কুমিল্লায় অ্যাসোসিয়েশনের দেয়া তালিকার চেয়ে দ্বিগুণ মূল্যে বেচাকেনা হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী,কুমিল্লা থেকে :
কুমিল্লায় কোরবানীর চামড়ার বাজারে আকাশ ছোঁয়া দামে এবার লোকসানের সম্মুখীন বেশিরভাগ চামড়া আড়ৎদাররা। এদিকে চামড়ার মালিকরা বেশি দামে চামড়া বিক্রি করে হয়েছে লাভবান। কোরবানীর ঈদের দিনের শুরু থেকেই এবার চামড়ার বাজার ছিল খুব চড়া। যার ফলে বাধ্য হয়ে চামড়া ব্যবসায়ী ও আড়ৎদাররা বেশি দামে চামড়া কিনে ব্যবসায়িক লোকসানের আশংকায় এদের অধিকাংশই ভুগছে। ঈদের আগে সরকার কোরবানির চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিলেও কুমিল্লায় এ নিয়ম মানেননি কোন ব্যবসায়ীরা। কিছু চামড়া মালিক, মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দাপটে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এবং বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের দেয়া তালিকার চেয়ে দ্বিগুণ মূল্যে বেচাকেনা হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া।

কুমিল্লা জেলায় অন্তত শতাধিক স্থানে চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। এর মধ্যে শহরের কাশারীপট্রি চৌমুহনী, দক্ষিন চর্থা (থিরা পুকুর পাড়) কাপড়িয়াপট্রি,ছাতিপট্রি,রাজগঞ্জ, তেলিকোনা,বালুধুম, নুরপুর, শাসনগাছা, ঋষিপট্রিতে চামড়া মালিকরা চামড়া ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কাছে চামড়া বিক্রি করেছে। চামড়ার প্রকার ও আকার ভেদে প্রতি পিস চামড়া বিক্রি হয় ৬শ থেকে ৩ হাজার টাকায় এবং অনেক চামড়া বিক্রি হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর মধ্যে গরুর ছোট চামড়া ৬শ থেকে ১২০০ টাকা, মাঝারি চামড়া ১৪শ থেকে ১৭শ টাকা এবং বড় গরুর চামড়া ২৪শ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা এবং প্রতি পিস ছাগলের চামড়া ১১০ থেকে ২২০ টাকায় আড়ৎদারদের কাছে বিক্রি করেছে চামড়া মালিকরা। কুমিল্লায় অন্যতম চামড়ার বড় মহাজন রয়েছেন ২৫-৩০ জন আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছেন প্রায় ২ শতাধিক। তবে এর বাইরে একটি বড় অংশের ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা মৌসুমী ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত। মূলতঃ বেশি দামে চামড়া কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমী ব্যবসায়ী ও আড়ৎদাররা। তবে প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীরা কম মূল্যেই চামড়া কিনেছেন।

চামড়ার আড়তদার ব্যবসায়ীরা জানান, চামড়ার বাজার দাম যে এবার বেশি হবে সেটা তারা আগে থেকে ধারণা করেছিলেন। তারা চামড়ার মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে অ্যানথ্রাক্সসহ ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দায়ী করেন । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আড়ৎদার জানান, মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিবারই বেশি দাম দিয়ে চামড়া কিনতে হয়। তবে এর জন্য মৌসুমি ব্যবসায়ীরা দায়ী করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকদের।

চামড়া আড়তদাররা আরো জানান, ঢাকা থেকে ট্যানারি মালিকরা আগে থেকেই তাদের জানিয়ে দিয়েছিল গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুট ঢাকার বাইরে ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২০ টাকা থেকে ২২ টাকা রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এতিম, গরিব এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করে এবছর দাম নির্ধারণ করা হয়। দেশে প্রতিবছর চামড়ার চাহিদা প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট। এর প্রায় ৫০ শতাংশ সংগ্রহ হয়ে থাকে কোরবানীর ঈদের সময়। আর রোজার ঈদে ২০ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রস্তুত চামড়া, চামড়াপণ্য এবং রপ্তানীকারক সমিতি (বিএফএলএলএফই), বাংলাদেশ ট্যানার্স সংগঠন (বিটিএ) এবং বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস যৌথ ভাবে এ দাম নির্ধারণ করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এলাকাভিত্তিক মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবার চামড়ার বেচাকেনা । দুই ক্যাটাগরির ব্যবসায়ীদের হাত বদল হয়ে আড়তদারদের হাতে পৌঁছে গবাদি পশু ও ছাগলের চামড়া। কুমিল্লার প্রায় অর্ধশতাধিক আড়ৎদার এলাকাভিত্তিক বেপারিদের কাছ থেকে এসব চামড়া সংগ্রহ করেন। কুমিল্লায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েকশত লোক অংশ নেন এই মৌসুমি ব্যবসায়। কিন্তু এলাকাভিত্তিক মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের দাপটে আড়ৎদাররা ছিল অসহায়। তারা কোরবানি দাতাদের কাছ থেকে কিনেছেন কম দামে। আর তা আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেছেন প্রায় দ্বিগুণ দামে। কোথাও গবাদি পশুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৮০ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হয়। এর ফলে বাড়তি দামে কেনা চামড়া ট্যানারিতে সরবরাহ করলে উপযুক্ত দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কাঁচা চামড়ার আড়ৎদাররা এলাকাভিত্তিক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কেনার পর তা নির্ধারিত গুদামে নিয়ে যায়। লবণ মাখিয়ে তা আগামী ১/২ সপ্তাহ পর্যন্ত গুদামে সংরক্ষণ করা হবে। এরপর দরকষাকষি করে ট্যানারির মালিকদের কাছে সরবরাহ করা হবে বলে আড়তদাররা জানান।

চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বছর ৩ হাজার ২শ’ কোটি টাকার চামড়া বিদেশে রপ্তানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার চামড়া শুধু কোরবানির মৌসুমে রপ্তানি হয়। আর ২/৩ মাস পর থেকে রপ্তানি শুরু হবে। কোরবানির চামড়ার টাকা গরীব দুঃস্থ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা ও এতিমখানায় প্রদান করতে হয়। কিন্তু কিছু জায়গায় প্রভাবশালী স্থানীয় যুবকদের কাছে কম মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন চামড়া মালিকরা। ফলে কোরবানির চামড়ার টাকা গরীব দুঃস্থ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা ও এতিমখানায় প্রদান করা সম্ভব হয়নি অনেক জায়গায়। চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কুমিল্লায় এবার প্রায় লক্ষাধিক কোরবানীর পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে।

Check Also

লাকসাম-মনোহরগঞ্জের বিএনপি’র সাবেক এমপি আলমগীরের জাতীয় পার্টিতে যোগদান

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা-১০ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) বিএনপি’র সাবেক এমপি এটিএম আলমগীর জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেছেন। সোমবার জাতীয় ...

Leave a Reply