অবহেলিত হরিজন সম্প্রদায়

এস এম নাজমুল হক ইমন :

ছবি -এস এম শরিফুল হক ইমন
রাত দুপুরে সভ্যতা যখন ক্লান্ত হয়ে ইটের পরে মাথা রাখে। ঘুমায় দীর্ঘটানা ঘুম তখনও একদল মানুষ নিজেদের ব্যস্ত রাখে। শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলি-গলি হয়ে বাজার, বাসস্ট্যান্ড, অফিস আদালত চত্বর পযর্ন্ত যাতের হাতের ছোয়া একদিন না পড়লে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আমাদের এই সুন্দর নগর-সভ্যতা। তারা আমাদেরই-এ সমাজের। আমাদের মতই রক্তে-মাংসে গড়া। আমাদেরই মতো পরিচয়দানকারী মানুষ। আমরা কেউ ঝাড়–দার; কেউ পরিচ্ছন্ন কর্মী বা ক্লিনম্যান অথবা ক্লিনার বলে ডাকি। আবার কেউ কেউ পরিচ্ছন্ন সেবক হিসেবেও আখ্যায়িত করি । নিজেদের হরিজন সম্প্রদায় বলে পরিচয়দানকারী এ মানুষগুলোর সংখ্যা সমাজে কম নয়। অন্য সব মানুষের মতো তাদেরও জীবনে সুখ আছে, দুঃখ আছে, ব্যাথা আছে, বেদনা আছে। আছে চাওয়া পাওয়া। আমরা তাদের নিত্যদিনের সুখ-দুঃখের কতটুকুই-বা খবর রাখি। জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও আমরা প্রতিদিন তাদের মুখোমুখি হই। ঘর থেকে বের হলেই ঝাড়– হাতে, বেলচা হাতে, ছোট্ট ট্রলি হাতে আমাদের উচ্ছিষ্ট সব জড়ো করে নিয়ে যায়। আমরা কি ভেবে দেখেছি নিজেরা আমরা কতটুকু পরিবেশ সচেতন ? বগুড়ার সান্তাহারের কয়েকটি এলাকায় বসবাস করে হরিজন সম্প্রদায় বা প্রচলিত ভাষায় সুইপার। তাদের নিয়ে নানা মানুষের মধ্যে নানান কৌতুহল। আর সেই হরিজন সম্পদায়ের লোকেরা আমাদের সমাজে নানা ভাবে অবহেলিত। তাদের কথা গুলো সবাইকে জানাতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হলো।

আদিবাসস্থান
ভারতে অচ্ছুৎ বা অস্পৃশ্য নিম্ন হিন্দু শ্রেনীর সম্প্রদায়ভুক্ত এ জন গোষ্ঠী হরিজন নামে পরিচিত। তাদের আদিবাস স্থান ভারতের উত্তর প্রদেমের কানপুর এবং অন্ধ্রপ্রদ্রেমর তেলেগু। সান্তাহারে তেমন কেউ বলতে পারে না কিভাবে সান্তাহারে এরা স্থায়ী হলো তবে ধারনা করা হয়, সান্তাহার যেহেতু ষ্টেশন জংশন সেহেতু এই রেলওয়ের কাজেই এরা এখানে স্থায়ী আর এই হরিজন বা সুইপাররা বৃট্রিশদের জন্যই সান্তাহারে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করছে। আর বংশানুক্রমেক এর পরিধি ও জন সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে।

সমাজ ব্যবস্থা
হরিজনদের সমাজ ব্যবস্থার বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়্ পিতৃপ্রধান পরিবার। সমাজে বিভিন্ন গোষ্ঠী দ্বারা বিভক্ত। প্রত্যেক গোষ্ঠীতে সর্দার বা মন্ডল আছে একটি করে। কতকগোষ্ঠী মিলে যে সমাজ গঠিত হয় সেই সমাজ আবার একজন প্রধান সর্দার বা প্রধান মন্ডল থাকে।
সান্তাহারের কয়েকটি স্থানে এই হরিজন বা বাঁশফোড় বার সুইপার শ্রেনীর লোকেরা বসবাস করে। সান্তাহার চা-বাগান কলনী, চা-বাগান ড্রাইভার কলনি, হাউজিং কলনী। এছাড়া নওগাঁ শহরেরও অনেক হরিজন মানুষেরা বসবাস করে মুরগীহাটি বাজার, কাজীর মোড়।
আর এছাড়া সৈয়দপুর, দর্শনা, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী, ঢাকার কিছু এলাকায় এই হরিজন সম্প্রদায়ের লোকেরা বসবাস করে।
সান্তাহারে হরিজনের মধ্যে আবার দুই ধরনের হরিজন বসবাস করে। যাদের একটি অংশ কানপুরী, অন্য অংশ হলো তেলেগু। আর এই দুই সম্প্রাদয়ের তথা পুরো সান্তাহরে বসবাসরত হরিজন বা সুইপারদের সংখ্যা প্রায় ২৮০০/৩০০০ বা তারও বেশি। হরিজনদের মধ্যে যে একটু জ্ঞানী বা বয়স্ক লোক থাকে তাকেই সর্দার বা মন্ডল বানিয়ে দেওয়া হয়। নানা সমস্যার সমাধান এই সর্দার বা মন্ডল দিয়ে থাকেন।

ধর্মীয় আচার
হরিজনরা নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষার অধিকারী। তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে রয়েছে নিজস্ব স্বকীয়তা। সনাতন ধর্মাবলম্বী। পূজা-পার্বণ নিজেদের রীতি বা পশ্চিমা রীতিতে করে থাকে। বড় উৎসব দূর্গা পূজা। এছাড়া দীপাবলী বা কালীপূজায় অনেক আনন্দ করে থাকে তারা। কলনীতে শিব মন্দিরও আছে।

বিবাহ পদ্ধতি
বাংলাদেশী হিন্দু সমাজ ব্যবস্থায় যেমন কলাগাছ পুতে সাতপাক ঘুরতে হয় তাদের বেলায় ও সাতপাক অবশ্যই ঘুরতে হয়, তবে তা কলা গাছ পুতে নয়। তারা সাত পাক ঘুরে মারোয়া কে ঘিরে। মারোয়া নামক কাঠের দন্ডকে এই হরিজন বা সুইপার সম্প্রদায় দেবতাতুল্য জ্ঞান করে।
গোত্র ভিত্তিক বিবাহ হয়। এক গোত্র বা গোষ্ঠী অন্য গোত্রে বিবাহ নেয়না, দেয় না। পরিবারের প্রদানরা বিয়ের বর কনে পছন্দ করে। বিয়েতে মন্ত্র পাঠ হয়। পুরহিত বা তাদের ভাষায় ব্রাক্ষন মন্ত্রপাঠ করে । বিয়ের দিন-ক্ষন ব্রাক্ষন পাঞ্জি-পুথী দেখে নির্ধারন করতে হয়। প্রতিটি কলনীকে কমপক্ষে একটি করে ব্রাক্ষন আছে। বছরের তিন মাস মাঘ, ফাল্গুন ও বৈখাশ মাসে বিবাহ হয়। বিয়েতে প্রচুর ধুমধাম ও আনন্দ করে থাকে।

আবাসন সমস্যা
হরিজন সম্প্রদায়ের লোকেরা চরম ভাবে আবাসন সংকটে ভোগেন। প্রতিনিয়ত যে ভাবে মানুষ বাড়ছে সে পরিমানে বসবাসের জায়গা বাড়ছেনা। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধি ফলে হরিজন সম্প্রদায়ের লোকেরা যে এলাকায় বসবাস করে সে এলাকা স্বাস্থ্যকর থাকে না। থাকার সমস্যা এর পাশাপাশি টয়লেট আর গোসল খানারও সমস্যার আন্ত নেই।

শিক্ষা ব্যবস্থা
সান্তাহারের হরিজন সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের জন্য ভালো শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। চা-বাগান কলনীতে একটা ব্র্যাক স্কুল আছে তাতে কোনো মতে ক্লাশ টু পর্যন্ত পড়ানো হয়। এছাড়া কিছু কিছু সংস্থা তাদের ছেলে মেয়ের পাশে এসে দাড়িয়েছে। আরকো সংস্থা, বরেন্দ্র সমাজ উন্নয়ন ভূমি (বিএসডিও) ইত্যাদি। এছাড়া সমাজে বর্ণ বৈষম্য ও আর্থিক দীনতার কারনে দুরের স্কুলে পাঠিয়ে তাদের ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া করানো হয়ে ওঠে না।

বেকার সমস্যা
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেকার সমস্যা নিরসনে যুব-সমাজকে প্রযুক্তিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা আবশ্যক। কিন্তু হরিজনদের কেউ কোন কাজ দিতে চায় না। সমাজ এখনও তাদের বাকা চোখে দেখে। এতে করে বেকার যুবকরা হতাশায় ভুগছে।

অতীত ও বর্তমান
নিজ পেশাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে তারা পালন করে। পূর্ব পুরুষরা যে কাজ করে এসেছে তারাও করে সে কাজ। পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় যাওয়া সম্পর্কে অনেকে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন- কেউ তাদের চাকুরি দিতে চায় না। অন্য চাকুরিতে তাদের কেই অংশগ্রহন করলেও তাদের মূল পরিচয় পাওয়ার পর চাকুরি আর হয়ে ওঠে না। এমনকি নিজেদের পেশায় এখন সরকার নিয়োগ দেয়া কমিয়ে দিয়েছে। অন্য ধম্বাবল্বীদের চাকরি দিয়ে তাদেরকে বঞ্চিত করছে।

কাজের সময়সীমা
সপ্তাহে সাতদিই কাজে যেতে হয়। কাজ করতে হয় দৈনিক কমপক্ষে ৮ ঘন্টা। নিয়মিত যারা তারা সরকারি বেতন-ভাতা পায়। আর যারা অনিয়মিত তাদের কাজ নেই মজুরি নেই এই ভিত্তিতে। যেদিন কাজ করে সে দিন মাস্টার রোলে বেতন পায়। রোড ক্লিনার, ড্রেন ক্লিনার ইত্যাদি কাজে দৈনিক পরিশ্রম করে।

সংগঠন
নিজেদের মধ্যে ঐক্য, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তারা একটি সংগঠন গঠন করছে। সংগঠনটির নাম হরিজন কল্যান উন্নয়ন সমিতি। হরিজন বা স্পুারা যে যে এলাকায় এলাকায় থাকে সে এলাকায় এক বা একাধিক মন্ডল আছে। তারাই সেই কলনীর মধ্যে মনি হয়ে থাকেন। সান্তাহারে যে হরিজন কল্যান সমিতি আছে তার সভাপতি যুমনা বাঁশফোড় আর সাধারন সম্পাদক কৃষ্ণা বাঁশফোড়। আর বিভিন্ন এলাকার মন্ডলেরা হলো- শিবুজান বাঁশফোড়, বাদশা বাঁশফোড়, সুরেষ বাঁশফোড়, মোহনলাল বাঁশফোড়। তারা এলাকার বিভিন্ন সমস্যা অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করে। হরিজন সম্প্রদায়ের লোকেরা যারা সান্তাহারে আছে তারাও তাদের মান্যগন্যই করে।

-লেখক-ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও ফিচার
সান্তাহার, বগুড়া।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply