টিআইবির বিরুদ্ধে করা মামলা সন্ধ্যায় খারিজ : মামলা দুঃখজনক -টিআইবি

কুমিল্লা, ২৬ ডিসেম্বর (কুমিল্লাওয়েব ডট কম) :

কুমিল্লায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বিরুদ্ধে সকালে দায়ের মানহানি মামলা সন্ধ্যায় খারিজ করা হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এ মামলা খারিজের আদেশ দেয় বলে বাদীপক্ষের আইনজীবী মইনুল আলম জানিয়েছেন।

এরআগে সকালে কুমিল্লায় মানহানির অভিযোগ এনে দণ্ডবিধি ৫০০, ৫০১ ও ১০৯ ধারায় টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ও সিনিয়ির ফেলো মো. ওয়াহিদ আলমের বিরুদ্ধে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। কুমিল্লা জজ কোর্টের আইনজীবী ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য অ্যাডভোকেট মো. তৌহিদুর রহমান বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন।

মামলার শুনানির পরপরই মামলার বাদী ও আইনজীবীরা জানান, প্রকাশ্য আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট মৌখিকভাবে টিআইবির অভিযুক্ত ৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এর লিখিত আদেশ পাওয়া যায়নি। মৌখিক আদেশ দেয়ার পর সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলেও লিখিত সমন জারি না হওয়ায় মামলার আদেশ নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়।

অবশেষে দিনভর গোপনীয়তার পর কুমিল্লার ১ নং আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইদুর রহমান গাজী রাতে ‘যথা সময়ে ওয়ারেন্ট প্রসেস না করায়’ মামলাটি খারিজের লিখিত আদেশ দেন।

অপরদিকে বাদীর আইনজীবী মইনুল আলম মনি এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সন্ধ্যা ৭টায় আদালতের পেশকার ‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করায়’ মামলাটি খারিজ করে দেয়া হয়েছে বলে তাকে জানিয়েছেন। তিনি জানান, মামলাটি গ্রহণ করার পর নিয়ম অনুযায়ী মামলা নম্বর রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। ওই নম্বর পাওয়ার পর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অথবা সমন আদেশে যাই থাকুক তার প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। আমরা নম্বর জানলাম না। দিনভর লিখিত আদেশ পেলাম না। সবশেষে জানলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করায় মামলাটি খারিজ হয়ে গেছে।

মামলার বাদী অ্যাডভোকেট মো. তৌহিদুর রহমান জানান, ম্যাজিস্ট্রেট প্রকাশ্য আদালতে প্রথমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মৌখিক আদেশ দেন। আমরা লিখিত আদেশ পাইনি। শুনেছি মামলাটি খারিজ করা হয়েছে। সোমবার আদেশের কপি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান জানান, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশের কথা এপিপি আবুল কালাম তমাল আমাকে বলেছে। রাত ৭ টার পর মামলার নথি হাতে পৌঁছে। নথিতে প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করায় মামলাটি খারিজের আদেশ দেয়া হযেছে। সময়মত নথি পেলে বাদীপক্ষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারত।

বাদী অ্যাডভোকেট মো. তৌহিদুর রহমান মামলার অভিযোগে উল্লেখ করেন, ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর তিনি আইনজীবী হিসেবে সমন্বিত বিচার বিভাগের অংশ। বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বার্থন্বেষী মহল স্বাধীন বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় বিবাদীরা টিআইবির ব্যানারে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০১০’ র্শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সেবা খাতগুলোর মধ্যে বিচার বিভাগের দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি প্রদর্শন করে জরিপ ফলাফল প্রকাশ করে। যা সম্পূর্ণ অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিক প্রকাশ। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাদীর পেশাগত মর্যাদা ও সুনাম ক্ষুন্ন হয়েছে। এ কারণে তিনি ৫০১, ৫০২ ও ১০৯ ধারায় আদালতে বিবাদীদের বিরুদ্ধে বিচার প্রার্থী হয়েছেন। মামলায় মোট ১৩ জন আইনজীবীকে ঘটনার সাক্ষী করা হয়েছে।

মামলার বাদী তৌহিদুর রহমানের কাছে মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মামলা করা হয়নি। টিআইবির প্রকাশিত জরিপে সামগ্রিক বিচার বিভাগকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। তাই বিক্ষুদ্ধ হয়ে মামলা করেছি।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ও আদালতে উপস্থিত থাকা বেশ কয়েকজন আইনজীবী জানান, মামলা দায়েরের পর আদালতে বিচারক প্রকাশ্যে মামলা গ্রহণ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কথা উল্লেখ করেন।

তারা বলেন, দেশের বিচারকরা এখনো পরিচ্ছন্ন আছেন বলে বিচার বিভাগের দরজায় মানুষ আসেন। বিচার বিভাগকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হলে সাধারণ মানুষ হতাশ হবে এবং ন্যায় বিচারের জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের তিন সদস্যের বিরুদ্ধে দায়ের মামলাকে ‘জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন। তিনি বলেন, মামলা সম্পর্কে তারা এখনো অবগত নন। মামলার বিস্তারিত নথি হাতে এলে প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেয়া হবে।

কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম আদালতে মামলা দায়েরের পর রবিবার সন্ধ্যায় আরটিএনএন ডটনেট-কে হাফিজউদ্দিন এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পরপর চারবার দেশ দুর্নীতিতে শীর্ষে থাকার জরিপ প্রকাশ হলে আজকের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ রিপোর্টের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে মামলার হুমকি দিয়েছিলেন।

তবে সে সময়ে মামলা না হলেও এই প্রথম টিআইবি মামলার মুখোমুখি হলো বলে জানান তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা। বলেন, সংক্ষুব্ধ হলে যে কেউই মামলা করতে পারেন। তার মানে এই নয় যে, আমরা অপরাধী।

তিনি আরো বলেন, টিআইবি সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতেই এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এখানে ব্যক্তির কোনো মতামত নেই। জরিপে প্রাপ্ত ফলাফলই কেবল প্রকাশ করা হয়েছে। তাই কেউ সন্তুষ্ট বা অসুন্তষ্ট হলে আমাদের কিছু করার নেই।

এ ধরনের মামলায় আগামীতে টিআইবির কার্যক্রমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে কি না এমন প্রশ্নে- টিআইবি চেয়ারম্যান বলেন, রিপোর্ট কারো বিপক্ষে গেলে তিনি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতেই পারেন। তবে এতে আমাদের কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত হবে বলে মনে করি। আগের মতোই সব কিছু অব্যাহত থাকবে।

১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশে টিআইবির কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার নজির টেনে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের জরিপের সুনাম থাকায় দাতা সংস্থাগুলো সন্তুষ্ট হয়েই আমাদের কাজে অর্থায়ন করছে।

প্রসঙ্গত, দেশের ৬৪টি জেলার ৬ হাজার খানার (পরিবার) ওপর গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে দেশের দুর্নীতি চিত্র তুলে ধরে গত ২৩ ডিসেম্বর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে টিআইবি। রিপোর্টে দেশের ১৩টি সেবা খাতের মধ্যে বিচার বিভাগ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে উল্লেখ করা হয়।

রিপোর্ট প্রকাশের পরপরই সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতারা এ রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেন এবং জরিপের ফল রাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।

সবশেষে গতকাল শনিবার এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এ রিপোর্ট প্রকাশে বিচারকদের মানহানি হয়েছে উল্লেখ করে এ বিষয়ে মামলা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন।

কুমিল্লায় টিআইবির বরুদ্ধে মানহানির মামলা : চেয়ারম্যান সহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply