পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের জের : মুরাদনগরে প্রধান শিক্ষক লাঞ্চিত

স্টাফ রিপোর্টার, মুরাদনগর :
মুরাদনগর উপজেলার শ্রীকাইল ইউনিয়নের চন্দনাইল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি মনিরুল হক মানিকের বিরুদ্ধে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের জের ধরে সভাপতির জামাতা নজরুল ইসলাম বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল খায়েরকে শনিবার সকালে প্রকাশ্য দিবালোকে লাঞ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
জানা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে মুরাদনগর উপজেলার শ্রীকাইল ইউনিয়নের চন্দনাইল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সকল সদস্য ব্যাতিরেকে মনগড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিদ্যালয়ের সভাপতি মনিরুল হক মানিক। তিনি উক্ত বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী ফুল মিয়ার মাধ্যমে ৩৯ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিনা রশিদে সর্বনিম্ন ১ হাজার ৫শ’ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে ফরম পূরন করিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫ জন ছাত্রদের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা করে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে বোর্ড ফি বাবদ মাত্র ২৭ হাজার ২৭০ টাকা জমা দিয়ে অতিরিক্ত ৭৮ হাজার ৩৩১ টাকা ভাগভাটোয়ারা করে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও সভাপতি মনিরুল হক মানিক ম্যানেজিং কমিটির সাথে জড়িত নন এমন ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে প্রায়ই বিদ্যালয়ে গিয়ে মহড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার অবৈধ সুযোগ-সুবিধা আদায়সহ প্রধান শিক্ষক ও কমিটির অপরাপর সদস্যদের বিভিন্ন প্রকার হুমকি-ধমকী এবং গালমন্দ করছেন। বর্তমানে তিনি সহকারী শিক্ষক ইব্রাহিম হোছেনকে দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এ নিয়ে মতানৈক্য দেখা দিলে সভাপতি মনিরুল হক মানিক প্রধান শিক্ষক আবুল খায়েরকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রাননাশের হুমকিসহ স্কুল ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন। বাধ্য হয়ে জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের বিদ্যালয়ের সভাপতি মনিরুল হক মানিকের বিরুদ্ধে মুরাদনগর থানায় একটি সাধারন ডায়রী করেন (যার নং-১০৭৪, তাং-২৮/১০/১০ইং)।
ঘটনটি গত সপ্তাহে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে প্রকাশিত হলে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়। বিষয়টির প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বিদ্যালয়ের সভাপতি মনিরুল হক মানিকের জামাতা নজরুল ইসলাম বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল খায়েরকে মঙ্গলবার দুপুরে মুরাদনগর মুক্তিযোদ্ধা অফিসের সামনে পেয়ে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। সে ধারাবাহিকতায় প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের শনিবার সকালে স্কুলে যাবার পথে চন্দনাইল বাজারের একটি লাইব্রেরীতে বসে চা-পান শেষে প্রকাশ্য দিবালোকে বিদ্যালয়ের সভাপতি মনিরুল হক মানিকের জামাতা নজরুল ইসলাম লাঞ্চিত করে আটকে রাখেন। পরে এলাকাবাসীসহ স্কুলের শিক্ষার্থীরা এসে প্রধান শিক্ষক আবুল খায়েরকে উদ্ধার করে নেয়।
ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী লাইব্রেরীর মালিক আব্দুর রশীদ ব্যাপারী, সাবেক মেম্বার শহীদুল হক ও দেলোয়ার হোসেন দেলু ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমরা সামনে না থাকলে আজ হয়তো প্রধান শিক্ষকের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতো। তবে ঘটনার নায়ক বিদ্যালয়ের সভাপতি মনিরুল হক মানিকের জামাতা নজরুল ইসলামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের সভাপতি মনিরুল হক মানিক অতিরিক্ত টাকা নেয়ার বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, প্রধান শিক্ষককে কোন প্রকার হুমকি-ধমকী দেয়া হয়নি। শুধু একটি কেন, প্রধান শিক্ষক ১০টি জিডি করলেও আমার কিছু হবে না। অতিরিক্ত টাকা গুলো শিক্ষকদের জন্য নেয়া হয়েছে। আমি বলেছি-আমাকে ভাল একটা রেজাল্ট দেন, আপনাদের সমস্যার বিষয়ে আমি দেখব। টাকা কোথায় থেকে আসে তা’ আপনাদের দেখার বিষয় নয়। তিনি আরো বলেন, মাত্র ৮ মাসে বিদ্যালয়ের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এমপিও বহির্ভূত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাঁর জামাতা নজরুল ইসলাম কর্তৃক প্রধান শিক্ষককে হুমকি দেয়া ও লাঞ্চিত করার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
অপর দিকে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী ফুল মিয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সভাপতির নির্দেশে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়েছে। তবে অতিরিক্ত টাকা আদায়ে প্রধান শিক্ষক সম্পৃক্ত নন এবং এ বিষয়ে তিনি অসন্তুুষ্ট। সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন। অপর দিকে সহকারী শিক্ষক ইব্রাহিম হোছেন এ বিষয়ে কিছু বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম মেনে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি উলে¬খসহ ফরম পূরনের জন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে যথাসময়ে নোটিশ করা হয় (যার নং-২৪/১০, তাং-৩০/১০/১০ইং)। পরবর্তীতৈ জেএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকালে আমার অজান্তে অতিরিক্ত ফি আদায় করে ফরম পূরন করা হয়। পরবর্তীতে ফরম পূরন বাবদ ২৭ হাজার ২৭০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট করা হয়েছে। অতিরিক্ত ৭৮ হাজার ৩৩১ টাকা কোথায়, কি অবস্থায় আছে, তা’ আমার জানা নেই। সভাপতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের জের ধরে তাকে হুমকি দেয়া ও লাঞ্চিত করার ঘটনাটি তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন বলে জানান।
উক্ত বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সফিউল আলম তালুকদার জানান, প্রধান শিক্ষককে হুমকি দেয়া ও লাঞ্চিত করার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তিনি প্রধান শিক্ষককে বলেছেন বলে জানান। তবে বোর্ডের নির্দেশ অমান্য করে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত টাকা নিয়ে ফরম পূরন করার বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি এ ব্যাপারে কোন প্রকার অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Check Also

দেবিদ্বারের সাবেক চেয়ারম্যান করোনা আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যু: কঠোর নিরাপত্তায় গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ভাণী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান (৫৫) করোনায় আক্রান্ত ...

Leave a Reply