোগিতা। কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে দায়েরকৃত মামলার বাদীরা মূলতঃ বলেছেন,টিআইবি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খানা জরিপের নামে রিপোর্ট করে বিচার বিভাগের মানহানি করেছে। যেহেতু বাদীরাও বিচার বিভাগ এবং আইনের সঙ্গে সংশিস্নষ্ট সেহেতু এতে তাদেরও মানহানি হয়েছে।

এবিষয়ে টিআইবির বক্তব্য ষ্পষ্ট- মামলা দুর্ভাগ্যজনক : টিআইবি ॥ বিচার বিভাগে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা নিয়ে মানহানির মামলাকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন টিআইবি চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন খান। সম্প্রতি প্রকাশিত জরিপকে তথ্য নির্ভরযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ বলেও দাবি করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারম্নজ্জামান (জনকন্ঠ, ডিসেম্বর ২৭, ২০১০)

খোদ দেশের প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগ সম্পর্কে কি মনে করেন তা থেকেই হয়ত পুরো বিষয়টি সাফ হয়ে যাবে। গত ১২ নভেম্বর ২০১০ সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত বিচার বিভাগীয় সম্মেলনের শেষ দিন মাননীয় প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেন, বিচার বিভাগ এখন জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে । দেশের মানুষ বিচারকদের কর্মকাণ্ড ও সততা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। ১৬ কোটি মানুষ বিচারকদের নিয়োগ দিলেও তারা বিচারকদের কর্মকাণ্ডে অখুশি। নাজিরদের সঙ্গে অনেক জেলা জজ যে টাকা লেনদেন করেন তা তিনি বন্ধ করার আহব্বান জানান। সারা দেশ থেকে যোগদান করা ১৫৪ জন জেলা ও দায়রা জজের উপস্থিতিতে আরো কিছু মৌলিক বিষয়ের উপর তিনি আলোকপাত করেন যেমনঃ জামিন কোন মৌলিক অধিকার নয় তবে কাউকে অন্যায়ভাবে আটক রেখে স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার সুযোগ নেই। —সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে আপনারা এসেছেন। কারুকার্য খচিত চেয়ারে আপনারা বসেন। আপনি আপনার সৃষ্টিকর্তার প্রতিভূ। যখন বিচারকাজ পরিচালনা করবেন আপনার সামনে থাকবে বিবেক। এটা থেকে কেউ পালাতে পারবেন না। মনে রাখবেন, মহান আল্লাহর দৃষ্টিশক্তির বাইরে কারো যাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বিচারাঙ্গনের অনেকগুলো সমস্যাকে চিহ্নিত করে বিচারকদের কিছু দিক নির্দেশনা দেন। তন্মধ্যে মামলাজট দূর, সময়মত এজলাসে আসা, মামলার রেকর্ড আসতে বিলম্ব ও তদবির, বিচারকদের পোষাক সহ আরো কিছু বিষয়ে বেশ খোলামেলা কথা বলেন। এছাড়াও বিচারকদের সমস্যাগুলো তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেন এবং যথাযথ প্রতিকারের আশ্বাস দেন।

সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকে বন্ধু ডঃ তোফায়েল আহমেদের বিচারালয় ও বিচার ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ শীর্ষক একটি লেখা পড়েছিলাম । তাতে মামলার মহাজট : সমস্যার একটি দিক চিহ্নিত করে দৈনিক ইত্তেফাকে দেশের উচ্চ ও নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যাকে ৩৭ লাখ উল্লে্খ করে একটি সম্পাদকীয় (২৩/০৫/২০১০) এর বরাত দেয়া হয়েছে । জুলাই ২০০৯ পর্যন্ত এদেশে বিভিন্ন বিচারালয়ে ১৮,২৯,১৬৫টি মামলা বিচারাধীন ছিল বলে একটি পত্রিকা অক্টোবর ২০০৯-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে। অতি সম্প্রতি এ সংক্রান্ত আর একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে (১৮/০৯/২০১০) বর্তমানে দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১১ লাখ উল্লেখ করা হয়। এই তিনটি তথ্যের মধ্যে কোনটি সত্যের কাছাকাছি তা সংশ্লিষ্টরাই নিশ্চিত করবেন। তবে এর মধ্যে ৩,০৩,২৭৬টি মামলা উচ্চতম বিচারালয়ের দু’টি বিভাগে তথা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। বাকি সব মামলা জেলাপর্যায়ে নিম্ন আদালত ও বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন বলে অনুমান করা হচ্ছে। যে সংখ্যক মামলা প্রতিবছর নিষ্পত্তি হচ্ছে তার চেয়ে বেশি প্রতিবছর নতুন মামলা রজু হচ্ছে। তবে একথা সত্যি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ফলে এবং উচ্চতর আদালতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে বিচারালয়ের কার্যক্রমে গতিশীলতা সঞ্চার হয়েছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। বিচার ব্যবস্থা পৃথকীকরণের দু’বছরে নিম্ন আদালতে মামলার নিস্পত্তির সংখ্যা ও হার বৃদ্ধি পেয়েছে। বিচার ব্যবস্থা পৃথকীকরণের দু’বছরে নিম্ন আদালতে মামলার নিস্পত্তির সংখ্যা ও হার বৃদ্ধি পেয়েছে। আনুষ্ঠানিক বিচারালয়ের বাইরেও আমাদের ভ‚মি ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। দৈনিক ইত্তেফাকের (২৩/০৫/২০১০) ঐ সম্পাদকীয়তে দেশের উচ্চ ও নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলা সংখ্যাকে ৩৭ লাখ উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, তার প্রায় ৪৭% ভ‚মি সংক্রান্ত মামলা, সংখ্যা বিচারে প্রায় ১৭ লাখ। তাছাড়া খাস জমি, জলমহাল, বালুমহাল, পাথরমহাল, অর্পিত ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি সংক্রান্ত অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা প্রায় আরও এক লক্ষ। এর মধ্যে ভ‚মি মন্ত্রণালয়ে ১০ হাজার, আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর উইং-এ ৬ হাজার, জেলাপর্যায়ে ৫০ হাজার এবং উচ্চ আদালতে ২৫ হাজার মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এখানে আরও উল্লেখ্য যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদাসীনতা, দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে ১০ হাজার মামলায় সরকার পক্ষ পরাজিত হয়েছে। ফলে এভাবে বহু সরকারি জমি বেহাত হয়েছে, আপিলের সময় পার হয়ে যাওয়ায় বহু মামলা তামাদি হয়ে গিয়েছে এবং এগুলোর কোন সিভিল রিভিউ হয়নি। বর্তমানে জেলা প্রশাসন বলতে ডেপুটি কমিশনার, অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার, সহকারী কমিশনারগণ এবং জেলা আদালতের কৌঁসুলি জিপি এজিপিরা তৎপর হলে ভ‚মি সংক্রান্ত প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা অনেক কমতে পারত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকার ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোযোগ পর্যাপ্ত নয় বলেই ধারণা করা হয়। তাছাড়া ভ‚মি সংক্রান্ত মামলাকে বিপথগামী করার ক্ষেত্রে সমাজের প্রভাবশালী একটি অংশ সবসময়ই অত্যন্ত সক্রিয় থাকে। তাই এখানে নিষ্পত্তির চেয়ে ‘ঝুলিয়ে রাখা’র নীতি অনেক বেশি অগ্রাধিকার পায়।

বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থা এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তৃণমূলে বিচার ব্যবস্থা উদ্বেগজনক ভাবে বিত্তশালীদের কব্জায় । আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এখন দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জ। গনমাধ্যমে টিআইবি’র প্রতিবেদনটি সাড়া জাগানোর কারন -বিচার বিভাগ এখনো মানুষের শেষ ভরসাস্থল। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পরিবেশ আদালতের গুরুত্বকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে দেশের উচ্চ আদালতের । কতগুলো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অতিসম্প্রতি আইনী ফয়সালা হয়েছে বা এখনো হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। উচ্চ আদালতগুলোতে অবশ্য বিত্তহীনদের প্রবেশাধিকার খুবই সীমিত। প্রসংগত কয়টা বিষয় এখানে উল্লেখ্য যে সাংবাদিকদের বহূল প্রত্যাশিত প্রেস কাউন্সিল আজো একটি কার্য্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিনত হতে পারেনি বা তাকে হতে দেয়া হয়নি। ‘ঝুলিয়ে রাখা’র কৌশল নিয়ে কাউন্সিলের অথরিটিকে চ্যালেন্জ করা হয়েছে ১৯৮৯ সালে (প্রেস কাউন্সিল-মামলা নং ৬/ ১৯৮৮) হাইকোর্টে একটি রিট দাখিলের মাধ্যমে যা আজো নিস্পত্তির অপেক্ষায়। হাইকোর্টে অপসাংবাদিকতার একটি অভিযোগ নিস্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে বিগত ২১ বছর, এমনি লক্ষ লক্ষ মামলা নিস্পত্তির অপেক্ষায় যুগ যুগ তারপর ও বিচার ব্যবস্থা টিকে আছে।

উল্লেখ্য, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ভারতে দুর্নীতি প্রসংগে সম্প্রতি একটি অতি মূল্যবান মন্তব্য করেছেন তার মতে কোনো একটি নির্দিষ্ট সরকারের উপর দুর্নীতির দায় চাপিয়ে দেয়া অন্যায়। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার যে সরকারের নিকট থেকে ‘উত্তরাধিকার’ লাভ করেছে সেই সরকারেও দূর্নীতি ছিল। তদন্ত করলেই সেই দুর্নীতির তথ্য বের হয়ে আসবে। অমর্ত্য সেনের মতে, দুর্নীতি হঠাৎ করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি। তিনি আরো বলেন, আপনি যদি দূর্নীতিকে সামাজিক সমস্যা হিসেবে মেনে নেন, তবে অমুক দোষী কিংবা তমুক দোষী এভাবে সময় নষ্ট না করে দূর্নীতি কেন তৈরী হচ্ছে এবং কিভাবে একে মোকাবিলা করা যায় সেটা নিয়েই সময় ব্যয় করা উচিত। ড. সেন আরো বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে দূর্নীতির যে চিত্র বের হয়ে আসছে তা যথেষ্ট ভয়াবহ। তবে এই দূর্নীতির খবরকে অভিনব কোনো উদ্ভাবন বলে আমি মনে করি না। সেটা আগেও ছিল এখনো আছে। দুর্নীতির পূর্বসূত্র বোঝাতে নোবেল বিজয়ী সেন বলেন, আপনি মনমোহন সিংকে গুলি করতে পারেন, তার পূর্বসূরিকে গুলি করতে পারেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না; প্রধান সমস্যা দূর্নীতি রয়েই যাবে। তবে আশার কথা, জনগণ এখন দূর্নীতির বিরদ্ধে একট্টা হচ্ছে এবং দূর্নীতিকে ঘৃণা করতে শিখছে (ইত্তেফাকঃ ডিসেম্বর ২৭, ২০১০) ।

নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন, টিআইবি এর হাফিজউদ্দিন, অধিকারের সুলতানা কামালের কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে আমরা ও বাংলাদেশে একটি সৎ, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সাহসী বিচার ব্যবস্থা চাই, চাই দূর্নীতির বিরদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ, চাই আইনের শাসন, চাই বিশ্বের অনন্য এক গনতান্ত্রিক সংস্কৃতি। চাই প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের মতো বিচারপতিদের সমন্বিত চিন্তা, চেতনা ও উপলব্ধি যারা, সাধারন হবার অসাধারনত্ব দেখাতে পারেন, পারেন সৃষ্টিকর্তার প্রতিভূ হিসাবে ভয় নয় বরং জনগনের সন্মান জয় করতে। আমরা চাই শাসক নয় এক সেবক সরকার যারা মনে প্রানে বিশ্বাস করেন ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। টিআইবি এর প্রতিবেদনটির সারবস্তু হলো দূর্নীতিকে চিহ্নত করা। সবকিছুতেই ষড়যন্ত্র খোজা সরকারকে ভিতর থেকে সাবোটাজ করা কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার। সরকারকে সহিঞ্চুতা ও সংস্কারের পথে এগুতে হবে তা না হলে সরকারের সব অর্জনই বৃথা যাবে।

লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, রিচার্স ফেলো, সেন্ট পলস কলেজ, ইউনির্ভাসিটি অব ম্যানিটোভা, কানাডা। বাংলাদেশের তৃণমূলে একজন মানবাধিকার সংগঠক এবং সংবাদপত্রে নিয়মিত প্রবন্ধ, ফিচার ও স্তম্ভ লেখক।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply