নাঙ্গলকোট থানার বিতর্কিত ওসি নজরুল ক্লোজ্ – জনমনে স্বস্তির নিঃশ্বাস

জামাল উদ্দিন স্বপন :

ওসি নজরুল
অবশেষে বহুল আলোচিত বিতর্কিত কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল কুমিল্লা পুলিশ লাইনে ক্লোজ্ হওয়ার খবর পাওয়া গিয়াছে। ওসি নজরুলের ক্লোজ্ এর খবর এলাকায় প্রচারিত হলে জনমনে স্বস্তির নিঃশ্বাস লক্ষ্য করা যায়। নাঙ্গলকোটবাসী রাহুর কবল থেকে মুক্ত হল। নাঙ্গলকোট থানা সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে এ ধরনের পুলিশ অফিসার আর আসে নাই বলে এলাকাবাসী মন্তব্য করেন। এ থানায় ২০ মাস চাকুরীকালীন জনসাধারনকে অতিষ্ট করে তুলেছে সে। জনগন অনেক আগ থেকে তার অপসারন দাবী কর আসছিল।
ওসি নজরুল এ থানায় যোগ দিয়েই ঘুষ-দূর্নীতি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, মাদক সেবন, বিক্রি বন্ধ ও জুয়া বন্ধের প্রচার স্বরূপ মসজিদে মসজিদে হাটে বাজারে লিফলেট বিতরন করেছিল। এলাকাবাসী মনে করেছিল হয়তো তিনি ভাল কাজ করবেন। কিন্তু দেখা গেছে এটা ছিল তার একটা ভন্ডামী। বরং ঘুষের মাত্রা বৃদ্ধির জন্য তার এ কৌশল এবং নিজেই বিভিন্ন ক্ষেত্র তৈরী করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছেন। তবে সরকার দলীয় কতক নেতাকে খুশি করে অন্যান্যাদের উপর ষ্টীম রোলার চালিয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় সাংসদ আ-হ-ম মুস্তফা কামাল লোটাস কামালকে ভুল তথ্য সরবরাহ করে তাকে ম্যানেজ করে রেখেছেন। এক পর্যায়ে সাংসদ লোটাস কামাল নজরুলের ভন্ডামী বুঝতে পেরেছেন।
এর আগে বিভিন্ন সময় পত্রিকা সাপ্তাহিক সবুজপত্রে ওসি নজরুলের ক্ষমতার অপব্যবহার ও দূর্নীতির চিত্র তুলে তার শাস্তি মূলক বদলী দাবী করে আসছিলেন। তখন যদি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হতো তাহলে নাঙ্গলকোটবাসী কিছুটা স্বস্তি পেত এবং সরকারের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি হত। শেষতক “এতক্ষনে অরিন্দম কহিল বিষাদে।”
নজরুলের ওজন এত ভারী যাহা নাঙ্গলকোটাবাসী সহ্য করতে না পেরে স্থানীয় এক জন প্রতিনিধির নিকট মৌখিক ভাবে অভিযোগ করেছিল। সে জনপ্রতিনিধি তাকে বদলানোর জন্য কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মোঃ সফিকুল ইসলামের স্বরনাপন্ন হয়েছিলেন কিন্তু জনপ্রতিনিধি প্রস্তাব শুনার পরপরই পুলিশ সুপার আঁতকে উঠলেন। মনে হয় যেন পুলিশ সুপারও তার ম্যানেজ ছিল। অবশ্যই ওসি নজরুল প্রায় গল্প করতেন সদ্য বদলী হওয়া চট্র্রগ্রাম রেঞ্জ ডি আই জি আসাদুজ্জামান মিয়া তার খুব সুপরিচিত। ডি,আই জি ঢাকায় এসবির এস এস থাকাকালীন নজরুল তার সাথে ডিউটি করেছেন। এ কারনে সম্পর্ক একটু দহরম মহরম। আবার মাঝে মাঝে স্থানীয় সাংসদ লোটাস কামালের ভাগ্নি জামাই পরিচয় দিতেন। এ সকল কারনে হয়ত পুলিশ সুপার তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে দ্বিধা করতেন। এখন সকল রহস্য উন্মোচিত হওয়ায় ক্লোজ্ এর কবল থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হয়নি তার।

অনুসন্ধানে ওসি নজরুল যে সকল কৃতকর্মের জন্য বিতর্কিত হয়েছে তার কিছু অংশ উল্লেখ করা হল :
১. থানা আঙ্গিনায় পুলিশের ওপেন হাউজডে পালনের লক্ষ্যে যে গোল ঘর নির্মিত হয়েছে সেটা তিনি দরবার হল বানিয়েছেন। কোন ভূক্তভোগী থানায় মামলা করতে আসলে বাদী বিবাদীকে কিছু নির্ধারিত সিন্ডিকেট ধারী সালিশদারের মাধ্যমে সমাধানের কথা বলে পক্ষপাতিত্ব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়। এতে বাদী বিবাদী উভয় পক্ষ থেকে চাহিদা মোতাবেক টাকা আদায় করে। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

২. মামলার ক্ষেত্রে সকল মামলা চার্জশিট উপযোগী সেগুলো চার্জশিট দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বাধ্য করেন।

৩. দৌলখাঁড় ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামের মোঃ রফিকুল ইসলাম সোহাগকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির ক্যাডার এ অজুহাতে তাকে গ্রেফতার করে। পরে এলাকাবাসী চ্যালেঞ্জ করলে তার বিরুদ্ধে কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। পরবর্তীতে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। সোহাগকে গ্রেফতারের নেপথ্যে জানা গেছে তারই প্রতিবেশী প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে ওসি নজরুল কে মোটা অংকের টাকা দিয়ে হয়রানির করার উদ্দেশ্যে তাকে গ্রেফতার এবং ওসি নিজেকে সেইফ করার জন্য জেলা পুলিশ সুপার মোঃ সফিকুল ইসলামের নির্দেশে গ্রেফতার করার কথা প্রকাশ করলেও বিশ্বাস করাতে পারেনি।

৪. মিথ্যা মামলা গ্রহন করে কিছু সংখ্যক আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের হয়রানির অভিযোগ, তার মধ্যে দৌলখাঁড় ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকলীগের ১২ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা গ্রহন ও তিনজনকে তাৎক্ষনিক গ্রেফতার, সৌন্দহল গ্রামের আওয়ামীলীগ কর্মী মোঃ রব চৌধুরীকে গ্রেফতার ও সর্বশেষ নাঙ্গলকোট হরিপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ এছাক সাহেবের বাড়ীর লোকজন এর বিরুদ্ধে ৩২৬ ধারার মিথ্যা মামলা গ্রহন করে তড়িঘড়ি গ্রেফতার। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের মাঝে গ্রেফতার আতংক ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাংসদ লোটাস কামাল প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানোর জন্য দৌলখাঁড় হাইস্কুল মাঠ স্থানীয় নেতাকমীদের নিয়ে মত বিনিময় সভার আয়োজন করে। মতবিনিময় সভা জনসভার পরিণত হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে। সে সভার উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোঃ শাহজাহান ভূঁইয়া দলীয় নেতাকর্মীদের পুলিশি হয়রানি বন্ধের ও ওসি নজরুলের অপসারন দাবী করেন এবং সাংসদ লোটাস কামালও মিথ্যা মামলা গ্রহন করে নেতাকর্মীদের হয়রানির জন্য ওসি নরুলকে দায়ী করেন। সর্বশেষ হরিপুরের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে ভূক্তভোগীদের সান্তনা দেন এবং ওসি নজরুলকে বদলী হয়ে চলে যাওয়ার জন্য ৩০ দিনের আলটিমেটাম দেন।

৫. জুয়ার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে ওসি নজরুল ও পি এস আই উজ্জ্বলের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ঘটনা বিভিন্ন ইলেকট্রোনিক মিডিয়া ও একাধিক জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে পরের দিন অতিঃ পুলিশ সুপার মোঃ সাজিদ তদন্ত করে ঘটনার সতত্য প্রমান পান। পরবর্তীতে ওসি নজরুল নিজেকে সেইফ করার সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহন করে পি এস আই উজ্জ্বলকে বলির পাঁঠা বানায়। তদন্তের ছয়দিনের মাথায় চাকুরীচুত্য । এ নিয়ে স্বয়ং পুলিশ বিভাগে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। উল্লেখ্য উপজেলার রায়কোট ইউনিয়নের যজ্ঞশাল গ্রাম থেকে একদল জুয়াড়ীকে নিয়ে পুলিশের পি এস আই উজ্জ্বল থানায় রওয়ানা দিলে ওসির টেলিফোনের নির্দেশে তাদেরকে ছেড়ে দেয়। উজ্জ্বল ছেড়ে দিতে গড়িমসি করলে ওসি মাইন্ড করে এবং পরেরদিন সকালে ওসি তার চেম্বারে উজ্জ্বলকে ডেকে এনে জুয়াড়ীরা যে ঘুষ দিয়েছে তার ভাগ দাবী করে। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে উজ্জ্বলকে চড় থাপ্পড় মারা শুরু করলে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

৬. নাঙ্গলকোট উপজেলার মধ্যে প্রায় ৫০০ (পাঁচশত) সিএনজি গাড়ী চলাচল করে। এর মধ্যে প্রায় ২০০ গাড়ী নাম্বারবিহীন, বিভিন্ন জেলায় রেজিষ্ট্রেশন ও চোরাইকৃত। এ সকল গাড়ী চলাচলের অলিখিত অনুমোদনের জন্য থানার ওসিকে লক্ষাধিক টাকা মাসোয়ারা দিতে হয়। আর অবৈধ গাড়ীর দরুন বৈধ ওয়ালারও মাসোয়ারার শিকার হচ্ছে।

৭. উপজেলা থেকে মাত্র ১২ কিঃ মিঃ দূরে ভারতীয় সীমান্ত। ভারত থেকে প্রতিরাত্রে ফেন্সিডিল, ভারতীয় শাড়ী, চিনি ও মোটর সাইকেল আসে এগুলো রায়কোটের ঝাটিয়াপাড়া বাজার ও ঢালুয়া ইউনিয়নের শিহর বাজার হয়ে নোয়াখালীর চৌমুহনী বাজারে যায়। নাঙ্গলকোটের উপর দিয়ে পারাপার হতে হয় এ কারনে থানা মাসোয়ারা আদায় করে।

৮. বিভিন্ন জায়গায় জুয়ার বোর্ড, ফেন্সিডিলের হাট বসিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করার অভিযোগ রয়েছে। মাদকের হাট হিসেবে পরিচিত বাঙ্গড্ডা বাজার রায়কোটের মাহিনী ও ঝাটিয়া পাড়া বাজার ঢালুয়া ও শিহর বাজার নাঙ্গলকোট বাজার, দৌলখাঁড়, বটতলী ও সৌন্দাইল বাজার জোড্ডা ও মান্দ্রাবাজার এবং গাঁজার হাট হিসেবে দৌলখাঁড়-বক্সগঞ্জের সড়কপথ প্রসিদ্ধ।

৯. সম্প্রতি গত ২০ শে নভেম্বর মৌকরা ইউনিয়নের মোড্ডা গ্রাম থেকে বিএনপি ক্যাডার মোঃ আব্দুর রহিম ওরফে রমাকে গ্রেফতার করে ছেড়ে দেওয়ার খবর জানাজানি হলে জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং ২৪ নভেম্বর নাঙ্গলকোট দৌলখাঁড় সড়কের শ্রীহাস্য বাজারের দক্ষিনে ট্রাক্টর ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখী সংঘর্ষ উভয়কে থানায় আটক করে। উভয়ের থেকে ২২ হাজার টাকা আদায় করে ছেড়ে দেয়।

১০. এলাকার কয়েক স্থানে কথিত জ্বিন হাজিরা চলে। জ্বিনের বাদশারা সকল সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে সহজ সরল মানুষদের ঠকাচ্ছে। সকল হাজিরার স্পট থেকে ওসি নজরুলকে মাসোয়ারা দেয়ার খবর রয়েছে। তন্মধ্যে ঢালুয়া ইউনিয়নের সিংগরিয়া ও দৌলখাঁড় খিলপাড়া গ্রামে ছপুরা বেগম উল্লেখযোগ্য।

বর্তমানে ওসি নজরুলের স্থলে কে আসছেন তা জানা যায়নি। তবে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা যিনি আসবেন তিনি যেন নজরুল কর্তৃক হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে এনে পুলিশের মুখ উজ্জ্বল করেন। জনগনের আশা পূরনের সহায়ক হবেন এবং উল্লেখিত বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করবেন বলে সকলের বিশ্বাস।

Check Also

কুমিল্লায় তিন গৃহহীন নতুন ঘর পেল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা সদর উপজেলায় গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ৪নং আমড়াতলী ইউনিয়নের গৃহহীন নুরজাহান বেগম, ...

Leave a Reply