আজ ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত দিবস

কুমিল্লা, ৮ ডিসেম্বর (কুমিল্লাওয়েব ডট কম) :

আজ ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত দিবস । মুক্তিযুদ্ধের এই দিনটিতে বৃহত্তর কুমিল্লার এই তিনটি জেলা হানাদার মুক্ত হয় ।
১৯৭১ সালের এদিনে কুমিল্লা পাক হানাদার বাহিনী থেকে মুক্ত হয়। র্দীঘ নয় মাসের যুদ্ধ,আর নির্যাতনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মিত্রবাহিনীসহ গণ জাগরণের উল্লাস ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠে কুমিল্লা। তবে এ সময়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের চর্তুদিকে পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে মুক্তবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর জোয়ানরা। পরে ১৬ ডিসেম্বর আÍসমর্পণের মধ্য দিয়ে সেনানিবাস পাক হানাদার দখলমুক্ত হয়।

এর আগের দিন রাতে ৭ ডিসেম্বর রাতে সীমান্তবর্তী এলাকার তিনদিকে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী কুমিল্লা বিমান বন্দরে পাক বাহিনীর ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের ঘাটিঁতে আক্রমণ শুরু করে। পাক বাহিনীর অবস্থানের উপর মুক্তিসেনারা মর্টার আর্টিলারি আক্রমণ চালিয়ে শেষ রাতের দিকে তাদের আÍসমর্পণ করাতে সক্ষম হয়। সারা রাত ব্যাপী পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পাক বাহিনীর কতিপয় সেনা বিমান বন্দরের ঘাটি ত্যাগ করে শেষ রাতে বরুড়ার দিকে এবং সেনানিবাসে ফিরে যায়। বিমান বন্দরের ঘাঁটিতে ধরা পড়া কতিপয় পাক সেনা আÍসমর্পণ করে। রাতে মিত্রবাহিনীর ১১ গুর্খা রেজিমেন্টের আর কে মজুমদারের নেতৃত্বে কুমিল্লা বিমানবন্দরের তিনদিকে আক্রমণ চালানো হয়। সীমান্তর্বতী বিবির বাজার দিয়ে লেঃ দিদারুল আলমের নেতৃত্বে একটি দল এবং অপর দুটি দল গোমতী নদীর অতিক্রম করে ভাটপাড়া দিয়ে এবং চৌদ্দগ্রামের বাঘের চর দিয়ে এসে বিমান বন্দরের পাক সেনাদের ঘাটিঁতে আক্রমণ করে। রাতের মধ্যে বিমান বন্দরের ঘাঁিটতে অবস্থানরত পাক সেনাদের সাথে মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যৌথ বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পাকসেনাদের প্রধান ঘাঁটি পতনের মধ্য দিয়ে পরদিন ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা পাক সেনা মুক্ত হয়। এদিন ভোরে মুক্তিসেনারা শহরের চকবাজার টমছমব্রিজ ও গোমতী পাড়ের ভাটপাড়া দিয়ে আনন্দ উল্লাস করে শহরে প্রবেশ করে। তখন রাস্তায় নেমে আসে জনতার ঢল। কুমিল্লার আপামর জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে মুক্তির উল্লাসে বরণ করে নেয়। পরে এদিন বিকেলে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে বীর মুক্তিযোদ্ধা মিত্রবাহিনী জনতার উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা

উত্তোলন করা হয়। তৎকালীন পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মরহুম জহুর আহমেদ চৌধুরী, দলীয় পতাকা এবং কুমিল্লার প্রথম প্রশাসক অ্যাডভোকেট আহমদ আলী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ।

কুমিল্লা মুক্ত দিবস উদযাপন উপলক্ষে ৮ডিসেম্বর জেলা আওয়ামীলীগ র‌্যালি, কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন চিত্রাংকন ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।

আজ চাঁদপুর মুক্ত দিবস

আজ ৮ ডিসেম্বর , ১৯৭১ সালের এই দিনটিতে চাঁদপুরও হানাদার মুক্ত হয়। আজ থেকে ৩৯ বছর আগে পাক হানাদার বাহিনীকে হটিয়ে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বিজয়ে উল্লাসিত হয়ে চাঁদপুরের আপামর জনতা। গর্বভরে মাথা উচু করে পত পত করে উড়িয়ে দিয়েছিল স্বাধীন বাংলার সবুজ জমিনের উপর পতাকা। সেদিন মহকুমা শহর বর্তমান জেলা মুখরিত হয়ে উঠে বিজয় মিছিলে। হাজার হাজার নারী পুরুষ শিশু ঘর ছেড়ে শত্রু মুক্ত দিবসে তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বলে প্রকম্পিত করেছিল গোটা চাঁদপুরের মাটি। তাই এই দিনটি চাঁদপুরবাসীর পরম গৌরবের ও অহংকারের। ২৬ মার্চের পর এপ্রিলের প্রথম দিকে চাঁদপুর শুরু হয় হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। ৭ এপ্রিল হানাদার বাহিনী দুটি ছাই রংয়ের স্যাভার জেট বিমান ৪০ মিনিট সেলিং চালায় । মুক্তাকাশ ছেয়ে যায় কাল ধোয়ায়। রক্তে সিক্ত হয়ে উঠে শ্যামল প্রান্ত। এরই মাঝে মেজর ইফতেখারের নেতৃত্বে শ’ পাঁচেক পাক সৈন্য শহরের অদূরে টেকনিক্যাল স্কুলে আস্তানা ঘাড়ে। এ অবস্থার ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ সংলগ্ন আনসার ক্লাব (বর্তমানে ছাত্র নিবাস) মাঠে মুক্তিযোদ্ধারা শুরু করে প্রশিক্ষণ। এরপর দীর্ঘ নয় মাস চাঁদপুরের শ্যামল প্রান্তরে মুক্তিযোদ্ধারা ছড়িয়ে পড়ে। অংশ নেয় মুখোমুখি আক্রমণের। পাক বাহিনী কর্তৃক অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা, লুটপাটের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে।

ডিসেম্বরের শেষ দিকে চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধা দামাল ছেলেরা দেশমাতৃকাকে শত্র“মুক্ত করার জন্য গর্জে উঠে। হাজীগঞ্জে পাকবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়। একটানা যুদ্ধ চলে প্রায় ৩৬ ঘন্টা। দুর্বল হয়ে পড়ে শত্র“পক্ষ। অবশেষে ওই পক্ষের ৩৯ অস্থায়ী ডিভিশন অফিসার প্রফেসর মেজর কমান্ডিং জেনারেল রহিম খান হাজীগঞ্জ হামিদা জুটমিলসহ তাদের সবগুলো ক্যাম্প ছেড়ে পালাতে শুরু করে। ৭ ডিসেম্বর রাতে চাঁদপুর শহরে এসে তারা যখন নদীপথে গানবোট, লঞ্চ, স্টিমার যোগে নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য জায়গায় রওয়ানা দিতে চাঁদপুরের বিভিন্ন শ্যামল প্রান্তর মুক্ত করে আসা মুক্তিযোদ্ধারা তাদের নৌযানের উপর আক্রমণ চালায়। এতে বহু পাক সেনা হতাহত হয়। মেজর জেনারেল রহিম খানও আহত হন। তবে তার ভাগ্য ভালো ঢাকার দিক থেকে উড়ে আসা একটি হ্যালিকপ্টার তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। বলা বাহুল্যা হাজীগঞ্জ থেকে আসা শত্রু বাহিনী পালিয়ে আসার পর যাবার প্রাক্কালে কোন প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়নি দুর্বল হয়ে পড়ায়। তাই বলতে গেলে বিনা বাধায়ই ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর মুক্তি হয়।

এদিকে ওই সকাল থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা মহকুমা শহরে জড়ো হতে থাকে। ১০টার দিকে মিত্রবাহিনীর ট্যাংক বহর লেঃ কর্ণেল সুট্টির নেতৃত্বে মহকুমা শহরটিতে প্রবেশ করে। তার বিএলএফ বাহিনীর চাঁদপুর মহকুমা কমান্ডার রবিউল ইসলাম কয়েক হাজার জনতার সমানে চাঁদপুর থানার সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে উড়িয়ে দেন বাংলাদেশের পতাকা। এই মাঝে মহকুমার বিভিন্ন স্থান থেকে রাজাকারদেরে ধরে এনে তাদের রশি দিয়ে টানিয়ে পেটানো হয়। অনেকে লজ্জা ও ভয়ে আÍহত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের চাঁদপুরের মাটিতে পাকসেনাদের আক্রমণে যারা প্রাণ হারিয়েছে তাদের সঠিক পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের এক হিসেবে দেখা গেছে সাধারণ জনতাসহ তাদের সংখ্যা ৫০। তবে নিহতের সংখ্যা আরও অনেক। এদের মধ্যে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের নাসির কোর্টে এক ভয়াবহ সম্মুখ সমরে প্রাণ হারায় ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা। এরা হচ্ছেন এম এ মতিন, মোঃ জয়নাল আবেদনী, এম জহিরুল হক, জাহাঙ্গীর আলম, আবু বকর, এস এম ইলিয়াস ও আবদুর রব। এই বীর শহীদদের নাসিরকোর্ট কলেজের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। আর ওই সমাধিস্থলে গড়ে উঠেছে স্মৃতি সৌধ।

চাঁদপুরের বীর যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এম এ ওয়াদুদ দাউদকান্দি যুদ্ধচলাকারীন সময় দাউদকান্দি উপজেলায় গোয়ালমারিতে পাকহানাদার বাহিনীর হাতে ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর ইদুল ফিতরের দিন গুলিবিদ্ধ হন।ওই দিন তাকে সঙ্গীরা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মতলব নিশ্চিন্তপুর হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে তিনি মাসব্যাপী চিকিৎসারত ছিলেন। এদিকে প্রথম প্রহরে পাক সেনাদের প্রতিরোধকল্পে বোমা বানাতে গিয়ে শহীদ হয় কালাম, খালেক, সুশীল এবং শংকর। তাদের চারজনের নামে সম্প্রতিকালে তৈরি হয় নিউ ট্রাকরোডে স্মৃতি সৌধ। স্বাধীনতার পর থেকে দিবসটিকে মুক্তিযোদ্ধাসহ চাঁদপুর বাসী স্মরনে রাখে এবং পালন করেছে। তবে ১৯৯২ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার ধারবাহিকতায় এ দিবসটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করার প্রেরণা আরও জাগ্রত হয়।

আজ বুধবার ৮ডিসেম্বর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত দিবস
১৯৭১সালের এই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর মুক্ত হয়েছিল। এ দিনেই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের প্রধান জহুর আহমেদ চৌধুরী শহরের পুরাতন কাচারী ভবনস্থ তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে শত্রুমুক্ত করতে ৭১’র ৩০নভেম্বর থেকে জেলার আখাউড়া সীমান্ত এলাকায় মিত্র বাহিনী পাক বাহিনীর উপর বেপরোয়া আক্রমন চালাতে থাকে। ১ডিসেম্বর আখাউড়া সীমান্ত এলাকায় ২০হানাদার নিহত হয়। ৩ তারিখ আজমপুরে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এখানে ১১হানাদার নিহত হয়। শহীদ হন ৩জন মুক্তিযোদ্ধা। এরই মাঝে নবগঠিত বিজয়নগর উপজেলার মেরাশানী, সিঙ্গারবিল, মুকুন্দপুর, হরষপুর, আজমপুর, রাজাপুর এলাকা মুুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। ৪ডিসেম্বর পাক হানাদাররা পিছু হটতে থাকলে আখাউড়া অনেকটাই শত্রুমুক্ত হয়ে পড়ে।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply