সমাজপতিদের প্রহসণে মুরাদনগরে যৌতুকের শিকার লিপি আক্তারের গ্রাম ছাড়া হবার উপক্রম

স্টাফ রিপোর্টার, মুরাদনগর :

মুরাদনগরে শিশু পুত্র হৃদয়সহ যৌতুকের শিকার লিপি আক্তার। -ছবি-হাবিবুর রহমান
রোববারের মধ্যে আমাদের সঙ্গে কোর্টে যেয়ে মামলা তুলে নিতে হবে, অন্যথায় রোববার থেকেই যৌতুকের শিকার লিপি আক্তারের পরিবারকে এলাকা ছাড়া করা হবে বলে ঘোষনা দিয়েছেন কুমিল্লার মুরদানগর উপজেলার ধামঘর ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামের সমাজপতি আব্দুল খালেক (৫০) ও জাহাপুর গ্রামের আবু হানিফ (৪৫)। মামলার বাদী লিপি আক্তার (২৪) ও তার পিতা আবদুল মান্নানকে (৫০) আরো বলেন যে, মামলা তোলার পর তাদেরকে ১০ হাজার টাকা দিতে পারলে এ ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন সমাজপতিরা। অসহায় লিপি আক্তার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা চেয়ে ইউএনও’র কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। প্রতিকার না পেলে তিনি আত্বহত্যা করার হুমকি দেন।

এলাকাবাসী ও পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে লক্ষীপুর গ্রামের মৃত আইয়ুব আলীর পুত্র আল আমিনের সঙ্গে একই গ্রামের আব্দুল মান্নানের কণ্যা লিপি আক্তারকে গলা ও কানের স্বর্ণালংকারসহ নগদ ১ লক্ষ টাকা যৌতুক দিয়ে বিয়ে হয়। বিয়ের পর হতেই লিপি আক্তারের স্বামী ও তার পরিবার বিভিন্ন সময়ে মোটা অঙ্কের যৌতুক দাবী করে না পেয়ে তাকে নানা ভাবে শারিরীক ও মানুষিক নির্যাতন শুরু করে। এরই মধ্যে ২০০৯ সালের ১৮ মে লিপি আক্তার একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেন, আনন্দে নাম রাখেন হৃদয়। মেয়ে ও নাতির সুখের কথা চিন্তা করে লিপি আক্তারের পিতা-মাতা তাদের শেষ সহায় সম্বল বসত ভিটা ও একটি হালের বলদ বিক্রি করে, গ্রামীন ও ব্রাক এনজিও হতে কিস্তিতে ঋণ এনে আরো ৫০ হাজার টাকা যৌতুক তুুলে দেন লিপি আক্তারের স্বামীর হাতে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, শিশু পুত্র হৃদয়ের তিন মাস বয়স পূর্ণ না হতেই স্বামী আল আমিনের হাতে মোবাইল ফোন ও ঘড়ি তুলে দিতে না পারায় লিপি আক্তারের স্বামী ও শ্বাশুরী মিলে তাকে বেধরক মারপিট করে শিশু পুত্রসহ এক কাপড়ে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। বিষয়টি নিয়ে বিচারের প্রার্থনা করে স্থানীয় সমাজপতিদের দ্বারে দ্বারে ঘুুরে কোন সুরাহা না পাওয়ায় লিপি আক্তার বাদী হয়ে স্বামী, ভাসুর ও শাবশুরীর বিরুদ্বে কুমিল্লার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিট্টেট আদালতে (১৯৮০ সনের যৌতুক নিয়ন্ত্রন আইনের ০৪ ধারায়) মামলা করেন। উক্ত মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। এ খবর শুনে স্বামী ও শ্বশুর পরিবার ক্ষিপ্ত হয়ে এলাকার নামধারী সমাজপতিদের দিয়ে মামলা তুলে না নিলে গ্রাম ছাড়া করার হুমকি দেয়। এ দিকে লিপি আক্তার নিরুপায় হয়ে বে-সরকারী সেচ্ছাসেবী সংস্থা ব্রাকের মাধ্যমে ২০০৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর একটি অভিযোগ দায়ের করেন (যার নং-৪০/০৯, নিবন্ধন নং ৮৪)। ব্রাক মানবাধিকার কর্মী আমিনুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি সত্য, নতুন করে আরেকটি মামলার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

মামলার বাদী লিপি আক্তার কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমার সুুখের জন্য বাবা-মা বসত বাড়ী, হালের বলদ বিক্রি করে এবং ঋণের উপর টাকা এনে আমাকে বিয়ে দিয়েছে। এখন আমার শ্বশুর পরিবার ও তাদের লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসীদের ভয়ে বাবা-মাও বাড়ির বাহিরে যেতে পারছে না। শুনেছি রবিবার আমি এবং আমার বাবা সর্দার আবু হানিফ ও আব্দুল খালেক সর্দারের সাথে যেয়ে কোর্ট হতে মামলা না তুললে আমাদেরকে গ্রামে থাকতে দিবে না তারা। এখন দেখছি এ উপায় হতে মুক্তি পেতে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোন পথ নেই। লিপির স্বামী আল আমিন ও শাশুড়ী রুবি বেগম জানান, লিপিকে বিদায় করতে যে টাকা লাগবে তা সর্দার-মাতাব্বরের পেছনে খরচ করব, তারপর দেখি মামলা কিভাবে চলে।

এ দিকে মামলা তুলে না নিলে তার পরিবারকে এলাকা ছাড়া করা হবে মর্মে অভিযোগ এনে সমাজপতি আবু হানিফ, আব্দুল খালেক, আল আমিন, মানিক মিয়া ও রুবি আক্তারসহ অজ্ঞাত ৫-৬ জনকে অভিযুক্ত করে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিপি আক্তার বাদী হয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমা বেগম অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তিনি পুরো বিষয়টি জেনেছেন, লিপি ও তার পিতাকে সমাজপতিদের চাপের কারণে কোন ভাবেই মামলা তুলতে দেয়া হবেনা। প্রয়োজনে ওই পরিবারকে পুলিশী হেফাজতে এনে রাখার জন্য শিঘ্রই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে স্থানীয় মাতাব্বর আবু হানিফ ও আব্দুল খালেক বলেছেন, গ্রাম্য সালিসের সিদ্ধান্তই কার্যকর করবেন তারা।

Check Also

করিমপুর মাদরাসায় বোখারী শরীফের খতম ও দোয়া

মো. হাবিবুর রহমান :– কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার করিমপুর জামিয়া দারুল উলূম মুহিউস্ সুন্নাহ মাদরাসায় ১৪৪০ ...

Leave a Reply