প্রতিবছর থ্যালাসিমিয়ায় আক্রান্ত ৭ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে


নিত্যগোপাল :
শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে বেড়েই চলছে অনিরাময়যোগ্য মরণব্যাধি থ্যালাসিমিয়া। এটি একটি জিনগত রোগ হলেও সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এ ব্যাধিটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। ঢাকা শিশু হাসপাতালে একটি পূর্ণাঙ্গ থ্যালাসিমিয়া সেন্টার থাকলেও রোগীর আধিক্যের কারণে সেটিও পর্যাপ্ত সেবা দিতে পারছে না। আর এসব কারণেই প্রতিবছর থ্যালাসিমিয়ায় আক্রান্ত প্রায় ৭ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে বলে সূত্র জানায়।

গত কয়েকদিনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, থ্যালাসিমিয়া হিমোগোবিন

ডিজঅর্ডার জনিত একটি বংশগত রোগ। পিতা-মাতা বাহক হলে সন্তানের মধ্যে জিনের মাধ্যমে এটি প্রবেশ করে। কিন্তু পিতা-মাতার একজন বাহক, অন্যজন স্বাভাবিক হলে জন্ম নেয়া শিশু থ্যালসিমিয়া সৃষ্টিকারি জিনের বাহক হবে তবে সে থ্যালাসিমিয়া রোগে আক্রান্ত হবে না । তবে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫কোটি মানুষ থ্যালসিমিয়া সৃষ্টিকারি জিনের বাহক। আর রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ।

শিশু হাসপাতালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ২০ ভাগ মানুষ এ রোগের বাহক। যার শতকরা ৪.১ভাগ বিটা থ্যালাসিমিয়া, ৬.১ভাগ হিমোগোবিন ই, ১০ভাগ বিটাথ্যালাসিমিয়া ও হিমোগোবিন ই এর বাহক। এছাড়া প্রতি বছর থ্যালাসিমিয়ায় আক্রান্ত ৭৪৮৩টি শিশু জন্ম নিচ্ছে ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছে, চিকিৎসা দিয়ে এ রোগ নিরাময় সম্ভব নয়। প্রতিরোধই এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়। কেননা বাবা-মা বাহক হওয়ার ফলে এটি সন্তানের মাঝে সংক্রমিত হয়। অন্যদিকে এটি একটি ব্যয় বহুল রোগ। জানা যায়, থ্যালাসিমিয়ায় আক্রান্ত একজন রোগির মাসিক ন্যূনতম ব্যয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা।

থ্যালাসিমিয়া সেন্টারের কাউন্সিলর কামরুন্নাহার বলেন, এ রোগটি অতন্ত ভয়াবহ। শুধুমাত্র বাবা-মার অজ্ঞতার কারণেই যে রোগটির সৃষ্টি, তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কোন উদ্দোগ নেই। অথচ সরকার এর চেয়ে গুরত্ব কম এমন অনেক রোগ নিয়ে কাজ করছে।

এ সম্পর্কে ঢাকা শিশু হাসপাতাল থ্যালাসিমিয়া সেন্টারের সভাপতি অধ্যাপক ওয়াকার এ খান বলেন, প্রতিষেধক দিয়ে কাজ হবে না। প্রতিরোধ করতে হবে। কারণ এটি একদিকে যেমন সম্পূর্ণ জিনগত সমস্যা অন্যদিকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আর এ জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক ভিত্তিক জনসচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ নিয়ে কাজ করার কোন প্রস্তাব করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বাংলাদেশ সময়কে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি মহোদয়ের সংগে আলোচনা হয়েছে। তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেছেন।

এ রোগের প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে থ্যালাসিমিয়া সেন্টারের বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ সেলিমুজ্জামান বলেন, বিয়ের আগে অব্যশই হিমোগোবিন ইলেকট্রোফরেসিস নামের রক্তের পরীক্ষা করে নিতে হবে। এছাড়া যারা হিমোগোবিন ডিজঅর্ডারের বাহক তাদের নিজের বংশের কাউকে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

এদিকে রাজধানীর ছোট বড় বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, কোন হাসপাতালেই এ রোগটির চিকিৎসার জন্য নেই কোন ব্যবস্থা। গ্রাম অঞ্চল থেকে আগত রোগীরা সরকারি কোন সহায়তা না পাওয়ায় অনেকেই ফিরে যাচ্ছে নিরাশ হয়ে। কুষ্টিয়া থেকে আগত তেমনি এক রোগী সোনিয়া খাতুন মায়ের সঙ্গে এসেছেন বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশ সময়কে সোনিয়া বলেন, এ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা নেই বলে বাড়ি চলে যাচ্ছি। মেয়ের এ পরিণতির জন্য মা শান্তা বেগম নিজেকে দায়ী করে বলেন, সন্তান নেওয়ার আগে যদি জানতাম তাহলে আজকে আমার মেয়ের পরিণতি এরকম হতো না। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ রোগটির চিকিৎসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সতন্ত্র কোন ব্যবস্থা নেই। হেমাটোলজি বিভাগের মাধ্যমেই কাজ চালানো হচ্ছে। যেখানে রক্ত পরীক্ষা আর নামে মাত্র কিছু ওষুধপত্রেই চিকিৎসা সিমাবদ্ধ থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চিকিৎসক জানান, এখানে থ্যালাসিমিয়ার চিকিৎসার জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তিনি বলেন শুধু চিকিৎসার সুযোগ না বাড়িয়ে সরকারের উচিত ব্যাপকভাবে জনসচেতনা গড়ে তোলা।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply